কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে থাকতে পারেন: রাঙামাটি পুলিশ সুপার

1
1

সিএইচটি নিউজ.কম,
রাঙামাটি: গতকাল সোমবার ঢাকার সাংবাদিক রিফাত ইসলাম ঈসা, তামান্না খান ও মানবাধিকার কর্মী হানা শামস আহমেদের সাথে আলাপ কালে রাঙামাটি পুলিশ সুপার ও কল্পনা চাকমা অপহপরণের তদন্ত কর্মকর্তা আমেনা বেগম বলেছেন, তিনি প্রধান সন্দেহভাজন লে: ফেরদৌস (বর্তমানে মেজর), ভিডিপি নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে ইতিমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

কল্পনা চাকমা
কল্পনা চাকমা

তিনি বলেন, ফেরদৌস কায়সার খান তার বক্তব্য দেয়ার জন্য রাঙামাটি আসেন। ২০১৩ সালের জানুয়ারী দেয়া আদালতের আদেশ পাঠিয়ে চট্টগ্রামের জিওসির মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ হয়। ফেরদৌস এখন ময়মনসিংহে সামরিক স্কুলে কাজ করছেন।

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক তদন্ত কর্মকর্তার কাজ তদারক করার জন্য একজন সুপারভাইজার থাকেন। কিন্তু যেহেতু তিনি পুলিশ সুপার, তাই তার তদন্ত কাজ তদারক করার কেউ নেই। এটাকে তিনি একটা সমস্যা বলে মনে করেন।

হানা শামস আহমেদ রাঙামাটিতে আমেনা বেগমের সাথে সাক্ষাতের পর জানান, ”আমেনা বেগম বলেছেন ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাতে লে. ফেরদৌস উগলছড়ি ক্যাম্পে অন্য তিন আর্মি অফিসারের সাথে একই রুমে ঘুমিয়েছিলেন। সেজন্য তার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে তার এই বক্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা। লে. ফেরদৌস কজইছড়ি ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। কজইছড়ি ক্যাম্প থেকে উগলছড়ি ক্যাম্পে পায়ে হেঁটে ৪ ঘন্টায় যাওয়া যায়। তিনি (লে. ফেরদৌস) ১১ জুন সকালে কজইছড়ি থেকে উগলছড়ি যান পরদিন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য।”

“আমেনা বলেন, এ ব্যাপারে তার (আমেনার) সন্দেহ আছে যে, লে. ফেরদৌসের মতো পদাধিকারী ব্যক্তি এ রকম একটি অপরাধ করবেন।”

আমেনা বেগম Dhaka Tribune এর সাংবাদিক রিফাত ইসলাম ঈসা, ডেইলী স্টার প্রত্রিকার তামান্না খান ও মানবাধিকার কর্মী হানা শামস আহমেদকে আরো জানান, তিনি ইতিমধ্যে কালিন্দী কুমার ও লাল বিহারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

হানা বলেন, তবে মনে হয় তিনি কালিন্দী কুমার চাকমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। কালিন্দী কুমার চাকমার স্ত্রী হলেন কল্পনা অপহরণের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী।’

এসপি আমেনা জানান তিনি কিছুদিনের মধ্যে ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয় কেতন চাকমার সাক্ষ্য নেবেন। অপহৃত কল্পনা চাকমা সে সময় তার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।

এসপি আমেনা বলেন, ‘কালিন্দী কুমারের বর্ণনায় বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, যা পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেমন, কেন কালিন্দী এফআইআর-এ লে. ফেরদৌসের নাম যোগ করেননি, কেন তিনি একবার বলেছেন অপহরণকারীরা ছিল খালি পায়ে, আবার অন্য এক জায়গায় বলেছেন তিনি বুটের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন, এবং কেন ঘটনার পরদিন বাড়িতে কল্পনা চাকমার কাপড় চোপড় পাওয়া যায়নি অথচ তার কয়েক দিন পর সেগুলো দেখা যায়।’

হানা বলেন: আমেনার মতে লে. ফেরদৌস তার কর্তব্য পালনের সময় ছিলেন একজন “hyperactive” ব্যক্তি এবং তিনি শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। যেহেতু কালিন্দী কুমার ও লাল বিহারী শান্তিবাহিনীর সদস্য ছিলেন, তাই এটা তদন্ত করে দেখতে হবে যে এটা (কল্পনাকে অপহরণ) লে. ফেরদৌসের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য শান্তিবাহিনীর সাজানো ঘটনা ছিল কী না।

