একজন ভিন্নধর্মী যোদ্ধা ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ানের জীবনাবসান

0
245
ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান। সংগৃহিত ছবি।

সিএইচটি  নিউজ ডেস্ক ।। ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান (যিনি আর এস দেওয়ান নামে অধিক পরিচিত) প্রয়াত হন মাস দুয়েক আগে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের নিজ অ্যাপার্টমেন্টে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তাঁর মৃত্যুর সঠিক তারিখ ও সময় এবং কারণ কিছুই জানা যায়নি। সেখানকার পুলিশই তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে লাশ উদ্ধার করে কবর দেয়। তিনি ছিলেন অকৃতদার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র।

দূরদেশে এভাবে নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

মি. দেওয়ান একজন পিএইচডি ডিগ্রীধারী হওয়া সত্ত্বেও চাকরি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের উপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারকাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে ও মানবাধিকার সংগঠনের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেন এবং পাহাড়িদের অধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

ব্যক্তি জীবনে মি. দেওয়ান অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠাবান ও সাদাসিধা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন বলে জানা যায়। যুক্তরাজ্যের মতো একটি দেশে বসবাস করলেও নিজের দেশ ও স্বজাতির প্রতি তাঁর ভালবাসা ও প্রাণের টান সবসময় অটুট ছিল। পাশ্চাত্য সমাজ জীবনের ভোগবাদী সংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে ও নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে স্বজাতির জন্য আজীবন কাজ করে তিনি এক গৌরবময় দৃষ্টান্ত সষ্টি করে গেছেন।

তিনি কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি লাভ করার পর লোভনীয় চাকরির দিকে ধাবিত না হয়ে ব্রিটিশ সরকারের বেকার ভাতা নিয়ে টানাপোড়েনের জীবন গ্রহণ করে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে গেছেন। যুক্তরাজ্য সরকারের বরাদ্দ করা দু’ কামরা বিশিষ্ট একটি ছোট্ট ঘরে সাদাসিধে জীবনযাপন করে গেছেন আজীবন।

ড. আর এস দেওয়ান ১৯৩২ সালের ৭ই জানুয়ারি বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার সদর উপজেলাধীন খবংপড়িয়া (খবংপুজ্যা) গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রমেশ চন্দ্র দেওয়ান ও মাতার নাম চন্দ্রমূখী দেওয়ান। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ।

ধীমান খীসার একটি লেখা থেকে ড. আর এস দেওয়ানের শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কে জানা যায়। তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় Khabongporia Lower Primary School (বর্তমানে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলাধীন খবংপড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) থেকে। উক্ত স্কুলে ২য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি চলে যান বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলাধীন নানিয়ারচর উপজেলার মহাপুরম (মাওরুম) এ। সেখানে মহাপুরম মিডল ইংলিশ স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর তিনি রাঙ্গামাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং উক্ত স্কুল থেকে বিজ্ঞান শাখায় সেন্টার ফার্স্ট হয়ে ১৯৫২ সালে ১ম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৫৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা প্রদানের সময় তাঁর মা মারা গেছে মর্মে একটি উড়ো চিঠি আসলে তিনি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। ফলে লেখাপড়ায় সহপাঠীদের কাছ থেকে একবছর পিছিয়ে পড়েন। সন্দেহ করা হয়, তাঁর মেধা ও যোগ্যতার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে এবং শ্রেষ্ঠত্বকে ঠেকানোর জন্য সহপাঠীদের মধ্যে কোন একজন গোপনে উড়ো চিঠি প্রদানের হীনকাজটি করেন। একবছর ক্ষতি হলেও তিনি ক্ষান্ত হননি। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৫৫ সালে পুনরায় একই কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১ম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। অতঃপর তিনি ঢাকাস্থ আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। উক্ত প্রতিষ্ঠানে দুই বছর পর্যন্ত পড়ার পর পাঠ্য বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হতে না পারায় কোর্স সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে ১৯৫৭ সালে তিনি ইঞ্জিনীয়ারিং পড়া ছেড়ে দেন এবং ঐ বছরই কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান UTAH Company তে চাকুরি গ্রহণ করলে কাপ্তাইয়ে তাঁর পোস্টিং হয়। লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারনে উক্ত চাকুরিতেও তিনি মন বসাতে পারেননি। তাই বছরখানেক পরে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৫৮সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং উক্ত ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৬১ সালে বিএ অনার্স (রসায়ন) ও ১৯৬৩ সালে এমএসসি(রসায়ন) সম্পন্ন করেন। উক্ত ডিগ্রীসমূহ অর্জনের পরেও তিনি ক্ষান্ত হননি। শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রী পিএইচডি অর্জনের অদম্য আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য তিনি উপায় খুঁজতে থাকেন। তৎসময়ে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর এক অজ পাড়াগাঁর মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে বিদেশে গিয়ে ডিগ্রী অর্জনের বিষয়টি ছিলো আকাশকুসুম কল্পনার মতো। কারন তাঁর পরিবারের পক্ষে এতো ব্যয়বহুল খরচ যোগান দেয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা ছিলো না। তারপরেও তিনি দমবার পাত্র নন। আর্থিক আনুকুল্যতা সৃষ্টির জন্য তিনি অবশেষে ঢাকার সাইন্স ল্যাবরেটরিতে চাকুরি নেন। চাকুরির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড় করা সম্ভব হলে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে বিলেত (ইংল্যান্ড) এ চলে যান এবং সেখানকার বিশ্বখ্যাত Salford University থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।

