সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
সংবাদ শিরোনাম

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের কারণ ও তার প্রতিকারের উপায়

।। মন্তব্য প্রতিবেদন ।।
গত এপ্রিল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের সংবাদ মাধ্যমে খবরের প্রধান শিরোনাম সরবরাহ করে আসছে। ঐ মাসের ১৯ তারিখ সেনা হেফাজতে কলেজ ছাত্র ও ইউপিডিএফ-সমথির্ত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নেতা রমেল চাকমার মৃত্যু এবং ২ জুন রাঙামাটির লংগদুতে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি গ্রামে হামলা ও অগ্নি-সংযোগের ঘটনা দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই দুই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ১৩ জুন রাঙামাটি, বান্দরবান, ও খাগড়াছড়িতে ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। শেষোক্ত ঘটনাকে আপাতভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মনে হলেও আদতে তা নয়, বরং উপরোক্ত তিনটি ঘটনাই পুরোপুরি মনুষ্য-সৃষ্ট এবং এ ঘটনাগুলোকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন মনে হলেও তারা আসলে একই সূত্রে গ্রথিত এবং একই মৌলিক-কারণ-সম্ভূত। এই প্রসঙ্গে এখানে বিস্তারিত আলোচনা না করে শুধুমাত্র এটাই বলতে চাই, ১৯৭৯-৮২ সালে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় চার লক্ষ বাঙালিকে পুনর্বাসনই হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যার মূল কারণ। এক কথায়, সেটলারদের আগমন পার্বত্য চট্টগ্রামের চেহারাকে সব দিক দিয়ে মৌলিকভাবে পাল্টিয়ে দেয়। তাই সাম্প্রতিক পাহাড় ধসের কারণকে বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই এই প্রেক্ষিত থেকে বিবেচনা ও ব্যাখ্যা করতে হবে, কেবল অতিবৃষ্টি ও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে দোষ দেয়া হলে তাতে মূল কারণ ঢাকা পড়ে যাবে এবং এতে করে পাহাড় ধসের সমস্যার কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না।

আমাদের বিবেচনায় রাঙামাটিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের জন্য মুলতঃ ৭টি কারণ দায়ি। নিচে সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

এক। সেটলারদের আগমন
উপরে ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জিয়া ও এরশাদ আমলে চার লক্ষ বাঙালিকে পুনর্বাসনের মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যার কারণকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এইসব বাঙালি সেটলারদের আগমনের ফলে জনসংখ্যা হঠাৎ বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং এতে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপরও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রথমত তাদের বসতি গড়ে তোলার জন্য বহু বন সাবাড় করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১৩ জুনের ভূমি ধস প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন, “পাহাড়ের বিপর্যয়ের জন্য বিএনপি দায়ী; সেখানে চার লাখ মানুষকে পুনর্বাসন করে ভারসাম্য নষ্ট করেছে তারা।” (সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১৮জুন ২০১৭)Landslide3

