শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
সংবাদ শিরোনাম

খণ্ডিত গণতন্ত্রের পরিণতি : ‘অপারেশন উত্তরণ’ ও নিবর্তনমূলক ‘১১দফা নির্দেশনার’ সম্প্রসারণ এখন সমগ্র দেশে

॥ রাজনৈতিক ভাষ্যকার 

বিরোধী দল বিএনপি’র লোকেদের মুখে এখন বহুল উচ্চারিত কথা হচ্ছে ‘দেশে এখন গণতন্ত্র নেই’। শুধু বিএনপি নয়, আওয়ামী ঘরণার বাইরের সবারই একই কথা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে নিপীড়ন নির্যাতন চলছে, সে কারণে তারা এ অভিযোগ করে থাকে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে যুগ যুগ ধরে তার চেয়ে বেশি নির্যাতন চলে আসছে। এমনকী বিএনপি’র শাসনামলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে একই ধারা অব্যাহত ছিল। বিএনপি’র কথিত ‘গণতন্ত্র’ পার্বত্য চট্টগ্রামে কখনই ছিল না। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি জনগণ যে নিপীড়ন বঞ্চনার শিকার হয়েছিল, বর্তমানেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের একই দশা চলছে।

কোন অঞ্চল, বিশেষ জাতিসত্তার জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে খণ্ডিতভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিণাম কখনই শুভ হয় না। পূর্ব পাকিস্তানে যদি পশ্চিম পাকিস্তানিরা শোষণ-বৈষম্য ও দমন-পীড়ন না চালিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করত, তাহলে হয়ত ইতিহাস অন্য রকম হতো। দমন-পীড়ন চালিয়ে খণ্ডিতভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইলে আখেরে তার খেসারত দিতে হয় সবাইকে। এবারের ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের’ মাধ্যমে এ সত্য আবারও প্রতিপন্ন হলো। এত দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূখ-ের জনগণ যে অন্যায়-অবিচার-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে এই নিপীড়নের থাবা বিস্তৃত হয়েছে সমগ্র দেশে।

বস্তুত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ তার কুৎসিত চেহারা ঢেকে রাখতে সক্ষম হয় নি। তাদের অঙ্গুলি হেলনে চালিত হয়ে সাংবিধনিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনও জনগণের আস্থা খুইয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবৎকালে সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে পক্ষপাতমূলক আচরণ করে আসছিল, এবার তার সম্প্রসারণ হলো সমগ্র দেশে। যে সেনাবাহিনীর ওপর ঐক্যফ্রন্ট বেশ ভরসা করেছিল, সেই সেনবাহিনীও তাদের নিরাশ করেছে। ঐক্যফ্রন্ট যে সময়ে সেনাবাহিনীর ‘মেজিস্ট্রিসি’ ক্ষমতার দাবি জানিয়েছিল, তখনও সেনা অভিযানে পার্বত্য চট্টগ্রামে  পাহাড়ি জনজীবন ছিল পর্যূদস্ত। স্বাভাবিকভাবে এ দাবিতে পাহাড়ি জনগণ শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা গণবিরোধী আইন তৈরি করে সরকার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের মিডিয়া অনেক আগে থেকে সেনা-সরকারের নিয়ন্ত্রিত। নির্বাচনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে এটাই বেরিয়ে আসে যে, মিডিয়াসহ সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী– রাষ্ট্রের সমস্ত সংস্থাকে আওয়ামীলীগ নিজ দলীয় অঙ্গসংগঠনে পরিণত করেছে। এক কথায় বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণিত হয়েছে।

এখানে আরও স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর হাসিনা সরকার জনসংহতি সমিতির সাথে ‘পার্বত্য চুক্তি’ সম্পাদন করলেও দীর্ঘ ২২ বছরেও তা বাস্তবায়ন করে নি। হাসিনা সরকার জনসংহতি সমিতি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। তেমনি নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বানে সংলাপ করলেও সেটা ছিল আইওয়াশ মাত্র। সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের কোন দাবিই আওয়ামীলীগ মেনে নেয় নি, তালগাছটি বরাবরের মতোই আওয়ামীলীগের ছিল। বারে বারে দেখা যায়, ছলচাতুরি ও প্রতারণা হচ্ছে আওয়ামী রাজনীতির অংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা ১১ নির্দেশনা সংক্রান্ত সার্কুলার

