চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে ম্রো’দের আবাসভূমি বেদখলের প্রতিবাদে সংহতি সমাবেশ

পাঁচতারকা হোটেল প্রকল্প বাতিলে ২৬ মার্চ পর্যন্ত আল্টিমেটাম

0
56

ঢাকা ।। বান্দরবানের চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের নামে ম্রো আবাসভূমি বেদখলের প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি।

আজ মঙ্গলবার (০২ মার্চ ২০২১) ‘চিম্বুক পাহাড় ম্রো ভূমি রক্ষা আন্দোলন’ এর ব্যানারে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান।

সুদুুর চিম্বুক পাহাড় থেকে ম্রো জনগোষ্ঠীর লোকজন আসেন সমাবেশে যোগ দিতে। তারা সাথে নিয়ে আসেন তাদের ঐতিহ্যবাহী প্লুং বাঁশি। সেই প্লুং বাঁশির সুরে শুরু করা হয় সংহতি সমাবেশ।

সঞ্জীব দ্রং এর সঞ্চালনায় উক্ত সমাবেশে সংহতি বক্তব্য রাখেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ও সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস, বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হোসেন, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, ঢাবি শিক্ষক ড. জোবায়দা নাসরীণ কণা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. রেহনুমা আহমেদ, নারী মুক্তি কেন্দ্রের সীমা দত্ত, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন. চিম্বুকের ম্রো জনগোষ্ঠীর পক্ষে মেনচিন ম্রো, ছাত্রনেতা রেং ইয়ং ম্রো।

সমাবেশে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, চিম্বুক পাহাড় বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। কাজেই এই ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। স্বাধীনতার মাসে বলতে হচ্ছে, আমরা এজন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি এবং এই লুটেরাদের হাতে বাংলাদেশকে ছেড়ে দিতে পারি না।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সিকদার গ্রুপের মত লুটেরা গ্রুপ কী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের মালিক বনে গেছে?  তিনি বলেন, এটা কেবল ম্রোদের বিষয় নয়। পাহাড়, বন ও জাতিগোষ্ঠী ধ্বংস করে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কোনো লুটেরা গ্রুপ ও কর্পোরেট গ্রুপ’কে দেয়া হবে না।

নাট্যকার মামুনুর রশীদ বলেন, আমার বিশ্বাস যতই পাঁয়তারা করুক পাঁচতারা হোটেল সেখানে হতে পারবে না। সারা বিশ্বের পরিবেশবাদী মানুষ জেগে উঠবে। ম্রো’দের প্লুং বাঁশির হাহাকার শাসকদের শুনতে হবে। চিম্বুকের ম্রো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে সেখানে কেন উন্নয়ন করতে হবে বলেও তিন প্রশ্ন করেন। তিনি অবিলম্বে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণ বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

ম্রো ভূমিতে কারা হোটেল বানাচ্ছে তাদের ‘ক্যারেক্টার’ চিনে নেওয়া উচিত মন্তব্য করে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এই হোটেল যারা বানাচ্ছে তাদের অন্যতম সিকদার গ্রুপ। ম্রোদের উচ্ছেদ করে সেখানে পাঁচতারা হোটেল করবেন আর বিত্তশালী মানুষ সেখানে আমোদ করবে, বিহার করবেন তা হতে পারে না। পাহাড়ের মানুষ অশিক্ষিত হয়ে পড়ে থাকবে আর তাদেরকে পর্যটকদের দেখানো হবে পর্যটনের অংশ হিসেবে, তা হতে পারে না। হোটেলের পরিবর্তে পাহাড়ে স্কুল ও কলেজ স্থাপনেরও দাবি করেন তিনি।

চিম্বুক থেকে আসা মেনচিন ম্রো নিজের ভাষায় বক্তব্য রাখেন এবং বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন জাহঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা রেং ইয়ং ম্রো। মেনচিন ম্রো তাঁর বক্তব্যে বলেন, নীলগিরি আমাদের জুম ভূমি ছিল। সেই নিলগীরি পর্যটন হওয়ার সময়ে আমাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হবে, দোকানপাট করে দেয়া হবে বলে নানাভাবে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এইসব করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের যে পানির উৎস সেখানে বাঁধ দিয়ে নীলগীরি কর্তৃপক্ষ পানি সংগ্রহ করছে। যার ফলে বছরে ছ’মাস আমাদেরকে পানি কষ্টে ভুগতে হয়।