পিএইচডি ডিগ্র্রী অর্জনের পর ড. আর এস দেওয়ান উক্ত ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করেন। তৎসময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতি আন্দোলন দানা বাধলে তিনি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে আন্দোলনের স্বপক্ষে প্রচার কাজে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার সুবিধার্থে জনসংহতি সমিতি থেকে তাকে সংগঠনটির মুখপাত্র হিসেবে একটি পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, যে, ড. আর এস দেওয়ান ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আপন মামা।

জনসংহতি সমিতির নেতা মঙ্গল কুমার চাকমার গ্রন্থনায় প্রকাশিত ড. আর এস দেওয়ানের এক সাক্ষাতকার থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইনের ক্ষেত্রে তিনি লন্ডনের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তা লাভ করেন। তিনি প্রথম পর্যায়ে যোগাযোগ করেন এন্টি-স্লেভারী সোসাইটি (Anti-Slavery Society)-এর সাথে। সেসময় এ সংগঠনের Mr. Peter Devis নামে একজন মানবাধিকার কর্মী তাঁকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন। এছাড়া Quaker Peace Service (QPS) নামে একটি সংগঠনের নাম তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তাঁর অনুরোধে লন্ডনস্থ QPS অফিসে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রচারণার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন বলে তিনি জানান। প্রচারণার অংশ হিসেবে জুম্মদের মধ্যে তিনিই প্রথম ১৯৮৪ সালে জেনেভাস্থ জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি Sub-Commission on the Prevention of Discrimination and Protection of Minorities এর অধীন Working Group on Indigenous Populations (WGIP)-এর অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর ভাষণ প্রদান করেন। সেসময় শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাথেরোও উক্ত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন বলে তিনি জানান।

তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লর্ডসভার সদস্য Lord Avebury-এর কাছে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাতেন। লর্ড এভেবুরিও তাঁর রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রচারণার কাজ চালাতেন।

সে সময় তাঁর সমসাময়িক অনেকে বিদেশে বসবাস করলেও তিনিই একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়ন-নির্যাতন বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য।

এ বিষয়ে তাঁর ওই সাক্ষাতকারে থেকে আরও জানা যায়, তিনি সেসময় আন্তর্জাতিক স্তরে আন্দোলনের পক্ষে প্রচারণা চালানোর লক্ষে একটি তহবিল গঠনের জন্য প্রবাসী জুম্মদের প্রতি আহ্বান জানালে দু’একজন ছাড়া অধিকাংশ প্রবাসী জুম্ম এগিয়ে আসেননি। এমনকি জনৈক ব্যক্তি তাঁকে এই ক্যাম্পেইনের কাজ ছেড়ে দিতে বলেন এবং চাকরি করতে পরামর্শ প্রদান করেন বলে তিনি সাক্ষাতকারে উল্লেখ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে যে সামাজিক সুরক্ষা ভাতা পেতেন তা থেকে বাঁচিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইনের খরচ যুগিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

বলা যায়, ড. আর এস দেওয়ান একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক-জাতপ্রেমিক ছিলেন। তিনি আজীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অধিকারের স্বপক্ষে কাজ করে গেছেন।

তবে, ১৯৯৭ সালে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যেকার চুক্তির পরবর্তীতে তিনি নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন এবং একাকীত্ব জীবন-যাপন করছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরকালে তাঁর পরামর্শ গ্রহণ না করা ও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জন্য যে ধরনের অধিকারের পক্ষে লড়ে গেছেন, চুক্তিতে সে ধরনের অধিকার অর্জিত না হওয়া, তার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত জুম্ম-স্বার্থ বিরোধী ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চলতে থাকা — ইত্যাদি কারণে তিনি অনেকটা মনোক্ষুন্ন ছিলেন বলে জানা যায়।

ড. আর এস দেওয়ান জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকারের স্বপক্ষেই কাজ করেছেন। স্বজাতির জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন ও যে অবদান রেখে গেছেন তার জন্য জুম্ম জাতি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। তবে শেষ বয়সে তিনি যেভাবে অসহায়ভাবে মারা গেছেন তা কখনো কাম্য ছিল না।

এদিকে, তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানা আলোচনার সূত্রপাত হয়। বিশেষত কখন, কিভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কেন সঠিক সময়ে তাঁর মৃত্যু বিষয়ে জানা যায়নি সে নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে আবার পাল্টা যুক্তিও দিয়েছেন। তবে মি. দেওয়ানের প্রতি সকলে গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

আমরা সিএইচটি নিউজ পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.