অপহরণের ১৮ বছরেও খোঁজ মিলেনি কল্পনা চাকমার

1
1

বিশেষ প্রতিবেদক, সিএইচটিনিউজ.কম
Kalpana chakma3অপহরণের ১৮ বছরেও খোঁজ মিলেনি হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী অপহৃত কল্পনা চাকমার। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে কজইছড়ি ক্যাম্প কমান্ডার লে. ফেরদৌস ও তার দোসরদের দ্বারা অপহৃত হন কল্পনা চাকমা। এ অপহরণ ঘটনার মামলা দায়ের করা হলেও পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়া হয় অপহরণকারীদের নাম। ইতিমধ্যে এ মামলার তদন্ত কাজে দায়িত্বপ্র্রাপ্ত ৩৫ জন কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। বর্তমানে রাঙামাটি পুলিশ সুপার আমেনা বেগমন এ মামলার তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন। কিন্তু তিনিও তদন্ত শেষ হতে না হতেই বিভ্রান্তিমূলক তথ্য উপস্থাপন  করার কারণে তাঁর তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও নানা সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, এ অপহরণ ঘটনায় দেশ ও বিদেশের ব্যাপক জনমত ও আন্দোলনের চাপে পড়ে সরকার ঘটনা তদন্তে ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে সরকার পুলিশ বিভাগের মাধ্যমেও তদন্ত চালায়। এ ঘটনার ৩৪তম তদন্ত কর্মকর্তা এস আই ফারুক আহম্মদ অপহরণের সাথে জড়িত প্রকৃত দোষী সেনা অফিসার লেঃ ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য সালেহ আহম্মদ ও নুরল হকের নাম উল্লেখ না করে ২০১০ সালের ২১ মে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। এর বিরুদ্ধে মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা না-রাজি আবেদন জানান।

বিচারক সিআইডির মাধ্যমে পুনর্বার তদন্তের নির্দেশ দিলে সিআইডি কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল্লাহ ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেন। কিন্তু উক্ত তদন্ত রিপোর্টেও প্রকৃত দোষীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি বরং উক্ত তদন্ত রিপোর্টে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে কল্পনা অপহরনের সাথে জড়িতদের রক্ষার চেষ্টা করা হয়।Kalpana chakma2

এরপর ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি সিআইডি প্রতিবেদনের উপর চূড়ান্ত শুনানীর দিন ধার্য করা হলে রাঙামাটির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম সিরাজুদ্দৌলাহ কুতুবী ১৬ জানুয়ারি নতুন করে মামলার শুনানীর দিন ধার্য করেন। এই দিন সিআইডির দাখিল করা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের উপর দু’দফা শুনানী শেষে রাঙামাটির অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মো: সিরাজুদ্দৌলাহ কুতুবী রাঙামাটি পুলিশ সুপারকে(এসপি) দিয়ে পুনঃতদন্তের আদেশ দেন।

বর্তমানে রাঙামাটি পুলিশ সুপার আমেনা বেগম মামলার তদন্তে দায়িত্বে রয়েছেন। তিনিও তদন্ত শেষ হতে না হতেই কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনাকে সন্দেহ পোষণ করে বিভ্রান্তিমূক বক্তব্য দিয়ে ঘটনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। গত সোমবার কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে তিনি বলেছেন, ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাতে লে. ফেরদৌস উগলছড়ি ক্যাম্পে অন্য তিন আর্মি অফিসারের সাথে একই রুমে ঘুমিয়েছিলেন। সেজন্য তার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে তার এই বক্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা। লে. ফেরদৌস কজইছড়ি ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। কজইছড়ি ক্যাম্প থেকে উগলছড়ি ক্যাম্পে পায়ে হেঁটে ৪ ঘন্টায় যাওয়া যায়। তিনি (লে. ফেরদৌস) ১১ জুন সকালে কজইছড়ি থেকে উগলছড়ি যান পরদিন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য।”

“আমেনা বলেন, এ ব্যাপারে তার (আমেনার) সন্দেহ আছে যে, লে. ফেরদৌসের মতো পদাধিকারী ব্যক্তি এ রকম একটি অপরাধ করবেন।” তবে তিনি প্রধান সন্দেহভাজন লে: ফেরদৌস (বর্তমানে মেজর), ভিডিপি নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে ইতিমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন বলেও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, কালিন্দী কুমারের বর্ণনায় বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, যা পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেমন, কেন কালিন্দী এফআইআর-এ লে. ফেরদৌসের নাম যোগ করেননি, কেন তিনি একবার বলেছেন অপহরণকারীরা ছিল খালি পায়ে, আবার অন্য এক জায়গায় বলেছেন তিনি বুটের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন, এবং কেন ঘটনার পরদিন বাড়িতে কল্পনা চাকমার কাপড় চোপড় পাওয়া যায়নি অথচ তার কয়েক দিন পর সেগুলো দেখা যায়।’

আমেনার মতে লে. ফেরদৌস তার কর্তব্য পালনের সময় ছিলেন একজন “hyperactive” ব্যক্তি এবং তিনি শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। যেহেতু কালিন্দী কুমার ও লাল বিহারী শান্তিবাহিনীর সদস্য ছিলেন, তাই এটা তদন্ত করে দেখতে হবে যে এটা (কল্পনাকে অপহরণ) লে. ফেরদৌসের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য শান্তিবাহিনীর সাজানো ঘটনা ছিল কী না।

আমেনা বলেন, কল্পনা চাকমা কোথায় আছেন সে সম্পর্কে তার কাছে কিছু তথ্য আছে। আমেনার মতে কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে থাকতে পারেন। তবে বাড়তি তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত তিনি এসব এখন প্রকাশ করবেন না।

আমেনা আরো বলেন, তদন্ত কাজের জন্য কালিন্দী কুমার ও লাল বিহারীর ডিএনএ স্যাম্পল দরকার। তিনি বলেন পুলিশকে ডিএনএ স্যম্পল দিতে কালিন্দী কুমারের অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে আদালত রায় দিয়েছেন। এ জন্য তিনি খুশী।

এ বিষয়ে কালিন্দী কুমার চাকমা বলেন, ফেরদৌসের নাম এফআইআর-এ বলিনি বলে আমেনা বেগন যে কথা বলছেন তার উত্তরে আমার বক্তব্য হলো, ‘‘আমি এফআইআর কি জানি না তবে টিএনও এবং থানায় গিয়ে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করেছি। তারা লিখেছে কিনা আমি তা জানি না। তাছাড়া আমার কাছ থেকে স্বাক্ষরও রাখেনি। আমি আইন সম্পর্কে কিছুই জানি না। তারা কি বানিয়েছেন সেটাও জানি না। ”

তিনি আরো বলেন, পুলিশ সুপার আমেনা বেগম যে প্রশ্নগুলি উপস্থাপন করেছেন তা মিথ্যা এবং বানোয়াট। ঘটনার পরপর যে সমস্ত সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মি এসেছেন কল্পনা’র ঘটনা জানার জন্য তাদের মধ্যে প্রিসিলা রাজও এসেছিলেন। তারা সকলেই কল্পনা’র কাপড় চোপড় দেখে গিয়েছেন। তার রুমের কাপড়-চোপড়সহ বই পত্র উল্টে পাল্টে দেখেছেন। অহেতুক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। সেই শান্তিবাহিনীর কথাও সেই ধরনের। এসপি যখন এখানে এসেছেন তখন আমার কাছ থেকে কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার পর কারও সাথে কথা বলেননি। মিথ্যা এবং বানোয়াট ভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

এদিকে, কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস ও তার দোসদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তির  দাবিতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন আজ প্রতিবাদ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
————-

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.