রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়?

0
1

সিএইচটিনিউজ.কম ডেস্ক:
এ লেখাটি  ২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক অনিয়মিত পত্রিকা ‘জাতীয় ডাক’ এর ১ম সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে রাঙামাটিতে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সরকারের কার্যক্রমের প্রেক্ষিতে  সিএইচটিনিউজ.কমের পাঠকদের জন্য জাতীয় ডাক-এর সৌজন্যে লেখাটি এখানে হুবহু প্রকাশ করা হলো:

রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়?
গত ২১ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের ঝগড়াবিল এলাকার জনগণ ইউনিয়নের বিলাইচর পাড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সরকারী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে Rangamati2রাঙামাটি শহরে মানববন্ধন করেছেন। শত শত পাহাড়ি ঐদিন সকালে কোর্ট বিল্ডিংএর সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচীতে অংশ নেন। তারা সরকারকে প্রস্তাবিত রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ বন্ধেরও দাবি জানান এবং জেলা প্রশাসকে মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি পেশ করেন।

তারা বলেন, সরকার পাহাড়িদের উচ্ছেদের জন্য এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। বক্তারা বলেন, ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে হাজার হাজার পাহাড়ি উদ্বাস্তু হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় করা হলে তাদেরকে আরো একবার উচ্ছেদ হতে হবে। দাবি মানা না হলে তারা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলারও হুমকি দেন।

উপরোক্ত কথাগুলো ইংরেজী দৈনিক ডেইলী স্টার-এর ২২ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত খবর থেকে উদ্বৃত। এই সংবাদটি পড়ে হয়তো অনেকের চোখ ছানাবড়া হয়ে যেতে পারে। ‘কেন? তারা কি উন্নয়ন চায় না?বিশ্ববিদ্যালয় হলে তো তাদেরই লাভ; কেন তারা বিরোধীতা করছে? তারা কি উচ্চ শিক্ষা চায় না?’ ইত্যাদি প্রশ্ন দেখা দেয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কেন তারা একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সবাই উন্নয়ন চায়, শিক্ষা চায়, ভালোভাবে ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। পাহাড়িরাও উন্নয়ন বিমূখ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলে পাহাড়িরা খুশী হওয়ারই কথা, যেমনভাবে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্তে খুশী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যে কারণে সে সময় তারা খুশী হতে পারেনি, ঠিক একই কারণে তারা এখনো খুশী হতে পারছেন না। এ যাবত ‘উন্নয়ন’ পাহাড়িদেরকে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের ক্ষতির কারণই হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়নের জন্য কাপ্তাই বাঁধ হয়েছে, তার ফলে পাহাড়িরা নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ ও ছন্নছাড়া হয়েছেন। ১৯৫৩ সালে চন্দ্রঘোনায় পেপার মিল হয়েছে, পাহাড়িরা মিলের আশেপাশের এলাকা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। আমেনা মহসিন তার পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজম বইয়ে লিখেছেন: The construction of this mill led to the displacement of the Marmas (actual number not known) who lived in that area. Today there is no indigenous settlement near the mill and almost 100 per cent of the nearby population comprises of Bengalis. অর্থাৎ এই মিল নির্মাণের ফলে যে সব মারমা এই এলাকায় বসবাস করতেন (প্রকৃত সংখ্যা অজ্ঞাত) তারা উচ্ছেদের শিকার হন। বর্তমানে মিলের পাশে কোন পাহাড়ি বসতি নেই, এবং আশেপাশের লোকজন প্রায় সবাই বাঙালি।

এই উন্নয়নের বলি পাহাড়িরা অনেক বার হয়েছেন। শুধু পাকিস্তান আমলে নয়, বাংলাদেশ আমলেও। বন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য রিজার্ভ ফরেস্ট গঠন করা হয়েছে, আর তার ফলে পাহাড়িরা তাদের জমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, বংশ পরম্পরায় তারা যে বনের ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে এসেছেন সেই বনের ওপর থেকে তাদের সকল অধিকার হারিয়েছেন। এসব উন্নয়ন করা হয়েছে কার স্বার্থে? নিশ্চয়ই পাহাড়িদের স্বার্থে নয়। আর এসব তথাকথিত উন্নয়ন পাহাড়ি জনগণের কোন মতামত নেয়া হয়নি। যাদের জন্য উন্নয়ন তাদেরই মতামত নেয়ার প্রয়োজন বোধ করা হয়নি। এটা কি আশ্চর্য্যজনক নয়?

নতুন পাকা রাস্তা হয়েছে মানে পাহাড়িদের কপালে দুঃখে জন্ম হয়েছে। তারা তাদের জমি হারিয়েছে, উচ্ছেদের শিকার হযেছে। তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের দ্বার অবারিত হয়েছে। সবুজ শ্যামল পাহাড়গুলো বিরান হয়ে গেছে। কেন পাহাড়িরা নতুন রাস্তা চায় না সে ব্যাপারে স্বপন আদনান অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পান: “They apprehend that these would facilitate interventions by the state and the security forces, as well as the inflow of Bengali settlers, traders, moneylenders, loggers, etc. অর্থাৎ তাদের (পাহাড়িদের) আশঙ্কা এর ফলে (রাস্তাঘাটের উন্নয়নের ফলে) রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপের সুবিধা হবে এবং বাঙালি সেটলার, ব্যবসায়ী, মহাজন ও গাছ ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটবে। ‘ স্বপন আদনান এটাকে বলেছেন development paradox বা উন্নয়নের স্ববিরোধিতা। তিনি তার গবেষণামূলক গ্রন্থ Mrgration, Land Alienation and Ethnic Conflict: Causes of Proverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh-এ  এসব কথা লিখেছেন।

