সেনা-সেটলার হামলার এক বছর

উপবাস পালন করেছে বগাছড়ির ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা

0
2

সিএইচটি নিউজ ডটকম
Bogachari2, 16.12.2015নান্যাচর (রাঙামাটি): সেনা-সেটলার হামলার এক বছরপূর্তিতে উপযুক্ত ক্ষতিপুরণসহ নিজ নিজ বাস্তভিটায় পুনর্বাসনের দাবিতে আজ ১৬ ডিসেম্বর বুধবার উপবাস পালন করেছে বগাছড়ির ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি পরিবারগুলো। এতে সংহতি জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি, পিসিপি, যুব ফোরাম, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ ও এলাকার জনসাধারণ।

বগাছড়ি করুণা বনবিহার মাঠে সকাল ১০টায় উপবাস পালন কর্মসূচি শুরু হয়ে বিকাল ৫টায় শেষ হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যসহ দুইশতাধিক লোক অংশগ্রহণ করেন।

উপবাস পালন কর্মসূচিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে বক্তব্য রাখেন রাম কার্বারী, সুবিন্টু চাকমা, রিকন চাকমা, তুষন চাকমা,আনন্দ মেম্বার ও কাজলী ত্রিপুরা প্রমুখ।

এছাড়া সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ঘিলাছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান অমর জীবন চাকমা, কুদুকছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান সন্টু চাকমা, বুড়িঘাট ইউপি চেয়ারম্যান প্রমোদ বিকাশ খীসা, সাপছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান শিমুল বিকাশ চাকমা, পিসিপি রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি অনিল চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের রাঙামাটি জেলা শাখার সদস্য ধর্মশিং চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা শাখার সদস্য মন্টি চাকমা ও মুলুক্ষী ছড়া গ্রামের কার্বারী মিশন চাকমা।

ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করে বলেন, সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় সেটলাররা গতবছর আজকের এই দিনে (১৬ ডিসেম্বর) সুরিদাশ পাড়াসহ আশের পাশের গ্রামে হামলা চালিয়ে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পুড়ে ছাই করে দেয়। সারা দেশে আজ বিজয়ের উল্লাস করলেও আমরা উপবাস পালন করতে বাধ্য হচ্ছি। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনে আশ্বাস দিলেও গত এক বছরে তেমন কিছুই বাস্তবায়ন করেনি। উপরন্তু সুরিদাশ পাড়ায় পাহাড়িদের জায়গায় সেনা চৌকি বসিয়ে হুমকিমূলক টহল ও হয়রানি করছে।Bogachari, 16.12.2015

তারা আরো বলেন, আমাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ছাত্রদের বই-খাতা, স্কুল ড্রেস পুড়ে যাওয়াতে তাদের শিক্ষার চরম ব্যাঘাত ঘটছে। গত একটি বছর আমরা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছি। খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করা কতখানি কষ্টের তা যারা ভুক্তভোগী কেবল তারাই বুঝে। এ সময় তারা যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দিয়ে তাদেরকে নিজ বাস্তভিটার পুনর্বাসন, হামলাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানান।

সংহতি বক্তব্যে সন্টু চাকমা বলেন, এটা আমরা কোন দেশে বাস করছি। একদিকে বিজয়ের উল্লাস আর অন্যদিকে উপবাস। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান সমস্যা ভূমি সমস্যা উল্লেখ করে পাহাড়িদের প্রথাগত নিয়মে এ সমস্যার সমাধান করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের দেখলে চোখে জল আসে। দিনের পর দিন তারা কি যে কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তা একমাত্র তারাই জানবেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে দাবি করেন।

অমর জীবন চাকমা বলেন, ১৯৭১ সালে এই দিনে আমরা একটি স্বধীন পতাকা পেয়েছি এবং আমরা মনে করেছি সত্যিকার স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু আমরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছি? বাংলাদেশ সরকার সারা দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় বিজয় দিবস উদযাপনের পরিবর্তে এখানে উপবাস পালন করতে হচ্ছে। গতবছর বিজয় উৎসবের দিনে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সেটলার দ্বারা এখানে পাহাড়িদের ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার ঘরবাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে লোক দেখানো কয়েকটি ঘর নির্মান করে দিয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম। তিনি আরও বলেন, সরকার যখন উন্নয়নের কথা বলে তখন আমাদের সন্দেহ হয়, কোন নীল নক্সা বাস্তবায়নের পায়তারা করছে কিনা।

তিনি হামলা ও অগ্নিসংযোগ জড়িতদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানোর দাবি করেন এবং ঘটনার পরবর্তী গঠিত তদন্ত কমিটিকে সমালোচনা করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যত ঘটনার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কোন কমিটিই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি এবং প্রকৃত রিপোর্টও প্রদান করতে পারেনি। তিনি অনতিবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ নিজ বাস্তভিটার পুনর্বাসনের দাবি জানান। এছাড়া তিনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

কাজলী ত্রিপুরা বলেন, সুরিদাশ পাড়ায় সেনা চৌকি, সেনাবাহিনী টহল দিলেও আমরা নিরাপত্তা বোধ করি না। যারা সেটলারদের হামলায় সহযোগিতা দেয় তাদের উপর এলাকাবাসীর কোন আস্থা নেই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনী নিরাপত্তার নামে হুমকিমূলক টহল এবং মধ্যরাতে জনগনের হয়রানি করছে।

সেনা-সেটলারদের নব্য রাজাকার হিসাবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, বিজয় দিবসে কেবল রাজাকাররা হামলা করতে পারে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এদেশের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মিশনে গিয়ে সুনাম করতে পারে, অথচ নিজ দেশের জনগণের উপর এ কেমন বর্বরতা!

তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশ্য বলেন, যতদিন দাবি বাস্তবায়ন হবে না ততদিন আন্দোলন করতে হবে। এছাড়া আর কোন পথ নেই।

তিনি অবিলম্বে সরিদাশ পাড়া থেকে সেনা চৌকি তুলে নেয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দিয়ে নিজ বাস্তভিটায় পুনর্বাসন ও ভূমি বেদখল বন্ধের দাবি জানান।
——————-

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.