বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

রমেল চাকমার পরিবারের করুণ কাহিনী

লিখেছেন : রাজা দেবাশীষ রায়

[রাজা দেবাশীষ রায়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি এখানে হুবহু প্রকাশ করা হলো– সম্পাদকমণ্ডলী]

 

১ মে ২০১৭-তে রমেল চাকমার পরিবারের সদস্যদের সাথে তাদের গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে কথা বলেছি। হ্যাঁ, সেই রমেল চাকমা, যাকে সপ্তা দুয়েক আগে নির্মম, নিষ্ঠুর ও বেআইনি-ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সাথে, অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন আমার সহধর্মিণী রানী য়েন য়েন ও বিশিষ্ট পার্বত্য নেতা, গৌতম দেওয়ান।

17883804_1407323369318545_7982007025493183326_nমা-বাবা ছাড়া পরিবারে রয়েছে রমেলের এক ছোট ভাই ও দুই বড় বোন। ভাইয়ের সাথে দেখা হয়নি। উনি মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে এক বৌদ্ধ বিহারে শ্রমণ হিসেবে বসবাস করছেন। এর আগে, অধ্যয়ন জীবনে তার দাদার সাথে নান্যাচর উপজেলা সদরের কাছে একই ভাড়া বাসায় থাকতেন। দুই বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, তবে একজন নিকটস্বত গ্রামেই (মা-বাবার খুঁটি হয়ে তার ও তার বোনেরই থাকতে হবে!)।

আমাদের গ্রামে অবস্থানকালীন সময়টা জুড়েই ছিল রমেলের মায়ের চোখে জল (রানী য়েন য়েন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ বিষয় উল্লেখ করেছেন)। এর মধ্যেও তিনি আমাদের আতিথেয়তা করতে ভুলেন্নি। তাঁর স্বামীর ন্যায় ব্লাড প্রেশারে না ভুগলেও উনি অসুস্থ। বাবার পকেটে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল ট্যাবলেটের ফাইল।

রমেলের বেআইনি গ্রেপ্তারের দিন, সাপ্তাহিক রীতি অনুযায়ী ছেলের জন্য চাল, তেল, ঙাপ্পি প্রভৃতি কিনে দিয়েছেন তার বাবা, নান্যাচর বাজার থেকে। কিন্তু ছেলের দেখা মেলেনি। পরে জানলেন যে ছেলে সেনাবাহিনী কর্তৃক “গ্রেপ্তার” হয়েছেন। বাবার আদরের বাজারকৃত খাওয়া রমেলের ভাগ্যে আর জুটলনা।

চট্টগ্রামের হাসপাতালে থাকার সময় কোন এক সরকারী ব্যক্তির সহায়তায় এক বোনের সাথে রমেলের টেলিফোন-যোগে কথা হয়েছিলো। কয়েকবার। হাসপাতালে গিয়ে তার অবস্থা দেখার জন্য পরিবার উদগ্রীব ছিল। কিন্তু অনুমতি নাকি পাওয়া যায়নি। পরে টেলিফোনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল।

রমেলের বাবা নিরক্ষর। মাও সম্ভবত তাই। তবে অনেক কষ্টে পাহাড়ি জমিতে বাগান আবাদ করে মা-বাবা চার সন্তানকেই লেখা পড়ার যথাযথ সুযোগ দিয়েছেন। চারজনই মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ। বোধ হয় এক মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেছেন। তা রমেলের ভাগ্যে জুটল না। পরীক্ষা শুরু করে শেষ করার আগেই তার গ্রেপ্তার ও খুন।

গ্রেপ্তারের একদিন বা দুদিন পর রমেলের বাবা তার ছেলের এক কলেজের সহপাঠীর কাছ থেকে জানলেন যে রমেলকে জোর পূর্বক সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক একটি যানবাহনে তুলে নেয়া হয়। রমেল নাকি জোরদার ভাবে আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায়নি।

যেদিন রমেলের দেহাবশেষ গ্রামে নিয়ে এসে তাদের বাড়ীর ৫০-৬০ ফিট দূরে, দাহ করা হয়, তখন রমেলের মা-বাবা ও প্রতিবেশীগণ কেউই গ্রামে ছিলেন না। তার আগের দিনে এলাকার এক কারবারি ও অন্য এক ব্যক্তিকে নিকটের সেনা দপ্তরে হাজির হতে বলা হয় এবং তাদেরকে রাতে আর গ্রামে ফিরতে দেয়া হয়নি। খবর শুনে গ্রামবাসী – রমেলের মা-বাবা সহ – গ্রাম ছেড়ে আতঙ্কে পালিয়ে যায়। কি আর করবে তারা! এরকমভাবে কতবার গ্রাম ছাড়তে হয়েছে তাদের।

আমরা গিয়ে তেমন কি আর করলাম! সান্ত্বনা দেয়ার মতো কি বা আছে আমাদের। পুরুষ-শাসিত সমাজের রীতি অনুযায়ী তাদের আর কি রইলো! এক ছেলে হল নিহত। মর্মান্তিক ভাবে। আরেক ছেলে সংসার জীবন ছেড়ে সন্যাস জীবন অবলম্বন করলো। রমেলের বোন একজনকে আসার আগে বললাম, “তোমরা দুই বোনই এখন বাবা-মার অবলম্বন। তোমরাই এখন ছেলে ও মেয়ে” (এই মুহূর্তে মনে নেই,সে কাছের গ্রামে নাকি অনেক দূরের গ্রামে বিয়ে হয়ে চলে গেছে। সম্ভবত দূরের গ্রামে)।

এক গ্রামবাসী বললেন নান্যাচর থানায় তারা খুনের মামলা করতে চেয়েছিলেন। তাঁদেরকে বলা হয়েছে যে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট থানা থেকে Death Report না আনা হলে মামলা করা যাবেনা। তবে পুলিশের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, সেনা কর্তৃপক্ষ যেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আর মন্তব্য প্রদান করুক না কেন, রমেলের বিরুদ্ধে থানাতে কোন মামলা ছিলনা। এবং রমেলের “গ্রেপ্তার” -এর সাথে, এবং তার অ-স্বাভাবিক মৃত্যুর সাথে, পুলিশ বাহিনী কোনভাবে জড়িত না। পুলিশের ভূমিকা ছিল কেবল মৃত দেহটি চট্টগ্রাম থেকে নান্যাচরে স্থানাতর করা, ও দেহটি সৎকার করার জন্য গ্রামে নিয়ে যেতে সেনাবাহিনীকে সহায়তা প্রদান করা।

রমেলদের গ্রামে এক ঘণ্টা বা তার কিছু বেশীকাল সময় অবস্থানের পর সেখানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি সফররত তদন্ত কমিটির সদস্যদের সাথে দেখা হয়। এঁদের মধ্যে ছিলেন কমিশনের সদস্য প্রফেসর বাঞ্ছিতা চাকমা (রাঙামাটি সরকারী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ)। সাথে ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট, কমিশনের কর্মকর্তা ও পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা ও কর্মচারী (নারী সহ)।

এই কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আমরা চলে আসার সময় এই কমিটি রমেলের পরিবারের সাথে কথা বলছিল। দেখা যাক, কমিটি সাহসিকতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়নতা ও professionalism অবলম্বন করে যথাযথ প্রতিবেদন পেশ করে কিনা।

পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক গণহত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি বা কমিশনের প্রতিবেদন জনসমুখ্যে প্রকাশ করা হয়নি। এরূপ অনেক প্রতিবেদনের যথাযথ ও বস্তুনিষ্ঠ সুপারিশমালা সরকার বাস্তবায়ন করেননি।

তা যদি করা হয়ে থাকতো, ন্যায় বিচার যেমন প্রতিষ্ঠিত হতো, এতে সেনাবাহিনী সহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের ব্যক্তিগতভাবে হয়তো শাস্তি হতো (তাদের দায়িত্ব তাদের, ব্যক্তিগতভাবে, প্রতিষ্ঠানের নয়), কিন্তু সার্বিকভাবে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীটির (সেনা বাহিনী, BGB, পুলিশ, আনসার, VDP, ইত্যাদি) দক্ষতা, নিয়মানুবর্তিতা, সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় থাকতো ও উন্নতি লাভ করতো এবং আপামর নাগরিকগণের আস্থা অর্জন ও বৃদ্ধিতে সহায়ক হতো।

চলে আসার আগে রমেলের বাবা-কে বললাম, “আপনার ছেলেকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেনা। সুবিচারও পাওয়া যাবে কিনা বলা যাচ্ছে না। তবে এটা ভেবে যদি কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পান যে আপনার ছেলের বেআইনি ও অন্যায়মূলক হত্যার সুবিচার পাওয়ার জন্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের গনতন্ত্রমনা ও মানবাধির-সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে অন্তত এরকম নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ না হলেও, কিছুটা হলে কমবে।”

অর্থাৎ রমেলদের মত হতভাগাদের সংখ্যা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যত্রে, অন্তত চঢ়মভাবে বাড়বে না। এই নিরাশ অবস্থাতেও এই ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রইলাম। তবে এর জন্য যার যার অবস্থান থেকে যা করণীয়, তা করতে হবে। দেশের আপামর নাগরিকদের মানবাধিকারের, দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন ও সার্বিক উন্নতির স্বার্থে, এবং সেনাবাহিনী সহ দেশের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সমূহের মর্যাদা ও যথাযথ ভূমিকা অব্যাহত রাখার স্বার্থে । বসে থাকলে চলবে না।
——————–
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.