বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

ঢাকায় পিসিপি’র সংহতি সমাবেশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি পেশ রামগড়ে বিজিবি-সেটলার হামলার তীব্র প্রতিবাদ

ঢাকা :  অবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবৈধ নির্দেশনা প্রত্যাহার ও সকল শিক্ষার্থীর সংবিধান স্বীকৃত অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে রবিবার (২৮ জানুয়ারি ২০১৮) ঢাকায় বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) এক সংহতি সমাবেশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি পেশ করেছে। সমাবেশটি ছিল পূর্বনির্ধারিত, এ উপলক্ষে পিসিপি একটি পোস্টার ও বুকলেটও প্রকাশ করে। খাগড়াছড়িতে ৮ জানুয়ারি আহূত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির তারিখ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যের সামনে সমাবেশ করার কথা থাকলেও ‘সচেতন ছাত্রসমাজ’ ব্যানারে একটি সংগঠন আকস্মিকভাবে একই সময়ে উক্ত স্থানে মানবন্ধনের কর্মসূচি দেয়। এ অবস্থায় পিসিপি’কে স্থান পাল্টিয়ে রাজু ভাস্কর্যের নিকট সমাবেশ করতে হয়। এতে অনুষ্ঠানে কিছুটা ব্যাঘাত সৃষ্টি হলেও পিসিপি’র কর্মীবাহিনী ছিল অবিচল। এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম থেকে পিসিপি ও এইচডব্লিউএফ-এর দেড় শতাধিক কর্মী-সমর্থক মধ্য রাতে ঢাকায় এসে পৌঁছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্কুলারের কারণে এমনিতে ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ, তার ওপর বিলাইছড়ির ফারুয়ায় সেনা কর্তৃক দুই কিশোরী ধর্ষণ, অপরাধ আড়াল করতে দালাল দিয়ে সংবাদ সম্মেলন আর রামগড়ে বিজিবি-সেটলার কর্তৃক পাহাড়ি গ্রামে হামলার ঘটনা যুক্ত হওয়ায় তা যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেয়ার সামিল হয়।

ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ব্যানারের ক্যাপশন ছিল “বিলাইছড়িতে দুই কিশোরী ধর্ষণ, রমেল-মিঠুন হত্যা, অব্যাহত ধরপাকড় নিপীড়ন, বস্তুভিটা বেদখল, শিক্ষার্থীদের কয়েদী বানানোর “অপারেশন” উত্তরণ বন্ধ কর!” এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আগত ও ঢাকাস্থ ছাত্র-ছাত্রীরা প্ল্যাকার্ড ধরে সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধভাবে সড়কের ওপর বসে পড়ে এবং বক্তাদের বক্তব্যের সমর্থনে শ্লোগান দেয়। লক্ষ্যণীয় যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অগণতান্ত্রিক সার্কুলার প্রত্যাহারের দাবির পাশাপাশি বিলাইছড়ি ও রামগড়ের ঘটনা সমাবেশে প্রাধান্য পেয়েছে। প্ল্যাকার্ডে বড় অক্ষরে শোভা পাচ্ছিল ‘রামগড়ে বিজিবি-সেটলার থামাও, আমাদের বাঁচতে দাও!’ ‘হাসিনা তোমার উন্নয়ন, আমাদের ধ্বংস ডেকে আনে!’ ‘আর কত পাহাড়ি গ্রাম ধ্বংস, লুটপাট আর ভিটেবাড়ি বেদখল হলে ‘অপারেশন উত্তরণ’ বন্ধ হবে!’ ‘পাহাড়ের নব্য রাজাকার মুখোশবাহিনীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!’ ‘CHT-এর শিক্ষার্থীরা কয়েদী নই, স্কুল-কলেজ হাজতখানা নয়’ ‘ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে জেলা পরিষদের প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ মানি না, বাতিল কর!’

পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সভাপতি বিনয়ন চাকমার সভাপতিত্বে সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র ঐক্যের সভাপতি এমএম পারভেজ লেনিন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী সভাপতি এবং প্রগ্রতিশীল ছাত্র জোটের অন্যতম সংগঠক ইকবাল কবির, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এর সভাপতি এবং প্রগতিশীল ছাত্র জোট সমন্বয়ক ইমরান হাবিব, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের সভাপতি বিপ্লব ভট্টচার্য ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা। উপস্থিত থেকে সংহতি জানান ল্যাম্পপোস্ট এর সাধারণ সম্পাদক নাহিদ সুলতানা লিসা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের রিপন চাকমা। সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বিপুল চাকমা। সভা পরিচালনা করেন পিসিপি’র সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমা।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দমনমূলক “১১ নির্দেশনা” জারির মাধ্যমে কার্যত পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। এতে করে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে অতিমাত্রায় একটি নির্দিষ্ট গ-ির বেড়াজালে আটকে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, নানিয়ারচর কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ১৯ নভেম্বর/১৭ অগণতান্ত্রিক সার্কুলার জারির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাজুক, ঢিলেঢালা শিক্ষা ব্যবস্থাকেও গলা টিপে হত্যা করার পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। তিনি সমাবেশ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি, অবৈধ এবং অগণতান্ত্রিক সার্কুলার প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানান।

