রাঙামাটিতে বোমা, ভূমি কমিশনের শুনানী ও চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা প্রসঙ্গে

0
1
 সিএইচটিনিউজ.কম

রাজনৈতিক ভাষ্য,

গত মে মাসের শেষের দিনগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত, ২০ মে রাঙামাটি শহরে বোমা বিষ্ফোরণ ও এতে ১১ জন ছাত্রের আহত ও পরে একজনের মৃত্যু হওয়ার ঘটনা। দুই, ২৩ ও ২৪ মে ভূমি কমিশনের শুনানী বাতিল ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় ইউপিডিএফ-সমর্থিত গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ডাকে ৩৬ ঘন্টা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ। তিন, ২৮ মে ঢাকায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠান। নিচে এ ঘটনাগুলোকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
১.
রাঙামাটিতে বোমা বিষ্ফোরণ: cui bono?
রাঙামাটিতে বোমা বিষ্ফোরেণর ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। সন্তু গ্রুপ দৃশ্যত রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হীন উদ্দেশ্যে ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে। তবে ইউপিডিএফকে দায়ী করলেও সন্তু গ্রুপের লোকজন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে না যে এ ঘটনা ইউপিডিএফ ঘটিয়েছে। পুলিশ ঘটনাকারীকে এখনো চিহ্নিত ও আটক করতে পারেনি।
চুক্তির পর গত দেড় দশকে সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড জনগণের মধ্যে বহু অসন্তোষ, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক শত্রু সৃষ্টি করেছে। ইউপিডিএফ ছাড়াও জেএসএস-এর সরাসরি প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে জেএসএস (এমএন লারমা)। কয়েক মাস আগে সন্তু গ্রুপ বরকলে ৫ বাঙালিকে অপহণ করলে সেটলারদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখা দেয়। সমঅধিকার সন্তু লারমার আঞ্চলিক পরিষদের অফিস আক্রমণ করে। সন্তু গ্রুপ এরপর কাপ্তাই থেকে আওয়ামী লীগের এক নেতা অনিল তনচঙ্গ্যাকে অপহরণ করে। তাকেও আজ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া হয়নি। এছাড়া রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী এলাকায় সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গত কয়েক বছরে শতাধিক লোককে অপহরণ কিংবা খুন করেছে। এই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুদ্ধ পক্ষগুলোর মধ্যে থেকে যদি কেউ ওই হামলা ঘটিয়ে থাকে, তাহলে অবাক হওয়ার কোন ব্যাপার আছে?
যখন জানা বা ন্যায়সঙ্গতভাবে ধারণা করা যায় না কারা ঘটনা ঘটিয়েছে তখন ল্যাটিন ভাষায় প্রশ্ন করা হয় cui bono? অর্থাৎঘটনা থেকে কে বা কারা লাভবান হচ্ছে? যে বা যারা লাভবান হচ্ছে তারাই ঘটনার জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। এখন পাঠক বিচার করবেন রাঙামাটির বোমা বিষ্ফোরণ ঘটনা থেকে কারা লাভবান হচ্ছে।
সন্তু গ্রুপের উচিত ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করে নির্মোহও নিরাবেগ সহকারে ঘটনার বিশ্লেষণ করা ও সেই অনুসারে পদক্ষেপ নেয়া। ইউপিডিএফ যদি হামলা করে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইতো, তাহলে আমার ধারণা তারা সমাবেশের আগে অথাৎ সমাবেশে যোগদানে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে হামলা চালাতো। সেটাই তাদের দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত ও স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে সমাবেশ শেষে, যখন বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য ছাত্ররা কল্যাণপুরে পেট্রোল পাম্পে গাড়ির অপেক্ষা করছিল। আর ঘটনার পর ইউপিডিএফ যে লাভবান হয়নি তা তো সবার কাছে স্পষ্ট।
ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক, লাভের খাতায় কিন্তু সন্তু লারমা ঠিকই নাম উঠাতে সক্ষম হয়েছেন। এ ঘটনা তার জন্য ইংরেজীতে যাকে বলে একেবারে a shot in the arm. তিনি ঘটনাকে ব্যবহার করে ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরদার করেন। এমনকি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায়ও তিনি এই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। চুক্তি বাস্তবায়নের চাইতে ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করা বেশী জরুরী বলে মন্তব্য করেন। এক কথায়, ঘটনার পর তিনি যা করেন তাতে মনে হয় তিনি যেন এ ধরনের ঘটনার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছিলেন।
সরকার অথবা সেনাবাহিনীর একটি অংশ চায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) এর মধ্যে যাতে কোনভাবেই ঐক্য গড়ে না ওঠে বা দুই পার্টির মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপৎ কোনভাবেই যাতে আন্দোলন গড়ে না ওঠে। ভূমি কমিশনের শুনানীর বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ রাঙামাটি ঘটনার বহু আগে সড়ক অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা দিয়েছিল। সন্তু গ্রুপেরও পূর্বনির্ধারিত ৩০ মের সমাবেশ (যা হয়নি) থেকে চুক্তি বাস্তবায়নের কর্মসূচী ঘোষণাকরার কথা ছিল। যদি দুই পার্টি সমানতালে আন্দোলনে যেতো তাহলে আন্দোলনের মাঠে যেকোনভাবে একটা ঐক্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই ছিল। আমার ধারণা, সরকার ও সেনাবাহিনীর এই মহলটি এটা বুঝতে পেয়েছে এবং সন্তু গ্রুপকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে পরিকল্পিতভাবে ২০মের বোমা হামলা ও ২৮ মে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা আহ্বান করানো হয়েছে।
২.
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা
ঢাকায় ২৮ মে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এটি ছিল কমিটির চতুর্থ সভা। সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংসদ উপনতা ও চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক সাজেদা চৌধুরী অর্থহীন কিছু কথাবার্তা বলেছেন। তিনি বলেন, “সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো মতভিন্নতা নেই। আমরা একই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই। সেই উদ্দেশ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে আমরা একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌছেঁ গেছি।“ প্রথম আলোর রিপোর্ট বলছে, সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের বিল উত্থাপন করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জেএসএস সেটাই চায়। তবে এ ব্যাপারে তিনি (সাজেদা) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন”।
তাহলে পরিস্কার, ভূমি কমিশন আইনের সংশোধন চলতি বাজেট অধিবেশনে কেন এই সরকারের মেয়াদে হয় কিনা তার কোন গ্যারাণ্টি নেই। আসলে সরকার একদিকে চুক্তি বাস্তবায়নের মুলো ঝুলিয়ে রেখে সন্তু গ্রুপের সংগ্রামী অংশকে আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ভূমি কমিশনকে দিয়ে ঠিকই তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সন্তু লারমার নিজেরও চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে যেতে কোন আগ্রহ নেই। সেটা তার কথা ও কাজের মধ্যে পরিস্কার। চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা শেষে সন্তু লারমা বলেন, “বর্তমানে ইউপিডিএফের সন্ত্রাসী কার্যক্রম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির চেয়েও বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করা”। সন্তু লারমা মাঝে মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কঠোর আন্দোলন শুরু করার হুমকি দিতে বাধ্য হন দলীয় কর্মীদের চাপের কারণে। বস্তুত তার দলের সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ইউপিডিএফের সাথে সমঝোতা করে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করার পক্ষপাতী। কিন্তু সন্তু লারমা মুখে আন্দোলনের কথা বললেও মনেপ্রাণে সেটা চান না। অন্যদিকে নেতাকর্মীদের আন্দালনে যাওয়ার চাপও উপেক্ষা করতে পারেন না। তাই তিনি আন্দোলনের হুমকীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে তার দলীয় কর্মীদের বগলে রাখার চেষ্টা করেন। দলীয় কর্মীদের শান্ত রাখতে সরকারও তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করে। যেমন চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভার পর তিনি তার দলীয় নেতাকর্মীদের বলতে পারবেন: সরকার যেহেতু বলছে চুক্তি বাস্তবায়ন করবে, তখন আরো একটু অপেক্ষা করে দেখা যাক। কাজেই সন্তু গ্রুপের যে সব ছাত্রযুবক মনে প্রাণে আন্দোলন চান, জনগণের জন্য ভালো কিছু করতে চান, তারা হতাশ হতে বাধ্য; তারা সন্তু লারমার দলে বেশী দিন থাকতে পারবেন না। তবে যারা বিভিন্ন সুবিধার জন্য তার সাথে আছেন, বা যে সব ছাত্র পড়াশুনা শেষে চাকুরী বা বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার আশায় সন্তু লারমার দল ভারী করছেন তাদের কথা আলাদা।
পাঠকদের নিশ্চয়ই খেয়াল আছে, গত বছরের শেষের দিকে সন্তু লারমা তার দলীয় নেতাকর্মীদের চাপের মুখে এ বছর ফেব্রুয়ারী মাস থেকে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রীর দূত হিসেবে গওহর রিজভী রাঙামাটি গিয়ে সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৬ জানুয়ারী গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সন্তু লারমার বৈঠক ও ২০ জানুয়ারী চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্তু লারমা এই দুই বৈঠক ও সভাকে ফলপ্রসূ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আজ পর্যন্ত তার কোন প্রতিফলন দেখা যায়নি। সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে এক কদমও অগ্রসর হয়নি।
আসলে রিজভীর রাঙামাটি সফর, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সন্তু লারমার বৈঠক ও চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা এসব কিছু্র উদ্দেশ্য হলো জেএসএস-এর সন্তু গ্রুপকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখা। সন্তু লারমাকে তার দলীয় নেতাকর্মীদের চাপ থেকে রক্ষা করা। অর্থাৎ সন্তু গ্রুপের নেতাকর্মীদের মুখে লেবেঞ্জুস পুড়ে দেয়া। ‘তোমরা লেবেঞ্জুস চুষে চুষে থাক, আন্দোলনের কথা ভুলে যাও, আর আমরা এদিকে ভূমি কমিশনকে দিয়ে কাজ সেরে নিই’। এই হলো সরকারের অভিপ্রায়।
এবারের চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভাও লোক দেখানো ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়। এটা সরকারের পাবলিক রিলেশন এক্সারসাইজের মতো।পর্দার অন্তরালে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সংস্থার লোকজনই ক্যারিগ্রাফটা তৈরি করেছে। সাজেদা চৌধুরী, সন্তু লারমা, যতীন্ত্র লাল ত্রিপুরা ও গওহর রিজভী কেবল চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা নামক নাট্যাংশে নিজ নিজ অংশের অভিনয় করলেন মাত্র। তবে নাটকের ক্যানভাস বেশ বড় এবং পাত্রপাত্রীদের মধ্যে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম এবং পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারও রয়েছেন। যখন যার অভিনয়ের দরকার হয় তখন তাকে স্টেজে ওঠানো হয়।
আরো একটি ব্যাপার বিশেষভাবে লক্ষ্য করা দরকার। আর তা হলো যখনই ইউপিডিএফ কোন আন্দোলন ঘোষণা করে তখনই বিশেষ সংস্থার লোকরা তৎপর হয়। যেমন সন্তু লারমার অনেক দাবি সত্বেও সরকার ২০০৫ সালের জুন মাসের আগে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির কোন সভা করেনি। যখন ইউপিডিএফ খাগড়াছড়িতে ২০০৫ সালের ১৫ জুন ভূমি বেদখল বিরোধী সমাবেশ আয়োজন করে তখনই সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির প্রথম সভা করতে বাধ্য হয়েছিল। এবারের সভাও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়ার পরই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এভাবে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য হলো জনগণকে বিভ্রান্ত করা এবং বাধ দিয়ে যেমন নদীর পানি ভিন্ন খাতে নেয়া হয়, তেমনি আন্দোলন যাতে জোরদার না হয় তার জন্য জনগণের চিন্তা ও শক্তিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ সংস্থার ইঙ্গিতেই যে সরকার এই সব সভা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিভিন্ন পদক্ষেপগুলো নেয় তা স্পষ্টই বোঝা যায়।
৩.
ভূমি কমিশনের শুনানী ও ইউপিডিএফের সড়ক অবরোধ
ভূমি কমিশনের একতরফা শুনানী বন্ধ ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির দাবিতে ইউপিডিএফ-ভুক্ত গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রামব্যাপী সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী পালন করে। দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রাম বান্দরবানেও সর্বাত্মকভাবে অবরোধ পালিত হয়। মিডিয়ার খবর মতে, রুমা, লামায় পর্যন্ত দূর পাল্লার কোন যানবাহন চলাচল করেনি। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতেও অবরোধ পুরোপুরি সফল হয়। অবরোধ, বর্জন ও বয়কটের মুখে খাদেমুল ইসলাম আগামী শুনানীর তারিখ নির্ধারণ করেছেন ১০ ও ১১ জুন। গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ১০ জুন খাগড়াছড়িতে ভূমি কমিশনের অফিস ঘেরাও করার কর্মসূচী নিক্ষেপ এবং খাদেমুলকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।
যতদূর জানা যায়, গত বছর খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ভূমি কমিশন আইনের সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত ভূমি কমিশেনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সে বার সাজেদা চৌধুরীর ভূমি কমিশনের শুনানী কার্যক্রম উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু চাপের মুখে তিনি তার সেই কর্মসূচী বাতিল করতে বাধ্য হন। কিন্তু এরপরও ভূমি কমিশন তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্মতি ছাড়া ভূমি কমিশন চেয়ারম্যান খাদেম সাহবে শুনানী কার্যক্রম চালাবেন তা কাকপক্ষীরাও বিশ্বাস করবে না।
মোট কথা, সরকার জুম্মদের মধ্যেকার ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের সুযোগ নিয়ে সেটলারদের অবৈধ ভূমি বন্দোবস্তকে আইনী বৈধতা দিতে চাইছে, যেভাবে ১৯৮০র দশকে শান্তিবাহিনীর মধ্যে লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে সরকার সেটলারদের অবস্থানের ভিত পাকাপোক্ত করেছিল। কিন্তু এটা আশির দশক নয়। পার্বত্য রাজনীতির মাঠও আগের মতো নেই।
ভূমি কমিশনের শুনানীর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। সরকার ভূমি কমিশনের আইন সংশোধন করলে বর্তমান কমিশন চেয়ারম্যানের সব কার্যক্রম রদ হয়ে যাবে এটা মনে করে হাত পা গুটিয়ে বসে খাকা হবে চরম বোকামী। প্রথমত, সরকার আদৌ এই আইন সংশোধন করবে কি না বা করলে যে সব সন্তু বাবুদের মনোমত করে করবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। হয়তো দেখা যাবে, আগামী অধিবেশনে যে বিলটি পেশ করা হবে তাতে আরো অনেক গণবিরোধী ধারা রয়েছে। কারণ এ সরকারকে কোনভাবেই বিশ্বাস করা যায় না।
৪.
