শনিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

বিদায় মিঠুন!

বিশেষ রচনা
ঘাতকের গুলিতে নিহত ইউপিডিএফ সংগঠক মিঠুন চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আজ। কিন্তু সকাল থেকেই সেনা বাহিনী ও পুলিশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসতে লোকজনকে বাধা দিচ্ছে। দীঘিনালা, পানছড়ি, গুইমারা, লক্ষ্মীছড়ি ইত্যাদি বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে দুটি বাসে যোগ দিতে যাওয়া নেতাকর্মীদেরও খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তবর্তী নোয়া বাজার আর্মি ক্যাম্পে আটকানো হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের এই ভূমিকা অত্যন্ত নিন্দনীয়। কেন এবং আইনের কোন ধারা বলে তারা এভাবে বাধা প্রদান করছে আমরা তা জানতে চাই। সংবিধানের কথা বাদ, সেই সংবিধানকে সেনাবাহিনী প্রতিদিন বুটের তলায় পিষ্ট করে চলেছে – ন্যুনতম সৌজন্যতাবোধ দেখাতেও কেন সেনাকর্তা ও প্রশাসনের এত কৃপনতা? পাহাড়িদের কী শোক প্রকাশের অধিকারও নেই ?

সেনাবাহিনী ও প্রশাসন গায়ের জোরে লোকজনকে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যেতে বাধা দিতে পারে, কিন্তু এতে তাদের চেহারাও উন্মোষিত হয়েছে। তারা নিজেরাই প্রমাণ করেছে তারা মিঠুন চাকমার হত্যাকারীদের পক্ষে। তাদেরকে গণরোষ থেকে বাঁচাতেই সেনা-প্রশাসনের এতসব আয়োজন। তাই আমরা আজ খোলাখুলি বলতে চাই, মিঠুন চাকমার মৃত্যুর জন্য সেনাবাহিনী দায়ি। তারা নব্য মুখোশ বাহিনী গঠন না করলে এ হত্যাকা- হতো না। তারাই নব্য মুখোশ বাহিনী সন্ত্রাসীদের দিয়ে একের পর এক জঘন্য খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। নব্য মুখোশ বাহিনীর হিট লিষ্ট থেকে এবং নান্যাচর বাজারে যাওয়ার জন্য জনগণের ওপর অব্যাহত চাপ দেয়া থেকে বোঝা যায় পর্দার আড়াল থেকে সন্ত্রাসীদের পুতুলের মতো কারা নাচাচ্ছে। কাজেই নব্য মুখোশ বাহিনীর খুনসহ সকল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ভার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে বহন করতেই হবে।

আমরা জানি, মিঠুন চাকমা যে রাজনীতি করতেন এবং যার পক্ষে রাজনীতি করতেন তা সেনাবাহিনীর আদৌ পছন্দ ছিল না। মিঠুন চাকমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর শিক্ষক হিসেবে যোগদানের সুযোগ স্বেচ্ছায় প্রত্যাখ্যান করে জুম্ম জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে প্রত্যক্ষভাবে সামিল হতে ইউপিডিএফে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। একই সাথে তিনি দেশের প্রগতিশীল সংগঠন ও আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি ইউপিডিএফের সংগঠক হিসেবে খাগড়াছড়ি ও সাজেক অঞ্চলে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সংগ্রামে অংশ নেন। ২০০৭-৮ সালে দেশে জরুরী অবস্থার সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মদদে ভূমি বেদখল যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন মিঠুন চাকমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ সময় অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দেন, দুর্গত এলাকায় গিয়ে ভূমি বেদখলের তথ্য সংগ্রহ করেন এবং জনগণের মনে সাহস ও ভরসা যোগান দেন। এক কথায় ভূমি বেদখল বিরোধী আন্দোলনে তার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে তিনি ছিলেন চেনামুখ, ব্লগারও ছিলেন তিনি, নিয়মিত লেখালেখি করতেন। এ কারণেই মিঠুন চাকমা সেনা ও স্থানীয় প্রশাসনের রোষের শিকার হন। তার বিরুদ্ধে দেড় ডজনের বেশী মামলা ঝুলিয়ে দেয়া হয়, অথচ কোন ধরনের অপরাধের সাথে তার ন্যুনতম সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

