বুধবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯
সংবাদ শিরোনাম

পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রান্তিকীকরণ[১]

।।  র বী ন মে ন্দ র ।।

[The bourgeoisie, by the rapid improvement of all its means of production, by the immensely facilitated means of communication, draws all, even the most barbarian nations into civilisation. The cheap prices of its commodities are the heavy artillery with which it batters down all Chinese walls, with which it forces the barbarians’ intensely obstinate hatred of foreigners to capitulate. It compels all nations, on pain of extinction, to adopt the bourgeois mode of production; it compels them to introduce what it calls civilisation into their midst, i.e., to become beourgois themselves. In one word, it creates a world after its own image.

Karl Marx and Fredrick Engels, Communist Manifesto. Marx Engels Selected Works Volume 1, Foreign Publishing House Moscow 1962.]

 [সকল উৎপাদন-যন্ত্রের দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে, যোগাযোগের অতি সুবিধাজনক উপায় মারফত বুর্জোয়ারা সভ্যতার মাঝে টেনে আনছে সমস্ত জাতিকে, এমনকি বর্বরতম জাতিকেও। তাদের সস্তা পণ্য হল ভারী কামান যার দ্বারা তারা চীনা প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেয় ও বর্বর জাতিগুলোর একরোখা জাতিবিদ্বেষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। তারা সমস্ত জাতিকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে বুর্জোয়া উৎপাদন-পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য করে। বুর্জোয়ারা যাকে সভ্যতা বলে তাকে নিজেদের মধ্যে প্রবর্তন করতে অর্থাৎ বুর্জোয়া বনে যেতে তারা জাতিগুলোকে বাধ্য করে। এক কথায়, বুর্জোয়ারা নিজের ছাঁচে জগৎটাকে গড়ে তোলে। -কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো।]

জাতিগত নিপীড়ন বা এক জাতি কর্তৃক অন্য জাতির জনগণের ওপর শোষণ ও নির্যাতন বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদীরা তাদের উৎপাদিত শিল্প পণ্য বিক্রি ও কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ায় এবং এটা করতে গিয়ে তারা কেবল চীনা প্রাচীরের মতো প্রতিবন্ধকতা গুঁড়িয়ে দিয়ে “বন্য জাতিগুলোকে” তাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করে তা নয়, তারা সেই জাতিগুলোকে পদানতও করে। পুঁজিবাদ বহু দূর প্রান্তে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত অবস্থায় শত শত হাজার হাজার বছর ধরে পড়ে থাকা অনড় অচল সমাজগুলোকে চুম্বকের মতো তার বাজার-ব্যবস্থায় টেনে নিয়ে আসে এবং ওই সমাজগুলোতে এক অভাবনীয় গতিশীলতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিগুলোর সমাজও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-ব্যবস্থার নিগড়ে বাঁধা পড়ে কিভাবে এই পাহাড়ি সমাজব্যবস্থা প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়েছে তার চিত্র সংক্ষেপে তুলে ধরাই এই লেখার উদ্দেশ্য।

পুরনো সাম্যবাদী সমাজে ভাঙন
১৭৬০ সালে বৃটিশ আগ্রাসন শুরুর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ধরনের সমাজব্যবস্থা বর্তমান ছিল তাকে এক ধরনের আদিম সাম্যবাদ বলা যায়। সরল উৎপাদন ব্যবস্থাই-যাকে জুম চাষ পদ্ধতি বলা হয়- এই সরল সমাজব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল। পাহাড়ে প্রযুক্ত এই উৎপাদন পদ্ধতির বলা যায় একমাত্র ও প্রধান হাতিয়ার হল এক পাশে ধারাল হাতল-ওয়ালা লোহার তৈরি দা। সমাজে রাজা উপাধিতে একজন সমাজপতি ও তার অভিজাতবর্গ[1]  ছিলেন, তবে তার কোনো স্থায়ী সৈন্যবাহিনী ছিল না। সৈন্যবাহিনী থাকার প্রয়োজন ছিল না, কারণ এটা ছিল শ্রেণীহীন সাম্যবাদী সমাজ, যে সমাজে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি না হওয়ার কারণে রাষ্ট্র নামক বলপ্রয়োগ ব্যবস্থারও দরকার হয় না। রাজা ও অভিজাতবর্গ কিছু বিশেষ সুবিধা ভোগ করতেন, তবে তাকে শোষণ বলা যায় না। তাদের প্রধান কাজ ছিল সমাজে অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেক সদস্যের সুবিধা-অসুবিধার দিকগুলো দেখা এবং বিচার-আচার সম্পাদন করা। প্রাক-উপনিবেশিক পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সমাজের বিস্তারিত বর্ণনা T H Lewin -এর লেখায় পাওয়া যায়। তার ভাষায়:

Communal ownership of all material resources, sharing and exchange constituted the cores of their economic as well as cultural values. The concept of surplus and private profit was totaly alien to them, for it was a subsistence economy.
[সমস্ত বস্তুগত সম্পদের ওপর সম্প্রদায়গত মালিকানা, ভাগাভাগি এবং বিনিময় হচ্ছে তাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মৌলিক উপাদান। উদ্বৃত্ত ও ব্যক্তিগত মুনাফার ধারণা তাদের কাছে অপরিচিত, কারণ তাদের অর্থনীতি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ।]

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনে এই সমাজব্যবস্থা আর ঠিক থাকতে পারেনি। বৃটিশদের যে একটি পদক্ষেপ এই সমাজের ভাঙনে প্রধান ভূমিকা পালন করে তা হল হালচাষ পদ্ধতির প্রবর্তন। বৃটিশরা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের সমাজে যুগান্তকারী পরিবর্তন সৃষ্টির ক্ষেত্রে তা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। উৎপাদনের এই নতুন প্রযুক্তি সমাজে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেয়, উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে- যার আত্মসাৎকারী হল বৃটিশ ও বাঙালি মধ্যসত্ত্বভোগী, এবং পাহাড়িদের বিশেষত চাকমাদের সমাজে এনে দেয় শ্রেণী-বিভাজন। যারা হালচাষি তারা জুমচাষিদের তুলনায় অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়, যদিও তাদের মধ্যেও পরে স্তরভেদ দেখা দেয়। এ প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে জন্ম নেয় মধ্য-শ্রেণী যে শ্রেণীর শিক্ষিত অংশটি পরবর্তীতে জাতীয়তাবদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


