খাগড়াছড়ির উত্তর খবংপুয্যায় আটককৃতদের কাছে অস্ত্র পাওয়ার দাবি ভিত্তিহীন

0
0

সিএইচটি নিউজ ডটকম
Khagrachariসরেজমিন প্রতিবেদন॥ গত ১৯ নভেম্বর বৃহষ্পতিবার খাগড়াছড়ির উত্তর খবংপুয্যার একটি দোকান থেকে  আটক হওয়া ইউপিডিএফ সদস্য ও সমর্থকদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের দাবি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করে জানা যায়, ঐদিন নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক আটক ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সংগঠক প্রতীম চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জিকো ত্রিপুরা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক নিকাশ চাকমা ও স্বনির্ভর বাজারস্থ চাবগী ডেকোরেটরস এর স্বত্ত্বাধিকারী স্বপন চাকমার কাছ থেকে কোন অস্ত্র কিংবা বেআইনী কোন কিছু পাওয়া যায় নি।

অপরদিকে প্রায় একই সময়ে নারাঙহিয়ার অনন্ত মাস্টার পাড়া থেকে সেনাবাহিনী রঞ্জু চাকমা ওরফে খোকনকে ধরে নিয়ে গেলেও তাকে উক্ত চারজনের সাথে উত্তর খবংপুজ্যা থেকে আটক করা হয়েছে বলে এফআইআর-এ উল্লেখ করা হয়েছে। তার কাছ থেকেও বেআইনী কোন কিছু উদ্ধার করা হয়নি।

যা ঘটেছে
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও দোকান মালিক মানিক ধন চাকমা এ প্রতিবেদককে জানান, ‘‘দুপুর সাড়ে বারটার দিকে একটা গাড়ি যোগে ৪জন সাদা পোষাকধারী এবং একজন সেনা বাহিনীর ইউনিফর্মধারী লোক দোকানের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামেন। তারপর দোকানে থাকা কয়েকজনকে ধাওয়া করে আমার বাড়ির দিকে নিয়ে যায়। সেখানে কি হয়েছে আমি জানি না। বেশ কিছুক্ষণ পর তারা আবার আমার দোকানে আসেন। সেই সময় দেখতে পাই দুজনকে চোখ বেধেঁ নিয়ে আসা হয়েছে। দুজনের মধ্যে একজন আমার বাসায় ভাড়াটিয়া খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের ছাত্র নিকাশ চাকমাও রয়েছে। দুজনকেই মারধর করা হয়েছে। সেই সময় একজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অন্য সদস্যদের বলেন, ‘স্যার দোকানটা সার্চ করা দরকার।’

“দোকান থেকে তারা জিকো ত্রিপুরাকে গ্রেফতার করে। তাকে মারধর করা হয়। সেই সাথে আমাকে এবং পার্শ্ববর্তী ভবন লাইট হাউজের কেয়ারটেকার কনকন চাকমা জাল্যেকেও মারধর করা হয়।”

তিনি জানান, তাদেরকে একটা সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি এবং কালাচান চাকমা প্রশ্ন করেন, ‘‘কেন স্বাক্ষর করতে হবে?” এর জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, সাক্ষী হিসেবে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করতে হবে।”

তখন কালাচান বাবু এবং মানিক ধন চাকমা জব্দ তালিকায় কি লেখা আছে তা না পড়ে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। মানিক ধন চাকমা বলেন, “আমি বলেছি জব্দ তালিকায় কি কি পাওয়া গেছে আমরা জানি না। কি কি আছে তা এখন লিখলে আমরা স্বাক্ষর করতে পারব।” কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জব্দ তালিকা তৈরি না করে তাদেরকে একটা সাদা কাগজের নিচে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। প্রথমে মানিক ধন চাকমা, পরে তার স্ত্রী রওশোনা চাকমা এবং প্রতিবেশী কালাচান চাকমার স্বাক্ষর নেয়া হয়।

মানিক ধন চাকমা জোর দিয়ে বলেন, আটককৃতদের কাছ থেকে কি কি পাওয়া গেছে তা তাদেরকে দেখানো হয়নি এবং সেই সময় কোন অস্ত্র বা গোলা বারুদও তাদরকে দেখানো হয়নি। তিনি দাবি করেন, “আমরা জানি তাদের (আটককৃতদের) হাতে কোন অস্ত্র ছিল না। আটকের সময় তাদের কাছ থেকে কোন অস্ত্র ও গুলি পাওয়া যায়নি এটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি।”

ঘরের তালা ভেঙে তল্লাশী
ঘটনার আরো এক প্রত্যক্ষদর্শী রওশোনা চাকমা বলেন, “ঘটনার সময় আমি গোসল করছিলাম। বাড়িতে শুধু আমার মেয়ে তুষ্টি এবং আমি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করে কাউকে সেদিকে যেতে দেখেছে কিনা? আমার মেয়ে জানায় সে কাউকে যেতে দেখেনি। কোলাহল শুনে আমি বাড়ির বাইরে আসি। তখন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দরজা এবং তালা খুলে দিতে বলে। আমি বলি আমার বাসায় ভাড়াটিয়ারা বাসায় তালা দিয়ে রাঙ্গামাটি গেছে। নিরাপত্তা কর্মিরা আমাকে জোর করলে আমি বলি যে, আপনারা এদিকে আসেন এবং তাদেরকে একটা হাতুরি দিয়ে বলি আপনারা (তালা) ভেঙ্গে দেখতে পারেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, আপনি নিজে ভাঙুন আমরা শুধু দেখব। আমাকেই হাতুরি দিয়ে তালাটি ভাঙতে হয়। এরপর তারা বাড়িতে তন্নতন্ন করে তল্লাশী চালায়, কিন্তু কোন কিছু পায়নি।”

