শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাক সেনাদের মতো বর্বর আচরণ করবে কেন?

লিখেছেন- জিতু মুৎসুদ্দী

[জিতু মুৎমুদ্দীর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি এখানে প্রকাশ করা হলো–সম্পাদক মণ্ডলী]

কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। অঝোরে রিম ঝিম বৃষ্টি ঝড়ছে। ঠাণ্ডা বাতাস! মনটাও ভীষণ খারাপ। মাস খানেক হতে চললো- পারিবারিক নানা ঝুট-জামেলায় কম্পিউটার থেকে দূরে ছিলাম, তাই ফেসবুকও দেখা হয় না অনেক দিন। আজ শুধু এই লেখাটি লিখবো বলেই ফেসবুকে আসা। সময় বয়ে যায়, তার গতিতে! সময়ের সাথে সাথে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক নানা ঘটনা প্রবাহ যুক্ত হয় জীবনের সাথে, ইতিহাসের সাথে। আজ যা বর্তমান; কাল তা অতীত।

14264095_10206871731543032_4726411071156043683_nসেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে আরো একটি মর্মান্তিক, বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো। সেনা সন্ত্রাস!!! গণপ্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণের টাকায় কেনা গুলি ওরা আমাদের বুকে চালায়! গণপ্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী এক সৈনিক, এক কর্মকর্তা আমাদের সাথে এমন বর্বর আচরণ কেন করে? জাতিগত বিদ্বেষ থেকে? উগ্র বাঙালি জ্যাত্যাভিমানী শিক্ষা থেকে? কি ট্রেনিং দেয়া হয় তাদের? জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা কত সুনাম অর্জন করছে। আমাদেরও গর্ব হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সেনা কর্মকর্তারা আসেন তাদের আচার-ব্যবহার এত উগ্র- জাতিগত বিদ্বেষী হয় কেন?

রমেল চাকমার হ্ত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখছি- হ্যাঁ; এটা নতুন কোন ঘটনা নয়। অতীতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে জুম্ম জনগণ বহু গণহত্যার শিকার হয়েছে। মনে পড়ে – গাজীপুরের কালিয়াকৈর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্র জিম্পু চাকমাকেও মাটিরাঙ্গা বাজার থেকে সেনা সদস্যরা ধরে নিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছিল। কিন্তু কোন বিচার হয়নি।

ক’দিন প্রতিবাদ মিছিল, স্মারকলিপি পেশ….। অত:পর অন্য কোন একটি ঘটনায় ঢাকা পড়ে যায়, আবার নতুন ইস্যু সামনে এসে উপস্থিত হয়! এসকল ঘটনায় আমাদের দেশের প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া; সত্য প্রকাশে নির্ভীক কলম সৈনিকরা নির্বিকার!

গত ৫ এপ্রিল ২০১৭ নান্যাচর কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী একজন নিরীহ ছাত্রকে বাজার থেকে সেনা সদস্যরা ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করেছে। পরে ওই ছাত্রকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে সেনা সদস্যরা মুমূর্ষ অবস্থায় নান্যাচর থানায় সোপর্দ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ গ্রহণ করেনি। সেনা বাহিনীর হেফাজতে চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৭ এপ্রিল ২০১৭ [১৯ এপ্রিল ২০১৭ ] ওই ছাত্র মারা যায়।
সেনা বাহিনী সদস্যদের নির্যাতনে নিহত ছাত্রের নাম রমেল চাকমা (১৯)। রাঙ্গামাটির নান্যাচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের পূর্ব হাতিমারা গ্রামের বিনয় কান্তি চাকমা ছেলে। তার মায়ের নাম আলো দেবী চাকমা।

জানি; এ হত্যাকাণ্ডেরও কোন বিচার হবে না! কারণ – পার্বত্য চট্টগ্রামে “অপারেশন উত্তরণ ” নামক সেনা সামরিক শাসন জারী রয়েছে। তাই অনেক ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন এখানে নিধিরাম সর্দার!

পার্বত্য চট্টগ্রামে “অপারেশন উত্তরণ ” নামক সেনা শাসন বলবৎ রাখতেই সেনা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা সুক্ষ্ম পরিকল্পনায় অস্থিরতা সৃষ্টির পায়তারা চালাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে এখনো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায়নি।

ছবিটি জিতু মুৎসুদ্দীর ফেসবুক থেকে নেয়া
#ছবিটি জিতু মুৎসুদ্দীর ফেসবুক থেকে নেয়া

শাসক দলগুলো যেহেতু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতার রাজনীতি করেন, আর আমরা আন্দোলন করছি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য । মৌলিক পার্থক্যটা এখানেই। শাসকগোষ্ঠী আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করে দিতে চায়। আমরা প্রতিমুহূর্ত চরম নিরাপত্তাহীনতায় ও অস্তিত্ব সংকটে জীবন অতিবাহিত করছি। যুগ যুগ ধরে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা অছিলায় অপারেশন উত্তরণ(পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্বে অপারেশন দাবানল) নামক সামরিক শাসন জারি রেখেছে!
শাসকগোষ্ঠী কখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের সমস্যাকে মানবিক ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি!