বৃটিশ শোষণ
মোগল আমলে পাহাড়িরা কর প্রদানের বিনিময়ে চট্টগ্রাম সীমান্ত এলাকায় বাজার-সুবিধা লাভ করত (তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম ছিল কার্পাস মহল)। ১৭৫৭ সালে বাংলা অধিকারের পর বৃটিশরা এই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখে। এই করের রূপ ছিল তুলা এবং তার পরিমাণ প্রথমদিকে নির্দিষ্ট ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মধ্যস্বত্ত্বভোগী বাঙালি ফড়িয়ার মাধ্যমে এই কর আদায় করত। এই বাণিজ্য করের পরিমাণ নির্দিষ্ট না থাকার কারণে ফড়িয়ারা বৃটিশ প্রভুদের সহযোগিতায় পাহাড়িদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ইচ্ছেমতো তুলা আদায় করত। লুইন লিখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রতি বছর ৫৫,৮৫৪ মণ তুলা বাইরে রপ্তানি হত।[2]  এই তুলা প্রধানত ইংল্যান্ডে বিকাশমান টেক্সটাইল শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হত।

কর আদায়ের নামে বৃটিশদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বাঙালি ফড়িয়াদের এই শোষণ সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে পাহাড়িরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। “ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম” নামক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত “পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা বিদ্রোহ” শীর্ষক প্রবন্ধে সুপ্রকাশ রায় লেখেন:

এই ব্যবস্থার ফলে পার্বত্য অধিবাসীদের জীবিকা নির্বাহ অসম্ভব হইয়া উঠে। প্রথমত, প্রথম ইজারাদারটি তাহাদের নিকট হইতে রাজস্বের নামে প্রায় সমস্ত তুলাই লুটিয়া লইত। দ্বিতীয়ত, তাহার লুন্ঠনের পর যে সামান্য পরিমাণ তুলা থাকিত তাহা চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে লইয়া গিয়া উহার বিনিময়ে বা উহার বিক্রয়লব্ধ অর্থে আদিবাসীদের পক্ষে খাদ্য প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করা দ্বিতীয় ব্যক্তিটির জন্য অসম্ভব হইয়া উঠিত। কারণ, সেই ব্যক্তি বিভিন্ন উপায়ে ঐ অবশিষ্ট তুলা নামমাত্র মূল্যে তাহার নিকট বিক্রয় করিতে আদিবাসীদের বাধ্য করিত। এই অঞ্চলের আদিবাসীরা সমান ওজনের দ্রব্যের বিনিময়ে সমান ওজনের দ্রব্য লইতে অভ্যস্ত ছিল। সুতরাং তুলার ব্যাপারী দুই টাকা মূল্যের এক মণ লবণের বিনিময়ে আট টাকা মূল্যের এক মণ তুলা আত্মসাৎ করিত। এইভাবে কোনো একটি বা দুইটি দ্রব্য ক্রয় করিতেই আদিবাসীদের সমস্ত তুলা নিঃশেষ হইয়া যাইত। এই উভয়বিধ শোষণের ফলে আদিবাসীরা অনিবার্য মৃত্যুর মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। অবশেষে তাহারা আত্মরক্ষার শেষ উপায় হিসাবে বিদ্রোহের পন্থা অবলম্বন করিতে বাধ্য হইল।”

এই “বিদ্রোহ” শুরু হয় ১৭৭৬ সালে এবং শেষ হয় ১৭৮৯ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে দুই পক্ষের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে। সুপ্রকাশ রায় এই লড়াইকে চাকমা বিদ্রোহ হিসেবে অভিহিত করার প্রয়াস পেলেও, এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে আগ্রাসী বৃটিশ শক্তির বিরুদ্ধে পাহাড়ি বা জুম্ম জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এই যুদ্ধের প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত শোষণ হলেও আরও অন্যান্য কারণ থাকা অস্বাভিক নয়। রাজা শের দৌলত খাঁ ও তার সেনাপতি রনু খাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই যুদ্ধে পাহাড়ি যোদ্ধারা পরাক্রমশালী বৃটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন সুপ্রকাশ রায় তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

“বিদ্রোহ-কালে চাকমাগণ [পাহাড়িরা- লেখক] যে পদ্ধতিতে উন্নত অস্ত্র-সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর সহিত যুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছিল, তাহা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সেই যুদ্ধ ছিল একালের গেরিলা যুদ্ধেরই অনুরূপ; ইংরেজ বাহিনী চাকমা অঞ্চলে প্রবেশ করিবামাত্র তাহারা সম্মুখ যুদ্ধে বাধা দিবার চেষ্টা না করিয়া স্ত্রীপুত্র ও অস্থাবর সম্পত্তিসহ গভীর পার্বত্য অঞ্চলে পলায়ন করিত এবং এইভাবে ইংরেজ বাহিনীকে গভীর পার্বত্য অঞ্চলে টানিয়া লইয়া যাইত। ইংরেজ সৈন্যগণ চাকমাদের গ্রাম, বাড়ীঘর, ক্ষেতের শস্য সমস্ত কিছু জ্বালাইয়া দিতে দিতে অগ্রসর হইত। এইরূপে বহু দূর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াও যখন ইংরেজ বাহিনী বিদ্রোহীদের সন্ধান পাইত না, তখন তাহারা ফিরিতে আরম্ভ করিবামাত্র বিদ্রোহীদের আক্রমণ আরম্ভ হইত। চাকমাগণ বড় বড় গাছ কাটিয়া পার্বত্য পথগুলি বন্ধ করিয়া, পর্বত-গহ্বরের মুখে ফাঁদ পাতিয়া ও পানীয় জল নষ্ট করিয়া দলে দলে ইংরেজ সৈন্য সংহার করিত। ১৭৭৬ হইতে ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই চৌদ্দ বছরে কত ইংরেজ সৈন্য ও ভারতীয় সিপাহী যে বিদ্রোহী চাকমাদের বিষাক্ত তীরে প্রাণ দিয়াছে, কত সৈন্য ফাঁদ-পাতা পর্বত-গহ্বরে পড়িয়া এবং পানীয় জলের অভাবে পিপাসায় ছটফট করিয়া মরিয়াছে তাহার হিসাব নাই।”