বিপ্লবী যুব ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি বিপ্লব ভট্টাচার্য বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিত সেনাশাসন জারি রেখে পার্বত্য এলাকার সাধারণ জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করে তাদের বিলুপ্তির লক্ষ্যে নীল ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দমনমূলক “১১ নির্দেশনা” বাতিল এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত অগণতান্ত্রিক সার্কুলার প্রত্যাহারের জোর দাবি উত্থাপন করেন।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি এম এম পারভেজ লেনিন বলেন, সরকার বিভিন্ন ষড়যন্ত্র এবং সার্কুলার জারি করে জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার গণআন্দোলনকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবৈধ নির্দেশনা বাতিলের দাবিতে সকল ছাত্রসহ পাহাড় এবং সমতলের সর্বস্তরের জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণমুক্তির আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানান।

পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সভাপতি বিনয়ন চাকমা তার বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি বিশেষ মহলের ইশারায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের নানিয়ারচর কলেজের নবীন বরণ এর মত নিরীহ অনুষ্ঠানকে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ উল্লেখ করে গত ১৯ নভেম্বর/১৭-তে একটি অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ নির্দেশনা জারি করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবৈধ নির্দেশনায় নবীন বরণে ব্যবহৃত ব্যানারের শ্লোগানে একাংশ ‘রাজনৈতিক সমাধান’ এর স্থলে ‘রাষ্ট্রীয় সমাধান’ উল্লেখ করে, যা অত্যন্ত দুঃখের ও বিষ্ময়কর। প্রামাণ্য হিসেবে উক্ত অনুষ্ঠানের ব্যানারের ছবিও পিসিপি’র নিকট রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার অঘোষিত সেনাশাসন জারি রাখায় পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তার নামে নিয়োজিত সেনবাহিনী বেপরোয়াভাবে পাহাড়িদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন, নারী ধর্ষণ, খুন ও গুম এর মত লোমহর্ষক ঘটনা ঘটানোর মহোৎসবে মেতে রয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় গত বছর নানিয়ারচর সেনা জোনের অধিনায়ক লে. কর্ণেল বাহলুল আলম ও মেজর তানভিরের নেতৃত্বে সেনা হেফাজতে নানিয়ার কলেজের ছাত্র রমেল চাকমাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। অতি সম্প্রতিতে সেনাসৃষ্ট নব্য মুখোশ সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক ইউপিডিএফের খাগড়াছড়ি জেলার অন্যতম সংগঠক মিঠুন চাকমা সহ সাবেক ইউপি সদস্য অনাদি রঞ্চন চাকমা, বন্দুকভাঙা ইউপিডিএফ সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে দিন দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিলাইছড়ির প্রত্যন্ত গ্রামে ফারুয়া সেনা ক্যাম্পের সেনাসদস্য কর্তৃক দুই মারমা কিশোরী ধর্ষণ এবং গতকাল রামগড় হাচৌক পাড়া বিজিবির ছত্রছায়া পাহাড়িদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে এ যাবতকাল সংঘটিত ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি সেনাবাহিনীকে পার্বত্য এলাকার জন্য হুমকি হিসেবে মন্তব্য করেন। তিনি অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল প্রকার অবৈধ নির্দেশনা প্রত্যাহার, বিলাইছড়ি দুই মারমা কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সেনা সদস্যদের যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান এবং রামগড়ের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।

সংহতি সমাবেশ শেষে স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণকারীগণ রাজু ভাস্কর্য হতে মিছিল সহকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিমুখে যাত্রা করেন। এ সময় বিতর্কিত সার্কুলার প্রত্যাহারের দাবিতে পিসিপি’র কর্মিগণ বিভিন্ন শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
পরবর্তীতে পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি বিনয়ন চাকমা, সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমা, দপ্তর সম্পাদক রোনাল চাকমা ও এইচডব্লিউএফ এর কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক চৈতালি চাকমা এ চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষা মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে তাঁর কার্যালয়ে যান। শিক্ষা মন্ত্রী কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন মন্ত্রীর একান্ত সচিব নাজমুল হক খান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পেশকৃত স্মারকলিপিতে ৫ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হচ্ছে- ১. অবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, বেরসকারী কলেজ শাখা-৬’এর জারিকৃত সার্কুলার (১৯ নভেম্বর/১৭) প্রত্যাহার পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সকল শিক্ষার্থীর সংবিধান স্বীকৃত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে; ২. পার্বত্য চট্টগ্রামে জেলা পরিষদ কর্তৃক ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ বাতিলপূর্বক যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে; ৩.পাঠ্যসূচি থেকে সাম্প্রদায়িক অংশ বাদ দিয়ে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে; ৪. বহুল বিতর্কিত প্রাথমিক সমাপণী পরীক্ষা বাতিলপূর্বক শিশুদের মানসিক চাপ মুক্ত করে সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী রমেল চাকমার খুনী নানিয়ারচর সেনা জোনের অধিনায়ক লে. কর্ণেল বাহলুল আলম ও মেজর তানভিরের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

ঢাকায় পিসিপির সংহতি সমাবেশে প্রকাশিত পোষ্টার-ফেষ্টুন

——————————————————-

সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *