রবিবার, ২৫ জুন, ২০১৭
সংবাদ শিরোনাম

পিসিপির নেতা রমেল চাকমার মৃত্যু, আইএসপিআর ও কিছু প্রশ্ন

।। মন্তব্য প্রতিবেদন।।
নানিয়াচরে সেনাবাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের পর চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পিসিপি নেতা রমেল চাকমার মৃত্যুর ঘটনায় সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন উত্তাল। গতকাল সেনাবাহিনী তার মরদেহটি নিজ গ্রাম পূর্ব হাতিমারায় নিয়ে যেতে বাধা দিলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরো বেশী ঘনীভূত হয়। আজ কিছুক্ষণ আগে তাকে সেনা প্রহরায় পরিবার, জ্ঞাতি ও আত্মীয়স্বজনের অনুপস্থিতিতে জোর করে দাহ করা হয়। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে রমেল চাকমার মৃত্যুর জন্য নানিয়াচর জোন কমাণ্ডার মোঃ বাহালুল আলম ও মেজর তানভীরকে দায়ী করা হয়েছে এবং সড়ক ও নৌপথ অবরোধসহ কর্মসুচি ঘোষণা করা হয়েছে।

রমেল চাকমাঅপরদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে রমেল চাকমাকে ‘একটি ট্রাক পোড়ানো ও দুটি বাস লুটের মামলার আসামী’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন সেদিনই অর্থাৎ ৫ এপ্রিল তাকে নানিয়াচর থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। উক্ত সংবাদ সংস্থাকে তিনি আরো বলেন ‘পুলিশের হেফাজতেই সে চিকিৎসাধীন ছিল। সেনাবাহিনীর নির্যাতনে মৃত্যুর বিষয়টি ঠিক নয়, এটি ভিত্তিহীন অভিযোগ।’

রাশিদুল হাসানের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো সেনাবাহিনী রমেল চাকমার মৃত্যুর দায় পুলিশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা গা বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু আমরা জানি জোনে অমানুষিক নির্যাতনের পর সেনারা রমেল চাকমাকে থানায় হস্তান্তর করতে চাইলে ওসি মোঃ আব্দুল লতিফ তাকে গ্রহণ করেনি। পরে তাকে মুমুর্ষু অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে তাকে পুলিশি প্রহরায় চিকিৎসা দেয়া হয়। তাহলে কি সত্যিই রমেল চাকমা পুলিশের হেফাজতে ছিল ? আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষত নানিয়াচর থানার ওসির কাছ থেকে এ ব্যাপারে জবাব ও ব্যাখ্যা আশা করছি। তবে রাশিদুল হাসানের কথা মতে সেনাবাহিনী যদি রমেল চাকমার মৃত্যুর জন্য দায়ী না হয়, তাহলে কেন তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চাইছে? কেন তারা মৃত্যুদেহটি বাড়িতে নিয়ে যেতে না দিয়ে ছিনিয়ে নিয়েছে ? কেন তারা তার হেফাজতী মৃত্যুর সংবাদটি প্রচার না করার জন্য সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে? এবং কেনই বা আজ মৃতদেহটি চুপিসারে পুড়িয়ে ফেলেছে? বাংলাদেশে পুলিশি হেফাজতে আসামী ও নিরীহ নাগরিকের মৃত্যুর এন্তার অভিযোগ রয়েছে এবং আমরা যে সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত, কিন্তু রমেল চাকমার মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের দায় কতটুকু বা তারা আদৌ দায়ি কিনা তা আমরা নিশ্চিত নই। তবে তার মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ যে নির্মম শারীরিক নির্যাতন যে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের কোন অবহেলা ছিল কী না এবং সে কারণে তার মৃত্যু হয়েছিল কী না তাও আমাদের অজানা। একমাত্র সুষ্ঠু তদন্ত হলে তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় চিকিৎসা চলাকালে কেন তার আত্মীয় স্বজনসহ কাউকে তার সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি?