মিঠুন চাকমাকে দুইবার গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রথমবার ২০০৪ সালে তাকে অন্য একজনসহ খাগড়াছড়ির স্বনির্ভরে অনুষ্ঠিত একটি সমাবেশ থেকে সেনারা তুলে নিয়ে যায়। ক্যান্টনমেন্টে আটকাধীন অবস্থায় ব্যাপক শারীরিক নির্যাতনের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর তাকে আটক করা হয় ২০১৬ সালের ১২ জুলাই। তিন মাস কারাভোগের পর তিনি ১৮ অক্টোবর জামিনে ছাড়া পান।

এত জেল-জুলুম ও নির্যাতনের পরও মিঠুন দমে যাননি। তিনি আন্দোলনে ও সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে থাকেন। নব্য মুখোশ বাহিনী সৃষ্টি হওয়ার পরও তিনি ঝুঁকি নিয়ে নিজ বাসায় অবস্থান করে কাজ চালিয়ে যান, যা সেনা-প্রশাসনসহ অনেকের পছন্দ ছিল না। সে কারণে খুন হওয়ার কিছুদিন আগে তাকে খাগড়াছড়ি বাজারের একটি রেস্তোরাঁ থেকে তাকে অপরিচিত লোক দিয়ে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল।

যারা মনে করে খুন করে দমনপীড়ন চালিয়ে ইউপিডিএফ-কে শেষ করে দেয়া যাবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ১৯৯৮ সালে গঠনের পর থেকে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে পার্টির আড়াই শ-এর বেশী নেতা-কর্মী ও সমর্থক শহীদ হয়েছেন। অনেকে ভেবেছিলেন এভাবে ইউপিডিএফ-কে নির্মুল করা যাবে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নই রয়ে গেছে। ইউপিডিএফ বরং দীর্ঘ সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় সবকিছু মোকাবিলা করে আরো বেশী শক্তিশালী, আরো বেশী দক্ষ এবং আরো বেশী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আজ মিঠুন চাকমা নেই, তাকে বর্বরোচিতভাবে খুন করা হয়েছে; কিন্তু তার মতো আরো অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ যোদ্ধা ইউপিডিএফে যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন ইউপিডিএফই একমাত্র ভরসা। এই পার্টিই আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে ভূমি বেদখল বিরোধী সংগ্রামসহ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।

সেনা কর্তৃপক্ষ জনগণকে শোক প্রকাশ করতে দিক বা না দিক, এই শোক একদিন শক্তিতে পরিণত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অমিত তেজে জ্বলে উঠবে। আর তখন নব্যমুখোশ বাহিনী নামক জাতীয় কুলাঙ্গাররাসহ সকল অপশক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, যেভাবে অতীতে তাদের পূর্বসূরীরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আজ মিঠুন চাকমার প্রতি তার দল ও সংগঠনের সহযোদ্ধাদের এবং জনগণের ভালোবাসার প্রকাশ থেকে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মিঠুন চাকমার খুনী এবং তাদের গডফাদাররা যারাই হোক, তারা পেলে, ম্যারাডোনার মতো যত পাকা ‘খেলোয়াড়’ হোক, এই জঘন্য অপরাধের শাস্তি তাদের একদিন পেতেই হবে। এটাই নিয়তি, এটাই অমোঘ সত্য, যা অলঙ্ঘনীয়।

বিদায় মিঠুন!

# সেনা-প্রশাসনের বাধা সত্তেও মিঠুন চাকমার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছেন  শত শত মানুষ।

——————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *