বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় বৈসাবি শোভাযাত্রা দালাল-প্রতিক্রিয়াশীলদের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে এলাকার জনগণ

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি ॥ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের ঐতিহ্যবাহী বৈসু-সংগ্রাই-বিঝু (বৈ-সা-বি) উৎসবের প্রথম দিন আজ ১২ এপ্রিল খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় শোভাযাত্রার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সর্বজনীন বৈসাবি উদযাপন কমিটির ব্যানারে জেলার  মানিকছড়ি, গুইমারা, রামগড় ও লক্ষ্মীছড়িতে এসব শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এছাড়া দীঘিনালায় অনুষ্ঠিত হয় শুভেচ্ছা র‌্যালি। তবে রামগড়ে বিজিবি ও পুলিশ শোভাযাত্রায় বাধা প্রদান করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে, একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের দালাল-প্রতিক্রিয়াশীল সেনাসৃষ্ট নব্য মুখোশ বাহিনীর সর্দার তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা এবং মুখোশদের মদদদাতা-সেনা দালাল তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলে ও শক্তিমান চাকমার কুশপুত্তলিকাও দাহ করে তাদের জাতবিরোধী ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে এলাকার জনগণ।

বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রাপ্ত খবর:

মানিকছড়ি: ‘উৎসবে চাই নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ’, ‘ভয়ভীতি প্রদর্শন নিরাপত্তার নামে টহল-তল্লাশি-হয়রানি ও নব্য মুখোশ লেলিয়ে দিয়ে খুন অপহরণ উপদ্রব চলবে না, বন্ধ কর’ এই শ্লোগানে এবং “গণশত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও, উৎসবে হও ঐক্যবদ্ধ” এই আহ্বানে সর্বজনীন বৈসাবি উদযাপন কমিটির ব্যানারে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় শোভাযাত্রাটি মানিকছড়ি জামতলা থেকে শুরু করে গচ্ছাবিল, মানিকছড়ি কলেজ গেইট হয়ে মানিকছড়ি উপজেলা সদর সিএমবি এলাকা প্রদক্ষিণ করে ধর্মঘরে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যেমে শেষ হয়। এতে বক্তব্য রাখেন পাইপ্রু মারমা, রুমেন চাকমা ও রিয়েন চাকমা প্রমুখ।

পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী জনতা নব্য মুখোশ বাহিনীর সর্দার ও তাদের মদদদাতা বর্মা, পেলে ও শক্তিমান চাকমার কুশপুত্তলিকা দাহ করে দালাল-প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতি ঘৃণা-ধিক্কার জনায়।

গুইমারা: একই শ্লোগান ও আহ্বানে গুইমারা সর্বজনীন বৈসাবি উদযাপন কমিটির ব্যানারে সকাল সাড়ে ৯টায় উপজেলার রামেসু বাজার থেকে বৈসাবি শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি গুইমারা বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় সহস্রাধিক এলাকার শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।

রামগড়: সর্বজনীন বৈসাবি উদযাপন কমিটির ব্যানারে রামগড়ে বৈসাবি শোভাযাত্রায় বাধা প্রদান করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি) ও রামগড় থানা পুশিশ। আজ ভোর সাড়ে ৫টায় রামগড় তৈচালা বিজিবি ক্যাম্পে বৈসাবি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য রিজার্ভ করা ১২টি গাড়ির চাবি নিয়ে আটকে রাখা হয়। সকাল ১০ থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রামগড় যৌথ খামার এলাকায় শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী ১৫টি গাড়ি আটকিয়ে দেয়। পরে বৈসাবি উদযাপন কমিটি ও এলাকার জনপ্রতিনিধির অনুরোধে গাড়িগুলো ছেড়ে দেওয়া হলেও দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রামগড় উপজেলা সদরে বিজয় স্মরণী পার্কে একত্রিত হয়ে শোভাযাত্রা বের করতে চাইলে সেখানেও বিজিবি-পুলিশে বাধা দেয় এবং অংশগ্রহণকারীদের সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি প্রদান করে। শোভাযাত্রা বের করার জন্য বৈসাবি উদয্পান কমিটি ও বিভিন্ন এলাকার সমবেত জনপ্রতিনিধি এবং কার্বারীরা ২ মিনিট সময় চাইলেও তারা অনুমতি দেয়নি।

উক্ত ঘটনায় এলাকার জনপ্রতিনিধি, কার্বারী ও মুরুব্বীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার গণতন্ত্রের কথা বে পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন এক অগণতান্ত্রিক শাসন জারি রেখেছে যার ফলে এখানে বৈসাবি’র মতো একটি প্রধান সামাজিক উৎসবও পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না। তারা বিজিবি-পুলিশের এই ঘৃণ্য আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং নিজেদেরকে সংগঠিত হয়ে এই সরকার-শাসকগোষ্ঠীর সকল ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

