অবমাননাকর দিনকে “প্রতিষ্ঠা দিবসে” রূপদানঃ আন্দোলনে নানা বিভ্রান্তি ও ভুলের অপরিমেয় খেসারত

2
1

মন্তব্য প্রতিবেদন, সিএইচটিনিউজ.কম

Commentaryসত্যদর্শী: 
স্বাধীনতার সূচনালগ্নে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক তারাবন্যা-কুকিছড়া ও বাঙ্গালকাটি হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট ও নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ৪দফা দাবিনামা সম্বলিত স্মারকলিপি দিতে বঙ্গভবনে যায়। শেখ মুজিব উক্ত স্মারকলিপি পড়ে দেখেন নি, গ্রহণ করা তো দূরে থাক। প্রতিনিধি দলকে বসতেও বলা হয় নি, তারা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বয়ঃজ্যেষ্ঠ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, সর্বোপরি একটি বিশেষ অঞ্চলের প্রতিনিধি। সেদিন তাদেরকে দাঁড়িয়ে থেকে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা সেরে নিতে হয়েছিল, যেন স্কুল ছাত্র তারা! শেখ মুজিব অনেকটা ধমকের সুরে বলেছিলেন,‘স্বায়ত্তশাসন! ঐ সব ভুলে যাও। বাঙালি হয়ে যাও’! এই হলো ‘১৫ ফেব্রুয়ারি’ ১৯৭২-এর স্মৃতি!!! আওয়ামী লীগ অবশ্য তাদের সুবিধে মত তালি মেরে ঘটনাটির ব্যাখ্যা করে থাকে। কিন্তু তা হচ্ছে সত্যের অপলাপ, যা কোন বোধবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। আওয়ামী লীগ কখনই উক্ত ঘটনার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের নিকট ভুল স্বীকার করে নি বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারে নি। ‘বাঙালি জাতীয়তা’ আরোপের নীতি থেকে আওয়ামী লীগ কখনই সরে দাঁড়ায় নি, যার জাজ্জ্বল্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে ২০১১ সালের ৩০ জুন বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করিয়ে দেশের ভিন্ন ভাষা-ভাষী জাতিসত্তাসমূহের ওপর ‘বাঙালি জাতীয়তা’ আরোপিত করা।

‘বাঙালি জাতীয়তা’ চাপিয়ে দেয়ার কারণে সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভিন্ন ভাষা-ভাষী জাতিসত্তাসমূহ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয় বিভিন্ন জায়গায়। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল সবচে’ সরব ও প্রতিবাদ মুখর। ‘বাঙালি জাতীয়তা’ আরোপের প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় লক্ষাধিক লোকের সর্বকালের বৃহৎ মানব বন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। তা ভণ্ডুল করতে রাঙ্গামাটির ঘাগড়ায় জেএসএস (সন্তুগ্রুপ)-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ‘বাঙালি জাতীয়তা’ বিরোধী হলেও উক্ত মানববন্ধনটি ইউপিডিএফ-এর নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়ায় গুলি চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। সে কারণে ‘বাঙালি জাতীয়তা’র বিরুদ্ধে কথা বললেও তাদের কর্মকা- সরকারের পক্ষে যায়। সে সময় তিন পার্বত্য জেলায় দু’দিনব্যাপী সফল অবরোধ পালিত হয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যত ‘বাঙালি জাতীয়তা’র আরোপের বিরুদ্ধে জনসংহতি সমিতি (সন্তুগ্রুপ)-এর বড় কোন কর্মসূচি ছিল না।