তিনি আরো বলেন, এই ঢাকা শহরে কোনো দিন আসি নাই। এমনকি আসতে হবে তাও ভাবি নাই। কিন্তু আমাদের পাহাড়ে যদি আমাদেরকে নিজেদের মত করে বাঁচতে দেয়া না হয় তাহলে আমাদেরকে যদি মারাও যেতে হয় আমরা শত বছর এর প্রতিবাদ করে যাবো।

জোবায়দা নাসরীন গত কিছুদিন আগে চিম্বুকের সেই স্পট দেখে আসার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, এমনভাবে সেই প্ল্যানটি করা হচ্ছে কেবল মাত্র ২০ একর জমি নিয়ে নয়। সেখানে যেটা করা হচ্ছে তা পুরো চিম্বুককে দখল করার জন্য।

তিনি আরো বলেন, চিম্বুকের সেই পর্যটন স্পটে যে বিলবোর্ড টানানো হয়েছে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর ছবিও আছে। কাজেই সেই ছবির উপস্থিতি আমাদেরকে ভয় ধরিয়ে দেয় যে, এই বিধ্বংসী প্রকল্পের সাথে কী প্রধানমন্ত্রীও জড়িত! কাজেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি এই প্রকল্পটি না চান এবং এর সাথে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকে তাহলে অবশ্যই নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে সেটা স্পষ্ট করতে হবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ম্রো জনগোষ্ঠীর মূল দাবি হল, তারা যেখানে শত বছর ধরে বসবাস করছে সেখানে তারা নিজেদের জীবন নিয়ে নিরবে যাপন করবে। এটা খুব একটা বড় দাবি নয়। কাজেই তাদের জীবন, জীবিকা, শিল্প, সংস্কৃতি ধ্বংস করে সেখানে হোটেল করার পরিকল্পনা কোনো সুষ্ঠু মানুষ মেনে নিতে পারে না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, আমরা এখানে সমবেত হয়েছি কারণ এই ম্রো’দের বাঁশির আওয়াজ কারো কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তারা এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে। কেবল বান্দরবানের ম্রো নয়, পাহাড়ের ও সমতলের সকল সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী আজ শঙ্কিত যে, এভাবে উন্নয়নের নামে কী ধীরে ধীরে আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেয়া হবে?

তিনি আরো বলেন, আমাদের অস্তিত্ব যেখানে বিপন্ন, মানবাধিকার যেখানে বিপন্ন যেখানে আমাদের ববাড়ির পাশে উন্নয়নের নামে পাঁচতারা হোটেল হবে তা তো মেনে নেয়া যায় না। এটা স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর নিজেদের জীবনের ব্যাপারে কিছু পছন্দ আছে। ম্রো জনগণ কিছুতেই এই পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের জন্য সম্মতি দেননি। কাজেই এই জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। জনমতের কাছে পরাজিত হওয়া মেনে না নিয়ে এক অদ্ভুত ধরনের গণতন্ত্র সরকার হাজির করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।  সেনাবাহিনীর সাথে সিকদার গ্রুপ ও এই প্রকল্পের সাথে জড়িত সকল চুক্তি বাতিল করে ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, অনেকের কাছে মনে হতে পারে এটা একটা সুন্দর দৃশ্য । কিন্তু আমার কাছে এটা বিভৎস দৃশ্য। এই বিভৎস্য দৃশ্যের সাথে কারা জড়িত তা আমরা জানি। আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী এবং সাথে সিকদার গ্রুপ। পাহাড়ের এই দখল দারিত্বের বিরুদ্ধে সরকারের বোধদয় হতে হবে।

ছাত্রনেতা রেং ইয়ং ম্রো বলেন, আমরা যতভাবে সম্ভব এবং যেভাবে আমাদের আবেদন-নিবেদন জানানো উচিত সেটার সবগুলোই করেছি। আমরা দেখেছি চিম্বুকের এই প্রকল্প হলে আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হবে। তাই আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু কোনো ধরনের প্রতিকারের ব্যবস্থা না করে উল্টা যারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে তাদেরকে হয়রানি করা হচ্ছে।

তিনি আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে যদি এই প্রকল্প বাতিল করা না হয় তাহলে নাইতং পাহাড়কে ঘিরে পাহাড়ে যে ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সেটার দায় সরকারকে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

সমাবেশ শেষে ম্রো’দের প্লুং বাঁশির সুরে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ঘুরে পূনরায় শাহবাগে এসে শেষ হয়। পরে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিতে তাঁর কার্যালয়ে যান।

সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন নিজ নিজ ব্যানারে সংহতি প্রকাশ করে।

 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.