রাস্তাঘাটের উন্নয়নের প্রভাব সম্পর্কে ওই বইয়ে তিনি আরো লেখেন: Our fieldwork observations indicate that, wherever Pahari settlements have been opended up by expansion of road and water transport networks, they have also been exposed to the entry and interventions of outsiders, inclusive of traders, settlers, officials, security forces and development agencies, Travelling across the CHT, we have been struck by the fact that the existence of good roads was almost always associated with significant extents of deforestation, soil erosion, enviromental degradation, in-magration by settlers and traders, forcible takeover of pahari lands, the establishment of rubber plantations, etc. (অর্থাৎ মাঠের কাজের পর্যবেক্ষণ এই ইঙ্গিত দেয় যে, যেখানে পাহাড়ি বসতিগুলো সড়ক ও পানি পথের যোগাযোগ নেটওয়ার্কের দ্বারা খুলে দেয়া হয়েছে সেখানে বহিরাগতরা অর্থাৎ ব্যবসায়ী, সেটলার, সরকারী কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনী ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো ঢুকে পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে আমরা এটা দেখে অবাক হয়েছি যে, প্রায় সকল সময় ভালো রাস্তার উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বন ধ্বংস-সাধন, ভূমির অবক্ষয়, পরিবেশগত অবনমন, সেটলার ও ব্যবসায়ীদের আগমণ, জোরপূর্বক পাহাড়িদের জমি হরণ, রাবার বাগান সৃষ্টি ইত্যাদি।

যদি এই সময় রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হয়, তাহলে পাহাড়িদেরকে আবার “উন্নয়নের” বলি হতে হবে। বহুল কথিত সেই ইতিহাসের পূনরাবৃত্তি। সে কারণে সরকারের বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণায় পাহাড়ি জনগণ খুশী হতে পারছেন না। কারণ প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়টি যে এলাকায় করা হবে সে এলাকার পাহাড়িরা উচ্ছেদের শিকার হবেন। এরা অতীতে কাপ্তাই বাঁধের ফলে একবার উচ্ছেদ হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পাহাড়িদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী সবাই না হলেও অন্ততঃ বেশীর ভাগই হবেন বহিরাগত। তৃতীয়ত, নিরাপত্তার অজুহাতে আসবে পুলিশ, থানা, সেনা ক্যাম্প ইত্যাদি। বসবে ব্যাংক, বাজার, যাতে থাকবে বহিরাগতদের প্র্রাধান্য। ধীরে ধীরে আশে পাশের পুরো এলাকা বেদখল হয়ে যাবে। চতুর্থত, পাহাড়িদের সংস্কৃতি কলুষিত হবে, যে সংস্কৃতির রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য সরকারের নেতা নেত্রীরা হারহামেশা সব দিয়ে থাকেন। এছাড়া সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনাকেও ছোট করে দেখা যায় না। পঞ্চমত ও শেষত, প্র্রাকৃতিক পরিবেশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ উচ্ছেদ হওয়া লোকজনের জীবিকার জন্য জুম চাষের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে ন। জনসংখ্যার প্রবল বৃদ্ধির কারণে জুমচাষ পার্বত্য চট্টগ্রামে ইতিমধ্যে অলাভজনক ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই এ সব বিবেচনায় সরকারের উচিত রাঙামাটি বা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রস্তাবিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা। সরকার যদি সত্যিই পাহাড়িদের শিক্ষার জন্য আন্তরিক হয়, তাহলে তার উচিত রাঙামাটিতে নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ স্থাপন না করে তার পরিবের্ত দেশের এসব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোটা বৃদ্ধি করা। পাহাড়িদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সরকার আরো একটা পদক্ষেপ নিতে পারে, তা হলো, ঢাকা ও  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে “ন্যাশনালিটিজ স্টাডিজ” নামে একটা নতুন ডিপার্টমেন্ট চালু করা।

দ্বিতীয়ত, আরো যেটা করা দরকার তা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় কমপক্ষে তিনটি হিমাগার স্থাপন। এটা এলাকার জনগণের দীর্ঘ দিনের দাবি। হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত ফলমুল ও অন্যান্য খাদ্যশসস্য নষ্ট হয়ে যায় ও কৃষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। অথচ এ ব্যাপারে সরকারের কোন দৃষ্টি নেই।

একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার যে, যত দিন পর্যন্ত পাহাড়িরা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্তা হতে পারবে না, যত দিন “উন্নয়নের” ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে না, ততদিন এই উন্নয়ন তাদের ক্ষতিরই কারণ হবে, যেমনটা অতীতে হয়েছে। সরকারের উচিত আগে পাহাড়িদের হাতে সত্যিকার অর্থে স্বশাসন দেয়া। যে কোন জাতি বা জাতিসত্তার উন্নতির জন্য এ ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
——–
সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.