একদিকে জনমনে ‘বাঙালি জাতীয়তা’ আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষোভ অসন্তোষের তীব্রতা, ইউপিডিএফভুক্ত সংগঠনসমূহের লাগাতার কর্মসূচি; অন্যদিকে জনসংহতি সমিতি (সন্তুগ্রুপ)-এর নিজেদের কর্মসূচিহীনতা–এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালে অনেকটা আচমকা ‘১৫ ফেব্রুয়ারি’কে প্রতিষ্ঠাদিবস ধরে নিয়ে জনসংহতি সমিতি (সন্তুগ্রুপ) ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাসমারোহে ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করে, যা জনমনে নতুন করে বিতর্ক ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। কারণ ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আগে বা পরে আর কখনই জেএসএস প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করে নি। এ বছর ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আজকের দিনটিতেও জেএসএস (সন্তুগ্রুপ)-এর কোন কর্মসূচি নেই। দিবসটিতে কার্যত নিষ্ক্রিয়তা ও মৌনব্রত পালিত হচ্ছে! কেন ২০১৩ সালে ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত হয়েছিল, আসলে জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কবে– সে প্রশ্ন ও বিতর্ক অত্যন্ত সঙ্গত কারণে সামনে চলে আসে। কারণ ঢাকায় বঙ্গভবনে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের নিকট স্মারকলিপি দিতে-যাওয়া প্রতিনিধি দলটিতে সদস্য হিসেবে মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাও ছিলেন। একইদিনে রাঙ্গামাটিতে মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার নেতৃত্বে কীভাবে জনসংহতি সমিতি গঠিত হতে পারে? কোন যুক্তি বা বাস্তবতা তা বলে না। লারমা বেঁচে থাকলে হয়ত এর সদুত্তর পাওয়া যেত, কিন্তু লারমা নেই বলে কি ‘যা তা’ তার নামে চালিয়ে দেয়া উচিত?

১৯৭২ সালের ‘১৫ ফেব্রুয়ারি’ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি দল শাসকগোষ্ঠীর হাতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ যে ব্যাখ্যাই দিক এটাই হচ্ছে রূঢ় সত্য। কাজেই এ দিনটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিগণ অবমাননাকর এক বিড়ম্বনা হিসেবে দেখে থাকেন। জেএসএস (সন্তুগ্রুপ) কর্তৃক উক্ত দিবসকে ‘প্রতিষ্ঠা দিবস’ হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ জাতীয় অবমাননা মহিমান্বিত করার সামিল, যা রাজনীতি সচেতন কারোর নিকট গ্রহণযোগ্য হবার কথা নয়।

২০১৩ সালে ‘১৫ ফেব্রুয়ারি’কে প্রতিষ্ঠা দিবস বানিয়ে জেএসএস (সন্তুগ্রুপ) কর্তৃক ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করার প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল রাঙ্গামাটির লংগুদু কাট্টলীবিলে, স্মরণ করা যেতে পারে এ অঞ্চলের লোকজন আন্দোলনে সবচে’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাল্পনিক প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে পরের দিন ১৬ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরার পথে জনসংহতি সমিতি (সন্তুগ্রুপ)-এর ৫২জন কর্মী-সমর্থক লংগুদু কাট্টলী বিলে স্থানীয় জনতা কর্তৃক ধৃত হয়ে দীর্ঘদিন আটক ছিল। উক্ত ঘটনাটিকে জেএসএস (সন্তুগ্রুপ) অপহরণ হিসেবে অপপ্রচারও চালিয়েছিল। জাতীয় অবমাননা মেনে নেয়া কোন সচেতন পার্বত্যবাসীর পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা লংগুদু কাট্টলী বা অন্যত্র সবখানেই একই প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়া অমূলক নয়। এরপর বিতর্কিত ‘১৫ ফেব্রুয়ারি’কে প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালন করার ব্যাপারে জেএসএস (সন্তুগ্রুপ)-কে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে। লংগুদু কাট্টলীবাসীকে দোষ দিলে হবে না। নিজেদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার দায় অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।

২০১৩ সালে কাল্পনিক প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর খেসারত দিতে হয়েছে ৫২জন কর্মী-সমর্থককে, সেটিই একমাত্র ঘটনা নয়। একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে জেএসএস নেতৃত্বের ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে বহু তরুণ সম্ভাবনাময় যুবককে। নিজের রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণে সন্তু লারমা বলি দিয়েছেন ছাত্র-যুবকদের, তার দৃষ্টান্ত অনেক দীর্ঘ। ‘পার্বত্য চুক্তি’ ও আত্মসমর্পণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবার পর স্পষ্টই জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কূটকৌশল খাটানো হয়েছিল। একদিকে আন্দোলন জোরদারের ধুয়ো তোলা, অন্যদিকে একশ্রেণীর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অচিরেই ‘চুক্তি’ ‘সমাধানের’ কথা বলে এসআই চাকুরি-ঠিকাদারি-ব্যবসা-এনজিও আর বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে টেনে নেয়া হয়। এদের এক অংশকে রাতারাতি শান্তিবাহিনীতে রিক্রুটসহ অন্যদের পিসিপি’র পাল্টা সংগঠন খাড়া করতে নিয়োজিত করা হয়েছিল। ভবিষ্যত আন্দোলন জোরদারের আশায় গ্রামের যে সব যুবক শান্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, অল্প পরে তাদের সারেন্ডার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বাধ্য হয়, নান্যাচরের এক সম্ভাবনাময় শিল্পীকে এ চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কঠিন অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

১৯৮০ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর সন্তু লারমা আন্দোলন জোরদারের ধুয়ো তোলেন, দলভারি করার উদ্দেশ্যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রদের জুটিয়ে শান্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে ভাঙ্গন ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষে তাদের অনেকে শান্তিবাহিনীতে টিকতে পারে নি। শোনা যায় সে সময় রেডিও সেন্টার স্থাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে রাঙ্গামাটির এক খ্যাতিমান শিল্পীকেও সন্তু লারমা নিজ দলে জুটিয়ে নিয়েছিলেন, শান্তিবাহিনীর ভিতরের অবস্থা দেখে পরে উক্ত শিল্পী হতাশ হয়ে ফিরে আসেন।

১৯৮৯ সালে জেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় তা বানচাল করারও ধুয়ো তোলা হয়, প্রয়োজনে “মানচিত্র পাল্টে দেয়ার” অঙ্গীকার করা হয়, অবশ্য পরে তা পর্বতের মুসিক প্রসবের মত অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছিল। বাস্তুভিটা ত্যাগসহ সর্বস্ব হারিয়ে চরম খেসারত দিতে হয়েছিল সাধারণ জনগণকে।

২০০১ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে পিসিপি’র প্রাক্তন সভাপতি রূপক চাকমাসহ বেশ কয়েক জন যুবককে খুন করাসহ তা-ব চালালেও রাঙ্গামাটিতে প্রকাশ্যে বিএনপি প্রার্থীর সমর্থনে জেএসএস নিয়োজিত ছিল। খাগড়াছড়িতেও বিএনপি প্রার্থীর সাথে ছিল গোপন সমঝোতা। নির্বাচনে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মত প্রকাশ করতে পারে নি।

২০১৫ সালে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন প্রতিরোধের নামে ছাত্রদের মাঠে নামানো হলেও ঘটনার এক পর্যায়ে সরকার আয়োজিত “শান্তি মিছিলে” যোগ দিয়ে কার্যত প্রতিরোধ আন্দোলনে পানি ঢালা হয়েছে। সরকার মেডিক্যাল কলেজ সরিয়ে নেবে সে রকম ঘোষণা দেয় নি, এ ব্যাপারে বিভিন্ন উড়ো কথাবার্তা শোনা গেলেও জেএসএস (সন্তুগ্রুপ) পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোন কর্মসূচি নেই।

জেএসএস (সন্তুগ্রুপ) নিজেদের সংকট আড়াল করার জন্য আগামীতে আরও কী ধুয়ো তুলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। জেএসএস (সন্তুগ্রুপ) দ্বারা ভ্রান্ত পথে চালিত হয়ে এ পর্যন্ত জনগণকে অবর্ণনীয় খেসারত দিতে হয়েছে। তা মনে রেখে জনগণকে আগামীতে সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে। #

(১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
——————————————

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.