খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে ফিলিস্তিনি সংহতি দিবসে তিন সংগঠনের আলোচনা সভা ও সংহতি সমাবেশ

0
1

29-11-16-khgখাগড়াছড়ি : ‘Support Palestinian people’s just struggle for self-determination! ফিলিস্তিন জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য সংগ্রামে সমর্থন দিন!’ এই দাবি সম্বলিত শ্লোগানে ও ‘ইহুদি সেটলারদের আগ্রাসনের নিন্দা জানান, ফিলিস্তিনদের আবাসভ‚মি দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন! We stand with Palestine people!এই আহ্বানে খাগড়াছড়ি জেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব ফিলিস্তিন সংহতি দিবস ২০১৬ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সংহতি সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ), পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিওএফ) খাগড়াছড়ি জেলা শাখা।

গতকাল মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর ২০১৬) বিকাল ৩টায় খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি দ্বিতীয়া চাকমার সভাপতিত্বে ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক সুমন্ত ত্রিপুরার সঞ্চালায় আলোচনা করেন, ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর সংগঠক মিঠুন চাকমা ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সহ-সভাপতি তপন চাকমা প্রমুখ।

সভায় বক্তাগণ বলেন, ফিলিস্তিনি নামক জায়গাটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। সে জন্য ঐ এলাকাকে দখল করার জন্য বা নিজেদের নিয়ন্ত্রনের আনার জন্য  মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা চেষ্টা চালাত। ১৯৪৭ সালে ২৯ নভেম্বর তিন শক্তি বিদ্রোহ করতে শুরু করলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনিকে দ্বিখণ্ডিত করে পৃথক দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। সে সময়ে যেহেতু ইসরায়েলরা সু-সংগঠিত তারা ১৯৪৮ সালে ১৪ মে একটি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন এবং সেখান থেকে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্র গঠিত হয়। তার বিরুদ্ধে আরব জনগণ ফিলিস্তিনিদেরকে নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও তাদের শক্তি না থাকার কারণে ও জনগণের চেতনা না থাকার কারণে ইসরায়েল থেকে ফিলিস্তিনি মানুষেরা পালিয়ে যায়।  ফলে ঐ এলাকায়  বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটলারদের মত ইহুদিদের অবস্থান সু-সংগঠিত করে নেয়।

বক্তাগণ আরো উল্লেখ করেন, একশ বছরে আগে ফিলিস্তিনিদের অবস্থান যেভাবে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামেও বিশ-পঁচিশ বছর আগে সেভাবে ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণকে  বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ভাস্তু হতে হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সংগ্রাম করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করছে।

১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আরব ও ইসরায়েল মধ্যে কয়েকটি বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ইসরায়েলদের শক্তি আরো বৃদ্ধি হতে থাকে। এতে ফিলিস্তিনের জনগণের ভাগ্যের দুর্ভোগ নেমে আছে। ফলে ফিলিস্তিনিরা তাদের মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্যে সংগঠিত হতে থাকে। পরে ইসরায়েল দখলদারির অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করতে রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন গঠনসহ সামরিক শাখা গঠন করে। কিন্তু সে সময়ে তারা তেমনি সংগঠিত হতে না পারায় এবং কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ইসরাইল ফিলিস্তিনের দুই অংশ পশ্চিম তীর ও গাজা নামে দুটি অঞ্চল ভাগ করে। পরে ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ ২৯ নভেম্বরকে ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকে যারা ফিলিস্তিনি নিপীড়িত জনগণের পক্ষে তারা জাতিসংঘ ঘোষিত ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস পালন করে থাকে। আমরাও নিপীড়িত জাতি হিসেবে ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস পালন করছি।

বক্তাগণ, ফিলিস্তিনি জনগণ যেভাবে স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রাম করতে গিয়ে হাজার হাজার জনগণকে সংগঠিত করে গণজাগরণ সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আন্দোলন জোরদার করছে এবং লড়াই করতে গিয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে বন্দী হতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানকার জনগণের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের উপর শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে জুম্ম জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

বক্তারা এই ফিলিস্তিনি সংহতি দিবসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে একত্মতা প্রকাশ করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের প্রতিও আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বিশ্বের প্রতিটি দেশের নিপীড়িত জনগণ সংহতি জানাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে মত প্রকাশ ও সভা সমাবেশের স্বাধীনতা দাও’ এই দাবি জানিয়ে ফিলিস্তিনি সংহতি দিবসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) রামগড় সরকারি ডিগ্রী কলেজ শাখা।

বিকাল ৩টায় মিছিলটি রামগড় সদর উপজেলার সোনাই আগা প্রাইমারি স্কুল মাঠ থেকে শুরু হয়ে সোনাই আগা বাজারে প্রদক্ষিণ করে আবার একই স্থানে এসে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন, ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর রামগড় উপজেলা সংগঠক হরি কমল ত্রিপুরা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) রামগড় সরকারি ডিগ্রী কলেজ শাখার সদস্য মানিক ত্রিপুরা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামে রামগড় উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন ত্রিপুরা প্রমুখ।

বক্তারা, পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক মিছিল মিটিঙে সেনা হস্তক্ষেপ বন্ধ করে জনগণের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে আহ্বান জানান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর জারিকৃত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দমনমূলক “১১ নির্দেশনা” বাতিলের দাবি করেন।

একই দাবিতে আজ দুপুর ১২টায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) মানিকছড়ি উপজেলা শাখা। মিছিলটি মানিকছড়ি সদর কলেজিয়েট স্কুল গেইট থেকে শুরু করে মানিকছড়ি গিরী মৈত্রী ডিগ্রী কলেজ গেইটে গিয়ে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) মানিকছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি উথোইপ্রæ মারমা ও মানিকছড়ি গিরী মৈত্রী ডিগ্রী কলেজ শাখার সভাপতি ক্যাচিং মারমা প্রমূখ।

এছাড়াও জেলার লক্ষীছড়িতেও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) লক্ষীছড়ি উপজেলা শাখা। দুপুর পৌনে ১২টায় মিছিলটি কৈলাস মহাজন পাড়া থেকে শুরু হয়ে দেওয়ান পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় গেইটে গিয়ে এক সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে পিসিপি’র উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মংসাচিং মারমা, কেন্দ্রীয় সদস্য হ্লাচিমং মারমা, লক্ষীছড়ি কলেজ শাখার সভাপতি পাইসুমং মারমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সদস্য উষাঅং মারমা প্রমূখ।

সমাবেশ থেকে বক্তারা, ইউপিডিএফ-এর নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা ও পিসিপি’র নেতা বিপুল চাকমাসহ সেনা প্রশাসনের কর্তৃক অন্যায়ভাবে গ্রেফতারকৃত ইউপিডিএফ ও তার সকল সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের উপর দায়েরকৃত সকল ধরনের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।
——————

সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.