একান্ত সাক্ষাতকারে সন্তু গ্রুপ নেতা : সন্তু লারমা এখন আত্মীয় স্বজন ও চাটুকার পরিবেষ্টিত

0
0

সিএইচটি নিউজ ডটকম

ছবি : প্রতীকী
ছবি : প্রতীকী

সাক্ষাতকার : (অংশ – ১)
কিছুদিন আগে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা অংশের এক বিক্ষুদ্ধ নেতার সাথে সিএইচটি নিউজ ডটকমের এক সাক্ষাতকার অনুষ্ঠিত হয়। বহু অনুরোধের পর তিনি এই সাক্ষাতকার দিতে সম্মত হন। তবে কতগুলো শর্তে: যেমন তার ছবি প্রকাশ করা যাবে না, সাক্ষাতকারটি অডিও-ভিডিও করা যাবে না, তবে হাতে নোট করা যাবে, এবং তার পরিচয় গোপন রাখা হবে ইত্যাদি। পার্বত্য চট্টগ্র্র্রাম-ভারত সীমান্ত এলাকায় একটি গোপন স্থানে সাক্ষাতকারটি নেয়া হয়। সাক্ষাতকারে তিনি পার্টির আভ্যন্তরীণ বিষয়, আন্দোলনের কলাকৌশল, সন্তু লারমার নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তবে এখানে বিশেষ কারণে তার সম্পূর্ণ সাক্ষাতকারটি প্রকাশ না করে কেবল এ সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো প্রকাশ করা হলো। আমাদের বিশ্বাস এতে জেএসএস সন্তু গ্রুপের বর্তমান অবস্থার চিত্র সম্পর্কে মোটামুটি একটা আভাস পাওয়া যাবে। দুই অংশে বিভক্ত করে নিচে সাক্ষাতকারটির প্রথম অংশ পত্রস্থ করা হলো:

সিএইচটি নিউজ ডটকম : কেমন আছেন? আপনাদের পার্টির কাজ কেমন চলছে?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: ভালো। আগের চাইতে আমাদের সাংগঠনিক কাজ অনেক জোরদার হয়েছে। প্রত্যেক এলাকায় আমাদের সংগঠন আছে।

সিএইচটি নিউজ ডটকম : কিন্তু আপনারা অর্থাৎ জেএসএস তো এখন দুই ভাগ। তারপরও বলছেন আপনাদের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: সুধাসিন্ধু বাবুরা বের হয়ে গিয়ে আমরা কিছুটা হয়তো দুর্বল হয়েছি। কিন্তু আমরা সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি।

সিএইচটি নিউজ ডটকম : কিভাবে? খাগড়াছড়িতে আপনাদের কোন কাজ নেই। পুরো রাঙ্গামাটিও আপনাদের দখলে নেই।
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: না। সেটা ঠিক। তবে খাগড়াছড়িতে আমাদের অনেক সমর্থক রয়েছে।

সিএইচটি নিউজ ডটকম: আচ্ছা, এই যে, ইদানিং আপনাদের পার্টির বেশ কিছু গোপন বিষয় ফাঁস হচ্ছে। গ্রেনেড সংগ্রহ, অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা ইত্যাদি। তাহলে আপনাদের দলে কি আবার বিভাজন বা ভাঙন দেখা দিয়েছে?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: বিভাজন বা ভাঙন নয়। পার্টিতে সংশোধনের চেষ্টা চলছে বলতে পারেন। সন্তু লারমার বয়স এখন ৭৫। সন্তু লারমা -পরবর্তী পার্টির অবস্থা কি হবে সে সম্পর্কে আমরা ভাবছি। তখন কিভাবে কাজ করা যায় সেটা ভাবছি। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম থেকে আর কত সময় নেতৃত্ব দিতে পারবেন সেটা কেউ বলতে পারে না। তবে মাঠ পর্যায়ে যে সব নেতা যোগ্যতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদেরকে আমরা নেতৃত্বের জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলতে চাই। তাদের পেছনে জনগণের সমর্থন এবং ‘‘ বন্ধুদের’’ সহযোগীতা রয়েছে। এই নেতাদের সাথে জেএসএস-এম এন লারমা গ্রুপের কোন ঝগড়া বিবাদ নেই। আর ইউপিডিএফের সাথে যে মতপার্থক্য রয়েছে তাও সহজে ঠিক করা যাবে জুম্মজাতির বৃহত্তর স্বার্থে। আমরা সত্যিকার অর্থে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করতে পারবো। এখন সন্তু বাবু যেভাবে আন্দোলনের কথা বলে আবার সরে আসেন সেভাবে নয়।

