ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ১ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত

0
2

Gilachari sommelon2 22.11.2014সিএইচটিনিউজ.কম
ঘিলাছড়ি(রাঙামাটি): রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলাধীন ঘিলাছড়ি বাজার মাঠে আজ ২২ নভেম্বর ২০১৪, শনিবার সকাল ১০টায় ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ১ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

“নারী নির্যাতন, জাতিসত্তা ধ্বংসের পাঁয়তারা ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে সংগঠিত হোন, প্রতিরোধ গড়ে তুলুন” এই শ্লোগানে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শান্তিপ্রভা চাকমা ও অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রতিরোধ কমিটির সদস্য কাজলী ত্রিপুরা। এছাড়া সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি সোনালী চাকমা, ৪নং ঘিলাছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান অমর জীবন চাকমা, ঘিলাছড়ি বাজার চৌধুরী নীহার বিন্দু চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সর্বানন্দ চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নিরূপা চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বাবলু চাকমা, সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি জ্ঞানেন্দু চাকমা, সাজেক নারী সমাজের সভাপতি নিরূপা চাকমা এবং ল্যাম্পপোষ্ট-এর সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য ও গণমুক্তির গানের দল’র ফারহানা হক শামা প্রমুখ।

সম্মেলনে ৫ শতাধিক নারী অংশগ্রহণ করেন। এতে টেকনাফ-উখিয়া, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকা থেকে বিভিন্ন জাতিসত্তার ছাত্র-যুব-নারী প্রতিনিধিবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।

‘আমরা করবো জয়…’ গান এর মাধ্যমে সম্মেলন শুরু হয় এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে সকল বীর শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২ মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।

সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে কাজলী ত্রিপুরা বলেন, এমন এক পরিস্থিতিতে ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ১ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারীদের উপর নির্যাতন ও ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর খুনের ঘটনা আগের চেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিগত ২০০৯ সালে ৮ নভেম্বর ঘিলাছড়ি আর্মি ক্যাম্পের সেনাসদস্য কর্তৃক যমুনা চাকমাকে শ্লীলতাহানীর চেষ্টার ঘটনায় প্রতিবাদ করতে আমাদের এই সংগঠন জন্ম লাভ করে। এই সংগঠন নারীদের উপর সকল ধরনের সহিংসতা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার রয়েছে। তিনি সম্মেলনে উপস্থিত থেকে সংহতি জানানোর জন্য টেকনাফ-উখিয়া, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকা থেকে ছাত্র-যুব-নারী প্রতিনিধিদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

Gilachari sommelon, 22.11.2014

পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি সোনালী চাকমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, শেখ মুজিব পাহাড়ি জনগণকে প্রমোশন দিয়ে বাঙ্গালী জাতি বানাতে চেয়েছিলো। শেখ হাসিনাও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা-বিজিবি রাখা মানেই নারী ধর্ষণ, ভূমি বেদখল ও সাম্প্রদায়িক হামলায় উস্কানী দেওয়া। নিরাপত্তার নামে নারীদের নিরাপত্তা হরণ করা।

তিনি আরো বলেন, আমরা যদি সচেতন ও অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম বেগবান না করি তাহলে আমরা আমাদের অধিকার অর্জন করতে পারবো না। নারী অধিকার অর্জন তখনি হবে যখন পাহাড়ে রাজনৈতিক অধিকার পূর্ণস্বায়ত্তশাসন অর্জিত হবে।

ঘিলাছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান অমর জীবন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর জনগণ ১৯৭১ সলে মনে করেছিলো পূর্ববাংলার জনগণের সাথে স্বাধীন হলে তারা নিজেদের অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু আমরা তা পাইনি। এই সম্মেলন আজ নারীদের অধিকারের সম্মেলন। যমুনা চাকমাকে শ্লীলতাহানীর প্রচেষ্টার ঘটনায় ঘিলাছড়ি নারীরা সংগঠিত হয়েছেন। শুধু প্রতিবাদ নয়, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঘিলাছড়ির নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল এলাকায় নারীদেরকে তাদের অধিকারের জন্য সংগঠিত হতে হবে।

অংগ্য মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতন, ভূমি দখলের ও জাতিসত্তা ধ্বংসের পাঁয়তারা এবং অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের সংগঠিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। আমাদেরকে জায়গায় জায়গায় সংগঠনে গড়ে তুলতে হবে অধিকার আদায়ের জন্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৭ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু এই চুক্তি থেকে তেমন কোন কিছু আশা করা ঠিক নয়। রাঙ্গামটিতে এক সময় দায়িত্বরত এসপি বলেছিলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি একটা মূলা”। এর পর আর কোন কিছু বলার থাকে না। তিনি চুক্তির বর্ষপূর্তির দিনে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রামের কথা বলে জনগণকে ধোঁকা না দিয়ে, শেখ হাসিনার আঁচল থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ি জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আঞ্চলিক পরিষদের গদি ছেড়ে জনগণের কাতারে আসার জন্য সন্তু লারমার প্রতি আহ্বান জানান।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরূপা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর খুন এর ঘটনা আগের চেয়ে ভয়াবহ রুপ লাভ করেছে। কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাকে নিয়ে সরকার যে তালবাহানা করছে তা ন্যাক্কাজনক উল্লেখ করে তিনি এর প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, কল্পনার ভাইদের ডিএনএ টেস্ট-এর নামে নতুন কোন তালবাহানা দেখাতে চাই না। অবিলম্বে কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস ও তার দোসরদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

সর্বানন্দ চাকমা বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে কাপ্তাই বাঁধ দেওয়ার মাধ্যমে পাহাড়ি জনগণকে উচ্ছেদ করেছিলো। আজ তার সাথে যুক্ত হয়েছে গুইমারা নাক্রাই বাঁধ। এই বাঁধ এর কারণে পাহাড়ি জনগণ লাভবানতো হবে না বরং তারা সেখান থেকে উচ্ছেদ হবে। তাই নাক্রাই এলাকায় বাঁধ দেয়া থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহকে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি করেন।

ফারহানা হক বলেন, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির এই সম্মেলন এর মাধমে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী নির্যাতন এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করবে। আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করছি কিন্তু আসলে তেমন কোন পরির্বতন হচ্ছে না। তাই আমাদের আন্দোলনে একটা গুণগত পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার মাধ্যমে জনগণ তাদের শোষক পরির্বতন ছাড়া আর কোন কিছু লাভ করেনি। নারী নির্যাতনের মাধ্যমে জাতিসত্তা ধ্বংসের পাঁয়তারা চালাচ্ছে উগ্র শাসক শ্রেণী। তাই নিপীড়িত জাতির জনগণকে অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

বাবলু চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখানো অঘোষিতভাবে সেনাশাসন চলছে। ১৯৭১ সালে বৃহত্তর বাঙ্গালী জাতি স্বাধীন হলেও পাহাড়ি জনগণ জাতিগতভাবে স্বীকৃতি পায়নি। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার মান বৃদ্ধি না করে এখানে ছাত্র সমাজের দাবীর বিপরীতে মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দিতে চাচ্ছে। উন্নয়নের নামে পাহাড়ি জনগণের সাথে প্রতারণা করছে। তিনি বলেন সরকারের কথিত উন্নয়ন পাহাড়ি জনগণ চায় না।

সম্মেলনে ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির নেত্রী কাজলী ত্রিপুরা ১০ দফা সম্বলিত রাজনৈতিক প্রস্তাব তুলে ধরেন।

রাজনৈতিক প্রস্তাবে উত্থাপিত ১০ দফা হলো:
১. রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করে, প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের অবকাঠামো উন্নয়নসহ শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য সকল জাতিসত্তার মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হোক।

২. কল্পনা চাকমা অপহরণের তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তালবাহানা বন্ধ করে চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌসকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচার করা হোক।

৩. রাঙ্গামাটি জেলার বগাছড়ির দিজেনপাড়া, নান্যাচর, কাউখালীতে ভূমি বেদখলের ষড়যন্ত্র ও খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারায় নাক্রাই বাঁধ প্রকল্প বন্ধ করা হোক।

৪. চাক ও মারমা জাতিসত্তাসহ নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা সাপেরঘাটা, আজিজ নগর, ত্রিরিশ পুকুর (আংখ্যংসা)পাড়া স্থায়ী বাসিন্দাদের বসতভিটা ও জায়গা-জমি রক্ষার্থে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

৫. বিভিন্ন কোম্পানীর নামে রাবার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাগান বাগিচা প্রকল্প বন্ধ করে অনাবাসী ভূমি মালিকদের জমি অধিগ্রহণপূর্বক তা প্রকৃত মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হোক।

৬. বান্দরবানে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বরাদ্ধ দেয়া প্লট বাতিলপূর্বক ভূমি বেদখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক।

৭. টেকনাফ-উখিয়ায় চাকমাদের জায়গা-জমি রক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে সরকারিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

৮. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী নির্যাতন বন্ধ ও গার্মেন্ট নারী শ্রমীকদের শ্রম শোষণ বন্ধের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

৯. সারা দেশে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও সভা-সমাবেশে পুলিশি নির্যাতন বন্ধকরণপূর্বক গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা হোক।

১০. নারী নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সবিতা চাকমা, রচনা দেবী ত্রিপুরা, উপ্রু মারমা’র ধর্ষণকারীসহ নারী ধর্ষণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি প্রদান করা হোক।

সম্মেলনে উপস্থিত সকলে হাত উচিয়ে ও তুমুল করতালীর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রস্তাব পাশ করেন ।

সম্মেলনের শেষান্তে ৮ গণসংগঠনের কনভেনিং কমিটির আহ্বায়ক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি সোনালী চাকমা ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ১৫ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি প্রস্তাব করেন। এরপর তুমুল করতালীর মাধ্যমে প্রস্তাবিত কমিটি গৃহীত হয়। নবগঠিত কমিটিতে কাজলী ত্রিপুরাকে সভাপতি, মিনতি চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক, মঞ্জুরাণী চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক, সোনামুখী চাকমাকে অর্থ সম্পাদক ও সোনা চাকমাকে দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়েছে।

ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির বিদায়ী সভাপতি শান্তিপ্রভা চাকমা সম্মেলনে উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং নবগঠিত কমিটিকে নতুন উদ্যমে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
————–

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.