উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে পুনর্বাসন করুন: দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটি

0
2

Dighinala2দীঘিনালা ॥ দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটি বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়ন কর্তৃক উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে যথোপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ স্ব স্ব এলাকায় পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে।

গত ১০ এপ্রিল ‘বিজিবি ৫১ কর্তৃক উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে নিজ বাস্তুভিটায় ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের দাবিতে সোচ্চার হোন’ প্রচারিত এক প্রচারপত্রে এ দাবি জানানো হয়েছে। এতে ভূমি রক্ষা কমিটির আন্দোলনে সহযোগিতা করায় দীঘিনালাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলা হয়েছে:

‘আমরা চাই উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে দ্রুত পুনর্বাসন করা হোক। এই পরিবারগুলো ভারত থেকে ফিরে আসা শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। তারা ইতিপূর্বে বহুবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন। তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ভারত থেকে ফিরে এসেও তারা তাদের জমি ফিরে পাননি। তারা এখন বাবুছড়ায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরিত্যক্ত কার্যালয়ে বিদেশী শরণার্থীর মতো গাদাগাদি করে দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের এখন চাষবাস বন্ধ, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা জীবন বিপন্ন। যেখানে আছেন সেখানে পড়াশোনার কোন পরিবেশ নেই। শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। অনেকে চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন খরচ মেটানোর জন্য অনেককে ধার দেনা করতে হয়েছে।’

প্রচারপত্রে ভূমি রক্ষা কমিটি অভিযোগ করে যে, খাগড়াছড়ির আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও কোন কাজ হয়নি। তার কথায় পুনর্বাসনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং কমিটি কিছু কাজও করে, কিন্তু হঠাৎ কুজেন বাবু তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে পড়েন। তার এই আচরণে তারা হতবাক হন বলে জানান।

কমিটি জানায় যে, ‘গত ২২ মার্চ ২০১৬ খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক দীঘিনালায় এলে ২১ পরিবারের পক্ষ থেকে তার কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ২১ পরিবারের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন এবং দীঘিনালা ইউএনওকে ২১ পরিবারের বিষয়ে দ্রুত রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি কুজেনবাবুর গৃহীত  উদ্যোগের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেন। সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল ২১ পরিবারের প্রতিনিধিদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ড. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা, দীঘিনালা ইউপি চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা, বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান সুগতপ্রিয় চাকমা ও বিজিবি কমান্ডার লে. ক. কামাল উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিজিবির প্রতিনিধি ২১ পরিবারের মধ্যে কেবল ৭ পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করলেও ইউএনও এবং অন্যান্যদের ব্যাখ্যা মেনে নেন। এরপর লে. ক. কামাল পুনর্বাসন যোগ্য পরিবারের সংখ্যা ২১ বলে স্বীকার করে নেন এবং তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে পুনর্বাসন সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।’

ভূমি রক্ষা কমিটি ‘মালেয়্যা’র চেতনা নিয়ে ২১ পরিবারকে পুনর্বাসনের দাবি আদায়ে সহযোগিতা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

কমিটি ২১ পরিবারকে উচ্ছেদ করে বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়ন হেডকোয়াটারের জন্য জমি অধিগ্রহণকে ‘সম্পূর্ণ আইন-বিরুদ্ধ’ আখ্যায়িত করে বলেছে,

‘এতে একদিকে যেমন জেলা পরিষদ আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত অন্যান্য আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি মহামান্য হ্ইাকোর্টের দেয়া নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি অধিগ্রহণ প্রবিধান ১৯৫৮  [The Chittagong Hill Tracts (Land Acquisition) Regulation, 1958] নামে যে আইনের বলে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তা পাকিস্তান আমালের এবং তা চরম অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী ও এমনকি সংবিধান পরিপন্থী।’

প্রচারপত্রে পাহাড়িদের সাথে বার বার বৈষম্যমূলক ও বৈরী আচরণ করার অভিযোগ করে বলা হয়, ‘বার বার তাদেরকে ন্যায্য পাওনা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবার অন্যায্য কোন কিছু দাবি করছে না, তারা সরকারের কাছে আকাশের চাঁদ দাবি করছে না। তারা ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছে মাত্র। অথচ সরকার তাদের এই ন্যায্য দাবি না মিটিয়ে তাদের উপর বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে।’

ভূমি রক্ষা কমিটি জনগণের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, গ্রেফতার হয়রানি বন্ধ এবং  কাউকে উচ্ছেদের শিকার হতে হবে না এমন স্থানে বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছে।

নিচে ভূমি রক্ষা কমিটি কর্তৃক সরবরাহকৃত লিফলেটের সফট কপি হুবহু তুলে ধরা হল:

বিজিবি ৫১ কর্তৃক উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে নিজ বাস্তুভিটায় ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের দাবিতে সোচ্চার হোন

সম্মানীত দীঘিনালাবাসী,
দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনারা জানেন, গত ২০১৪ সালের ১৪ মে রাতের অন্ধকারে বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে দীঘিনালা মৌজাধীন যত্ন কুমার কার্বারী পাড়া ও শশী মোহন কার্বারী পাড়া দখলে নেয় এবং এর পর ১০ জুন সেখান থেকে ২১ পরিবারকে বর্বর হামলা চালিয়ে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। শুধু তাই নয়, পরদিন বিজিবি এলাকার হেডম্যান ও চেয়ারম্যানসহ ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। উচ্ছেদ হওয়ার পর অসহায় পরিবারগুলো এখন বাবুছড়ায় নিজ ভূমে পরবাসীর মতো এলাকাবাসীর ত্রাণ সাহায্যের উপর নির্ভর করে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

বিজিবির এই অন্যায় অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদনসহ গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংঘটিত করা হয়েছে। এই সব কর্মসূচীতে আপনারা যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করেছেন তার জন্য দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটি এবং একুশ পরিবার আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। আমরা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণ করতে চাই গত বছর ১৫ মার্চের কথা। এ দিন বিজিবি ৫১ সদর দপ্তর অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় আপনারা যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন তা অতুলনীয়। পদযাত্রায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ হামলা চালালে আপনারা অনেকে আহত হয়েছেন, অনেকে গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। অনেকে এখনো আদালতে হাজিরা দেয়ার পেরেশানি পোহাচ্ছেন। অনেকে হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘর ছেড়ে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যকে সহযোগিতার জন্য আপনাদের এই আত্মত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার সবার কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

প্রিয় এলাকাবাসী,
আপনাদের হয়েতো মনে আছে, পনের মার্চের হামলার পর সেনাবাহিনী এলাকায় ব্যাপক দমনপীড়ন ধরপাকড় বাড়িয়ে দেয়। রাতে বিরাতে গ্রাম ঘেরাও, বাড়িঘরে তল্লাশী, হয়রানি, গুলিবর্ষণ করে ভয়ভীতি-ত্রাস সৃষ্টি, গ্রেফতার ইত্যাদি নিবর্তনমূলক কার্যক্রম নিয়মিত চলতে থাকে। এর ফলে এলাকার জনপ্রতিনিধিসহ অনেকে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন। তাই এ সময় সঙ্গত কারণে আমাদের কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়েছে সত্য, কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য থেকে কোনভাবে সরে যাইনি, ২১ পরিবারকে পুনর্বাসনের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি বিসর্জন দিইনি।

আমারা দমন পীড়ন মোকাবিলা করে আবার আন্দোলন জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিই এবং প্রথম পর্যায়ে ২১ পরিবারের পক্ষ থেকে দীঘিনালা ইউএনও অফিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করা হয়। অতপর খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ২১ পরিবারকে পুনর্বাসনের বিষয়ে মীমাংসর জন্য আলোচনার প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নবকমল চাকমার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ৩১ অক্টোবর ২০১৫ কুজেন বাবুর সাথে তার দীঘিানালাস্থ বাসভবনে আলোচনায় মিলিত হন। এই আলোচনায় সাংসদ কুজেন বাবু ভগবান ও শ্রদ্ধেয় বনভান্তের নামে শপথ নিয়ে ২১ পরিবারকে যথাযথ পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেন এবং কিভাবে পুনর্বাসন করা হবে সে ব্যাপারে তার চিন্তাভাবনা ও প্রস্তাবনা পেশ করেন। তিনি বলেন ২১ পরিবার যাতে স্বাবলম্বী হয়ে দাঁড়াতে পারে সেজন্য তিনি তাদের জন্য ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণসহ এককালীন আর্থিক সহায়তারও ব্যবস্থা করবেন এবং উক্ত অর্থ সংগ্রহে সরকার, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও জেলা পরিষদের সহযোগিতা নেবেন। কুজেনবাবু প্রতিনিধি দলকে বার বার তার উপর আস্থা রাখতে অনুরোধ জানান। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাকে জানান যে, তারা ফিরে গিয়ে ২১ পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের সাথে আলোচনা করে তার দেয়া প্রস্তাবের উত্তর জানাবেন। এরপর ৩ নভেম্বর ভূমি রক্ষা কমিটি ২১ পরিবারের প্রতিনিধি ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এ বিষয়ে আলোচনায় মিলিত হয়। এ বৈঠকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে বেদখলকৃত বাস্তুভিটা ফেরত দেয়ার দাবি থেকে সরে আসা হবে – এই শর্তে কুজেনবাবুর প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ৭ নভেম্বর ২০১৫ নব কমল বাবু ও অন্যান্য প্রতিনিধিরা কুজেনবাবুর সাথে দেখা করে তাকে ভূমি রক্ষা কমিটি ও ২১ পরিবারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এই দ্বিতীয় বৈঠকে কুজেনবাবু তাদেরকে পুনর্বাসনের জমি নির্বাচন করতে অনুরোধ জানান। তার কথা মত ২০ নভেম্বর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও হেডম্যানের সমন্বয়ে ৭ সদস্যের একটি ‘জমি নির্বাচন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটি পরে জমি নির্বাচন করে ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের পরিমাণসহ ২১ পরিবারকে পুনর্বাসনের একটি গুচ্ছ প্রস্তাব কুজেনবাবুর কাছে পেশ করে। উক্ত প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে কুজেনবাবু তার উপর আস্থা রাখতে অনুরোধ জানান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এর কিছু দিন পর কোন এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে পড়েন এবং জমি ক্রয় করে পুনর্বাসন করা হবে না বলে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে থাকেন। তার এ উল্টো অবস্থান দেখে আমরা সবাই হতবাক হয়ে যাই। কারণ আমাদের ধারণা ছিল যেহেতু তিনি সরকার দলীয় এমপি, তাই তিনি সরকার ও সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মতিক্রমে ২১ পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়ে থাকবেন।

প্রিয় বন্ধুরা,
এরপরও আমরা ধৈর্য্য ধারণ করি এবং গত ২২ মার্চ ২০১৬ খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক দীঘিনালায় এলে ২১ পরিবারের পক্ষ থেকে তার কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ২১ পরিবারের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন এবং দীঘিনালা ইউএনওকে ২১ পরিবারের বিষয়ে দ্রুত রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি কুজেনবাবুর গৃহীত  উদ্যোগের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেন। সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল ২১ পরিবারের প্রতিনিধিদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ড. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা, দীঘিনালা ইউপি চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা, বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান সুগতপ্রিয় চাকমা ও বিজিবি কমান্ডার লে. ক. কামাল উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিজিবির প্রতিনিধি ২১ পরিবারের মধ্যে কেবল ৭ পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করলেও ইউএনও এবং অন্যান্যদের ব্যাখ্যা মেনে নেন। এরপর লে. ক. কামাল পুনর্বাসন যোগ্য পরিবারের সংখ্যা ২১ বলে স্বীকার করে নেন এবং তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে পুনর্বাসন সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।

সংগ্রামী এলাকাবাসী,
আমরা চাই উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে দ্রুত পুনর্বাসন করা হোক। এই পরিবারগুলো ভারত থেকে ফিরে আসা শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। তারা ইতিপূর্বে বহুবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন। তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ভারত থেকে ফিরে এসেও তারা তাদের জমি ফিরে পাননি। তারা এখন বাবুছড়ায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরিত্যক্ত কার্যালয়ে বিদেশী শরণার্থীর মতো গাদাগাদি করে দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের এখন চাষবাস বন্ধ, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা জীবন বিপন্ন। যেখানে আছেন সেখানে পড়াশোনার কোন পরিবেশ নেই। শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। অনেকে চিকি
সা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন খরচ মেটানোর জন্য অনেককে ধার দেনা করতে হয়েছে।

এই উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবার আমাদেরই নিকটজন, আত্মীয়স্বজন, ভাই-বন্ধু অথবা বোন। তাদের দুর্দিনে দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকা আমাদের সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। A friend in need is a friend indeed. আমাদের সমাজে কৃষিকাজে ‘মালেয়্যা’ একটি বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় পদ্ধতি। ‘মালেয়্যার’ মাধ্যমে সমাজের লোকেরা সবাই মিলে কৃষিকাজে পেছনে পড়ে থাকা চাষীকে সাহায্য করে থাকেন। আসুন আমরা ‘মালেয়্যা’ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদেরই ভাইবোন ২১ পরিবারকে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সাহায্য করি, তাদের পাশে দাঁড়াই।

সবশেষে সরকারের প্রতি বক্তব্য ও আহ্বান:
এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, ২১ পরিবারকে উচ্ছেদ করে বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়নের জন্য যেভাবে ২৯.৮১ একর জমি ‘অধিগ্রহণ’ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ আইন-বিরুদ্ধ। এতে একদিকে যেমন জেলা পরিষদ আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত অন্যান্য আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি মহামান্য হ্ইাকোর্টের দেয়া নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি অধিগ্রহণ প্রবিধান ১৯৫৮ [
The Chittagong Hill Tracts (Land Acquisition)Regulation, 1958] নামে যে আইনের বলে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তা পাকিস্তান আমালের এবং তা চরম অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী ও এমনকি সংবিধান পরিপন্থী। সে কারণে এই আইনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে; এমনকি সরকার এই আইনটি সংশোধন না করে হুবহু রেখে দিয়েছে, আইনটি থেকে ‘Islamic Republic of Pakistan’ I ‘Governor of East Pakistan’ শব্দগুলো পর্যন্ত তুলে ফেলা হয়নি। অথচ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি পুনর্বাসনের সুবিধার্থে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েলটি তার ইচ্ছামত কাটাছেড়া করেছে। অর্থা সরকার একটি জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থে সিএইচটি ম্যানুয়েল স্থানীয় জনগণের বিরোধীতা সত্বেও সংশোধন করেছে, অন্যদিকে পাকিস্তান আমলের পরিত্যক্ত স্বৈরতান্ত্রিক আইন হুবহু বলব রেখেছে ও তা পাহাড়ি জনগণের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে। এখানে এ প্রসঙ্গে আরো বলা দরকার — সরকার ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ১৯৮২ সালে The Acquisition and Requisition of Immovable Property Ordinance জারি করে, যা ১৯৯৪ সালে সংশোধন করা হয়। এ আইনটি সারা দেশে প্রযোজ্য হলেও লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো তা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রয়োগ করা হয় না। সরকারের জারিকৃত ‘অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নির্দেশাবলী’তে ‘খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলাসমূহে সম্পত্তি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে দি চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন, ১৯৫৮ এর বিধানাবলী অনুসরণের’ কথা বলা হয়েছে। [সূত্র: স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ম্যানুয়েল ১৯৯৭, ভূমি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমী প্রেস] পাহাড়িদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্য কেবল আইনের মধ্যে নয়, প্রয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে। আমাদের জানা মতে, বান্দরবান সদর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য আর্টিলারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জ স্থাপনের জন্য ১৯৯১ সালে তিনটি মৌজার ১১,৪৪৬.২৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০ কোটি ২৫ লক্ষ ২৯ হাজার ২৬১.৭৮ টাকা প্রদান করা হয়। [সূত্র: মিস রিভিশন (বান্দরবান) ৩৬/৯৯ সূত্র: হুকুম দখল মামলা নং ৪১/৮৪৮৫ (বান্দরবান)] উক্ত অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মরিয়ম খাতুন নামে এক নারী ভূমি মালিক মামলা দায়ের করলে সেনাবাহিনী তাকে জমির বাজার দরের চাইতে কয়েক গুণ বেশী দাম পরিশোধ করে কোর্টের বাইরে আপোষ নিষ্পত্তি করে।

কাজেই আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, পাহাড়িদের সাথে বার বার বৈষম্যমূলক ও বৈরী আচরণ করা  হচ্ছে। বার বার তাদেরকে ন্যায্য পাওনা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবার অন্যায্য কোন কিছু দাবি করছে না, তারা সরকারের কাছে আকাশের চাঁদ দাবি করছে না। তারা ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছে মাত্র। অথচ সরকার তাদের এই ন্যায্য দাবি না মিটিয়ে তাদের উপর বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে।

আমরা ২১ পরিবারের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে দীঘিনালার বিভিন্ন স্তরের জনগণের সাথে মত বিনিময় চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত মত বিনিময় সভাগুলোতে সবাই এক বাক্যে তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং দাবি আদায়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। তাই সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি:

১। বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়ন কর্তৃক উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে যথোপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ স্ব স্ব এলাকায় পুনর্বাসন করুন।

২। ১১ জুন ২০১৪ ও ১৫ মার্চ ২০১৫ দায়ের করা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা তুলে নিন এবং গ্রেফতার হয়রানি বন্ধ করুন।

৩। কাউকে উচ্ছেদের শিকার হতে হবে না এমন স্থানে বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপন করুন।

দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটি


দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত। ১০ এপ্রিল ২০১৬।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.