রওশোনা আরো বলেন, সে সময় তিনি দেখতে পান যে তারা প্রতীম চাকমাকে চোখ বেঁধে রেখেছে। এর কিছুক্ষণ পর তাদের ভাড়াটিয়া খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের ছাত্র নিকাশ চাকমাকেও তার বাসা থেকে বের করা হয় এবং মারধর করা হয়। বেশ কিছু সময় ধরে তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় অবস্থান করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দুজনকেই সেখান থেকে নিয়ে যায়। এর মধ্যে তারা দোকানের দিকে যেতে চাইলেও তাদেরকে যেতে দেয়নি। বাড়িতেই বসে রাখা হয়েছে। তাই সে সময় দোকানে কি ঘটেছে তা তারা দেখতে পাননি।

আটককৃতদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি পাওয়ার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আটকের সময় কাউকে জানায়নি বা দেখায়নি যে, তারা তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে। আমরাও মনে করি তারা অস্ত্র পায়নি। কিন্তু তারা আমার স্বামী মানিক ধন চাকমা, প্রতিবেশী কালাচান চাকমা এবং আমাকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করে।” স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করলেও জোর করে আমাদের স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে।

স্বপন বলেছিল আমি পালাব না
ঘটনার সময় খাগড়াছড়ির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্বনির্ভরে মেসার্স চাবগী ডেকোরেটরস-এর মালিক স্বপন চাকমা লাইট হাউজ নামে একটি বাড়িতে ডেকোরেশনের কাজে সেখানে গিয়েছিলেন। তাকেও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ৬৭ বছর বয়স্ক কালাচান চাকমা এ প্রতিবেদককে জানান, “আমার বাড়িতে ট্রাক্টরে করে নতুন ইট আনা হয়েছিল, সেগুলো আনলোড করা হচ্ছিল। আমি এর তদারকি করছিলাম। সেই সময় মানিক ধন চাকমার দোকানে হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামে। ‘ধরধর’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছিল। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতবম্ভ হয়ে পড়ি। স্বপন চাকমাকে আটক করা হলে স্বপন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বলে ‘আমি পালাব না। পালালে আপনারা আমাকে গুলি করবেন।’

কালাচান চাকমা জানান তাকেও জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়। প্রতিবাদ করলেও কোন কাজ হয়নি। সেনা বাহিনীর এক অফিসার তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করান।

খোকন চাকমার আটক হওয়া প্রসঙ্গ
হুয়াঙ বোইওবা’র অন্যতম সংগঠক ও এর অর্থ সম্পাদক রঞ্জু চাকমা খোকনকে নারাঙহিয়ার অনন্ত মাস্টার পাড়ায় তার বাবার সরকারী বাসা থেকে ধরে নেয়া হলেও তাকে উত্তর খবংপুয্যা থেকে প্রতীমদের সাথে আটক করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনী দাবি করেছে এবং তা পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এফআইআর-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

খোকন-এর মা স্নেহবালা চাকমা এ প্রতিবেদককে বলেন, তার ছেলে বাড়িতে ভাত খাচ্ছিলেন। এ সময় অর্থাৎ দুপুর দেড়টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়িটি তিন দিক থেকে ঘেরাও করে এবং জিজ্ঞেস করে উঠানের মোটর সাইকেলটি কার, কাগজ পত্র আছে কিনা। তিনি বলেছিলেন গাড়িটি তার ছেলে রঞ্জু চাকমার এবং কাগজপত্রও দেখানো হয়। এরপর সেনা বাহিনীর সদস্যরা তার ছেলে কি করে জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন তার ছেলে ভাড়ায় হোন্ডা চালায়। এরপর সেনারা বলেন, ‘আপনার ছেলেকে একটু আমাদের সাথে যেতে হবে।’ খাবার শেষ করে খোকন হোন্ডা চালিয়ে সেনাদের সাথে যায়।

খোকনের মা জানেন না, তার ছেলের কী অপরাধ, কী কারণে তাকে গ্রেফতার করা হলো। গ্রেফতারের কারণও তাকে জানানো হয়নি। গ্রেফতারের সময় খোকনের বাবা জেলার হর্টিকালচার বিভাগের কর্মচারী রাঙাচান চাকমা বাসায় ছিলেন না। যে বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় তা সরকারী কোয়ার্টার।

ফেরীওয়ালারা আসলে গোয়েন্দা
অনেকের মতে সেনাদের উক্ত আটক অভিযানের শুরু এক ফেরীওয়ালার তথ্যের মাধ্যমে। জানা যায়, গাড়িতে করে সেনারা আসার আগে ওই এলাকায় এক ফেরীওয়ালাকে দেখা যায়। ধারণা করা হয় সেই প্রতিমদেরকে চিনতে পেরে আর্মিদের কাছে সংবাদ পাঠিয়ে থাকতে পারে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুল ছাত্রী বলেন, “আমি দেখেছি একজন কটকটি বিক্রেতা ফেরি করছিল। সে দশবল বিহারের সামনে দিয়ে আসার পর মোড়ের কাছে সেনা বাহিনীর গাড়িতে ফেরির সরঞ্জামাদি রেখে দেয়। এরপর সে গাড়ি থেকে ইউনিফর্ম পরে বাকি সেনা সদস্যদের সাথে অভিযানে যোগ দেয়।”
————————–

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.