রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭
সংবাদ শিরোনাম

প্রসঙ্গঃ নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী গঠনের সেনা ষড়যন্ত্র

॥ মন্তব্য প্রতিবেদন ॥
খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কে বাঘাইহাট জোনের গেটে তল্লাশীর সময় অস্ত্রসহ আটকের পর এক ব্যক্তিকে ‘উপরের নির্দেশে’ ছেড়ে দেয়ার ঘটনা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সেনাবাহিনী শ্যামল কান্তি চাকমা ওরফে জোলেয়্যা ওরফে তরু নামে আটক ঐ ব্যক্তিকে কেবল ছেড়ে দেয়নি, তাকে সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে বিশেষ মর্যাদায় আটককৃত অস্ত্রটিসহ খাগড়াছড়ি পৌঁছে দিয়েছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামে নজীরবিহীন।

২৬ অক্টোবরের এই ঘটনার পর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অধূনা-লুপ্ত বোরকা পার্টির স্টাইলে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ জোড়ালো হয়েছে। সিএইচটি নিউজ ডটকম বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে জুলাই-এর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পানছড়ি-খাগড়াছড়ি বেল্ট-এ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এক মিটিঙে দলচ্যুত ও সমাজচুত যুবকদের নিয়ে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। জনসংহতি সমিতি এম. এন. লারমা গ্রুপের চার কেন্দ্রীয় নেতাও ইউপিডিএফকে এই সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ঘায়েল করতে সেনাদের ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে জেএসএস এম. এন. লারমার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট অংশ এই ষড়যন্ত্রের অংশীদার হওয়ার ঘোর বিরোধী বলে জানা গেছে। তাদের বিরোধীতার কারণ, তারা মনে করেন এই ষড়যন্ত্র জুম্ম দিয়ে জুম্ম ধ্বংস করার সরকারী নীলনকসারই অংশ। এই সন্ত্রাসী বাহিনী সৃষ্টি করা হলে এলাকার জনগণের ঘুম আবার হারাম হবে, এলাকায় চরম অশান্তি অরাজকতা সৃষ্টি হবে, হানাহানি, রক্তপাত ও বহু জীবন হানি ঘটবে। তাই সেনাদের এই জঘন্য ষড়যন্ত্রে যারা সমর্থন দিতে পারে, যারা এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে গজিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে, তাদের ন্যুনতম বিবেক ও মনুষ্যত্ত্ববোধ আছে বলে মনে হয় না, দেশপ্রেম জাতপ্রেম অনেক দূরের কথা। যদি জেএসএস-এম. এন. লারমা দলের ঐ ‘নেতারা’ অশান্তি-অরাজকতা সৃষ্টি করে হলেও, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হলেও ইউপিডিএফ-কে শায়েস্তা করে সেনা ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়ে থাকেন, তাহলে তা হবে চরম অপরিণামদর্শী এবং আত্মঘাতি। এজন্য জাতি ও জনগণ তাদের কখনো ক্ষমা করবে না। কাজেই সময় থাকতে তাদের এই অবস্থান থেকে অবশ্যই সরে আসা উচিত।