লক্ষ্য করার বিষয় এই, স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে আওয়ামীলীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে যে দমন নীতি গ্রহণ করে তার ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন উত্তরণ’ দমনমূলক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অবৈধ ‘১১দফা নির্দেশনা’র মাধ্যমে এখনও ফৌজি শাসন জারি রেখেছে। বিএনপি’র আমলেও এ নীতির ভিন্ন কিছু ছিল না। অতীতে যা করে থাকুক না কেন, এ নির্বাচনে বিএনপি’র একটা সুযোগ ছিল নিপীড়ন নির্যাতনে পর্যূদস্ত পাহাড়িদের সাথে একাত্ম হয়ে তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবার। কিন্তু বাস্তবত তা দেখা যায় নি। বিএনপি যে চরিত্রের দল, তার পক্ষে তা করা সম্ভবও নয়। বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলনের যে রূপরেখা তৈরি করেছিল, তাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়টি অস্পষ্টই ছিল। এ দুঃসময়েও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে সমগ্র দেশের সাথে একই হিসাবে ধরে নি। এ যাবৎকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়নের প্রতিবাদে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাম প্রগতিশীল দলগুলোর ভূমিকাও নৈরাশ্যজনক। যার পরিণামে দেশ এখন ফ্যাসিবাদী দৈত্যের কবলে পতিত।

দেশে অন্যতম বৃহৎ দল হিসেবে বিএনপি’র যে সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনসমর্থন ছিল, দুর্নীতিসহ নিজেদের নানাবিধ ভ্রান্ত কার্যকলাপের কারণে দলটি অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিএনপি যদি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জনগণের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে আন্দোলন সংগঠিত করতে সক্ষম হতো (আগেই বলা হয়েছে চরিত্রগত কারণে তা সম্ভব নয়), তাহলে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এত দমন-পীড়ন চালানো সম্ভব হতো না। বিএনপি’র এ দুর্বলতার সুযোগে আওয়ামীলীগ নিজেদের “সংখ্যালঘু দরদী” হিসেবে জাহির করে ফায়দা লোটে। দেশের প্রগতিশীল বাম দলসমূহের দুর্বলতাও প্রবাদে পরিণত হতে চলেছে। সব কিছুর পরও ক্ষমতাসীন দল যত আইন-কানুন তৈরি করে মানুষের কণ্ঠরোধ করতে চেষ্টা করুক, সাধারণ জনগণ তা কখনই মেনে নেবে না।

মোটকথা দেশে কার্যকর বিরোধী দলের শূণ্যতা, গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের দুর্বলতা, মেরুদ-হীন একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর তোষামোদ ও ক্লীবতা এবং নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া (কোন কোন ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক ভূমিকা)– সব মিলিয়ে দেশে এক নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে। কোন পক্ষ থেকে বড় ধরনের প্রতিবাদ ও আন্দোলন সংগঠিত না হওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের দৌরাত্ম্য বেড়ে যেতে থাকে, ক্রমেই দলটি তার ফ্যাসিবাদী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘অপারেশন উত্তরণ’ ও সংবিধান বিরোধী অবৈধ ‘১১দফা নির্দেশনা’র মাধ্যমে শুরু করে এখন সারা দেশে তা প্রয়োগে সরকার উদ্যত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সকল সংখ্যালঘু জাতি ও দেশের সমগ্র জনগণের স্বার্থ মাথায় রেখে নতুনভাবে রাজনীতির চিন্তা করাই হচ্ছে এখন বর্তমান সময়ের দাবি।#

সৌজন্যে : ক্রান্তিকালের প্রতিধ্বনি, বুলেটিন নং-০৪, প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০১৯

———————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.