১৭৮৯ সালে কর প্রদানের মাধ্যম তুলা থেকে নগদ টাকায় রূপান্তরিত করা হয়। প্রথমে এই করের পরিমাণ নির্ধারিত হয় ৫,৭০৩.১৩ টাকা। পরে ১৮৪৬ সালে তা ১১,৮০৩ টাকায় বৃদ্ধি করা হয়।[3]  পার্বত্য চট্টগ্রামে এভাবে “মুদ্রা-অর্থনীতি” প্রচলনের ফলে পাহাড়ি উৎপাদকদের শোষণের দ্বার অবারিত হয়ে যায়। মহাজন, সুদখোর ও দাদন ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর হামলে পড়ে। আমেনা মহসিন Wolfgang Mey -এর উদ্বৃতি দিয়ে তার The Politics of Nationalism: The Case of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh গ্রন্থে লিখেছেন;

The monetisation went against the interests of the Hill people for in order to be able to pay the taxes they became dependent upon Bangali traders to whom they sold their products at nominal prices as the former controlled and manipulated the market. They were often forced to borrow money from Bengali money-lenders who provided them with credit at exorbitant interest rates, which sometimes went as high as 600 per cent.
[টাকার প্রচলন ছিল পাহাড়ি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে, কারণ কর দেয়ার জন্য তারা বাঙালি ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বিধায় তাদের কাছেই পাহাড়িরা উৎপাদিত সামগ্রী মামুলি দামে বিক্রি করে। তারা প্রায়শ বাঙালি মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই সুদের হার ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।]

ক্যাপ্টেন লুইন-এর লেখায়ও পাহাড়িদের ওপর শোষণের এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। A Fly on the Wheel গ্রন্থে তিনি এই শোষণের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। দীর্ঘ হলেও পাহাড়িদের ওপর শোষণের মাত্রা, প্রকৃতি ও ব্যাপকতা বুঝার জন্য এখানে তার লেখা থেকে উদ্বৃতি তুলে ধরা হল।

কোনো পাহাড়ির ফসলহানি হলে অথবা মেয়ের বিয়ের জন্য টাকার দরকার হলে তিনি বাঙালি মহাজনের কাছ থেকে বিশ কি ত্রিশ টাকা ধার করতেন। এই টাকা তাকে মাসিক পাঁচ টাকা বা বছরে ষাট টাকা সুদে আগ্রহের সাথে দেয়া হত। পাহাড়ি মানুষরা সৎ, তাই যতক্ষণ-না পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে ঋণের পুরো আসল টাকা শোধ করার অর্থ যোগাড় না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই ভারী সুদ শোধ করে চলত।

তার পর কী হত? আমি সাধারণ একটি ঘটনার বর্ণনা দেব। পাহাড়ি লোকটি তার টাকা শোধ করে। “ভাই, খুব ভালো করেছ।” সুদখোর বলে। “এই দেখ, আমি তোমার ঋণের দলিল নষ্ট করছি।” এই বলে সে একটি পুরাতন ঋণের দলিল ছিঁড়ে ফেলত, তবে পাহাড়ি লোকটির দলিল নয়। গরিব পাহাড়ি লোকটি পড়তে কিংবা লিখতে পারে না। সে এই খুশিতে বাড়ি চলে যেত যে সে তার ঋণ শোধ করে ফেলেছে এবং সে আবার মুক্ত মানুষ হয়েছে।

মহাজন সময়ের অপেক্ষায় থাকে। তারপর সে ঐ ঋণের দলিলপত্র নিয়ে কোর্টে হাজির হয় এবং ওই পাহাড়ি লোকটির বিরুদ্ধে, যার নাম ধরা যাক নীল চন্দ্র, তার বিরুদ্ধে একটি ঋণ মামলা রুজু করে দেয় চক্রবৃদ্ধি সুদে নেয়া ঋণের টাকা ও মামলার খরচের টাকা উসুলের জন্য। তারপর কোর্টে হাজির হয়ে তার বক্তব্য দেয়ার জন্য ওই নীল চন্দ্রের বিরুদ্ধে যথারীতি সমন জারি করা হয়।

শুনানির জন্য ধার্যকৃত দিনে মহাজন ওঁৎ পেতে থাকে কখন নীল চন্দ্র তার নৌকায় করে আসবে। তারপর উচ্ছ্বসিত হয়ে দ্রুত তার সাথে দেখা করে উদ্বিগ্ন মুখে ও কন্ঠস্বরে সে বলে: “ভাই, আমি সাংঘাতিকভাবে দুঃখিত যে একটা মাত্র ভুলের জন্য তোমাকে অনর্থক কষ্ট করে আসতে হল। তোমার  (কোর্টে) হাজির হওয়ার কোনো দরকার নেই। তোমার সমনের কাগজপত্র আমাকে দাও, আমি সাহেবের সঙ্গে বোঝাপড়া করব, আর তুমি আমার বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া কর।”

তারপর বেচারি মাঝিটি খাওয়া-দাওয়া করতে যায়, আর এদিকে ধূর্ত মাকড়সাটি কোর্টে হাজির হয়। যথারীতি কোর্ট বসে এবং নীল চন্দ্র উপস্থিত না হওয়ায় সমস্ত টাকা পরিশোধের জন্য তার বিরুদ্ধে একপাক্ষিক ডিক্রি জারি করা হয়।

মহাজন তার শিকারকে সহৃদয়তার সাথে আপ্যায়ন করার পর তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দেয়, এবং আপিলের সময় অতিক্রান্ত হয়ে ডিক্রিটি পাকাপোক্ত না হওয়া পর্যন্ত কী ঘটেছে সে ব্যাপারে তাকে কিছুই জানায় না। তারপর একদিন অভাগা পাহাড়ি লোকটির মাথায় বজ্রাঘাত পড়ে। সে জানতে পারে সে বিশাল এক ঋণের ভারে ভারাক্রান্ত হয়েছে, যে ঋণ সে কখনো নেয়নি এবং কখনো শোধ করতে পারবে বলে আশা করে না। এভাবে সে তার বাকি সারা জীবনের জন্য কার্যত মহাজনের গোলাম হয়ে যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসন, শোষণ ও লুন্ঠন জোরদার করার জন্য বৃটিশরা ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সরাসরি উপনিবেশিক শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। তারা এ অঞ্চলকে চাকমা, মঙ ও বোমাং এই তিন সার্কেলে বিভক্ত করে এবং জমি, পরিবহন, বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বনজ দ্রব্যের ওপর কর আরোপ করে। তবে বৃটিশদের এই শোষণ কেবল কর আদায়ের মধ্যে সীমিত ছিল না। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে লুন্ঠন করে, হাজার হাজার একর বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে সেখানে তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। এক হিসেবে ১৮৭১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬,৮৮২ বর্গমাইলের মধ্যে ৫,৬৭০ বর্গমাইল এলাকা সরকারি রিজার্ভ ফরেস্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সব সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড়িদের প্রবেশাধিকার হরণ করা হয়। এভাবে পাহাড়িরা নিজেদের সম্পদের ওপর তাদের চিরাচরিত অধিকার হারায়। আর জুমচাষিরা অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একদিকে বাঙালি ব্যবসায়ীদের নির্মম শোষণ ও অন্যদিকে জুমচাষের এলাকা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হওয়ার ফলে পাহাড়িদের অর্থনৈতিক মেরুদ- দ্রুত ভেঙে পড়ে।


পাকিস্তান আমল
পাহাড়ি জনগণের ওপর শোষণ ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়া পাকিস্তান আমলেও অব্যাহত থাকে। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় তা পাহাড়ি জনগণের জন্য চরম অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। এই কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হল কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ যার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। ইউএসএইড-এর আর্থিক সহায়তার ষাট দশকের প্রথম দিকে নির্মিত এই বাঁধের ফলে সৃষ্ট হ্রদে ডুবে যায় ৫৪ হাজার একর ১ম শ্রেণীর হালচাষের জমি, উচ্ছেদের শিকার হয় ১০,০০০ হালচাষি ও ৮,০০০ জুমচাষি পরিবারের মোট এক লক্ষ পাহাড়ি। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৮,০০০ বাঙালি ও ১,০০০ মারমা জাতির লোকজন। তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় নামমাত্র; সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য ৫১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়, কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ২.৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয়। জমির মালিকানার দলিলপত্র না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জুমচাষিদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। পুনর্বাসনের জন্য যথেষ্ট জমি না থাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের ৪০,০০০ জন ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন। কয়েক হাজার মারমা চলে যান বার্মায়।

কাপ্তাই বাঁধ ছিল পাহাড়িদের অর্থনীতির ওপর এক চরম আঘাত। এই বাঁধ নির্মাণের কয়েকটি উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে গাছ ও বাঁশ আহরণ অর্থাৎ পাহাড়িদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন করা। আমেনা মহসিন লন্ডনভিত্তিক এন্টি স্লেভারি সোসাইটির এক রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে তার ‘পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজম’ গ্রন্থে লেখেন:

“The construction of the dam had improved the communications in the area. Withdrawal of restrictions coupled with improved communication only helped the Bengalis further; but the Hill people were further marginalised by the policy. Rice production was totally stopped in these PF; “shortly afterwards lack of foodstuffs was reported then the first cases of starvation.”
[কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এই অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ও উন্নত যোগাযোগ বাঙালিদেরকেই কেবল আরো বেশি সুবিধা এনে দেয়। অপরদিকে, এই নীতির ফলে পাহাড়িরা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সকল প্রটেকটেড ফরেস্ট এলাকায় ধান উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়। এর কিছু সময় পর খাদ্যবস্তুর ঘাটতির খবর আসে এবং তারপর দেখা দেয় প্রথম খাদ্যাভাব।]

এখানে যে প্রটেকটেড ফরেস্ট-এর কথা বলা হয়েছে তা ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছিল। এই প্রটেকটেড ফরেস্ট বৃটিশদের ঘোষিত রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে আলাদা। এখানেও জুমচাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হরা হয়।

পাকিস্তান সরকার ১৯৫৩ সালে চন্দ্রঘোনায় এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজের কল প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে মিলের চারপাশে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক মারমা পরিবার উৎখাত হয়। তাদেরকে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। অপরদিকে, মিলে পাহাড়িদের মধ্য থেকে চাকুরির সংস্থান করা হয়নি।

কাজেই দেখা যায়, কাপ্তাই বাঁধ, প্রটেকটেড ফরেস্ট ঘোষণা ও পেপার মিল স্থাপনের ফলে পাহাড়িরা নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয় এবং তাদের অর্থনৈতিক জীবন চরম হুমকির সম্মুখীন হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাহাড়িদের এই বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক শোষণ আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও দাবিনামায় উপেক্ষিত থেকে যায়।