জমানা আসে জমানা যায়! শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হোসাইন মোহম্মদ এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনার জমানা। কিন্তু আদিবাসী জুম্ম জাতির জীবনে রাষ্ট্রের ধ্বংসলীলার সুনামীর জমানা কখনো শেষ হয় না। রাষ্ট্রের জাতিগত আগ্রাসন, শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের জমানা শেষ হয় না।
আমরা উগ্র সাম্প্রদায়িকতার যাঁতাকলে পিষ্ট । উগ্র বাঙালি জাত্যাভিমানীর দাদ্ভিকতায় আপাদমস্তক আচ্ছন্ন যে রাষ্ট্রে আমাদের বসবাস করি। এখানে আত্মমর্যাদা ও আত্ম-পরিচয় নিয়ে মাথা উচু করে বাঁচার মতো বাঁচতে হলে সংগ্রাম করে যেতে হবেই।

সেটেলার বাঙালিদের লেলিয়ে দিয়ে আদিবাসী জুম্মদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা ও ভূমি দখল অন্যদিকে সরকার তথাকথিত উন্নয়নের নামে আদিবাসী জুম্মদের বসতভিটা থেকে একের পর এক উচ্ছেদের নীলনক্সা বাস্তবায়ন করে চলেছে!
সরকারের এই জবরদস্তিমূলক চাপিয়ে দেয়া তথাকথিত উন্নয়নের নামে জাতি আগ্রাসী কার্যকলাপের ফলে আদিবাসী জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্ব বারবার চরম হুমকির সম্মুখীন হয়ে আসছে। তাই সঙ্গত: কারণে এটা বলার কোন অপেক্ষা রাখে না যে আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর মতামতকে উপেক্ষা করে এই ধরণের কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থপরিপন্থী। পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত উন্নয়নের নামে সরকার এ পর্যন্ত যা কিছু করছে, সবই আদিবাসী জুম্মদের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

শাসকগোষ্ঠী নতুন করে সামরিকায়নের মনোবাসনা নিয়ে আদিবাসী জুম্মদের উপর আবার বেপরোয়াভাবে দমন-নিপীড়নের পথ বেছে নিচ্ছে। সেটা দেশের জন্য সুখকর কোন পরিস্থিতির জন্ম দেবে না।

সরকার যদি মনে করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্তদ্ধ করে দেয়ার জন্য জুম্ম জনগণকে হত্যা করে, মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে, এলাকা ছাড়া করে আন্দোলন দমন করা যাবে। সেটা চরম ভুল করছে।

১৯৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথ বাস্তবায়নে সরকার যতই কালক্ষেপন করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততই জটিল ও অশান্ত হয়ে উঠবে। শাসকগোষ্ঠীর একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল চায় পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করুক। এতে ওই বিশেষ কায়েমী-স্বার্থান্বেষী মহলের বিশেষ লাভ! আর এই লাভ লোকসানের ফাঁদে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার অশান্ত হয়ে উঠুক, আবার রক্ত ঝড়ুক। এটা নিশ্চয়ই কোন প্রগতিশীল, গণতন্ত্রমনা, মানবতাবাদী, শান্তিকামী মানুষের কামনা হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো- সরকার কি চায়?

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি বিশেষ কায়েমী-স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রীড়ানক হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ফ্যাসীবাদী কায়দায় আদিবাসী জুম্মদের উপর জাতিগত আগ্রাসনের স্টিম রোলার চালায়। সরকার যদি আদিবাসী জুম্মদের সাথে ফ্রাকেনস্টাইনের দানবদের মতো আচরণ শুরু করে। আদিবাসী জুম্ম জনগণ সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করবেই।

নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাংলাদেশের একটি সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীর কোন সদস্য যদি অপরাধ করে, এর দায়ভার ওই বাহিনী কোনভাবেই এড়াতে পারে না।

তাই রমেল চাকমার হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সেনা সদস্যদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। সেনাবাহিনী জুম্ম জনগণের সাথে যেভাবে অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক আচরণ করে চলেছে অবিলম্বে সেটার নিরসন হওয়া দরকার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক সকল অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পসহ “অপারেশন উত্তরণ ” নামক সেনা শাসন প্রত্যাহার করে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরী।
———————
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.