সিএইচটি নিউজ ডটকম: তাহলে কি জেএসএস-এম এন লারমা গ্রুপের মতো আরও একটি অংশ বা উপদল জেএসএস-সন্তু গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসছে?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: না, মোটেই না। জুম্মরা আর কোন দল বা উপদল বা গ্রুপ দেখতে চায় না। সুধাসিন্ধু বাবুরা বের হয়ে গেছেন পার্টির ভেতর কিছু অনিয়মের প্রতিবাদ করে। সেটা অবশ্যই স্যারের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা ছিল। তবে তারা পার্টিতে থেকেও ফাইট করতে পারতেন। আমরা তাদের মতো বের হয়ে গিয়ে আলাদা দল করবো না। আমরা ভেতরে থেকে ফাইট করে যাবো এবং অপেক্ষায় থাকবো।আমরা বের হয়ে গেলেও তো আর পার্টির সমস্যাটা সমাধান হচ্ছে না। সেটা থেকেই যাচ্ছে। আমরা পার্টি ছেড়ে গেলে সন্তু বাবু নতুন লোককে বসাবেন এবং তাতে আমাদের লক্ষ্য হাসিল হবে না। সুধাসিন্ধু বাবুরা চলে যাওয়ার পরও পার্টির ভেতরকার সমস্যাগুলো দূর না হয়ে বরং বেড়েছে। যেমন স্বজনপ্রীতির কথা ধরুন। এটা এখন অনেকটা ক্যান্সারের মতো হয়েছে। সাধারণ সম্পাদকের পদটি দেয়া হয়েছে তার জামাতাকে। পিসিপির সভাপতি তার নাতি। মহিলা সমিতির নেত্রী তার আপন বোন। সামরিক শাখার প্রধান তার নিকট আত্মীয়। এক কথায় সন্তু লারমা এখন আত্মীয় স্বজন ও চাটুকার পরিবেষ্টিত। তাকে ভালো পরামর্শ দেয়ার জন্য তার পাশে আর লোক নেই।

সিএইচটি নিউজ ডটকম: জেএসএস বলছে যে, আমাদের সিএইচটি নিউজ ডটকমে প্রকাশিত গোপন রিপোর্টগুলো হলো বানানো ‘‘গল্প’’। আপনি কি মনে করেন এ ধরনের ‘‘ বানানো গল্প’’ দিয়ে সন্তু লারমাকে পরিবর্তন করা যাবে? আপনাদের কি আরো অন্য কোন উপায় আছে?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: এগুলো বানানো গল্প নয়। আপনি নিজেই জানেন এগুলো কোত্থেকে আসছে। সন্তু লারমাও জানেন এগুলো সত্য। পুরো বিষয়টির প্ল্যান করতে আমাদের যথেষ্ট সময় লেগেছে। এ পর্যন্ত যা করা হয়েছে বা রিলিজ করা হয়েছে তা হলো পুরো ফিল্মটার (পরিচালনা) কিছু চুম্বক অংশ মাত্র।

সিএইচটি নিউজ ডটকম: পুরো ফিল্ম বলতে আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: আমি যা বোঝাতে চেয়েছি তা হলো আমাদের পরিকল্পনা। আমি সবটুকু বলতে পারবো না, তবে ইঙ্গিত দিয়ে কিছু বলবো যাতে সন্তু বাবু বোঝেন যে আমরা আসলেই কথার কথা বলছি না।

আমাদেরকে ৭০ লক্ষ ভারতীয় রুপী দেয়ার ও নতুন ক্যাম্প স্থাপনের জন্য জায়গা পাওয়া যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। ইউপিডিএফকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য। এরপর আমরা মে মাসে (এ বছর) সকল ক্যাডার, তাদের ভৌগলিক অবস্থান, যোগাযোগের মাধ্যমে ইত্যাদি ভিডিওতে রেকর্ড করি। মে মাসে আমাদের লোকটি প্রজেক্টটি বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নামে। এ জন্য আমাদের লোকটি একজন সহকারীকে নিয়ে ইম্ফল (মুনিপুরের রাজধানী) হয়ে আইজল (মিজোরামের রাজধানী) যায়। আইজল বিমান বন্দরে সজন বাবু তাদেরকে রিসিভ করেন। এর পর তারা সোজাসুজি ঠেগা দোরে টিপেরা ঘাটে যায়। তারা সেদিনের রাতটি ড.ঝুবুর-এর বাসায় কাটান। ঘুম থেকে উঠার পর সহকারীটি ড: ঝুবুর-এর বাসায় থেকে যান এবং আমাদের লোকটি সজনবাবুসহ শিলকুরে জুম্ম লিবারেশন আর্মির হেডকোর্টারে যায়। এ সময় পুরো ক্যাম্পটি সেখানে উপস্থিত সকল নেতা, সশস্ত্র ক্যাডার, সকল অস্ত্র শস্ত্র, তার ভৌগলিক অবস্থান, সেন্ট্রি ব্যবস্থা ইত্যাদি একটি শক্তিশালী স্পাই ক্যামেরায় রেকর্ড করা হয়। এটি ছিল একটি অত্যন্ত অত্যাধুনিক ক্যামেরা, এতে কয়েক ঘন্টার মেমোরী ব্যবস্থা আছে। ক্যামেরাটি শিলকুর ক্যাম্পে পৌঁছার আগেই অন করা হয়, যাতে সবকিছু রেকর্ড করা যায়। তারা সেদিনই শিলকুর ক্যাম্প থেকে ফিরে আসেন এবং রাতটি আবার ড: ঝুবুর-এর বাসায় কাটান। তারপর আমাদের টিমটি সজনবাবুসহ কমলানগর যায় এবং সেখানে আশীষ বাবুর বাসায় থাকেন। আশীষ বাবুর বাসায়ও  সবকিছু রেকর্ড করা হয়েছে। টিমটি এরপর আইজলে ফিরে আসে এবং রিজ্ (জরুঃ) হোটেলে অবস্থান করে।