বাংলাদেশ আমল
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর গত ৩৯ বছরের পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস হল জাতিগত নিপীড়ন ও শোষণ তীব্রতর হওয়ার ইতিহাস। এ সময় এক ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত হয়, যাতে হাজার হাজার পাহাড়ি প্রাণ হারান। জ্বালাও-পোড়াও, নির্বিচার আটক, খুন, ধর্ষণ, লুন্ঠন ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় এবং পাহাড়িদের স্বাভাবিক জীবন যাপন ও অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ৬০ হাজার পাহাড়ি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেখানে ১২ বছরের দুর্বিষহ শরণার্থী জীবন শেষে তারা পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পর ১৯৯৮ সালে স্বদেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশ আমলে পাহাড়িদের অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণের প্রধান কারণগুলো হল সেটলার পুনর্বাসন ও ভূমি বেদখল, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, তথাকথিত কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সি, বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন, তথাকথিত উন্নয়ন কর্মসূচি ও পুঁজিবাদী শোষণ। নিম্নে এ সকল বিষয়ের ওপর সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

১. সেটলার পুনর্বাসন ও ভূমি বেদখল
১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ৩৪নং ধারায় পার্বত্য এলাকায় বহিরাগতদের জমি বন্দোবস্তির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সরকার তা ১৯৭৯ সালে তুলে নেয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩০,০০০ বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তার পর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এক হিসেব মতে চার লক্ষ সমতলবাসীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়, যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণাম হয় সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক। তাদেরকে “খাস” জমি দেয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে আসা হলেও পাহাড়িদের দখলীয় জমিতে তাদেরকে পুনর্বাসন করা হয়। ফলে ব্যাপক এলাকা ও বহু সুপ্রতিষ্ঠিত গ্রাম থেকে হাজার হাজার পাহাড়ি উৎখাত হয়ে যায়। বহু পরিবার জমিজমাসহ সর্বস্ব হারিয়ে নিমেষে সর্বহারায় পরিণত হয়। জুমচাষ ও মজুরি শ্রম ছাড়া তাদের জীবিকা অর্জনের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। স্বপন আদনান পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের দারিদ্র্যের জন্য যে কয়টি কারণকে দায়ী করেন তার মধ্যে ভূমি বেদখল অন্যতম। তিনি লেখেন:

Appropriation of the private and common lands of the Hill peoples by others provides the prime instance of the expropriation of their assets. It has also been the single most critical factor leading to their impoverishment.[4]
[অন্যদের দ্বারা পাহাড়ি জনগণের ব্যক্তিগত ও সাধারণ জমি আত্মসাৎ হল তাদের সম্পত্তি আত্মস্থ করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর এটাই হল তাদের দারিদ্র্যতার একমাত্র প্রধান কারণ।]

কত হাজার একর জমি এভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে ও কত পাহাড়ি পরিবার নিজ বাস্তুভিটা ও জমিজমা থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। উচ্ছেদের পর বহু পরিবার রাঙামাটি জেলার সাজেকসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেন ও বহু পরিশ্রম করে সেখানে বাগান-বাগিচা গড়ে তোলেন ও চাষের জমির পত্তন করেন। কিন্তু সাজেক থেকেও তাদেরকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে তাদেরই পত্তন করা জমিতে সেটলার পুনর্বাসনের চেষ্টা চলে আসছে ২০০৮ সাল থেকে। গত ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি সেখানে এক ডজনের অধিক পাহাড়ি গ্রামে সেনাবাহিনী ও সেটলারদের যে মিলিত আক্রমণ হয় তার কারণ হল এটাই।[5] এর আগে ২০০৮ সালেও একবার তাদেরকে উৎখাতের জন্য বেশ কয়েকটি গ্রামে হামলা করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। সাজেকে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলোর মতো উৎখাত হওয়া সব পাহাড়ি নতুন করে জুমচাষ চালিয়ে যেতে সক্ষম হন না। অবশেষে তাদের কী পরিণতি হয় তারও বর্ণনা দিয়েছেন স্বপন আদনান:

This marginalized section of the Hill peoples has been compelled to search for alternative avenues of livelihood, diversifying into non-traditional production and trading activities. These occupational shifts have tended to increase their market involvement, particularly in the labour, product and credit markets, often under unfavourable terms and conditions. The overall outcome has been a process of destitution and proletarianization among the Hill peoples of the CHT.[6]
[পাহাড়ি জনগণের এই প্রান্তস্থ অংশটি জীবিকার বিকল্প অবলম্বন খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এতে ঐতিহ্যগত নয় এমন উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কর্মকা-ের বহুমুখিতা সৃষ্টি হয়েছে। এই পেশাগত পরিবর্তন প্রায়শ অসুবিধাজনক শর্তে বাজারের সাথে এবং বিশেষত শ্রম, উৎপন্ন দ্রব্য ও ঋণ বাজারের সাথে তাদের সম্পৃক্তি বৃদ্ধি করে। এর চূড়ান্ত ফলাফল হল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের মধ্যে সহায়-সম্বলহীনতা ও সর্বহারায় পরিণত হওয়ার একটি প্রক্রিয়া।]

দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যাভাবের সময় বহু পাহাড়ির সর্বশেষ আশ্রয় হত বন। কিন্তু উৎখাত হওয়া অনেক পাহাড়ি পরিবার এ আশ্রয় থেকেও বঞ্চিত হন। বনের ওপর নির্ভর করে তারা জীবন ধারণ করতে সক্ষম হন না। ফলে তারা হয়ে যান দিনমজুর। স্বপন আদনানের ভাষায়:

Loss of access to lands and forests has also compelled a growing section of the Hill peoples to become wage labourers. (প্রাগুক্ত)
(ভূমি ও বনের ওপর অধিকার হারানোর ফলে পাহাড়ি জনগণের ক্রমবর্ধমান একটি অংশ মজুরি-শ্রমিকে পরিণত হতে বাধ্য হয়।)

২. ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পাহাড়িদের আদৌ নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং তারা ব্যবসায়িক শোষণের নির্মম শিকার। বাজার-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিধায় তারা তাদের উৎপাদিত সামগ্রী কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। পরিবহন, ব্যাংকিং, ঠিকাদারি, সেবাখাত সবকিছু বহিরাগতদের একচেটিয়া দখলে। ইদানিং পাহাড়িরা ছোটখাট ব্যবসার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। তবে তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম এবং বিভিন্ন কারণে বহিরাগতদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

৩. তথাকথিত কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সি
পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনাবাহিনী কাউন্টার ইন্সার্জেন্সির নামে পাহাড়ি জনগণের ওপর চরম দমন-পীড়ন চালায়। মানবমিত্র সেনাবাহিনীর কাউন্টার ইন্সার্জেন্সির কলা-কৌশলকে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক এই প্রধান চার ভাগে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করেন। অর্থনৈতিক কৌশলের মধ্যে রয়েছে (ক) পাহাড়িদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং যৌথ খামার, আদর্শ গ্রাম ও গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর এবং (খ) কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি। তিনি মনে করেন “এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাহাড়ি জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হওয়া তো দূরের কথা; বরং অনেকেই এই বন্দীশালা থেকে পালিয়ে এসে সর্বস্বান্ত হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির মতো ঘৃণ্য পেশা অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে।”

কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সির নামে সেনাবাহিনী নিরীহ পাহাড়িদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত পাহাড়ির পরিবারে এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য অত্যধিক। গ্রেফতার হওয়া মানে আর্থিকভাবে পঙ্গু হওয়া। প্রথমত, পরিবারে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, তার জন্য মামলার খরচ যোগাতে ও তাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে জমি-জমাসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়। তৃতীয়ত, গ্রেফতারের পর যে নির্যাতন চলে তার ফলে অনেকে পঙ্গু হয় ও পরবর্তীতে আর অর্থনৈতিক কর্মকা- চালাতে সক্ষম হয় না। এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অগণিত সংখ্যাক পাহাড়ি পরিবারে নেমে আসে অর্থনৈতিক দুর্দশা।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি বন্ধ হয়নি। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও এখনো গ্রেফতারের শিকার হচ্ছে।

৪। বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন ও নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ আমলে বাণিজ্যিকভাবে বনজ সম্পদ আহরণ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পেপার মিলে, ইট ভাটায়, তামাক চুল্লিতে ও আসবাবপত্র তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য অবাধে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঠ আহরণের ফলে একদিকে যেমন বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে ও এর ফলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে; অপরদিকে, বনকে নির্ভর করে পাহাড়ি জনগণের অর্থনৈতিক জীবন পুরোপুরি ধ্বংস হতে চলেছে। বছরে কত পরিমাণ কাঠ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাইরে পাচার হয় তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ১৯৯৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাঠ ব্যবসার মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। (সূত্র: জীবন আমাদের নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন রিপোর্ট, আপডেট ৩) এর মধ্যে নিশ্চয়ই চোরাইপথে পাচার হওয়া গাছের হিসাব ধরা হয়নি।

কেবল বনজ সম্পদ আহরণ নয়, বন নিয়ন্ত্রণের ফলাফলও হয় পাহাড়িদের জন্য মারাত্মক। ১৯৯৬ সালে রাজস্থলীতে জমি অধিগ্রহণের ফলে ধনুছড়ি মৌজা থেকে ২০০ খিয়াং পরিবার তাদের পূর্ব-পুরুষের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়। পুনর্বাসনের অভাবে তারা বাংলাদেশ-মিজোরাম সীমান্ত এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়। রাজস্থলী, বিলাইছড়ি ও কাপ্তাই এলাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষিত হওয়ায় জুমচাষের এলাকা অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে যায়, যাতে পাহাড়ি অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সেখানে রিজার্ভ ফরেস্ট-এর জমি নিয়ে প্রায় সময় সরকারি বন বিভাগের সাথে স্থানীয় জনগণের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বন বিভাগের কর্মচারীরা রিজার্ভ ফরেস্ট-এ “অবৈধ প্রবেশের” দায়ে তাদের বিরুদ্ধে অহরহ মামলা দিয়ে থাকে, যা স্থানীয়ভাবে বন মামলা নামে পরিচিত। এই মামলার খরচ যোগাতে গরিব অধিবাসীরা আরো.বেশি আর্থিকভাবে লোকসানের শিকার হয়।

৫। তথাকথিত উন্নয়ন কর্মসূচি
উন্নয়ন শ্রেণী-নিরপেক্ষ নয়। আর সামরিকায়িত অঞ্চলে এটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে থাকে। যে এলাকায় জনগণের সশস্ত্র বিদ্রোহ বা সংগ্রাম বিরাজ করে সেখানে উন্নয়ন কৌশল বিদ্রোহ দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা তারই সাক্ষ্য দেয়। ১৯৮০ দশকে উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে যৌথ খামার ও আদর্শ গ্রাম কর্মসূচির নামে সেনাবাহিনীর রণকৌশলগত লক্ষ্যকেই বাস্তবায়ন করা হয়। আর এর বলি হয় সাধারণ পাহাড়ি জনগণ ও তাদের পারিবারিক ও যৌথ অর্থনীতি। এই সব কর্মসূচির আওতায় পাহাড়িদের স্বনির্ভর অর্থনীতিকে ভেঙে দিয়ে যৌথ খামারে ও রাবার বাগানে তাদেরকে মজুরি দাসত্বে রূপান্তরিত করা হয়।