পৃথিবীর যে কোন দেশে সর্বকালে পাহাড়ি অঞ্চলে জনসংখ্যা সব সময় কম থাকে। কারণ এসব অঞ্চলে অধিক জনসংখ্যা ধারণ করার জন্য যেসব উপাদান দরকার তা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত কানাডীয় কোম্পানি Forestal Forestry and Engineering International Limited (যাকে সংক্ষেপে Forestal বলা হয়) দু’বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি ও ভূ-প্রকৃতি পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, “(The rate of population growth in the Hill Tracts exceeded the land capacity” (রাজকুমারী চন্দ্রা রায়ের গবেষণামূলক গ্রন্থ  Land Rights of The Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh 1996-এ উদ্বৃত, পৃ. ৬৬) অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ভূমির ধারণ ক্ষমতাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ফরেষ্টালের উক্ত রিপোর্ট ও সুপারিশ এবং প্রাকৃতিক নিয়মকে উপেক্ষা ও লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চার লক্ষ বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসে। শুধু তাই নয়, পাহাড়ে বিশাল জমি খালি পড়ে আছে, পাহাড়ে জমির অনুপাতে জনসংখ্যা কম ইত্যাদি প্রচার করে সেখানে সমতল থেকে বাঙালি পুনর্বাসনকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়। অবশ্য এই প্রচারণা ও উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক কারণই হলো মুখ্য। তবে যেই হোক, বাঙালি পুনর্বাসনের ফলে পাহাড়িদেরকে রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা করা গেলেও এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য দারুণভাবে নষ্ট হয় এবং সাম্প্রতিক ভূমি ধস এই ভারসাম্যহীনতারই ফলশ্রুতি। এ যেন পাহাড় ও প্রকৃতির তার ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলা নির্মম নিষ্ঠুর আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের ভাষা। তারপরও যদি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রকৃতির এই ভাষা বুঝতে অনিচ্ছুক হন, তাহলে মনে করতে হতে অদূর ভবিষ্যতে আরো এ ধরনের বহু বিপর্যয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাই মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মতো কেবল ‘চার লাখ মানুষকে পুনর্বাসন করে ভারসাম্য নষ্ট করা হয়েছে বলা যথেষ্ট নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়কে রক্ষা করতে হলে সরকারকে অবশ্যই এই চার লক্ষ সেটলারকে সমতলে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় রোধ করতে হলে এছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে সমতল অঞ্চলে গত কয়েক দশকে হাজার হাজার একর জমি সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে তাদেরকে সহজেই পুনর্বাসন করা যাবে। আর এই পুনর্বাসনে অর্থ সাহায্য দিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বহু আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে। বাংলাদেশের বহু বরেণ্য বুদ্ধিজীবী সেটলারদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরিয়ে নিয়ে সমতলে পুনর্বাসনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন।

দুই। জীবন যাত্রার পদ্ধতি
সমতল ও পাহাড়ের পরিবেশ এক নয়। তাদের জীবন যাত্রার পদ্ধতি ও সংস্কৃতিও ভিন্ন। সমতল অঞ্চলে কোন জায়গায় ঠাসাঠাসি করে বসবাস করা যায়, কিন্তু পাহাড়ে সেভাবে বাস করা যায় না। অথচ সমতলে ঠাসাঠাসিভাবে বাস করতে অভ্যস্ত বাঙালি সেটলাররা পাহাড়ে এসেও সেভাবে বাস করতে চায়। ফলে দুর্বল পাহাড়গুলো তাদের ঘনবসতিগুলোর ভার বহন করতে সক্ষম হয় না। পাহাড় ধসের এটাই প্রধান কারণ।

দ্বিতীয়ত, সমতলবাসী বাঙালিরা পাহাড়ি জমি অর্থাৎ ভূ-প্রকৃতির কাঠামোর পরিবর্তন না করে বাড়ি নির্মাণ করতে পারে না এবং বন ধ্বংস না করে উৎপাদন ও জীবন ধারণ করতে পারে না। A History of Bangladesh  গ্রন্থে Willem Van Schendel বাংলাদেশের ইতিহাসকে “a history of frontiers” উল্লেখ করে ৬টি ফ্রন্টিয়ারের কথা বলেছেন, যার মধ্যে একটি হলো agrarian frontier  বা কৃষি সীমান্ত। এই কৃষি সীমান্ত বিস্তার করতে গিয়ে কীভাবে বন ধ্বংস হয়েছে তিনি তার উক্ত বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন, “The eastward march of the agrarian frontier went hand in hand with the gradual destruction of the luxuriant Bengalian rainforest. By the late nineteenth century this process had converted most forests into farmland. The disappearance of the forests precipitated an agrarian crisis” (P. 25) অর্থাৎ কৃষি সীমান্তের পুর্বমুখী প্রসারণ বাঙ্গীয় ঘন বনাঞ্চলগুলোর ধ্বংসের সাথে হাত ধরাধরি করে ঘটেছিল। বিগত ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই এই প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ বনাঞ্চলকে কৃষি জমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এই বনাঞ্চল বিলুপ্ত হওয়ার ফলে এক কৃষি সংকট সৃষ্টি হয়।Landsliderangamati2

