কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও চিহ্নিত অপহরণকারীদের শাস্তির দাবি

0
3

সিএইচটিনিউজ.কম
2ঢাকা: হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনায় টালবাহানা বন্ধ করে অবিলম্বে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গঙদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে হিল উইমেন্স ফেডারেশন সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি নারী সংগঠন।

বুধবার (১০ জুন) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের দোতলাস্থ হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

একই দাবিতে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আগামী ১২ জুন (শুক্রবার) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং বিকাল ৪টায় শাহবাগ জাতীয় যাদুঘরের সামনে কল্পনা চাকমার প্রথম ভিডিও বক্তৃতা প্রদর্শন ও সংহতি সভা কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরূপা চাকমা। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন সাজেক নারী সমাজের সভাপতি নিরূপা চাকমা, সাধারণ সম্পাদক জ্যোৎন্সারানী চাকমা ও ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি কাজলী ত্রিপুরা। এছাড়া কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দি কুমার চাকমাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নিরূপা চাকমা বলেন, দীর্ঘ ১৯ বছরে চিহ্নিত অপহরণকারী ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে আজও কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না, সেটাই আমাদেরকে তথা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের নারী সমাজকে বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী করে তোলে। ১৯টি বছর ধরে আমরা চিহ্নিত অপহরণকারীর শাস্তি দাবী জানিয়ে আসছি। কিন্তু বাস্তবে কোন সরকারই কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এদেশে কী আইন আদালত বিচার ব্যবস্থা ন্যায়ের শাসন কোনদিন প্রতিষ্ঠিত হবে না? খুনি দাগী অপরাধী দুর্বত্তরা খেয়াল খুশি চরিতার্থ করবে, অপহরণ, নারীর অমর্যাদা-শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণ-খুনের মত জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে যাবে, সরকার-প্রশাসন তাদেরকে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই নেবে না? দেশে এ অরাজকতা কি চলতেই থাকবে?

নিরূপা চাকমা আরো বলেন,“লেঃ ফেরদৌস সামরিক বাহিনীর সদস্য হবার কারণে তথা রাষ্ট্র ক্ষমতার জোরেই অপহরণের মত গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করেও বহাল তবিয়তে রয়েছে, শুধু তাই নয় মেজর পদোন্নতি লাভ করে সিলেটের এক সেনানিবাসে কর্মরত থাকার কথাও জানা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে সরকারের যে বিদ্বেষপ্রসূত নীতি জারি রয়েছে, তারই পরিণতি হচ্ছে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে নারী নির্যাতন শ্লীলতাহানি সহ আরো অনেক নৃশংস ঘটনা যার বিশদ বিবরণ এখানে দেয়ার অবকাশ নেই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয়ভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকায় অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক দিয়ে কেবল অবহেলিত বা বঞ্চিতই নয়, এখানে অপারেশন উত্তরণের নামে কার্যত সেনা শাসন জারি রয়েছে। একাত্তরের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, পাহাড়ে নারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর দিক থেকে সবচেয়ে বেশী হুমকির সম্মুখীন, কল্পনা অপহরণ ঘটনার তারই একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সারা দেশের নারীরা এমনিতে অবহেলিত ও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে, পহেলা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে শ্লীলতাহানি, কর্মশেষে ঘরমুখো গারো সম্প্রদায়ের তরুণীকে তুলে নিয়ে বাসে ধর্ষণসহ বহু ন্যাক্কার জনক ঘটনা ঘটে চলেছে। তবে সার্বিক বিচারে পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ।”

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “আলোর বিপরীতে অন্ধকারের মতোই প্রগতিশীলতার বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সর্বকালে ছিল এবং এখনও সক্রিয়। ১৯৯৬ সনেও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী কল্পনা অপহরণ নিয়ে নানা গালগল্প অপপ্রচার চালিয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রামস্থ ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদর দফতর থেকে সে সময় কল্পনা চাকমার সন্ধান চেয়ে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা দিয়ে লিফলেট প্রচার করে, যা সংবাদ মাধ্যমেও বহুল আলোচিত হয়। নাটকীয়তার সাথে একটি সাইনবোর্ড সর্বস্ব মানবাধিকার সংস্থা তদন্ত চালিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের এক অজপাড়া গাঁয়ে কল্পনার সন্ধান পেয়েছে দাবি করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তদন্ত রিপোর্টও প্রকাশ করে। অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, ঐ তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক সক্রিয় ভূমিকা রেখে প্রকারান্তরে শিক্ষক সমাজকে কলঙ্কিত করেছিলেন। ২৪ পদাতিক ডিভিশন তাকে পুরস্কার দিয়েছে কিনা, সে খবর আর জানা যায়নি। তার রহস্য কিন্তু উন্মোচিত হয় নি, এটাও একটি বড় দুর্বলতা বলে আমরা মনে করি। চিহ্নিত অপহরণকারীদের আড়াল করতে সে সময় বহু ষড়যন্ত্র চক্রান্ত হয়, এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। ডিএনএ টেস্টের নামে আসলে অপহৃত কল্পনা চাকমার ভাইদের হয়রানি ও তাচ্ছিল্য করার আইনী মারপ্যাঁচ ছাড়া আর কিছু নয়।”

সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলা হয়, কল্পনা অপহরণ শুধু পাহাড়ের ঘটনা নয়, কেবল একটি নারীর ব্যাপারও নয়, এক অর্থে এটি সমগ্র দেশের জনগণের ন্যায়-নীতি ও বাঁচার অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। যতদিন কল্পনা চাকমার বিচার না হবে, চিহ্নিত অপহরণকারীদের সাজা না হবে, ততদিন হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাজ পথের আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীরা সোচ্চার থাকবে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে ৪ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হচ্ছে- ১.অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে আসামী করে কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়া, পাহাড়ি ও বাঙালি প্রতিনিধির সমন্বয়ে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করা, অবিলম্বে উপরোক্ত তিন অপহরণকারীসহ কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার সাথে জড়িত সকলকে গ্রেফতার পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা ও অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত বাঘাইছড়ি থানা হেফাজতে থাকা অপহরণের আলামত সংরক্ষণ করা।
—————

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.