বিগত কয়েক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগের বিপুল উন্নতি করা হয়। এই উন্নয়নের পেছনে তাৎক্ষণিক ও প্রধান তাগিদ ছিল একইসাথে সামরিক ও বাণিজ্যিক: সেনাবাহিনীর চলাচলের সুবিধা সৃষ্টি ও বনজ সম্পদ আহরণ। সে জন্য দেখা যাবে, ১৯৮০ দশকের শেষভাগ থেকেই পাহাড়ের বনাঞ্চলো একে একে নিঃশেষ হতে থাকে। যে দিকেই পাকা রাস্তা হয়েছে সে দিকের বন একেবারে নিমেষে উজাড় হয়ে গেছে। স্বপন আদনানের পর্যবেক্ষণেও এই নির্মম সত্যটি ধরা পড়েছে। তিনি লিখছেন:

Our fieldwork observation indicate that, wherever pahari settlements have been opened up by expansion of road and water transport networks, they have also been exposed to the entry and interventions of outsiders, inclusive of traders, settlers, officials, security forces and development agencies. Travelling across the CHT, we have been struck by the fact that the existence of good roads was almost always associated with significant extents of deforestation, soil erosion, environmental degradation, in-migation by settlers and traders, forcible takeover of pahari lands, the establishment of rubber plantations, etc.[7]   

(আমাদের মাঠের কাজের পর্যবেক্ষণ এই ইঙ্গিত দেয় যে, যেখানে পাহাড়ি বসতিগুলো সড়ক ও পানি পথের যোগাযোগ নেটওয়ার্কের দ্বারা খুলে দেয়া হয়েছে সেখানে বহিরাগতরা অর্থাৎ ব্যবসায়ী, সেটলার, সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনী ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো ঢুকে পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে আমরা এটা দেখে অবাক হয়েছি যে, প্রায় সকল সময় ভালো রাস্তার উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত হল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বন ধ্বংস-সাধন, ভূমির অবক্ষয়, পরিবেশগত অবনমন, সেটলার ও ব্যবসায়ীদের আগমণ, জোরপূর্বক পাহাড়িদের জমি হরণ, রাবার বাগান সৃষ্টি ইত্যাদি।)

অপরদিকে, উন্নয়নের নামে পাহাড়ি জনগণের সম্প্রদায়গত মালিকানার জমি বেদখল করা হয়। ফলে এ-সব জমিতে তাদের জুমচাষ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭-৮ সালে বান্দরবানের চিম্বুকে সেনাবাহিনী মুরুংদের জমিতে “নীলগিরি” নামে একটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করলে শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৬। শিল্প-পুঁজির শোষণ
স্বপন আদনান লক্ষ করেছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক শুরু হয়েছে। তিনি লিখেছেন:

A critical feature of the contemporary CHT economy is the limited emergence of capitalist relationship, defined as production based on wage labour for the explicit purpose of making profit (as contrasted to meeting subsistance needs). (প্রাগুক্ত)
[সমসাময়িক পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল মুনাফার জন্য মজুরি শ্রমভিত্তিক উৎপাদনের অর্থে সীমিত আকারে পুঁজিবাদী সম্পর্কের গঠন। (নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য উৎপাদনের বিপরীতে)]

গত কয়েক দশকে পাহাড়ি সমাজে, বিশেষত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যে, যথেষ্ট মাত্রায় শ্রেণীবিভাজন ঘটেছে। বিত্তশালী শ্রেণীর পাশাপাশি দেখা দিয়েছে রিক্সাশ্রমিক, ঠেলাগাড়ি শ্রমিক, খেতমজুর ইত্যাদি। নিম্ন শ্রেণীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে কৃষি, বন ও অন্যান্য খাতে মজুরি শ্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। তাছাড়া পাহাড়ি সমাজের পরিবর্তনের অন্য একটি লক্ষণীয় দিক হল শিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত পাহাড়িদের চট্টগ্রাম, ঢাকা, সাভার ও কুমিল্লায় ইপিজেড-এ বিভিন্ন কারখানায় চাকুরি গ্রহণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিল্পকারখানার অবর্তমানে বাইরের পুঁজি তাদেরকে এ সব রপ্তানি-নির্ভর কারখানাগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মূলত ১৯৮০ দশকের শেষভাগ থেকে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীদের এ সব কারখানায় চাকরিতে নেয়া শুরু হয়। পরে পার্বত্য চুক্তির পর এই প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয়। একটি হিসাব মতে, বর্তমানে কেবলমাত্র চট্টগ্রাম ইপিজেড-এ কাজ করা পাহাড়ি শ্রমিকের সংখ্যা আনুমানক ২০ হাজার। এ সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।


শোষণের পরিণাম
বিগত কয়েক দশকে উন্নয়নের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে যা হয়েছে তা হল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজি কর্তৃক পাহাড়ি জনগণের নির্মম শোষণ ও তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ লুন্ঠন। এর ফলে একদিকে যেমন পাহাড়িদের স্বনির্ভর অর্থনীতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে ও তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সর্বহারা বা প্রায়-সর্বহারায় পরিণত হয়েছেন বা হতে চলেছেন, অন্যদিকে মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে মুরুং, খুমী ইত্যাদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠিগুলো। তাদের সমাজ-সংগঠন তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় তারা পুঁজিবাদী পরিবর্তনের ধাক্কায় আরো নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই করুণ চিত্র জার্মান নৃতত্ত্ববিদ এল জি লফলারের লেখায় সবচেয়ে মূর্তভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯৯১ সালে বান্দরবান ও রাঙামাটি সফরের পর তিনি লেখেন:

“Once upon a time, the Chittagong Hill Tracts were not only rich in timber and bamboo, but they also produced a surplus of paddy and cotton. Hard-working farmers were … comparatively well off, and really needy people were few in number. Nowadays, after millions of dollars of development aid have been spent needy people abound, rice and cotton have to be imported, and timber and bamboo have become so scarce that the formerly magnificent houses of the indigenous people gave way to poor huts.[8]
[এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল গাছ ও বাঁশ সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল না, উৎপাদিত ধান ও তুলারও উদ্বৃত্ত থাকত। কঠোর মেহনতকারী কৃষকরা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিলেন, আর অভাবী মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। উন্নয়ন সাহায্যের লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করার পর আজ অভাবী মানুষের সংখ্যা হয়েছে প্রচুর, চাল ও তুলা আমদানি করতে হচ্ছে এবং গাছ ও বাঁশের এত সংকট যে আগেকার আদিবাসী জনগণের সুন্দর ঘরগুলোর জায়গা নিয়েছে জীর্ণ-শীর্ণ কুটির।]