অস্ত্রসহ আটকের পরও ছেড়ে দেয়ার ঘটনা এমন সময় ঘটেছে, যখন সরকারী বাহিনীগুলো গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনরত ইউপিডিএফ ও অঙ্গ সংগঠনের নিরপরাধ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ধরে ধরে হাতে অস্ত্র গুঁজে দিয়ে জেলে পুড়ছে। এই ঘটনা এমন সময় ঘটেছে, যখন সেনাবাহিনী ও তাদের লেজুড়ের দল পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘অবৈধ অস্ত্র’ উদ্ধারের দাবিতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। সেনাবাহিনী বলে থাকে, তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দমনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত। সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য তারা জনগণের কাছে সাহায্যও চেয়ে থাকে। কাউখালিতে সেনারা এই ধরনের সাহায্যের আবেদন জানিয়ে ফোন নম্বরসহ জনগনের কাছে কার্ডও বিলি করেছে; খাগড়াছড়িতেও একই উদ্দেশ্যে মিটিং করা হয়েছে। অথচ অস্ত্রসহ গ্রেফতারের পরও সেনারা কাউকে কাউকে ছেড়ে দিচ্ছে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, একটি বিশেষ দলের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেয়া হলেও সেনারা তাদেরকে ধরার জন্য কিছুই করে না। বরং এটা একটা ওপেন সিক্রেট যে, আর্মিরা উক্ত বিশেষ দলের অস্ত্রধারীদের নানাভাবে সাহায্য করে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীই যে সন্ত্রাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক তার প্রমাণ ভুড়ি ভুড়ি। যেমন লক্ষীছড়িতে ২০০৯ সালের দিকে বোরকা পার্টি সৃষ্টি করা হয়। লক্ষীছড়ির জোন কমান্ডার লে. ক. শরীফুল ইসলাম ছিলেন এই সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতা। তার ছত্রছায়ায় এই বোরকা পার্টি লক্ষীছড়িতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও অরাকতার একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিল। অবশ্য জনগণের সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে পরে সেনাসৃষ্ট এই বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। বোরকা পার্টির মূল হোতা অনিল চাকমা গণপ্রতিরোধের এক পর্যায়ে প্রাণ হারান। আর্মি, পুলিশ, প্রশাসন, নিজস্ব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী পরিবেষ্ঠিত হয়েও তিনি রক্ষা পাননি। জাতি ও জনগণের বিরুদ্ধে গেলে কী করুণ পরিণতি হতে পারে অনিল চাকমার ঘটনা তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর্মি, পুলিশ কেউ তাকে রক্ষা করতে পারেনি। যারা আজ মনে করছে আর্মি ও পুলিশের কোলে উঠে শেষ রক্ষা হবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। তারা এতই বেকুব ও নরাধম যে, তারা বুঝতে পারে না আর্মিরা তাদেরকে ব্যবহার করছে মাত্র; ব্যবহার করে কাজ শেষ হলেই ছেড়া নেকড়ার মতো তাদেরকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। এইসব মুর্খদের বলা উচিত তারা যেন অনিল চাকমার ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়, মুখোশ বাহিনীর পরিণতি থেকে শিক্ষা নেয়। তাদের মনে থাকার কথা যে, এই মুখোশ বাহিনীও ছিল সেনাবাহিনীরই সৃষ্টি। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণপরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্র গণ আন্দোলন দমনের জন্যই ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে এই সন্ত্রাসী বাহিনীটির জন্ম দেয়া হয়েছিল। তবে খাগড়াছড়িবাসীর প্রবল গণজোয়ারে মুখোশরা খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল। আর্মি, পুলিশ ও প্রশাসন কেউ তাদের রক্ষা করতে পারেনি।

মোট কথা, আর্মিরা যদি মুখোশ বাহিনী কিংবা বোরকা পার্টির মতো নতুন করে আরও একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়, তাহলে পানছড়ি-খাগড়াছড়িবাসীর জন্য আর দুঃখের সীমা থাকবে না। তাই আগেভাগে এই বাহিনী গঠনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। সময়ে এক ফোঁড়, অসময়ে দশ ফোঁড় – এই কথাটা মনে রাখতে হবে।

ইউপিডিএফ জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে দলচ্যুতদের প্রতি ক্ষমা, মৈত্রী ও সহনশীল মনোভাব প্রদর্শন করেছে। গত ৮ নভেম্বর পানছড়িতে এলাকার মুরুব্বীদের সাথে এক মিটিঙে পার্টির নেতারা ঘোষণা করেছেন, দলচ্যুতরা যদি পার্টি বিরোধী ও জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী কার্যকলাপ বন্ধ করে সমাজের অন্য দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না। আমরা পার্টির এই ঘোষণাকে সাধুবাদ জানাই। এই ঘোষণা অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছে। আমরা আশাকরি, দলচ্যুতরা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী কাজ ছেড়ে দিয়ে সেনা খপ্পড় থেকে বেরিয়ে আসবে। একই সাথে জেএসএস-এম.এন. লারমা দলের প্রতি অনুরোধ, আপনারা সেনাদের সন্ত্রাসী বাহিনী গঠনের ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত হবেন না, আপনাদের যেসব নেতা এই ষড়যন্ত্রে অংশীদার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ নিন। কারণ দলের দু’ একজন নেতার ব্যক্তিস্বার্থের চাইতে সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থ অনেক বড়। এই মহান জাতীয় স্বার্থকে উর্ধে তুলে ধরুন। সেনাদের নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী গঠনের ষড়যন্ত্র অবশ্যই ভণ্ডুল করে দিতে হবে। (সমাপ্ত)
—————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *