সপ্তম পর্ব

ইউরোপের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলসমূহ

0
0

 

।।উবাই মারমা ।।
ইউরোপের কয়েকটি দেশের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা সম্পর্কে এখানে ধারাবাহিকভাবে যে আলোচনা করা হচ্ছে আজকে তার সপ্তম পর্বে পর্তুগালের ম্যাডেইরা ও এ্যাজোরেস।

সপ্তম পর্ব:
ম্যাডেইরা ও এ্যাজোরেস, পর্তুগাল (Madeira and Azores, Portugal)
৯৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে গঠিত ম্যাডেইরার জনসংখ্যা ২,৬৫,০০০ জন (২০০৩)। রাজধানীর নাম ফানচাল। অপরদিকে এ্যাজোরেসের আয়তন ২,৩৩৩ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী দ্বীপটির জনসংখ্যা ২,৪৬,৭৪৬ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০৬ জন। রাজধানীর নাম পন্টা ডেলগাডা। উভয়ের সরকারী ভাষা পর্তুগীজ। উভয় দ্বীপ ১৯৭৬ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে।

Mape of Maderia

পর্তুগাল বহু দশক ধরে জাতিগত বা ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব ছাড়া একটি দেশ হিসেবে বজায় ছিল। এমনকি স্পেনের সীমান্তের কাছে মিরান্দেজ-ভাষীদের (যা একটি Castilian dialect) আবিস্কার এবং জিপসী বা যাযাবরদের বহু দলের (যেমন রোমানী, Romany) উপস্থিতি সত্বেও পর্তুগালে স্বায়ত্তশাসন জাতি ও ভাষার ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের দেয়া হয়নি, বরং দেয়া হয়েছে ভৌগলিক ভিত্তিতে চিহ্নিত সংখ্যালঘুদের, যেমন দু’টি দ্বীপ শ্রেণী ম্যাডেইরা ও এ্যাজোরেস।

ম্যাডেইরা পর্তুগালের মূল ভূখ- থেকে আনুমানিক ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে, আর এ্যাজোরেস ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি আতলান্তিক মহাসাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এ্যাজোরেস তিন শ্রেণীর দ্বীপ নিয়ে এবং ম্যাডেইরা ৪টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। পর্তুগালই প্রথম উভয় দ্বীপ আবিস্কার করে এবং ১৪ ও ১৫ শতকে সেখানে বসতিস্থাপন করে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে দাস ও স্বর্ণ ব্যবসার সুবিধার জন্য জাহাজের নাবিকদের কাছে ম্যাডেইরা এক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। দক্ষিণে ম্যাডেইরার মত এ্যাজোরেস দ্বীপপুঞ্জ ছিল নতুন দুনিয়া আবিস্কারের আগ পর্যন্ত পশ্চিম দিগন্তে ইউরোপিয়ান বিস্তারের শেষ সীমান্ত।

নতুন দুনিয়ায় পর্তুগালের দ্বিগ্বিজয়ের বছরগুলোতে এ্যাজোরেস আতলান্তিক বরাবর যাত্রা শুরুর আগে সর্বশেষ চেক পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৫৮০ সালে পর্তুগালকে স্পেনের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে ১৯২০ দশক পর্যন্ত এ্যাজোরেস রাজনৈতিক নির্বাসিতদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।

১৯৭৬ সালের পর্তুগালের সংবিধানে এ্যাজোরেস ও ম্যাডেইরাকে “স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল” হিসেবে বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়া হয়। পর্তুগালের সংবিধান ঘোষণা করে যে, এ্যাজোরেস ও ম্যাডেইরার বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা হলো এসব অঞ্চলের ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের এবং এ অঞ্চলের জনগণের স্বায়ত্তশাসন লাভের ঐতিহাসিক আশা-আকাক্সক্ষার স্বীকৃতি স্বরূপ। সংবিধানে আরো বলা হয়েছে যে, এই স্বায়ত্তশাসন পর্তুগাল রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌমত্বকে কোনভাবেই ক্ষুণœ করতে পারবে না, এবং স্বায়ত্তশাসনের অধিকার জাতীয় সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োগ করতে হবে। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কারণে এ্যাজোরেস দ্বীপগুলোকে তিনটি জেলায় বিভক্ত করা হয়েছে, প্রত্যেক জেলা পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ‘চেম্বারে’ তার নিজস্ব প্রতিনিধি প্রেরণ করে থাকে। ম্যাডেইরা ও পোর্টো সান্টোকে (Porto Santo) সরকারীভাবে ফানচাল জেলা নামকরণ করা হয়েছে। এই জেলা পর্তুগালের জাতীয় সংসদে দু’জন প্রতিনিধি পাঠাতে পারে।

azores

দুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে নির্বাহী ক্ষমতা পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট এবং পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরামর্শক কমিটি কর্তৃক প্রজাতন্ত্র বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে হস্তান্তরিত হয়। এরপর অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কিত মন্ত্রীর ক্ষমতা এ্যাজোরেস ও ম্যাডেইরার আঞ্চলিক সরকারের হাতে তুলে দেয়া হয়। আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হলেন একজন প্রেসিডেন্ট, তিনি আঞ্চলিক সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত এবং প্রজাতন্ত্র বিষয়ক মন্ত্রী কর্তৃক নিযুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট আঞ্চলিক সরকারের মন্ত্রীদের মনোনয়ন দেন। আঞ্চলিক সরকার আঞ্চলিক সংসদের কাছে দায়বদ্ধ এবং অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে আঞ্চলিক সরকারকে ভেঙে দেয়া যায়।

দুই অঞ্চলেরই আইন প্রণয়নী ক্ষমতা রয়েছে এক কক্ষ বিশিষ্ট আঞ্চলিক সংসদের হাতে, যার সদস্যরা চার বছর মেয়াদের জন্য প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের বিচার ব্যবস্থা পর্তুগীজ ব্যবস্থার আনুকূল্যে পরিচালিত হয় এবং প্রত্যেক অঞ্চলে জেলা আদালত ও আপীল আদালত রয়েছে। চূড়ান্ত আপীল করতে হয় পর্তুগালের সুপ্রীম কোর্টে।

আঞ্চলিক সংসদের ক্ষমতা রয়েছে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে — ১. অঞ্চলের বিশেষ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন প্রণয়ন, ২. আঞ্চলিক আইনের উপর নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ, ৩. আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, এবং ৪. জাতীয় পরিকল্পনার প্রস্তুতিতে অংশগ্রহণ। আঞ্চলিক সরকারের কর ও শুল্ক সংগ্রহ এবং অভ্যন্তরীণ আয়ের ৯৫% খরচ করার ক্ষমতা রয়েছে। ১৯৭৬ সালের পর্তুগালের সংবিধান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোকে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি করার অধিকার দিয়েছে। দ্বীপটির সরকারী ভাষা হলো পর্তুগীজ। ১৯৮০-র দশকে এ্যাজোরেস  তার স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চালায়। দ্বীপের নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত ব্যবহারের অধিকার নিয়ে লিসবনের সাথে সংঘাত বাঁধে। দ্বীপের কতিপয় ধনাঢ্য পরিবারের সমর্থন নিয়ে ফ্রন্ট ফর লিবারেশন অব এ্যাজোরেস (এফএলএ) সহিংস প্রতিরোধ শুরু করার হুমকী দেয়। প্রথমদিকে পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকী মনে করে দ্বীপটির দাবি প্রত্যাখ্যান করে। পরে এসব প্রতীক নিয়ে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করা হয় এবং এ্যাজোরেসের স্বায়ত্তশাসনের পরিধি বৃদ্ধি পায়।

গ্রীনল্যান্ডের বিপরীতে, ম্যাডেইরা ও এ্যাজোরেস ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্য। এই দুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আন্তর্জাতিক বিষয়ে কোন ক্ষমতা নেই। এ্যাজোরেস অর্থনৈতিকভাবে চা, তামাক ও কমলা চাষের উপর নির্ভরশীল এবং উত্তর আতলান্তিকে একটি প্রধান মধ্যবর্তী বন্দর হিসেবে তার গুরুত্ব রয়েছে। ১৯১৩ সাল থেকে এ্যাজোরেসে আমেরিকার বিমান ঘাঁটি রয়েছে। দ্বীপগুলোতে প্রায়ই ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। পর্তুগালের উপনিবেশ বিস্তারের সময় ম্যাডেইরাও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানে এই দ্বীপটির আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো পর্যটন।

সূত্র:
১. The Working Autonomies in Europe by Thomus Benedikter.
২. https://en.wikipedia.org/wiki/Azores

—————————-

সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.