পার্বত্য চুক্তির পর ১৯৯৮-২০০৪ সালে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে স্বপন আদনান লফলারের উপরোক্ত পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করেন। তিনি লেখেন:

Our fieldwork in the CHT over 1998-2002 indicated that many of the observations made by Loffler (in 1991) regarding the deterioration in the living condition of the Hill peoples had been contining unabated.[9]
[১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের মাঠের কার্যক্রম এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, পাহাড়ি জনগণের জীবনযাত্রার অবনতি সম্পর্কে লফলার যে মন্তব্য করেছিলেন (১৯৯১ সালে) তার বহুলাংশ এখনো সঠিক রয়েছে।]


উপসংহার
পাহাড়ি জনগণের অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা রাজনৈতিক অধিকারহীনতার সহগামী। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসন কায়েমের মাধ্যমেই পাহাড়িদের রাজনৈতিক অধস্তনতা সৃষ্টি হয় এবং সেই সাথে তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। পরে পাকিস্তান বাংলাদেশ আমলে এই অধস্তনতা একেবারে নিরঙ্কুশ হয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য পাহাড়ি জনগণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হবেন সেটাই স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে স্বপন আদনানকে এখানে আরো একবার উদ্ধৃত করা যেতে পারে। পাহাড়িদের মধ্যে দারিদ্রতা সৃষ্টির জন্য চারটি প্রধান মেকানিজমকে তিনি দায়ী করেন এবং বলেন:

Nevertheless, the most critical factor underly the economic subordination of the Hill peoples has been their lack of political power. … These fundmamental inequalities in economic position and political power have also provided the bases of ethnic conflict in the CHT and stoked the resistance of the Hill peoples against economic exploitation and political domination. [10] 
(তা সত্ত্বেও, পাহাড়ি জনগণের অর্থনৈতিক অধস্তনতার পেছনে সর্বাপেক্ষা প্রধান কারণ হল রাজনৈতিক অধিকারহীনতা। … অর্থনৈতিক অবস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে এই মৌলিক অসমতা পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে এবং অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক অধীনতার বিরুদ্ধে পাহাড়ি জনগণের প্রতিরোধকে উসকে দেয়।)

পুঁজিবাদ একদিকে যেমন এক জাতির ওপর অন্য জাতির শোষণ-নির্যাতনের জন্ম দিয়েছে, তেমনি এই শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতি ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের শর্তও সৃষ্টি করেছে। পুঁজিবাদী সা¤্রাজ্যবাদীরা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যোগাযোগ মাধ্যমের বিপুল উন্নতি সাধন করলেও এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ঘুচে দিয়েছে। তাই আজকের পৃথিবীতে সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে সকল জাতির মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠার শর্ত সৃষ্টি হয়েছে। যদি ঐতিহাসিক কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ পরাশক্তির কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের পরাজয় অনিবার্য হয়ে থাকে, তাহলে সাম্রাজ্যবাদের পতনের যুগে আজ তাদের মুক্তিও অবশ্যম্ভাবী। (সমাপ্ত)

[লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী।]

 

টীকা:

[১] এই লেখাটি প্রথম ছাপা হয় বিষয়ভিত্তিক ত্রৈমাসিক পত্রিকা হালখাতার ২০১০ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর ৪র্থ বর্ষ ৩য় সংখ্যায় (বাংলাদেশ জাতিগত সংকট ও উত্তরণ সংখ্যা)

[1] অভিজাতবর্গ শব্দটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপে কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশে সামন্ত সমাজের যে শ্রেণীকে নির্দেশ করতে অভিজাতবর্গ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, এখানে সে অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদেরকে অভিজাতবর্গ নামে অভিহিত করা হয়েছে তারাও সাধারণের মতো উৎপাদনের সাথে জড়িত ছিলেন, বিশেষ কোনো শ্রেণী গঠন করতেন না এবং অন্যের উদ্বৃত্ত্ব মূল্য আত্মসাৎ করতেন না।

[2] আমেনা মহসিনের The Politics of Nationalism: The Case of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh গ্রন্থে উদ্ধৃত। পৃ: ৭৯।

[3] Alexander Mackenzie. 1884. History of the Relations of the Government With the Hill Tracts of the North Easte Frontier of Bangal. Calcutta : Home Office Department Press.আমেনা মহসিনের উপরোক্ত গ্রন্থে উদ্ধৃত।

[4] Migration, Land Alienation and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. 2004.

[5] ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি ২০১০ বাঘাইহাট জোনের সেনাবাহিনীর সদস্যরা ও বহিরাগত সেটলাররা মিলে সাজেকের বাঘাইহাটে পাহাড়ি গ্রামে হামলা চালায়। এতে কমপক্ষে ৪ জন পাহাড়ি গ্রামবাসী নিহত হয়, চার শতাধিক ঘর পুড়ে যায় ও কয়েক হাজার নরনারী জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

[6] Migration Land Alienation and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. 2004.

[7] Migration, Land Alienation and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. 2004. page 133

[8] Ecology and Human Rights: Report on a Short Visit to Bandarban and Rangamati. আমেনা মহসিন ও স্বপন আদনানের উপরোল্লেখিত গ্রন্থে উদ্ধৃত।

[9] Migration, Land Alienation and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. 2004.

[10] Migration, Land Alienation and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagon Hill Tracts of Bangladesh. 2004. page 139

———————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.