আইজল থেকে টিমটি যায় ডেমছড়ায় এবং সেখানে বিমল চাকমার বাড়িতে থাকে। ইনি হলেন ঈশ্বরবাবুর (সাবেজ জেএসএস নেতা) জামাই। কাঞ্চনপুর থেকে প্রাঞ্জল বাবু দুইটি কার নিয়ে আসেন এবং টিমটি গন্ডাছড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। টিমের লোকজন সেখানে কালাজারি গ্রামের বৌদ্ধ মন্দিরে অবস্থান করে। বৌদ্ধ মন্দির থেকে টিমটি তৈচাকমায় যায়, সেখানে তারা একদিন একরাত ইন্দুবাবুর বাসায় থাকেন। তৈচাকমা থেকে টিমটি আবার কালাজারিতে বৌদ্ধ মন্দিরে ফিরে আসে। তারপর সেখানে মানসবাবু আমাদের টিমের সাথে দেখা করতে আসে। সেখান থেকে টিমটি যায় শিলাছড়ি এবং গৌরাঙ্গ চাকমার বাড়িতে চা পান করে। টিমটি দুপুরের খাবার খায় করবুকে প্রয়াত মিত্রবাবুর ছেলের (নাম গোপন রাখা হলো) বাড়িতে। দুপুরের খাবার পর টিমটি আবার গন্ডাছড়ায় কালাজারির বৌদ্ধ মন্দিরে ফিরে আসে। অত:পর টিমটি আগরতলা চলে আসে। আমরা টিম লিডারের কষ্টকর পরিশ্রমের পর উপযুক্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করি। আগরতলায় প্যালেস কম্পাউন্ডে রয়েল গেস্ট হাউজে প্রতি রাত ৩,০০০ রুপিতে একটি স্যুট বুক করি। আমাদের টিমটি দুুপুর আনুমানিক ১২:৪০ টায় বাসে গোহাটির উদ্দেশ্যে আগরতলা ত্যাগ করে। সজনবাবু যিনি সার্বক্ষনিক টিমটির সাথে ছিলেন তিনি এখান থেকে বিদায় নেন। এরপর আমাদের টিমটি যাদের সাথে দেখা করা দরকার তাদের সাথে দেখা করে।

এখানে এমন কিছু নেই যা রেকর্ড করা হয়নি এবং গন্ডাছড়ায় যাওয়ার সময় শিলছুড়ির ক্যাম্প  ক্রস করতে হয়নি।

সিএইচটি নিউজ ডটকম: আপনারা কেন এসব প্রকাশ করছেন? সন্তু লারমা কি এসব জানতে পারলে আপনাদের লোককে যে ভিডিও করেছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: যদি সন্তু লারমা তাকে টাচ্ করেন, তাহলে তার (সন্তু) কি পরিণতি হবে তা তিনি ভালো করে জানেন। সন্তু লারমার জানা উচিত আমরা যা বলি তাই করি এবং তার বোঝা উচিত যে, এতগুলো দিনের কার্যক্রম গোপনে রেকর্ড করতে কী ধরনের ক্যামেরার প্রয়োজন হয়। ভিডিও’র কপিগুলো নিরাপদ জায়গায় আছে এবং যারা এর সাথে জড়িত তারা কখনো একে অপরের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।

সিএইচটি নিউজ ডটকম: আপনারা এসব রেকর্ড করতে গেলেন কেন?
বিক্ষুব্ধ সন্তু গ্রুপ নেতা: আমরা এম.এন লারমা গ্রুপের চন্দ্র শেখর বাবুর খুনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বিশেষ ব্যবস্থাটা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। জেএসএস-এর কেউ, সন্তু গ্রুপ এম এন লারমা গ্রুপ-এর কেউ চন্দ্র শেখর বাবুর মতো একজন পরীক্ষিত নেতা ও সহযোদ্ধার খুনের ঘটনাটাকে মেনে নিতে পারেনি। তার জন্য আমাদের সত্যিই সবার দুঃখ হয়। তাই আমাদেরকে এমন একটা উপায় বের করতে হয়েছে যাতে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি … ভিডিও রেকর্ডিংটা এ কারণেই করতে হয়েছে।

আগামীকাল পড়ুন দ্বিতীয় অংশ.…..
———————–
সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.