শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
সংবাদ শিরোনাম

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নয়, সেটলারদের পুনর্বাসন করা হোক

।। মন্তব্য প্রতিবেদন ।।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে পুনর্বাসনের জন্য ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সম্পূর্ণ দেশজ অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে শেষ হবে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি সরকারের এই উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। তবে নিজ দেশর জনগনের সমস্যার প্রতিও তার নজর দেয়া জরুরী। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটলারদের আগমনের ফলে সৃষ্ট ভূমি বিরোধসহ প্রাকৃতিক ও সামাজিক যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধানের চেষ্টা সরকারের মধ্যে আদৌ রয়েছে বলে মনে হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার মূলে রয়েছে ভূমি – যা এক বাক্যে সবাই স্বীকার করে থাকেন। ভূমি সমস্যার সাথে গভীরভাবে জড়িত সেটলার ইস্যুটি। পাহাড়িদের হাজার হাজার একর জমি রয়েছে তাদের দখলে। এখন সরকার যদি সত্যিকার অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান করতে চায় এবং পাহাড়িদের বেদখলকৃত জমি ফিরিয়ে দিতে আন্তরিক হয়, তাহলে সেটলারদের বিকল্প পুনর্বাসনের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তাই আমাদের জোর প্রস্তাবনা হলো সেটলারদেরকে ভাসানচরে অথবা সমতলের অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা হোক। যে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তারা এ দেশের নাগরিক নন। পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা যে কোন সময় মায়ানমারে ফিরে যাবেন। সে কারণে এত বিশাল অংকের টাকা খরচ করে তাদেরকে পুনর্বাসনের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। তাই সরকারের উচিত ভাসানচর প্রকল্পে কিছু পরিবর্তন এনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটলারদের সেখানে পুনর্বাসন করা এবং রোহিঙ্গারা বর্তমানে যেখানে রয়েছে সেখানে তাদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া।

আর একটি কথা, রোহিঙ্গারা হলেন আন্তর্জাতিক শরণার্থী। বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয় দিয়ে তার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করেছে। সেজন্য দেশে বিদেশে সরকার প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কেন সব রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল সহানুভূতি জানিয়ে ও ত্রাণ সহায়তা দিয়ে তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। তাদের উচিত বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন দেশে আশ্রয়দানের ব্যবস্থা করা। সিরিয়াসহ মধ্যপ্রচ্যের বিভিন্ন দেশের শরণার্থীদেরকে ইউরোপের দেশগুলো যেভাবে ভাগ করে নিয়েছিল এশিয়ার দেশগুলোও সেরকম করতে পারে। ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে [ধর্ম কেন এত হিংসার জন্ম দেয় ? দৈনিক জনকন্ঠ ১০ অক্টোবর ২০১৭]। বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে এবং সব ডিম একটি ঝুড়িতে রাখার ভুল নীতি দ্রুত পরিত্যাগ করতে হবে।

# সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যে মানবিক ও উদার নীতি গ্রহণ করেছে, সেই একই নীতি তার দেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা উচিত। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা ‘জাতিগত নিধন’ শব্দগুলো খুব বেশী উচ্চারিত হচ্ছে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সংখ্যালঘু পাহাড়ি জাতিগুলো প্রতিনিয়ত জাতিগত নিধনের শিকার হচ্ছে তার খবর কে রাখে? জাতিগত নিধনের কাজ কেবল গণহত্যা চালিয়ে কিংবা দেশ থেকে বিতাড়িত করে সম্পাদন করা হয় না। উবসড়মৎধঢ়যরপ বহমরহববৎরহম বা জনভারসাম্য পরিবর্তন করেও ঘটানো হয়। উদাহরণ স্বরূপ, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি পৌরসভায় চুক্তির সমসাময়িক কালে পাহাড়ি ভোটারের সংখ্যা বাঙালিদের চাইতে সামান্য বেশী ছিল। বর্তমানে এই দুই পৌরসভায় বাঙালি ভোটারের সংখ্যা পাহাড়িদের চাইতে দুই তৃতীয়াংশের বেশী। অপরদিকে বান্দরবান পৌরসভায় এই অনুপাত ৫.১। যদি বাঙালিদের বৃদ্ধির হার এভাবে চলতে থাকে তাহলে কয়েক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেমোগ্রাফিক চেহারার এমন পরিবর্তন ঘটবে যে, পাহাড়িরা সেখানে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মতো হতে বেশী সময় লাগবে না। কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে যা ঘটছে তাকে এথনিক ক্লিনজিং ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। এটা হলো বাঙালি জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাহাড়িদের সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যালঘুতর এবং ক্রমে তাদের জাতীয় অস্তিত্ত্ব ধ্বংস করে দেয়া।

তাই সরকারের উচিত অন্য দেশের বিরুদ্ধে এথনিক ক্লিনজিং-এর অভিযোগের তীর নিক্ষেপের আগে নিজের ঘর আগে সাফ করা। তা না হলে তার সেই অভিযোগের কোন মূল্য থাকবে না। অন্য দেশের এথনিক ক্লিনজিং-এর ব্যাপারে সরব হবেন, অথচ নিজ দেশে এথনিক ক্লিনজিং চালাবেন – এই দ্বৈত নীতি কোথাও সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কাজেই কাল বিলম্ব না করে সেটলারদের ভাসানচরে অথবা অন্য কোথাও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে এটা অবশ্যই সম্ভব। অনেক সময় কোন কোন মহলের পক্ষ থেকে বলা হয় সমতলে পর্যাপ্ত জমির অভাব। কিন্তু এটা আদৌ সত্য নয়। পাহাড়ে অনেক জমি খালি পড়ে আছে এটা যেমন একটা মিথ, সমতলে জমির স্বল্পতা রয়েছে এটাও তেমনি একটা মিথ। বাংলাদেশে সমতল জেলাগুলোতে এখনো পর্যন্ত হাজার হাজার একর খাস জমি রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ হলো এমন একটি দেশ যেখানে প্রতিবছর দেশের ভূখন্ডের সাথে ১৬ বর্গ কিলোমিটার জমি যোগ হচ্ছে। [প্রথম আলো, ৫ আগষ্ট ২০১৬]

গত কয়েক দশকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অসংখ্য চর সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংগঠনের মাধ্যমে সেটলারদের পুনর্বাসন করা কোন সমস্যাই হতে পারে না। সরকার ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের ইছাখালি চরে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এখানেও সরকার সেটলারদের পুনর্বাসন করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত করতে পারে।

মোট কথা, সেটলারদের জাতিগত নিধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে তাদেরকে সমতলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত করুন। এতে দেশ সমৃদ্ধ হবে, পাহাড়েও শান্তি ফিরে আসবে। (সমাপ্ত)
————-
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *