ষষ্ঠ পর্ব

ইউরোপের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলসমূহ

0
5

উবাই মারমা
ইউরোপের কয়েকটি দেশের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা সম্পর্কে এখানে ধারাবাহিকভাবে যে আলোচনা করা হচ্ছে আজকে তার ষষ্ঠ পর্বে ইতালির সাউথ টাইরল।

ষষ্ঠ পর্ব:
সাউথ টাইরল, ইতালি
ইতালির উত্তরাংশে অবস্থিত ৭,৪০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত দক্ষিণ টাইরলের জনসংখ্যা ৪,৮১,১৩৩ জন (২০০৫ সালের হিসাব)। রাজধানীর নাম বোজেন বা বোলজানো (Bozen/Bolzano)। জার্মান, ইতালিয়ান ও ল্যাডিন সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। সাউথ টাইরল ১৯৪৮ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে।

Tyrol map

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ এবং ২০ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ইতালি তার সরকার ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ১৯৪৬ সালে সেখানে রাজতন্ত্রের স্থলে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠত হয় এবং ১৯৪৮ সালে একটি নতুন সংবিধান রচিত হয়। ইতালি একটি এককেন্দ্রীক রাষ্ট্র থেকে আঞ্চলিকতাবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। তবে স্বায়ত্তশাসনসহ সংসদীয় ও নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ১৫টি অঞ্চলে আঞ্চলিক সরকার গঠন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ২০ বছর লেগেছিল। অপরদিকে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য ছাড়াও ইতালিকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও জাতি-ভাষাগত কারণে কিছু বিশেষ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। উত্তরে সংখ্যালঘু জাতি অধ্যুষিত তিনটি বড় অঞ্চল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অথবা নিদেনপক্ষে স্বায়ত্তশাসন দাবি করছিল: এগুলো হলো ফ্র্যান্সভাষী অঞ্চল এওস্তা উপত্যকা (Aosta valley); রায়েতোরোম্যানিয়ান এবং স্লোভেনিয়ান অধ্যুষিত ফ্রিউলি – ভেনেজিয়া গিউলিয়া এবং জার্মানভাষী তিরোলিয়ান জাতি অধ্যুষিত দক্ষিণ টাইরল। অপরদিকে দক্ষিণে সিসিলি প্রথমে স্বাধীনতার দাবি তোলে, পরে সার্ডিনিয়ার মতো স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানায়। এই নিবন্ধে কেবল দক্ষিণ টাইরলের স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হবে।

সাউট টাইরল উত্তর-পূর্ব ইতালিতে সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার সীমান্তে অবস্থিত। ১৩ শতক থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত (অবশ্য ১৮১০-১৪ সাল পর্যন্ত নেপোলিয়ানের অধীনে থাকার সময় বাদে) এ অঞ্চলটি অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বৃহত্তর টাইরোলিয়ান সত্তার সাথে যুক্ত ছিল। ১৯১৫ সালে ইতালি আঁতাত শক্তির (Power of the Entente) সাথে এক গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিতে ইতালি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আঁতাত শক্তির পক্ষে (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া) যুদ্ধে অংশ নিতে রাজী হয়। যুদ্ধে অংশ নেয়ার পুরস্কার হিসেবে যে কয়েকটি এলাকা ইতালিকে দেয়ার প্রস্তাব করা হয় দক্ষিণ টাইরল হলো তার একটি।

ইতালি ১৯১৯ সালে St. Germain-en Laye  চুক্তি মোতাবেক আনুষ্ঠানিকভাবে সাউট টাইরল অধিকার করে। ১৯১০ সালে অস্ট্রিয়ার পরিচালিত সর্বশেষ আদমশুমারী অনুযায়ী সাউথ টাইরলের জনসংখ্যার ৮৯% হলো জার্মান, ৪ শতাংশ লাডিন এবং ৩% ইতালিয়ান। অন্তর্ভুক্তির পর ইতালি এই অঞ্চলের ভাষাগত সংখ্যালঘুদের স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষার অঙ্গীকার করে। তবে এই অঙ্গীকার রক্ষার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ১৯২২ সালে ইতালিতে ফ্যাসিষ্টরা ক্ষমতা লাভ করলে দক্ষিণ টাইরলবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের আশা শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় নাৎসী জার্মানী অস্ট্রিয়া দখল করার পর হিটলার ইতালির মুসোলিনীর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে দক্ষিণ টাইরলের জার্মানভাষীদের কাছে দুইটি বিকল্প দেয়া হয়; তারা হয় দেশ ছেড়ে তৃতীয় রাইখ-এ (জার্মানী) যাবে অথবা যথাস্থানে থেকে গিয়ে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে বাধ্যতামূলক স্থানান্তরের ঝুঁকি নেবে। ৮০% জার্মানভাষী জার্মানীতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে তার মাত্র এক তৃতীয়াংশ টাইরল ত্যাগ করেন। তবে ১৯৪৫-এর পর তাদের অনেকে আবার ফিরে আসেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর দক্ষিণ টাইরলের প্রতিনিধিরা অস্ট্রিয়ার অস্থায়ী সরকারের সাথে মিলে তাদের এলাকাকে অস্ট্রিয়ার সাথে অন্তর্ভুক্তির ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। ১৯৪৭ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তিতে ইতালির সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়া হয়। ১৯৪৬ সালে প্যারিসে স্বাক্ষরিত দক্ষিণ টাইরলের স্বশাসিত সরকার সম্পর্কিত চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ টাইরল সমস্যাকে একটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয়া হয়। এই চুক্তি ইতালির সাথে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির সাথে সংযুক্ত করা হয়।

১৯৪৬ সালে দক্ষিণ টাইরলের জার্মানভাষী জনগণের স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে অস্ট্রিয়া ও ইতালির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্বায়ত্তশাসনের রূপ কি হবে তা ঠিক করার জন্য জার্মানভাষীদের সাথে আলাপ আলোচনার বিধান রাখা হয়। কিন্তু ইতালি ১৯৪৮ সালে এই চুক্তির শর্ত লংঘন করে যখন ইতালির সংসদে পাসকৃত প্রথম স্বায়ত্তশাসন আইনে (First Autonomy Statute) দক্ষিণ টাইরলকে অপর একটি জনবহুল ও ইতালীয় অধ্যুষিত ট্রেনটিনো প্রদেশের সাথে যুক্ত করা হয়। (দক্ষিণ টাইরলকে ইতালিতে বলজানো বা বোজেন প্রদেশ বলা হয়)। ফলে এতে জার্মানভাষী দক্ষিণ টাইরলীজরা আঞ্চলিক সরকারে সংখ্যালঘুতে পরিণত হন। ইতালিয়ানরা সকল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হয়।

১৯৫৫ সাল থেকে অস্ট্রিয়া দক্ষিণ টাইরলের স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে থাকে। ইতালির সাথে বহু দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর অস্ট্রিয়া বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করে। সাধারণ পরিষদ ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে দুইটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে দুই পক্ষকে আলোচনা শুরু করার আহ্বান ছাড়া আর কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। সমাধানে আসার জন্য চাপ জোরদার হতে থাকে এবং অনেকগুলো সন্ত্রাসী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ১৯৬১ সালে সমস্যা সমাধানের লক্ষে সুপারিশ গ্রহণের জন্য ১১ জন ইতালীয় ও ৮ জন দক্ষিণ টাইরলীজ সমন্বয়ে একটি মিশ্র কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত তাদের রিপোর্টটি অপর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হয়। তারপরও এই রিপোর্টের পর আলোচনার সূত্রপাত হয় এবং ১৯৬৯ সালে একটি চুক্তি গৃহীত হয়, যা কেবলমাত্র “প্যাকেজ”( Package) নামে পরিচিত। প্যাকেজে ইতালির সরকার কর্তৃক দক্ষিণ টাইরলের স্বায়ত্তশাসনকে উন্নত ও বিস্তৃত করে ১৩৭টি প্রশাসনিক ও আইনসভা সংক্রান্ত ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্যাকেজের মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে ছিল: (১) বোলজানো বা বোজেন প্রদেশের ব্যাপক আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক ক্ষমতা মঞ্জুর করা। (২) প্রদেশকে সরকারী ও আধা-সরকারী সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতিগত সমানুপাতিকতা ও ভাষাগত সমতার নীতি প্রয়োগ করা। (৩) কোন রাষ্ট্রীয় আইন ভাষাগত গোষ্ঠীগুলোর সাম্য লঙ্ঘন করলে প্রাদেশিক সরকার তা সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

প্যাকেজটি আদতে চুক্তি ছিল না। প্যাকেজটির ব্যাপারে আলোচনার পাশাপাশি ইতালি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে তথাকথিত ‘অপারেশনাল ক্যালেন্ডার’ স্বাক্ষরিত হয়। এতে উভয় দেশ প্যাকেজটি বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কোন বিবাদ দেখা দিলে তা আন্তর্জাতিক আদালতে পেশ করা এবং ইতালি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে মৈত্রী ও সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করা। ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে প্যাকেজ ও অপারেশনাল ক্যালেন্ডার অনানুষ্ঠানিকভাবে ইতালি ও অস্ট্রিয়ার সংসদে অনুমোদিত হয় এবং ১৯৭২ সালে সংশোধিত স্বায়ত্তশাসন আইন বলবৎ হয়।

১৯৭২ সালের স্বায়ত্তশাসন আইন
ট্রেনটিনো-এ্যালটো এডিজ বা দক্ষিণ টাইরলের আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যরা দুই প্রদেশ ট্রেনটো এবং বোলজানো বা বোজেন (দক্ষিণ টাইরল) থেকে আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট পদটি মেয়াদের অর্ধেক সময় থাকে ইতালিয়ান গ্রুপের সদস্যদের হাতে, এবং বাকী অর্ধেক সময় জার্মান গ্রুপের সদস্যদের হাতে। ইতালির প্রেসিডেন্ট জাতীয় মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের পরামর্শক্রমে আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক পরিষদসমূহ ভেঙ্গে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে ৩ মাসের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি বিলুপ্ত পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই কমিটিতে জার্মানভাষী গ্রুপের মধ্য থেকে অবশ্যই একজনকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে ।

অঞ্চলটিতে প্রদত্ত তুলনামূলকভাবে সীমিত ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক অফিসগুলো নিয়ন্ত্রণ, পৌর সীমানা, ভূমির রেকর্ড পত্র প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য সেবা, হাসপাতাল, চেম্বার অব কমার্স, সরকারী দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং সম্প্রদায়গত শৃঙ্খলা ইত্যাদি।

নির্বাহী ক্ষমতা
প্রদেশটি তিনটি সংগঠন (Organ) দ্বারা শাসিত: প্রাদেশিক পরিষদ (Provincial Council),  প্রাদেশিক সরকার (The Provincial Government), এবং এর প্রেসিডেন্ট। প্রাদেশিক সরকার কাউন্সিল কর্তৃক নির্বাচিত হয় এবং এর গঠন অর্থাৎ সরকারের সদস্য সংখ্যা কাউন্সিলে ভাষাগত গ্রুপগুলোর সংখ্যানুপাতিক হতে হয়।

প্রেসিডেন্ট ও প্রাদেশিক সরকার স্বায়ত্বশাসন আইনে প্রদত্ত বিষয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। জন শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি প্রদেশের নয়, তা ইতালির কেন্দ্রীয় সরকারের এক্তিয়ারভূক্ত। তবে স্থানীয় শহর ও গ্রাম পুলিশ প্রদেশের এক্তিয়ারে রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের কিছু নির্দিষ্ট জরুরী ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি ইতালীয় মন্ত্রী সভার মিটিঙে উপস্থিত থাকতে পারেন, যখন তার প্রদেশে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোন বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়। একজন কমিশনার প্রত্যেক প্রদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্র কর্তৃক হস্তান্তরিত বিষয়ে প্রদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের তদারকি করা।

আইন প্রণয়ন ক্ষমতা
প্রাদেশিক পরিষদের আইন প্রণয়নী ক্ষমতা যথেষ্ট বিস্তৃত। স্বায়ত্তশাসন আইনে ২৯টি প্রাইমারী ও ১১টি সেকেন্ডারী ক্ষেত্র উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে প্রদেশের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে। এই ক্ষমতা বিস্তৃত এবং মূলত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় সম্পর্কিত।

প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক পাশকৃত আইন কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাখান করতে পারে যদি সে আইন পরিষদসমূহের এক্তিয়ার বহির্ভূত হয়, অথবা সেগুলো জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয় অথবা উক্ত অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত দুই প্রদেশের যে কোন একটির স্বার্থের পরিপন্থী হয়। তবে কাউন্সিলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে কেন্দ্রের ভেটো রদ করা যায়, যদিও সরকার প্রদেশের গৃহীত কোন আইনের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তখন আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগ পর্যন্ত বেশ কয়েক বছর সে আইনের কার্যকারিতা স্থগিত থাকে।

বিচারিক ক্ষমতা
স্থানীয় বিচারিক কাজের জন্য রয়েছে “আঞ্চলিক প্রশাসনিক আদালত”। দক্ষিণ টাইরলের জন্য এর একটি আলাদা সেকশন রয়েছে। এর সদস্যরা জার্মান ও ইতালীয়নভাষী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে সমানুপাতিক হারে বোলজানো / বোজেন প্রাদেশিক পরিষদ কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত। কোন প্রশাসনিক কার্যক্রম বিভিন্ন ভাষাভাষী গ্রপগুলোর সমানাধিকারের পরিপন্থী হলে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা তার বিরুদ্ধে আদালতের দক্ষিণ টাইরল সেকশনে মামলা করতে পারেন।

একই অভিযোগে কোন একটি ভাষাগত সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিষদ সদস্য প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক আইনের বিরুদ্ধে জাতীয় সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। স্বায়ত্তশাসন আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্রীয় সরকারও সাংবিধানিক আদালতে মামলা করতে পারে।

অন্যান্য বিষয়:
ভাষা: ট্রেনটিনো – আলটো এডিজ (Trentino – Alto Adige) অঞ্চলে জার্মান ভাষাকে ইতালিয়ান ভাষার সাথে একই মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আদালতে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এই দুই ভাষার যে কোন একটি ব্যবহার করা যায়। সকল আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক আইন ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষায় লিখতে হয় এবং সরকারী কর্মচারীরা অবশ্যই কাজে আসা নাগরিকদের সাথে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় আলাপ করতে বাধ্য। স্বায়ত্তশাসন আইনের ১০০ নং অনুচ্ছেদে দুইটি ভাষার যে কোন একটি আলাদাভাবে ব্যবহারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

শিক্ষা: ১৯৪৬ সালের De Gasperi – Gruber  চুক্তির একটি মৌলিক নীতি হলো এই: প্রাথমিক ও সেকেন্ডারী শিক্ষা শিশুদের মাতৃভাষায় হতে হবে এবং দক্ষিণ টাইরলে জার্মান ও ইতালিয়ান ভাষায় আলাদা আলাদা স্কুলে পাঠদান করতে হবে। প্রদেশটিতে লাডিন ভাষী এলাকায় কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক স্কুলে লাডিন ব্যবহারের জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে। সে সব স্কুলে একই সাথে জার্মান ও ইতালিয়ান ভাষাও বাড়তি ভাষা হিসেবে পড়ানো হয়। স্কুলের প্রশাসন প্রদেশের হাতে, তবে শিক্ষকরা রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত।

ভাষা: স্বায়ত্তশাসন আইনে সরকারী চাকুরীতে সকল ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ইতালির সাংবিধানিক আদালত বরাবরই এই নীতির পক্ষে রায় দিয়েছে।

কর: আঞ্চলিক আইন দ্বারা অনুমোদিত সীমার মধ্যে প্রদেশটির কর সংগ্রহের অধিকার রয়েছে। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় কর ব্যবস্থার নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আঞ্চলিক কর আদায় করা হয়। প্রদেশটিতে নিয়মিত করের উৎস থেকে যে আয় হয় তা তার অর্থনীতি ও সমাজ কল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচের জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয়। তাছাড়া অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সম্পত্তি কর, ব্যক্তিগত আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও অন্যান্য জাতীয় কর ইত্যাদি উৎস থেকে সংগৃহীত রাষ্ট্রীয় করের ৯০% প্রদেশগুলো পেয়ে থাকে।

পররাষ্ট্র সম্পর্ক: কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করতে পারে, তবে ইতালির সাংবিধানিক আদালত এই মর্মে রায় দিয়েছে যে, অঞ্চলগুলো বিদেশী সরকারের সাথে প্রমোশন্যাল কার্যক্রম (যেমন পর্যটন) চালাতে পারবে, যদি তা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি না করে।

ইতালির ২০ টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল রয়েছে, যার মধ্যে ৫টি “বিশেষ মর্যাদা” ভোগ করে এবং দু’টির (Trentino-Alto Adige  এবং Friuli-Venezia Giulia) চুক্তি ভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

সূত্র:
১. Autonomy, Sovereignty, and Self-determination, Revised Edition (1996 ) by Hurst Hannum

২. The Working Autonomies in Europe by Thomus  Benedikter.
—————-

সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.