খাগড়াছড়ি জেলায় প্রত্যন্ত বহু গ্রামে তীব্র পানির সংকট

0
0

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটিনিউজ.কম
Pani-songkotখাগড়াছড়ি জেলায় পানির উৎস হিসেবে নদী খালের কিনারা কুয়ার ওপর নির্ভরশীল এমন গ্রামের লোকজন তীব্র পানির সংকটের মধ্যে দিন যাপন করছে। গ্রীষ্মের তীব্র গরম, খরা, নির্বিচারে গাছ কাটা ও বন উজারের কারণে নদী, খালের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। এই বিপর্যয় থেকে পরিবেশকে রক্ষার জন্য জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও বন রক্ষার উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা।

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর ও মহালছড়ি উপজেলার জনপদগুলি চেঙ্গী নদীর তীর ঘেষেই গড়ে উঠেছে। এই তিন উপজেলার প্রধান নদী হলো চেঙ্গী নদী। অতীতে এসব এলাকায় যোগাযোগের সহজ উপায় ছিলো খড়স্রোতা এই চেঙ্গী নদী। এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সেই খড়স্রোতা চেঙ্গী এখন মৃত্যুর মুখোমুখী। চেঙ্গী নদীর উপ-নদীগুলোর অবস্থা আরো বেশী শোষণীয়। খাগড়াছড়ি সদরের ছোট ও বড় গাছবান ছড়া, ঠাকুরছড়া খাল, খাগড়াছড়ি খাল, কমলছড়ি খাল মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এসব ছড়া ও খালের ওপর নির্ভরশীল গ্রামগুলোর মানুষের অবস্থা আরো বেশী শোচণীয় হয়ে উঠছে।

গত মংগলবার খাগড়াছড়ি সদরের পেরাছড়া ইউনিয়নের তৃতীয় কুমার পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, এই গ্রামের লোকজনের একমাত্র পানির উৎস বড় গাছবান ছড়া। এই ছড়াটি এখন শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। গ্রামের লোকজন ছড়ায় মাটির বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ করে কোন রকমে গোসল ও ধোঁয়ার কাজ সম্পন্ন করছেন। খাগড়াছড়ি শহর থেকে বার কিলোমিটার দূর এই গ্রামটি আরো কিছুদিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে পানির শেষ উৎসও শুকিয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই গ্রামের বাসিন্দা সিন্ধু কুমার ত্রিপুরা জানান, ছোটকাল থেকে এই ছড়ার পানি এভাবে শুকাতে কখনো দেখিনি। গত ৫-৬ বছর থেকে বড় গাছবান ছড়ার পানি শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলে সিন্ধু কুমার ত্রিপুরা মনে করেন, বন উজার হওয়ার কারণে ছড়ার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে।

এককালে কমলছড়ি খালও খড়স্রোতা ছিলো। কমলছড়ি খালের পানি গড়িয়ে চেঙ্গী নদীর সাথে মিশে যেতো। এখন শুকনো মৌসুমে কমলছড়ি খালের পানি চেঙ্গী নদী পর্যন্ত গড়ায় না। তার আগেই শুকিয়ে যায়। কমলছড়ি গ্রামের কৃষক বিভূতি চাকমা বলেন, কমলছড়ি খালের পানির ওপর নির্ভর করে শত একর জমিতে বোরো চাষ চলছে। এখন শুধু চাষের জন্য কমলছড়ি খালের পানিও সংকুলান হচ্ছে না। খালের পানি চেঙ্গী নদী পর্যন্ত যাওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সদর উপজেলায় একই ভাবে ছোট গাছবান, খাগড়াছড়ি খাল, ঠাকুরছড়া খাল, গুগড়াছড়ি, কুকিছড়া খাল গুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। এসব ছড়া-খালের ওপর নির্ভরশীল বহু গ্রামের মানুষ এখন তীব্র পানির সংকটে ভূগছে।

