তৃতীয় পর্ব

ইউরোপের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলসমূহ

0
1

।। উবাই মারমা ।।

তৃতীয় পর্ব
ইউরোপের কয়েকটি দেশের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা সম্পর্কে এখানে ধারাবাহিকভাবে যে আলোচনা করা হচ্ছে আজকে তার তৃতীয় পর্বে ডেনমার্কের গ্রীনল্যান্ড।

গ্রীনল্যান্ড, ডেনমার্ক (Greenland, Denmark)
গ্রীনল্যান্ডের মোট আয়তন ২১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গ কিলোমিটার। ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী দ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র ৫৬,৩৭৫ জন। এর রাজধানী নুউক (Nuuk), সরকারী ভাষা দুইটি: ইনুকটিটুট ও ড্যানিশ। ১৯৭৯ সালে গ্রীনল্যান্ডে স্বায়ত্তশাসন চালু করা হয়।

map_of_greenland

১১ শতাব্দীতে উত্তর আমেরিকার ইনুইট এবং স্ক্যান্ডেনেভিয়ান ভাইকিংরা প্রথম গ্রীনল্যান্ডে বসতিস্থাপন করেন। ১৩৮০ সালে এটি ডেনিশ-নরওয়ের যৌথ রাজন্যবর্গের অধিকারে আসে এবং নেপোলিয়নীয় যুদ্বের পর তা একচ্ছত্র ডেনিশ সার্বভৌমত্ত্বের অধীনে চলে যায়। ১৯৪০ সালের এপ্রিলে নাৎসি বাহিনীর ডেনমার্ক দখলের আগ পর্যন্ত গ্রীনল্যান্ডের উপর ড্যানিশ নিয়ন্ত্রণ বলবৎ ছিল। ঐ বছর আমেরিকা দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের পর দ্বীপটি ডেনমার্কের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং ১৯৫৩ সালের সংবিধানে তা ডেনমার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়। তা সত্ত্বেও গ্রীনল্যান্ডকে একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা  হয়েছে এবং বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই তা করেছে। তারা সোভিয়েট রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সেখানে রণ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ থিউল বিমান ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৯৫১ সালে ডেনমার্ক ও আমেরিকা দ্বীপটির যৌথ প্রতিরক্ষার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। শীতল যুদ্ধের পর গ্রীনল্যান্ডের সামরিক গুরুত্ব হ্রাস পায়, তবে আমেরিকা এখনো সেখানে পরিকল্পিত মিসাইল বিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যুহ স্থাপনের জন্য ঘাঁটি স্থাপন করতে চাইছে।

ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ৩ দশকের অধিক সময় ব্যাপী গণ আন্দোলন চলার পর গ্রীনল্যান্ডের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন দেয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য গ্রীনল্যান্ড বিষয়ক ডেনিশ মন্ত্রী ১৯৭৫ সালে একটি কমিশন গঠন করেন। ১৯৭৯ সালে গ্রীনল্যান্ড এক গণভোটে এই কমিশনের প্রস্তাবিত স্বশাসন ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়। তার আগে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা ১৯৭৮ সালে গ্রীনল্যান্ডের সংবিধান প্রণয়ন করে এবং পরবর্তী বছর এপ্রিলে প্রথম বারের মতো স্বায়ত্তশাসিত সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধানটি বলবৎ হয় ১৯৭৯ সালের মে মাসে এবং ডেনমার্কের সংসদ ফলকেটিং গ্রীনল্যান্ড হোম রুল এ্যাক্ট পাস করে। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সাধারণ গণভোটে ডেনমার্কের জনগণ ইউরোপিয়ান কমিশনে যোগদানের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। অবশ্য গ্রীনল্যান্ডবাসীরা প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। তা সত্বেও ভোটের সামগ্রিক ফলাফলের কারণে  গ্রীনল্যান্ডও ডেনমার্কের সাথে ইউরোপিয়ান কমিশনে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে স্বশাসন ক্ষমতা লাভের পর বিদেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন বিষয়ক প্রদত্ত ক্ষমতা বলে গ্রীনল্যান্ড ১৯৮২ সালে ইউরোপিয়ান কমিশনের সদস্য পদ বিষয়ে একটি গণভোটের আয়োজন করে। মোট ৫৩ শতাংশ সদস্য পদের বিপক্ষে ভোট দেন। প্রধানত ইউরোপিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মৎস্য শিকারী জাহাজগুলো কর্তৃক গ্রীনল্যান্ডের মৎস্য শিকার এলাকায় অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ তৎপরতার কারণে ভোটের ফলাফল এরূপ হয়। ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারী গ্রীনল্যান্ড ইউরোপিয়ান কমিশনের সদস্য পদ প্রত্যাহার করে একটি “ওভারসিজ টেরিটরি” বা বিদেশী অঞ্চল হিসেবে নতুন সম্পর্ক স্থাপন করে।