পরে সেখান থেকে ফিরে রামগড় পাগলা পাড়া যাত্রী ছাউনী এলাকায় এসে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে আসা জনগণ নব্য মুখোশ বাহিনীর সর্দার তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা) এবং মুখোশ সন্ত্রাসীদের অন্যতম মদদদাতা-সেনা দালাল তাতিন্দ্র লাল চাকমা (পেলে) ও শক্তিমান চাকমার কুশপুত্তলিকা দাহ করেন।

লক্ষীছড়ি : লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা সদর, দুল্যাতলী ও বর্মাছড়িতে পৃথকভাবে বৈসাবি শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

‘উৎসবে চাই নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভয়ভীতি প্রদর্শন নিরাপত্তা নামে টহল তল্লাশি হয়রানি ও নব্য মুখোশ লেলিয়ে দিয়ে খুন অপহরণ উপদ্রপ চলবে না, বন্ধ কর’ এই শ্লোগানে এবং ‘গণশত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও, উৎসবে হও ঐক্যবদ্ধ’ এই আহ্বানে লক্ষ্মীছড়ি সদরে সর্বজনীন বৈসাবি উদযাপন কমিটির ব্যানারে সকাল ৯টায় নদীতে ফুল ভাসানো হয়।

ফুল ভাসানোর পর সেখানে উপস্থিত জনতা নব্য মুখোশ সর্দার বর্মা ও মুখোশদের মদদদাতা পেলে ও শক্তিমান চাকমার কুশপুত্তলিকা দাহ করে তাদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে নিন্দা প্রকাশ করে।

এরপর সেখানে সংক্ষিপ্ত এক সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এসময় উপস্থিতি সকলের উদ্দেশ্য করে বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর লক্ষীছড়ি উপজেলা সংগঠক অমর চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক ক্যামরুন চাকমা, লক্ষীছড়ি বৈসাবি উদযাপন কমিটি সদস্য সচিব ও ১নং লক্ষীছড়ি সদর ইউপি চেয়াম্যান প্রবীল কুমার চাকমা, ৩নং বর্মাছড়ি ইউপি  চেয়ারম্যান হরি মোহন চাকমা ও  পার্বত্য  চট্টগ্রাম নারী সংঘের প্রতিনিধি তুনি চাকমা প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি উপজেলা ঘুরে এসে বাজার প্রদক্ষিণ করে জুর্গাছড়িতে এক সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

একই স্লোগানে উপজেলার দুইল্যাতলী ইউনিয়নেও আজ সকাল সাড়ে ৯টায় শোভাযাত্রা সহকারে নদীতে ফুল ভাসানো হয়। ফুল ভাসানোর পর সেখানে উপস্থিত জনতা মুখোশ সর্দার বর্মা এবং   মুখোশদের মদদদাতা পেলে ও শক্তিমানের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

পরে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ২নং দুল্যাতলী ইউপি চেয়ারম্যান ত্রিলন চাকমা ও এলাকার যুবক নিংসাউ মারমা।

বর্মাছড়ি ইউনিয়নেও বৈসাবি উপলক্ষে নদীতে ফুল ভাসানেও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।  সকাল সাড়ে ১০টায় নদীতে ফুল ভাসানো পর একইভাবে দালাল-প্রতিক্রিয়াশীল চক্রদের কুশপুত্তলিকা দাহ করে উপস্থিত জনতা।

পরে সেখানে অনুষ্টিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বর্মাছড়ি এলাকার যুবক জ্যোতির্ময় চাকমা ও উৎপল চাকমা।

সমাবেশ শেষে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি বর্মাছড়ি বাজার এলাকা পদক্ষিণ করে শেষ হয়।

দীঘিনালা : আজ সকাল ৮টায় মাইনী ব্রীজের পাশে মাইনী নদীতে ফুল ভাসানো শেষে ৪ নং দীঘিনালা ইউপি এলাকাবাসীর ব্যানারে বৈসাবি উপলক্ষে শুভেচ্ছা র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি বানছড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে হেডম্যান পাড়া ব্রীজ ঘুরে এসে আবারও বানছড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। এে বক্তব্য রাখেন সমাজ সেবক রাহুল চাকমা, সজীব চাকমা, স্থানীয় কার্বারী ত্রিশংকর চাকমা।

বক্তারা বলেন, সরকার ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করুক তা চায় না। তাই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক উস্কানী দিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত লাগিয়ে দিতে চায়।  চাই। বক্তারা সেনা মদদে হত্যা, গুম, অপহরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
——————
সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.