বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

ভাইবোনছড়ায় ‘অপহরণ’ নাটক সাজানোর নেপথ্যে           

নিজস্ব প্রতিনিধি।। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া এলাকায় গত রবিবার (৪ জুন ২০১৭) বিকালের দিকে এক অপহরণ নাটক সাজানো হয়েছে। এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকালের দিকে ৫টি গাড়িতে করে খাগড়াছড়ি জোনের সেনাবাহিনী ও খাগড়াছড়ি পুলিশের একটি টিম ভাইবোনছড়ায় পথের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কংচাইরী পচু নামক একটি মারমা গ্রামে যায়।  সেখানে সেনা ও পুলিশের দলটি পানছড়ি লতিবান ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডেও মেম্বার অংম্রা মারমাসহ গ্রামের কয়েকজনের সাথে সেনা-পুলিশের টিমটি কথা বলে। এসময় তারা কোনো প্রকার ভুমিকা না টেনে এক বাঙালি অপহৃত হয়ে গ্রামে লুকিয়ে রাখা হয়েছে অভিযোগ করে। এসময় গ্রামের লোকজন অপহরণ বিষয়ে অবগত নন এবং তাদের গ্রামে কোনো ধরণের অপহরণ ঘটনা ঘটার কথা না বলে সেনা ও পুলিশের টিমকে জানান। কিন্তু সেনা ও পুলিশের দলটি কোনো প্রকার কথা বলা বা যুক্তি দেখানো সময় না দিয়ে একঘন্টার মধ্যে অর্থাৎ সন্ধ্যায় ইফতার শেষ করার পরে তারা আরো গ্রামে আসবে বলে জানায়। এবং এরই মধ্যে কথিত অপহৃতকে উদ্ধার করে দিতে না পারলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে তারা সেখান থেকে চলে যায়।

Khagrachariপরে এলাকাবাসী ঘটনাটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে জল্পনা কল্পনা করতে থাকে এবং ঘটনার সত্য নাকি মিথ্যা তা যাচাই করতে নানাদিকে খোঁজ নিতে থাকে। এদিকে কথিত অপহৃত ব্যক্তি আদতেই কে, তারা বাড়ি কোথায়, সে কী করে তা না জেনে অপহৃতকেই বা কোথায় খুঁজবে তা নিয়ে হয়রান হবার পরে গ্রামবাসী ও গণমান্য ব্যক্তিগণ অসহায় হয়ে পড়ে।

পরে জানা যায়, কথিত উক্ত অপহৃত ব্যক্তিকে নাকি পাওয়া গেছে! তাকে কোথায় পাওয়া গেছে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে গ্রামবাসীরা জানতে পারেন, উক্ত ব্যক্তি মূলত, সন্ধ্যা পর্যন্ত তার কয়েকজন বন্ধুর বাড়িতে আসর জমিয়ে আড্ডা দিয়ে ছিলেন।

কিন্তু কেন হঠাৎ করে কথিত এই ‘অপহরণ নাটক’ সাজানো হলো?

এর পেছনে কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য কি রয়েছে? কোনো বদ মতলবে কি এই নাটক সাজানো হয়েছে? কথিত উক্ত অপহৃত উক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে কেন নাটক করা হলো?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই ধরণের অপহরণ নাটক, ‘পাহাড়িরা হত্যা করেছে’ গুজবেই সাধারণত, ডজনের অধিক গণহত্যা ঘটানো হয়েছে। জবরদখল করে নেয়া হয়েছে হাজার হাজার একর পাহাড়ি জনগণের ভুমি, বাপদাদার ভিটেমাটি।

তদুপরি, এখানে বলা দরকার যেদিন এই অপহরণ নাটকটি সাজানো হয়েছে সেদিনই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদরে তিন সংগঠনের মিছিলে হামলা করে নীতিময় চাকমা ও জীবন চাকমা নামে দুইজন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতাকে আটক করা হয়। আটকের সম্পূর্ণ ঘটনা উৎসাহী এক ব্যক্তি মোবাইলে ভিডিও করে ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। উক্ত ভিডিও সামাজিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। হাজার ও লক্ষের মতো ভিজিটর এই ভিডিওটি দেখে। এবং স্পষ্টভাবে দেশবাসী দেখতে পায় শান্তিপূর্ণ মাত্র ৪০/৫০ জনের একটি সাধারণ বিক্ষোভ মিছিল কী বর্বরতম উপায়ে ভন্ডুল করা হলো। একই সাথে দুইজন পিসিপি নেতাকে আটক করার পরে প্রকাশ্যে রাজপথে তাদের অত্যাচার করার দৃশ্যও দেশবাসী ভিডিওতে দেখতে পেলো। ভিডিওতে দেখা গেল, একজন নারীকে নির্যাতন করা হচ্ছে। মাত্র কয়েকদিন আগে গত ০২ জুন, ২০১৭ রাঙামাটির লংগদুতে সেটলাররা শতশত পাহাড়ি জনগণের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দীঘিনালায় কোনো ‘বে-রসিক’ ব্যক্তির ভিডিও ভাইরাল হবার কারণে আদতেই দেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর ভাবমূর্তি তলানিতে নামার উপক্রম।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে বেসামাল হয়ে নাকি সেনাবাহিনী উক্ত অপহরণ নাটক সাজিয়েছে? হয়তো হতেও পারে যে, দীঘিনালার ঘটনাকে কোনো না কোনোভাবে কিছুটা আড়াল করতেই হয়তো এই নাটক সাজানো হতে পারে।

অথবা এটাও হতে পারে, কোনো সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাজানো হয়েছে এই নাটক!? ভাইবোনছড়া বাজারের পাশে অবস্থিত কংচাইরী পাড়া ও তার আশেপাশের এলাকার পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া চেঙ্গি নদীর উপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি ব্রিজ। সাম্প্রতিককালে এলাকাসমূহের বিভিন্ন জায়গার মালিকানা দাবি করে সেটলারদের প্রায় ২৭০ পরিবারকে ভুয়া ও বেআইনী দলিল তৈরি করে দেয়া হয়েছে এবং সেই দলিল দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি কমিশন বরাবর সেটলাররা ভুমির মালিকানা দাবি করে দরখাস্ত দিয়েছে বলে জানা গেছে। হয়তো আগামীতে কোনো ধরণের গুজব ছড়িয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটানোর রিহার্সাল হিসেবে এই নাটকটি সাজানো হয়েছে কি না তা নিয়েও এলাকার সাধারণ সচেতন মানুষজন ভাবতে শুরু করেছে।
—————–
সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.