রবিবার, ২৫ জুন, ২০১৭
সংবাদ শিরোনাম

পার্বত্য চুক্তির ১৯ বছর : প্রসঙ্গ কিছু কথা

muktomot-copy2।। পারদর্শী।।
জনসংহতি সমিতি(সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন) ও আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ নামে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তারিখে। আজ সে চুক্তির ১৯ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু চুক্তিটি সরকার এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। এ ধরনের আরো একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯৮৫ সালে ১৯ এপ্রিল জনসংহতি সমিতির প্রীতিগ্রুপের সাথে। সেই চুক্তিতে ১০ দফা সমঝোতা হয়েছিল। সেই চুক্তি মোতাবেক প্রীতি গ্রুপ আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু সেই চুক্তিও বাস্তবায়ন হয়নি, প্রীতি গ্রুপের অস্তিত্বও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এ লেখায় চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয় বলার কারণ হচ্ছে, চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আগে থেকে সরকারের সাথে কি ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছে, কি কি বিষয়ে সমঝোতায় উপনীত হওয়া যাচ্ছে সে বিষয়গুলো সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। বৈঠক শেষে শুধু বলা হয়েছিল আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে… ইত্যাদি। সে সময় গণতান্ত্রিক তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে কি ভিত্তিতে সরকারের সাথে আলোচনা চলছে সে বিষয়ে খোলাসা করার জন্য জনসংহতি সমিতির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু বরাবরই তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে। জনগণের কোন মতামত গ্রহণ করা হয়নি। জনসংহতি সমিতি কিসের ভিত্তিতে সমাঝোতা উপনীত হচ্ছে তা জুম্ম জনগণের অজ্ঞাত ছিল। শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো জনসংহতি সমিতি জুম্ম জনগণের মৌলিক দাবি থেকে সরে গিয়ে জেলা পরিষদের আইনকে ঘষেমজে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলো। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে- জাতীয় স্বার্থ সম্বলিত কোন চুক্তি করতে গেলে(এমনকি জমিজমা বন্ধক রাখলে পর্যন্ত) সেখানে তৃতীয় কোন পক্ষকে সাক্ষী রাখতে হয়। কিন্তু দেখা গেছে চুক্তিতে জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমার বিপরীতে সাক্ষর করেছেন সরকারের তৎকালীন যোগাযোগ কমিটির প্রধান আবুল হাসানত আবদুল্লাহ। সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকলেও তিনি সাক্ষর করেননি। সরকারী লোকজন ছাড়া  তৃতীয় পক্ষ সাক্ষী হিসেবেও কাউকে রাখা হয়নি। ফলে এই চুক্তিটা জনগণের দাবি আদায়ের চুক্তি না হয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সম্বলিত চুক্তি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।  সে অনুসারে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

cht-accord

পার্বত্য চুক্তি আদতে পাহাড়ি জনগণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। যা স্বীকার করে সন্তু লারমাকেও বলতে হয়- ‘সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদন করে পাহাড়ি জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। পার্বত্য চুক্তি আজ কাগুজে চুক্তিতে পরিণত হয়েছে” (মুক্ত কণ্ঠ, ৯ এপ্রিল ২০০০)।

যে পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগ সরকার এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, চুক্তির পরপরই সরকার সেটা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। মূলত সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের আন্দোলনকে ধ্বংস করতেই এই চুক্তি করেছিল।

এখানে এ কথা বলা প্রয়োজন যে, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর যদি পাহাড়ি জনগণের মঙ্গলের জন্য করা হতো তাহলে সরকার নিশ্চয় এই চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতো। উপরন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘অপারেশন উত্তরণ’ নামক সেনা শাসন জারি রেখে চুক্তিপূর্ব পরিস্থিতির ন্যায় নিপীড়ন-নির্যাতন, ভূমি বেদখল, সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দমনমূলক ‘১১ নির্দেশনা’ জারি করে সরকার এই নিপীড়নকে আরো বৃদ্ধি করেছে এবং জনগণকে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখেছে।

এদিকে, প্রতিবছর ২ ডিসেম্বর এলে জনসংহতি সমিতি, সরকার, সেনাবাহিনী ও জেলা পরিষদের দালালরা নানা অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে জনসংহতি সমিতি চুক্তি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ করে সরকারের উদ্দেশ্যে কান্না জুড়ে দেয়। অপরদিকে সরকার, সেনাবাহিনী ও দালালরা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তির স্তুতি গেয়ে যায়। তারা শান্তির কনসার্ট আয়োজন করে, ফানুস ওড়ায়, আতশবাজির উৎসব করে।  এই হচ্ছে চুক্তির বর্তমান অবস্থা।

কাজেই, পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি জনগণের মুক্তি আসবে না এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাই চুক্তি নামক প্রতারণা দলিলটির উপর ভরসা না করে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সুসংগঠিত হয়ে নতুন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় এসেছে।

[মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো লেখকের নিজস্ব মতামতই প্রতিফলিত ]

—————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।