চুক্তির মধ্যেই আসল গলদ
সরকার ভূমি কমিশন নিয়ে যা করছে বা চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে যে খেলা খেলছে তার কারণ চুক্তিতেই আসল গলদ রয়েছে। ইউপিডিএফের চুক্তির সমালোচনার প্রধান পয়েন্ট হলো, সরকারী পক্ষ থেকে কোন কিছু করার আগেই ‘অস্ত্র সমর্পন’ করতে সম্মত হওয়া জেএসএস-এর ঠিক হয়নি। জেএসএস যেদিন খাগড়াছড়িতে অস্ত্র সমর্পন করে শ্রদ্ধেয় বনভান্তে তখন নান্যাচরে। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি তখন যথার্থই মন্তব্য করে বলেছিলেন: ‘দাড় ভাঙা হাঙারা অলাক্কেআই’। [বনভান্তের এক সিনিয়র শিষ্যের কাছ থেকে শোনা]। তার কথা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তাছাড়া সন্তু লারমা কেন যে একেবারে ফিজিক্যাল সো অব সারেন্ডার মেনে নিয়েছিলেন তা আজও অজানা রয়ে গেছে। এই ধরনের সারেন্ডার, যা চরম অপমানজনক, যুদ্ধের ইতিহাসেও যথেষ্ট বিরল। ১৯৭১ সালে জেনারেল জগজিত সিং অরোরা পাকিস্তানের নিয়াজীকে এভাবে আত্মসমর্পনে বাধ্য করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মাউন্টব্যাটেন জাপানের ফিল্ড মার্শাল কাউন্ট তেরুচিকে তরবারী হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করিয়েছিলেন। তবে জেনারেল ম্যাকআর্থার তা অনুমোদন করেননি, কারণ তিনি এ ধরনের ফিজিক্যাল সো অব সারেন্ডারকে আর্কাইক প্র্যাকটিস মনে করতেন।
জেএসএস যেভাবে সব অস্ত্র জমা দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য (চুক্তির ফলে সৃষ্ট সরকারের দায়দায়িত্ব পূরণ)সম্পূর্ণ সরকারের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করেছিল, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সিন ফেইন সেটা করেনি। সেখানে ১৯৯৮ সালে একটি বহুপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু সিন ফেইন তাদের অস্ত্র ডিকমিশন (decommission) করেছিল ২০০৫ সালে। এখানে লক্ষ্য রাখবেন তাদের চুক্তিতে অস্ত্র সমর্পন বা আত্মসমর্পণ শব্দগুলো পর্যন্ত লেখতে দেয়নি সিন ফেইন। ডিকমিশন শব্দটি নিয়ে বৃটিশ সরকার ও ইউনিয়নিস্টদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ডিকমিশন বলতে অস্ত্রগুলো ধ্বংস করা, টু পুট বেয়ন্ড ইউজ। সিন ফেইনের ক্ষেত্রে সেটাও কেবল সিমবলিক ছিল, কারণ বৃটিশ সরকার মনে করে সিন ফেইন অস্ত্র ধ্বংস করলেও যে কোন সময় আরও অস্ত্র যোগাড় করতে পারে। অথচ আমাদের জেএসএস প্রধান সন্তু লারমা নিজেই একটি একে ৪৭ হস্তান্তর করে আত্মসমর্পনের কাজ শুরু করেছিলেন। তার সেই অস্ত্রটি বাংলাদেশ সরকার এখন ঢাকার জাদুঘরে সংরক্ষণ করে রেখেছে। জেএসএস নেতা সন্তু লারমা কী এসবের অর্থ বোঝেন?