রমেল চাকমার মরদেহ
রমেল চাকমার মরদেহ

রাশিদুল সাহেব রমেল চাকমাকে একটি ট্রাক পোড়ানো ও দুটি বাস লুটের আসামী বলে উল্লেখ করেছেন। যদি যুক্তির খাতিরে হলেও তার এই অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নিই, তাহলেও প্রশ্ন তাকে আটকের পর জোনে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করার অধিকার আর্মিদের কে দিয়েছে? রমেল চাকমা শত মামলার আসামী হতে পারেন, কিন্তু ন্যায় বিচার পাওয়া তার নাগরিক অধিকার, যে অধিকার সংবিধানে দেয়া হয়েছে এবং য়ে অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনাবাহিনী বার বার বুটের তলায় পিষ্ট করে চলেছে। যদি তাকে ‘আসামী’ হিসেবে গ্রেফতার করা হতো,তাহলে কাছেই পুলিশের থানা সেখানে তাকে নেয়ার কথা, কিন্তু সেটা না করে জোনে নেয়ার রহস্য কী সেটা কি আমরা বুঝি না? মোট কথা হলো রমেল চাকমা সম্পূর্ণ নির্দোষ, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার বিরুদ্ধে থানায় কোন মামলা থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তিনি বেঁচে থাকলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ঝুলে দেয়া হতো সেটা নিশ্চিত। কারণ এটাই হচ্ছে আর্মিদের স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস, এভাবেই নিরীহ লোকজনকে তারা এযাত মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে আসছে। সত্য কথা হলো, সন্দেহবশত: এবং ইউপিডিএফ ও তার সহযোগী সংগঠনের উপর চলমান রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে তাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে শাসনের জন্য আর্মিদের কাছে লিজ দিয়ে বসে আছে। কিন্তু আর্মিদের শাসন অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে কিরূপ জটির করে তুলেছিল তা বোধ হয় নতুন করে বলার দরকার হবে না। তবে এটা সবার জানা দরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা শাসন কেবল ওই এলাকার জন্য নয়, সারা দেশের জন্যও অমঙ্গলজনক। আজ যারা পাহাড়িদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে, নিরপরাধ লোকজনকে খুন করছে, কাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে তারা যে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপরও দমনপীড়ন চালাবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? গত ২০০৭-৮ সালের জরুরী অবস্থার সময় সেনাদের মাইনাস-টু ফরমূলা প্রয়োগ করতে গিয়ে কত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাকে জেল-জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে (আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ) তা কি আমরা ভুলে গেছি? ঐ সময় সাধারণ একটা খেলাকে কেন্দ্র করে আর্মিরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্রদের ওপর কীরূপ নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাও আমরা দেখেছি। আর স্বাধীন বাংলাদেশে দু’জন রাষ্ট্রপতিকে কারা খুন করেছে? উত্তর হলো এই সেনাবাহিনী। নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে দেশকে চূড়ান্ত অধঃপতন ও ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল এই সেনাবাহিনীরই কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা। নিজেদের মধ্যে ক্যু ও কাউন্টার ক্যু করে খুনোখুনি করে মরেছেও এই সেনাবাহিনী। কাজেই সরকার এবং সব রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেনাবাহিনীর কাছে ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। পাশের বাড়িতে আগুন দিলে সে আগুনে আপনার বাড়িও পুড়ে যেতে পারে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীকে আগুন জ্বালাতে না দিয়ে তাকে অবশ্যই রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীন করতে হবে। এটা করতে ব্যর্থ হলে তার পরিণাম অবশ্যই খারাপ হতে বাধ্য।

যাই হোক, আমরা সেনা হেফাজতে নির্যাতনের ফলে রমেল চাকমার মৃত্যুর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবা জানাই। আমরা চাই অবিলম্বে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক, নিহতের পরিবারকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হোক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান রাজনৈতিক দমনপীড়ন বন্ধ করা হোক। (সমাপ্ত)
———————
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।