খাগড়াছড়ি সদরের স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতি পবিবেশ বিষয়ে সচেতনতার ওপর বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের কর্মকর্তা ছিলেন অমল ত্রিপুরা। তিনি বলেন, পাহাড়ে আমরা বনের ওপর নির্দয় অত্যাচার করেছি। এর প্রতিশোধ হিসেবে প্রকৃতি এখন আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। খাগড়াছড়ির বহু গ্রাম এখন তীব্র পানির সংকটের মধ্যে রয়েছে। একমাত্র পানির উৎসগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে। গাছ লাগানো, বনকে সংরক্ষণ করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।

এদিকে গত বৃহষ্পতিবার সকাল নয়টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে গিয়ে দেখা যায় অধিকাংশ অফিস বন্ধ। কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা নেই। ১৬টি সরকারী দপ্তরের মাঝে উপস্থিত পাওয়া গেল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মাত্র দু’জনকে। কারন অনুসন্ধানে জানা গেল উপজেলাটিতে মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম উপাদান পানিসহ নানা সংকটের কথা। অনেকে বলেছেন শুধু বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারনে চাকুরীস্থলে থাকতে চান না সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

খাগড়াছড়ির দুর্গম উপজেলা লক্ষীছড়ি । আয়তন মাত্র ২৪০ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের নব্বইভাগ এলাকা পাথুরে। পুরো উপজেলায় সব মিলিয়ে ছয় হাজার পরিবারে ২৬ হাজার লোকের  বসবাস। সকলের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ-বিশুদ্ধ পানির অভাব। জীবন ধারনের জন্য খাল-বিল ও ঝর্ণার পানি খেয়ে প্রায় পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয় শিশুসহ সব বয়সের লোকজন। উপজেলার  বিভিন্ন ধরনের ২৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই পানির ব্যাবস্থা । ফলে পানির অভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।  সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বিগত সময়ে পুরো উপজেলায় ৪৩২টি টিউবওয়েল ও রিংওয়েল বসানো হলেও সচল নেই এগুলোর বেশীরভাগ । পুরো উপজেলা হেডকোয়ার্টারে সচল মাত্র দু’টি ডীপ টিউবওয়েল। দীর্ঘদিন ধরে পানির কষ্টে ভুগলেও স্থানীয় লোকজন ছাড়তে পারেননি পূর্ব পুরুষদের ভিটে কিন্তু সরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারীরা বদলী হয়ে আসলেও থাকতে চাননা এই উপজেলায়। ফলে সকল ধরনের নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত লক্ষীছড়িবাসী। পানির সংকট লক্ষীছড়ি উপজেলার প্রধান সমস্যা। জীবন ধারনের জন্য জমির কুয়ো-খাল-বিল ও ঝর্ণার পানি খেতে হয় । খেয়ে প্রায় পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয় শিশুসহ সব বয়সের লোকজন। প্রায় স্কুলে নেই পানির ব্যাবস্থা। চরম কষ্টে দিন কাটে ছাত্র-ছাত্রীদের। একই সমস্যায় কর্মকর্তা কর্মচারীরা থাকতে চায়না লক্ষীছড়িতে।

লক্ষীছড়ি উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুভাস কান্তি চাকমা জানান, পানিসহ জীবন ধারনের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় অফিসারেরা থাকতে চাননা লক্ষীছড়িতে।

লক্ষীছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ শওকত ওসমান জানান, পানি সমস্যার কারনে চাকুরী করতে আসা লোকজনের সমস্যা হয়। বিষয়টি অনুধাবন করে ইতিমধ্যে ১০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে।

খাগড়াছড়ি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সোহরাব হোসেন জানান, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় তাদের বসানো বেশীরভাগ টিউবওয়েল ও রিংওয়েল এখন অকেজো। জনবল সংকটে সব টিউবওয়েল ও রিংওয়েল দেখাশোনা সম্ভব হচ্ছেনা। তবে উপজেলা হেডকোয়ার্টারের পানি সমস্যা নিরসনে খুব শীঘ্রই একটি করে ডীপ টিউবওয়েল বসানো হবে।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.