পার্বত্য চুক্তিটি যে বাস্তবায়িত হবে না তাতো চুক্তি পড়েই তখন বোঝা গিয়েছিল। চুক্তির ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে যে দায়দায়িত্ব সৃষ্টি হয় সেগুলো কিভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পার্বত্য চুক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, চুক্তির একটি পক্ষ (সরকার) চুক্তির ফলে সৃষ্ট তার দায়দায়িত্ব যেমন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, ভূমি কমিশন আইন পাস ও গঠন ইত্যাদির কোনটি পালন করার আগেই চুক্তির অন্য পক্ষ (জেএসএস) চুক্তির ফলে সৃষ্ট তার সকল দায়দায়িত্ব সম্পাদন করে ফেলেছিল (বোকার মতো)। অর্থাৎজেএসএস সরকারকে blank cheque দিয়েছিল। ফলে চুক্তির দায়দায়িত্ব পালন সরকারের মর্জির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। চেক এন্ড ব্যালেন্স থাকলো না। অথচ যদি ভূমি কমিশন আইন পাসের পর অস্ত্র সমর্পনের প্রথম দফা সম্পন্ন হতো, অর্থাৎ সরকার এটা করলে জেএসএস ওটা করবে, সরকার চুক্তি মোতাবেক এটা করতে ব্যর্থ হলে জেএসএস তার দায়দায়িত্ব পালন স্থগিত রাখবে — এভাবে যদি চুক্তিটা হতো তাহলে আজকের এই অবস্থা হতো না।কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি জেএসএস নেতৃত্বের অন্ধ ও অযৌক্তিক বিশ্বাস-আস্থা আজকের পরিণতির জন্য দায়ী। যে ‘উপজাতিসুলভ’ অতি সরলতা জেএসএস নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছে তা চরম বোকামী ও মূর্খতারই সামিল। তা আত্মধ্বংসের পথকেই প্রশস্ত করেছে।
৫.
উপসংহার: আন্দোলন ছাড়া গতি নেই
যেটা হাত দিয়ে পাওয়া সম্ভব ছিল, তা আজ বাঁশ দিয়েও নাগাল পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তবে যেই হোক, চুক্তি বাস্তবায়ন হোক, কিংবা পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হোক, আন্দোলন ছাড়া কোন বিকল্প নেই। অথচ যখন আন্দোলন প্রয়োজন, যখন সবাই আন্দোলনের কথা বলছে, তখন সেই আন্দোলনের প্রতিই এখন জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) নেতৃত্বের চরম অনীহা। সন্তু গ্রুপের প্রধান কর্মসূচী এখন চুক্তি বাস্তবায়ন নয়, ইউপিডিএফ নির্মূল করা। যদিও ইউপিডিএফ চুক্তি বাস্তবায়নের কর্মসূচীতে সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সন্তু গ্রুপের এই রকম একের পর এক ভুল ও হঠকারী সিদ্ধান্ত জুম্ম জাতিকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
সত্যের খাতিরে বলা দরকার, ১৯৯০ দশকে প্রসিত খীসার নেতৃত্বে ব্যাপক গণআন্দোলন সুচিত না হলে ১৯৯৭ সালে জেএসএস পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন করতে পারতো না। আর ভবিষ্যতে যদি এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে এই প্রসিত খীসার সহযোগিতার প্রয়োজন হবে; সন্তু বাবুদের একার পক্ষে এটা বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করার সামর্থ্য নেই।
চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভা, সরকারের মুখের কথা, চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ইত্যাদিতে আস্থা স্থাপন করা হবে চরম মূর্খতা। সরকার বার বার তার কথার বরখেলাপ করছে, ধানাইপানাই করছে, ছলচাতুরী করছে — এতকিছু দেখেও যদি আমাদের শিক্ষা না হয়, তাহলে দুর্ভাগ্যের জন্য অন্যকে দোষ দিয়ে লাভ কী? ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়। কিন্তু সন্তু বাবুরা বার বার বেল তলায় গিয়ে পড়ন্ত বেলের আঘাতে মাথা ফাটিয়ে ফেলেন, তবুও বেল তলায় যান। তাদের শিক্ষা না হোক, কিন্তু যে ছাত্র যুব সমাজ — যারা সমাজের সবচেয়ে সচেতন ও সংবেদনশীল অংশ — তাদের কেন শিক্ষা হবে না? তারা কেন আন্দোলনের পথে পা বাড়াবেন না? সব কথার আসল কথা হলো, সুবিধাবাদী নেতৃত্বকে গুডবাই দিন, তারপর আসুন পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৯০ দশকের মতো ছাত্র গণআন্দোলন গড়ে তুলি। [সমাপ্ত]

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.