আমার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রত্যেকটি মামলা মিথ্যা, বানোয়াট, ষড়যন্ত্রমূলক ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী : মাইকেল চাকমা

0
2

রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটিনিউজ.কম
গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইকেল চাকমা এক সংবাদ সম্মেলনে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রত্যেকটি মামলা মিথ্যা, বানোয়াট, ষড়যন্ত্রমূলক ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি বলে অভিযোগ করেছেন৷ দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস পর জামিনে মুক্তি পেয়ে ষড়যন্ত্রমূলক গ্রেফতারের বিবরণ তুলে ধরতে আজ ৩ অক্টোবর রাঙামাটির কুদুকছড়িতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়৷ সংবাদ সম্মেলনে এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি নতুন কুমার চাকমা, কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক সুপ্রীম চাকমা ও দপ্তর সম্পাদক সোনামুনি চাকমা৷

সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারের বিবরণ তুলে ধরে লিখিত বক্তব্যে মাইকেল চাকমা আরো বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আমাকে যতবার গ্রেফতার করা হয়েছে ততবারই তা বেআইনীভাবেই করা হয়েছে এবং আমার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রত্যেকটি মামলা মিথ্যা, বানোয়াট, ষড়যন্ত্রমূলক ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী৷ এভাবে আমার ওপর নির্দয় দমনপীড়ন, হয়রানি, গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলার উদ্দেশ্য হলো আমাদের সংগঠনকে দমিয়ে রাখা৷

গ্রেফতারের বিবরণ দিয়ে লিখিত বক্তব্যে মাইকেল চাকমা বলেন, সেদিন ছিল মঙ্গলবার৷ আমি বিকেল ৩টার দিকে একটি কম্পিউটার মেরামত করার জন্য বণিক পাড়ায় আমার বন্ধু দীপু চাকমার বাসায় যাই৷ আমি তার সাথে কাজ সেরে চলে আসবো এমন সময় আনুমানিক ৪:৩০টায় হঠাত্‍ একদল র‌্যাব সদস্য বন্দুক তাক ঘরে ঢুকে এবং সবাইকে নড়াচড়া না করতে ও মাথার ওপর হাত তুলতে নির্দেশ দেয়৷ এরপর তাদের একজন “মাইকেল চাকমা কে?” জিজ্ঞেস করে৷ আমি পরিচয় দিয়ে বলি: আমিই মাইকেল চাকমা৷ তারপর তারা আমার হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দেয়৷ আমি র্যাব সদস্যদের প্রশ্ন করি আমার অপরাধ কী এবং কেন আমাকে আটক করা হলো? র‌্যাবের একজন কমান্ডার আমাকে বললেন, “আপনার নামে ওয়ারেন্ট আছে, আপনি বিশটি মামলার আসামী৷ এখনই রাঙামাটির সকল থানায় এমএমএস করে পাঠাচ্ছি৷” এই বলে তিনি তার মোবাইলে আমার ছবি তুলে নেন৷ আমি উনাকে বলি, আপনি প্রত্যেকটি থানায় খোঁজ নিয়ে দেখুন আমার নামে কোন ওয়ারেন্ট নেই এবং ২০টি মামলাও নেই৷ ২০০৭ সালে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন সরকারের আমলে আমার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছিল সেই মামলায় আদালত আমাকে জামিন দিয়েছে৷

এরপর তারা রাঙামাটির সদর থানাসহ বিভিন্ন থানায় ম্যাসেজ পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেন যে আমার নামে কোন মামলা নেই৷ এরপর তারা কিছুণ পর পর ঘরের বাইরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কি যেন সলাপরামর্শ করে আবার ভিতরে আসেন এবং আমাকে আটকে রেখে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন৷ পরে এক পর্যায়ে এক র‌্যাব কমান্ডারকে বলতে শুনি মোবাইলে তিনি অন্য একজনকে বলছেন: “পার্টি কোথায়? কতদূর, আর কতণ?” পরে বুঝতে পারি আসলে আমার হাতে গুঁজে দেয়ার জন্য অস্ত্র আনা হচ্ছিল এবং তারা দেরী হচ্ছে বলে আমাকে অহেতুক নানা প্রশ্ন করে বসিয়ে রাখা হয়েছিল৷ আমাকে তারা এভাবে ঘন্টা তিনেক আটক রাখে৷ এক সময় আমি টয়লেটে যাওয়ার কথা বলি৷ তারা আমাকে বলে “এখন নয়”৷ তারপর ৪৫ মিনিট পর আমাকে টয়লেটে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়৷ (খুব সম্ভব এর মধ্যে অস্ত্রগুলো আসেনি বলে এতণ টয়লেটে না যেতে বলেছিল৷) আমি টয়লেটে গেলে এক র‌্যাব সদস্যও আমার সাথে যায়৷ কিন্তু টয়লেট করার পর বেরোতে চাইলে দেখি দরজা বাইরে থেকে লক করা৷ সেখানে আমাকে ২০ – ২৫ মিনিট আটক রাখা হয়৷ তাদের একজনকে বলতে শুনি, “স্যার আর কতণ আটক রাখবো?” অফিসার বললো, “এখন না, আর কিছুক্ষণ আটক রাখো৷” পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি তাদের পাশে তারা একটা ব্যাগ এনে রেখে দিয়েছে৷ আমি যখন টয়লেটে ঢুকি তখন ব্যাগটি সেখানে ছিল না৷ আমার বুঝতে আর অসুবিধা হলো না আমার ভাগ্যে কী হতে যাচ্ছে৷

আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে র‌্যাব কমান্ডার পুরো বাসা তল্লাশী করার নির্দেশ দেন৷ র্যাব সদস্যরা পাকঘর থেকে শুরু করে বিভিন্ন রুম চেক করার ভাণ করে৷ স্বাভাবিকভাবে তারা বেআইনি কিছুই পায়নি৷ এরপর পাশে পড়ে থাকা ব্যাগটি তারা উপুড় করে খুলে ধরলে দুটি ভাঙাচোরা এলজি পড়ে যায়৷ এমন ভাঙা যে এগুলোর বিভিন্ন পার্টস আলগা হয়ে খুলে পড়েছে৷ (পরে র‌্যাবের অফিসে তারা সেগুলো বহু কষ্ট করে জোড়া লাগায়৷) এরপর আর কোন কথা নেই৷ তারা আমাকে প্রশ্নও করলো না এ ভাঙাচোরা অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে? একজন কেবল জব্দ তালিকা করলো ও শ্রেফ আমাকে গাড়িতে তুললো৷ এভাবেই আমাকে গ্রেফতারের নাটক মঞ্চস্থ হয়৷ আগেই বলেছি, র্যাব আমাকে আটকের সাথে সাথে তল্লাশী করেছিল৷ কিন্তু সে সময় তারা আমার মোবাইল ফোন সেট, সংগঠনের কাগজপত্র ও টাকা পয়সা ছাড়া কিছুই পায়নি৷ এসব ঘরে উপস্থিত লোকজনও দেখতে পেয়েছে৷

র‌্যাবের কার্যালয়ের নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে মাইকেল চাকমা বলেন,আমাকে যখন র‌্যাব কার্যালয়ে নেয়া হয় তখন রাত আনুমানিক ১০:৩০টা হবে৷ সেদিন আমাকে সারারাত লকআপে রাখা হয়৷ পরদিন বিকেলে চোখ বেঁধে আমাকে সেই গ্রেফতারকারী অফিসারের কাছে নেয়া হয়৷ তিনি আমাকে আরো কিছু প্রশ্ন করেন এবং বলেন, “আপনার বিরুদ্ধে এমন মামলা দিচ্ছি ১৫ বছরেও বেরোতে পারবেন না৷” তবে আমার আঙুল কেটে ফেলার হুমকী দেয়া হলেও কোন শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি৷ এরপর আমাকে আবার লকআপে ঢোকানো হয়৷ এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে এক অফিসার ধমক দিয়ে বলতে থাকেন “একটা আসামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে এত সময় লাগে! তাড়াতাড়ি মামলা করো৷” তারপর আবার লকআপ থেকে বের করে একটা টেবিলের সামনে দাঁড় করানো হয়৷ দেখি টেবিলের ওপর দুটি এলজি রাখা৷ কিছুণ পর ছোট পলিথিনের প্যাকেটে করে বাদামী রঙের কিছু বড়ি নিয়ে আসা হয়৷ একজন বললো, “বিশ গ্রাম হবে না, আরো নিয়ে এসো৷” তারপর আরো কিছু বড়ি নিয়ে আসা হলো৷ সেগুলো তারা গুনে দেখলো ১৯০টা বড়ি৷ পরে জানতে পারি এগুলো ইয়াবা ট্যাবলেট এবং বিশ গ্রাম হওয়ার দরকার ছিল এই কারণে যে, কোন আসামীর কাছে থেকে কমপক্ষে সেই পরিমাণ হিরোইন বা সে জাতীয় মাদক পাওয়া গেলে তার সাজার মেয়াদ ১৫ বছর হয়৷ আমার কাছ থেকে দুটি এলজিসহ এই বড়িগুলো পাওয়া গেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়৷ তারপর তারা অস্ত্র ও ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আমার ছবি তুলে থানায় চালান দেয়৷

মাইকেল চাকমা তার গ্রেফতারের পিছনে জেএসএস (সন্তু লারমা) কে দায়ী করে বলেন, র‌্যাব আমাকে আটক করার পেছনে সন্তু লারমার (জেএসএস) সদস্যরা যে জড়িত এটা আমি প্রথমে ধারণা করি ও পরে সত্য বলে জানি৷ আমি যখন বণিকপাড়ায় যাই তখন সন্তু লারমা গ্রুপের কয়েকজন সদস্য বা সমর্থক আমাকে দেখতে পায়৷ তারাই আমাকে বিশটি মামলার আসামী উল্লেখ করে র্যাবের কাছে খবর দেয়৷ কিন্তু র্যাব এই তথ্যের সত্যতা না পেয়ে আমার বিরুদ্ধে নতুন মিথ্যা মামলা সাজিয়ে দিতে বাধ্য হয়৷ তাছাড়া আমাকে আটক করার কিছুক্ষণ পর আমার বন্ধু দীপু চাকমার রুমে মুখে রুমাল বেঁধে একজন আসে এবং আমাকে দেখিয়ে দিয়ে র‌্যাবকে বলে: “স্যার, এই হচ্ছে মাইকেল৷” আমি তাকে সঙ্গে সঙ্গে চাকমা ভাষায় ভাষায় বলি, “তোমাকে চিনিয়ে দিতে হবে না৷ আমি অনেক আগে আমার পরিচয় দিয়েছি৷”

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, আমাকে ৯ ফেব্রুয়ারী রাত ১১টার দিকে র‌্যাবের গাড়িতে করে পাহাড়তলি থানায় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়৷ পুলিশ সেখানে আমার কাছ থেকে কী কী জিনিস পাওয়া গেছে তা পরখ করে৷ এ সময় ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো গুনে দেখা গেলো একটা বেশী, অর্থাত্‍ ১৯১টি৷ পরদিন বিকেল ৩টায় থানা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আমাকে হাজির করা হয়৷ এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আইন মোতাবেক কাউকে গ্রেফতারের পর ২৪ ঘন্টার মধ্যে নিকটস্থ কোর্টে হাজির করতে হয়৷ কিন্তু আমাকে গ্রেফতারের ৪৮ ঘন্টার পর আদালতে নেয়া হয়েছিল৷

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এ একে এম শামসুল ইসলামের আদালত ২৯ মে ২০১১ আমার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন৷ কিন্তু পরদিন আমাকে ছেড়ে দেয়া হলে সাদা পোষাকধারী র‌্যাব সদস্যরা আবার আমাকে জেলগেট থেকে আটক করে পাহাড়তলি থানায় নিয়ে যায়৷ সেখানে আমাকে জুরাছড়ির একটি হত্যা মামলার সাথে জড়িয়ে আবার জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়৷ আমাকে জেলে আটক রাখার জন্যই সম্পূর্ণ বেআইনী ও অন্যায়ভাবে আমাকে এই মামলায় জড়ানো হয়৷ কারণ যেদিন জুরাছড়ির ওই হত্যাকান্ড ঘটে সেদিন আমি কুদুকছড়িতে একটি সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দিয়েছিলাম, যার খবর সে সময় পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল৷ এ কারণে রাঙামাটির আদালত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ সহজে ওই মামলায়ও আমাকে জামিন দেন৷ কিন্তু জামিনের আদেশনামার কপি ২৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেল কর্তৃপরে কাছে পৌঁছানো হলেও আমাকে ছেড়ে দিতে গড়িমসি করা হয়৷ পরে আমার নিয়োজিত এটর্নির বহু চেষ্টার পর আমি পরদিন অর্থা ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে ছাড়া পাই৷ (আমার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার নম্বরগুলো হলো ১১/২০১১, বিশেষ ট্রাইবু্যনাল মামলা নং ৮০/২০১১ ও দায়রা মামলা নং ৭৩৯/২০১১)

তিনি বলেন, আমার নাতিদীর্ঘ এই রাজনৈতিক জীবনে আমি এ যাবত ৫ বার আটক হয়েছি৷ প্রথমবার ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের বন্দর থানা এলাকায়, দ্বিতীয়বার ১৫ মার্চ ২০০৫ চট্টগ্রামের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ইউপিডিএফ-এর রাজনৈতিক প্রশিণ কোর্স-এ অংশগ্রহণের সময়, তৃতীয়বার ২৪ নভেম্বর ২০০৭ লংগুদুতে, চতুর্থবার ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১১ চট্টগ্রামের অলংকারের বণিকপাড়া থেকে এবং পঞ্চমবার ৩০ মে ২০১১ চট্টগ্রাম জেল গেট থেকে৷ তৃতীয়বার লংগুদুতে সেনাবাহিনী কর্তৃক জরুরী অবস্থার সময় আটক হওয়ার পর আমার ওপর প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল৷ সে সময় আটকের এক সপ্তাহ পরই আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল৷

সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা খারিজ করা, যারা তাকে গ্রেফতারের নাটক মঞ্চস্থ করেছে ও তার বিরুদ্ধে মিথ্যাভাবে অস্ত্র ও মাদক মামলা সাজিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া ও অবিলম্বে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও তার সহযোগী সংগঠনের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ করার দাবি জানান৷

উল্লেখ্য গত ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১১ চট্টগ্রাম মহানগরের অলংকারের বণিকপাড়ায় তার এক বন্ধুর বাসা থেকে র‌্যাসদস্যরা মাইকেল চাকমাকে গ্রেফতার করে৷ এরপর তার বিরুদ্ধে মিথ্যাভাবে অস্ত্র ও মাদক মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়৷

 


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.