গ্রীনল্যান্ডের আভ্যন্তরীণ সরকার ব্যবস্থার ধরণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্র, এর কাঠামো অনেকটা ফারো দ্বীপের সরকার কাঠামোর মতো। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট ল্যান্ডস্টিংগ-এর (সংসদ) হাতে। সদস্যগণ ৪ বছর মেয়াদের জন্য তিনটি সংসদীয় এলাকা থেকে আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো হলো এতাসুট (Atassut, brotherhood), দি ইনুইট ব্রাডারহুড পার্টি (মার্কসবাদী) এবং জাতীয়তাবাদী সিউমুত পার্টি। গ্রীনল্যান্ড ডেনিশ পার্লামেন্ট ফলকেটিং-এ দু’জন প্রতিনিধি পাঠিয়ে থাকে, যারা প্রত্যক্ষ ভোটে ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।

গ্রীনল্যান্ডের নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে ল্যান্ডসটায়ার বা নির্বাহী পরিষদের হাতে, যার প্রধান হলেন একজন লাগমাদুর বা প্রধানমন্ত্রী। নির্বাহী পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩ থেকে ৬ জন এবং তারা সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হন। গ্রীনল্যান্ডের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নির্বাহী পরিষদ বা ল্যান্ডসটায়ারের পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে। ১৯৭৯ সাল থেকে গ্রীনল্যান্ডে একজন হাই কমিশনার ডেনমার্কের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। ড্যানিশ সরকার গ্রীনল্যান্ডের বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা এবং বিচারিক ও অর্থ ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ত্ব করে থাকে। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রীনল্যান্ডের স্বশাসিত সরকার যে সব বিষয়ের উপর পূর্ণ ক্ষমতা লাভ করেছে সেগুলো হলো: স্থানীয় কর, মৎস্য, পরিকল্পনা, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, শিক্ষা, ধর্ম, সামাজিক সেবা এবং শ্রম। তবে সাধারণ বৈদেশিক সম্পর্কের উপর ডেনমার্কের কর্তৃত্ত্ব থাকলেও, গ্রীনল্যান্ডকে আলাদাভাবে বিদেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ১৯৮৫ সালে এই ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে, যখন গ্রীনল্যান্ড ইউরোপিয়ান কমিউনিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা যায় গ্রীনল্যান্ড ১৮টি জেলা আদালতে বিভক্ত। এই সব আদালতে প্রথম বিচার চাইতে হয়। আপীল যায় রাজধানী নুউক-এ অবস্থিত হাই কোর্ট ল্যান্ডসরেট-এ। এখানেই কেবল একজন পেশাদার বিচারক বা জজ বসেন। এই আদালতে গুরুতর মামলাগুলোর বিচার করা হয়। তার দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করতে হয় কোপেনহেগেনের হাইকোর্টে। গ্রীনল্যান্ডের ভাষা হলো গ্রীনল্যান্ডিক বা ইনুকটিটুট – এটি ইনুইটদের একটি ভাষা। আর ভাব আদান প্রদানের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় ড্যানিশ।

Source: The working autonomies in Europe by Thomas Benedikter.
——————-

সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.