পার্বত্য চট্টগ্রামেও বাংলার কৃষি সীমান্ত বিস্তারিত হয় এবং পাহাড়ের নৈগর্গিক প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করেই কৃষি উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়। বিপরীত দিকে, যেখানে সমতলবাসীরা প্রাকৃতিক বন থেকে জীবন ধারনের কোন উপাদানই সংগ্রহ করতে পারে না, বন ধ্বংস না করে উৎপাদন ও জীবন ধারণ করতে পারে না, সেখানে পাহাড়িরা প্রাকৃতিক বন ছাড়াই টিকতে পারে না। বন থেকেই তারা খাদ্য, পুষ্টি, ঔষধপত্র, বাড়িঘর নির্মাণের সামগ্রী সবকিছু পেয়ে থাকে। অর্থাৎ বনই হলো তাদের source of livelihood.এই বন ধ্বংস মানেই তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাওয়া। কেউ কেউ বন ধ্বংস এমনকি সাম্প্রতিক ভূমি ধসের জন্য জুম চাষকে দায়ী করেছেন, কিন্তু তাদের এই দাবি অযৌক্তিক ও অজ্ঞতাপ্রসূত। এটা সত্য জুম চাষের জন্য বন ধ্বংস করতে হয়। কিন্তু এটা আংশিক সত্য, পুরো সত্য নয়। পাহাড়ে উৎপাদনের জন্য অর্থাৎ জুম চাষের জন্য যেমন বন ধ্বংস করতে হয়, তেমনি জুম চাষের জন্য বনেরও প্রয়োজন হয়। বন ছাড়া জুম চাষ করা যায় না। ন্যাড়া পাহাড়ে কেউ জুম চাষ করে না। এ কারণে পাহাড়ি জুম চাষীরা একদিকে বন ধ্বংস করলেও তাদেরই নিজেদের প্রয়োজনে বনকে রক্ষা ও লালন পালন করতে হয়। তবে একথাও সত্য, বর্তমানে সেটলারদের আগমণের কারণে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জুম চাষ আর আগের মতো লাভজনক নয় এবং পরিবেশের জন্যও তা আর অনুকূল নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সাম্প্রতিক ভূমি ধসের জন্য জুম চাষ দায়ী। যে সব পাহাড়ে জুম চাষ করা হয় সেখানে কখনো ভূমি ধস হয়েছে বলে আজো শোনা যায়নি। বরং যে সব পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে সেখানেই ভূমি ধস হয়েছে। অর্থাৎ ভূমি ধসের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো পাহাড়ে বসবাসে অনভ্যস্ত বাঙালি সেটলারদের সমতলের কায়দায় ঘন করে বসতবাড়ি নির্মাণ।

৩। পর্যটন :
পার্বত্য চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ জন্য সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে স্থানীয় পরিবেশের কথা বিবেচনা না করে যত্রতত্র হোটেল মোটেল, ট্যুরিস্ট স্পট, ট্যুরিস্ট রেসোর্ট, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন পাহাড়িরা নিজ জমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে, অন্যদিকে বন ও পরিবেশের উপর পড়েছে বিরূপ প্রভাব। তাছাড়া পর্যটনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে আকর্ষণীয় হিসেবে চিত্রিত ও পরিচিত করার ফলে দলে দলে বাইরের লোকজন এখানে আসতে থাকে, যাদের অনেকে শহরাঞ্চলে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলে। সাম্প্রতিক ভূমি ধসের জন্য এটাও অন্যতম প্রধান কারণ।

৪। বৃক্ষ নিধন ও পাহাড় কাটা :
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষত শহরাঞ্চলে গাছ ও পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য দারুণভাবে নষ্ট হয়েছে। সামান্য খালি জায়গা পেলেই সেটা দখল করে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে যা পাহাড়ি পরিবেশের সাথে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রকৃতির নিয়মই হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রকৃতি তা নিজে থেকে ঠিক করার চেষ্টা চালায়। আর প্রকৃতির এই ভারসাম্যাবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার একটি নাম হলো ভূমি ধস, যার শিকার হচ্ছে মানুষ।

৫। অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ :
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা বিবেচনা না করে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। তা ছাড়া সামরিক প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে রাস্তার দু’ পাশের ঝোপ ঝাড় ও গাছপালা কেটে সাফ করা হয়। এর ফলাফল যা হতে পারে তাই হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেও ইন্সার্জেন্সী ছিল এবং এখনো খানিকটা আছে। কিন্তু কই সেখানে তো ভারত সরকার রাস্তার দু’ পাশের বন ধ্বংস করেনি, বরং সেখানে রাস্তার দু’পাশ ঘন বনে আচ্ছাদিত রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে বাণিজ্যিকভাবে গাছ বাঁশ আহরণ অত্যন্ত সহজ হয়েছে এবং যেখানেই পাকা রাস্তা হয়েছে সেদিকের বন জঙ্গল উজার হয়ে গেছে। পাহাড় ধসের জন্য এই বাণিজ্যিক বন আহরণও কম দায়ি নয়।Landsliderangamati

 ৬। প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য :
অবৈধভাবে পাহাড় কাটার জন্য যারা জড়িত তারা হলো মূলত: প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ট প্রভাবশালী লোকজন। এরা নানাভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পাহাড় কাটার মহোৎসব চালিয়ে যায়। এদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে না পারলে পাহাড় কাটা বন্ধ হবে না এবং সে কারণে ভূমি ধসের সম্ভাবনাও রোধ করা যাবে না।

৭। প্রশাসনের নজরদারীর অভাব :
প্রশাসনের নাকে ডগায় পাহাড় কেটে ও যত্রতত্র ঠাসাঠাসি করে বহিরাগতরা ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসতি গড়ে তোলে। অথচ এতে প্রশাসনের কোন বাধা নেই। এমনকি এতে প্রশাসনের বা কোন কোন মহলের মদদ, প্ররোচনা ও উৎসাহও থাকতে পারে। কারণ পাহাড়ে জাতিগত জনমিতির ভারসাম্য পাল্টে দেয়ার জন্য সরকারী প্রচেষ্টা বহু আগে থেকেই লক্ষ্যণীয়। পার্বত্য চুক্তির আগে পর্যন্ত খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড়ি-বাঙালির অনুপাত যেখানে প্রায় সমান, চুক্তির প্রায় বিশ বছর পর সেখানে বাঙালিরা এখন দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশী। প্রশাসনিক মদদ না থাকলে এই তিন শহরে এত দ্রুত বাঙালির জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটতে পারতো না। তাছাড়া ভূমি ধ্বস রোধে ইতিপূর্বে যে সব সুপারিশ ছিল প্রশাসন তা উপেক্ষা করে, এমনকি এ ধরনের সুপারিশের অস্তিত্ব সম্পর্কেও স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা অবহিত নয়। কাজেই সাম্প্রতিক ভূমি ধসের জন্য প্রশাসন বহুল পরিমানে দায়ি।

মোট কথা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় বর্তমান জনসংখ্যার চাপকে সহ্য করতে আদৌ সক্ষম হচ্ছে না। তাই পাহাড় রক্ষা ও ভূমি ধস রোধ করতে হলে অবিলম্বে বহিরাগত সেটলারদের ফিরিয়ে নিয়ে সমতলে পুনর্বাসন করতে হবে, পাহাড়ের জীবন যাত্রার সাথে উপযোগী করে বসতি নির্মাণ করতে হবে এবং ঘনবসতি বন্ধ করতে হবে, পর্যটনের নামে যত্রতত্র হোটেল-মোটেল-পর্যটন স্পট নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং পর্যটনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, পাহাড় কাটা ও বৃক্ষ নিধন কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-প্রকৃতির উপযোগী রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হবে, শহর এলাকায় যত্রতত্র বাড়ি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস করা লোকজনকে অন্যত্র পুনর্বাসন করতে হবে এবং প্রশাসনের নজরদারী বাড়াতে হবে। (সমাপ্ত)
————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।