আমেনা বলেন কল্পনা চাকমা কোথায় আছেন সে সম্পর্কে তার কাছে কিছু তথ্য আছে। আমেনার মতে কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে থাকতে পারেন। তবে বাড়তি তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত তিনি এসব এখন প্রকাশ করবেন না।

আমেনা আরো বলেন, তদন্ত কাজের জন্য কালিন্দী কুমার ও লাল বিহারীর ডিএনএ স্যাম্পল দরকার। তিনি বলেন পুলিশকে ডিএনএ স্যম্পল দিতে কালিন্দী কুমারের অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে আদালত রায় দিয়েছেন। এ জন্য তিনি খুশী।

২০১৩ সালের জানুয়ারী রাঙামাটির এক আদালত এসপি আমেনা বেগমকে কল্পনা অপহরণের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেন। তখন ঐ বছর ৯ জুনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়।

আমেনা বেগমের আগে পর পর দুই পুলিশ কর্মকর্তা কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনা তদন্ত করেন। কিন্তু তারা কল্পনা চাকমার হদিস যেমন দিতে পারেননি, তেমনি চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদসহ তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতেও সুপারিশ করেননি। বরং রিপোর্টে এই দুষ্কৃতিকারীদের রক্ষা করা হয়েছে।

অপরদিকে, ড. অনুপম সেনকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত রিপোর্টেও পর্বতের মুষিক প্রসব করা হয়েছে; ঘটনা সম্পর্কে সেনাবাহিনীর ভাষ্যকেই তাদের রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে ও অপরাধীদের রক্ষা করা হয়েছে।

আমেনা বেগমের বক্তব্য সম্পর্কে কালিন্দী কুমার চাকমার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেরদৌসের নাম এফআইআর-এ বলিনি বলে যে অভিযোগ তার উত্তরে আমার বক্তব্য হলো,  ‘‘আমি এফআইআর কি জানি না তবে টিএনও এবং থানায় গিয়ে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করেছি। তারা লিখেছে কিনা আমি তা জানি না। তাছাড়া আমার কাছ থেকে স্বাক্ষরও রাখেনি। আমি আইন সম্পর্কে কিছুই জানি না। তারা কি বানিয়েছেন সেটাও জানি না। ”

তিনি আরো বলেন, পুলিশ সুপার আমেনা বেগম যে প্রশ্নগুলি উপস্থাপন করেছেন তা মিথ্যা এবং বানোয়াট। ঘটনার পরপর যে সমস্ত সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মি এসেছেন কল্পনা’র ঘটনা জানার জন্য তাদের মধ্যে প্রিসিলা রাজও এসেছিলেন। তারা সকলেই কল্পনা’র কাপড় চোপড় দেখে গিয়েছেন। তার রুমের কাপড়-চোপড়সহ বই পত্র উল্টে পাল্টে দেখেছেন। অহেতুক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। সেই শান্তিবাহিনীর কথাও সেই ধরনের। এসপি যখন এখানে এসেছেন তখন আমার কাছ থেকে কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার পর কারও সাথে কথা বলেননি। মিথ্যা এবং বানোয়াট ভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

আমেনা বলেছেন আপনি একবার অপহরণকারীরা খালি পায়ে ছিল আরেকবার জুতা পায়ে ছিল বলেছিলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে কালিন্দী কুমার চাকমা বলেন, অপহরণকারীরা জুতা পরিহিত নাকি খালি পায়ে ছিল সে কথা তিনি একবারও জিজ্ঞেস করেননি। সে বিষয়ে আমেনা বেগমের সাথে কোন আলাপ হয়নি।  তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন অপহরণকারীরা কোন দিক থেকে এসেছে? বাড়ির ভিতর ঢুকেছিল কিনা?

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি কণিকা দেওয়ান সিএইচটি নিউজ.কমকে বলেন, আমেনা বেগমের বক্তব্য থেকে পরিস্কার হয়েছে তার তদন্ত রিপোর্টও অতীতের তদন্ত রিপোর্টগুলোর মতোই হবে। তিনি মনে হয় কিছু preconceived idea নিয়ে তদন্তে নেমেছেন। তা নাহলে তিনি তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কিভাবে বলতে পারেন লে. ফেরদৌসের মতো লোক ওই ধরনের অপরাধ করতে পারে না, যেখানে নারায়ণগঞ্জে র‌্যারের মেজর পদ মর্যাদার কর্মকর্তা পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে নিরীহ লোক খুন করছেন? সুতরাং তার বক্তব্যে এটা ধরে নেয়া অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত যে, তার তদন্ত রিপোর্টও কখনোই নিরপেক্ষ হবে না।
————-

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.