চিম্বুকে পাঁচতারকা হোটেল প্রকল্প ম্রো জাতিগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করবে- সিএইচটি কমিশন

0
871
সংগৃহিত ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক ।। আন্তর্জাতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন (সিএইচটি কমিশন) বান্দরবানের চিম্বুক-থানচি এলাকায় নির্মিতব্য নতুন পাঁচতারকা হোটেল প্রকল্পের দ্বারা বেশ কয়েকটি গ্রাম থেকে ম্রো জাতিগোষ্ঠীর লোকদের নির্বিচারে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রকল্পটি অবিলম্বে বাতিল করার জন্য সরকারের নিকট আহ্বান জানিয়েছে।

আজ ২ নভেম্বর ২০২০ কমিশনের কো-চেয়ার সুলতানা কামাল, কো-চেয়ার এলসা স্ট্যামাটোপলৌ এবং কো-চেয়ার মিরনা কানিংহাম কইন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, চিম্বুক-থানচি এলাকায় নির্মিতব্য এই প্রকল্পটির ফলে সরাসরি দরিদ্র ম্রো জাতিগোষ্ঠীর তিন গ্রামবাসী বাস্তুচ্যুত হবে এবং অন্য পাঁচটি গ্রাম থেকেও পরবর্তীতে উচ্ছেদ হওয়ার আশংকা রয়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউনে গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও ৬৯ ব্রিগেড, সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং সিকদার গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান আরএন্ডআর হোল্ডিংস লিমিটেড যৌথ উদ্যোগে নীলগিরি কিংবা তার আশেপাশে ম্যারিয়ট হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। উক্ত হোটেল এবং বিনোদন পার্কটি বান্দরবান সদর থেকে দক্ষিণ দিকে ৪৭ কিলোমিটার অদূরে চিম্বুক-থানচি রোডে নির্মাণ করা হবে এবং এই প্রকল্পটি আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এবং আরঅ্যান্ডআর হোল্ডিংস লিমিটেডের মধ্যে একটি ৩৫ বছরের ইজারা এবং লাভ-ভাগাভাগির চুক্তির আওতায় নির্মিত হবে।

কমিশন ইতিমধ্যে উক্ত প্রকল্প বন্ধে কাপ্রুপাড়া, দোলাপাড়া, ইরাপাড়া ও চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসরত ম্রো গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরে দেওয়া পিটিশনের এক কপি পাওয়ার কথা জানিয়ে বিবৃতিতে উল্লেখ করে যে, উক্ত পিটিশনে ম্রো গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন প্রস্তাবিত নির্মাণ প্রকল্পটির ফলে সরাসরি তিনটি ম্রো গ্রাম উচ্ছেদের শিকার হবে এবং অন্য পাঁচটি গ্রামও উচ্ছেদের হুমকির মূখে পড়বে। তারা ইতিমধ্যে বান্দরবানে অনেক জমি হারিয়েছে এবং এই প্রকল্পটি তাদের বিদ্যামান দুর্ভোগ আরও বাড়াবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রথাগত আইনের কথা জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এ জাতীয় জমি যেকোনো ব্যক্তি বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেয়ার ক্ষেত্রে কেবল পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ কর্তৃক স্বীকৃত সিএইচটি রেগুলেশন আইন ১৯০০ অনুসারেই হতে পারে। এটা খুবই উদ্বেগজনক যে পার্বত্য চট্টগ্র্রামে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে ভূমি কমিশন যখন কাজ শুরুও করতে পারেনি, তখন বান্দরবানে এ জাতীয় বিশাল কর্পোরেট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

বান্দরবানে কর্পোরেট পর্যটন ও অন্যান্য মুনাফা-উপার্জনের ব্যবসায়ের নামে জমি বেদখলের কাজ চলছে বহু বছর ধরে। এ ছাড়াও, ১৯৯৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সামরিক বাহিনীর প্রধান ৬টি সেনা গ্যারিসন বাদে সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, সেখানে সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বান্দরবান ও অন্যান্য অঞ্চলে সরাসরি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ভূমি বেদখলের অভিযোগ আছে। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনী কল্যাণ ট্রাস্ট, একটি বিতর্কিত কর্পোরেট সংস্থা আরএন্ডআর হোল্ডিংস লিমিটেড (সিকদার গ্রুপ)-এর সাথে একটি পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের জন্য একযোগে কাজ করছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, ২০২০ সালের ২৯-৩০ অক্টোবর পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পক্ষে, তৎক্ষণাত তাদের সুপারিশ এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদানের জন্য ওই এলাকার মৌজা হেডম্যান এবং অন্যান্য নেতাদের হুমকি দিচ্ছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মোতায়েনকৃত নিরাপত্তা বাহিনীর বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার আদেশ নেই, যার মধ্যে রয়েছে পর্যটন, বেসরকারি কর্পোরেশনের সাথে জোট, অথবা অন্যথায়। এটি বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদর্শের পরিপন্থী বলে বিবৃতিতে মন্তব্য করা হয়।

বিবৃতিতে সিএইচটি কমিশন নিম্নলিখিত প্রস্তাবনাসমূহ পেশ করেছে-

  • চিম্বুক-থানচি রুটে প্রস্তাবিত হোটেল প্রকল্পটি তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেওয়া উচিত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য একটি উপযুক্ত স্থান চিহ্নিত করা উচিত। যেকোনো পর্যটন প্রকল্পের জন্য স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের পাশাপাশি সিএইচটি আঞ্চলিক কাউন্সিল এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পরামর্শে হওয়া উচিত ।
  • ভূমি কমিশনকে প্রয়োজনীয় সকল সম্পদ সরবরাহের সাথে অবশ্যই কার্যক্ষম করতে হবে, যাতে সিএইচটি আঞ্চলিক কমিশনের পরামর্শ অনুসারে সিএইচটি ভূমি কমিশন বিধিমালা পাশ করার মধ্য দিয়ে সিএইচটি-তে সমস্ত জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ শুরু করতে পারে।
  • ইতিমধ্যে, রাবার বাগান, হর্টিকারচার ও শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য অস্থানীয় ব্যক্তি, সংস্থা এবং অন্যান্য কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে দেওয়া ইজারাসহ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সমস্ত জমি লিজগুলি স্থগিত করা উচিত যতক্ষণ না ভূমি কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি সংক্রান্ত সমস্ত বিবাদ মীমাংসা না করে।
  • যেখানে জনসাধারণের স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ অপরিহার্য, প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যে এবং সরকারী উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ ছাড়াও কোনও জমি নেওয়া উচিত নয়।
  • যাদের জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে নেওয়া হবে তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, বিকল্প জমি এবং যাবতীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • জমি অধিগ্রহণের সময় সমস্ত উচ্ছেদ পরিবারগুলির ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত, বিশেষত পার্বত্য জনগণের জমির ক্ষেত্রে যাদের কোনও সরকারী দলিল নেই, যদিও তাদের প্রথাগত জমির অধিকার রয়েছে।
  • পর্যটন সম্পর্কিত নির্মাণ প্রকল্পগুলি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে পরামর্শ এবং স্বাধীন, অগ্রীম ও অবগত সম্মতি ব্যতিরেকে নেওয়া উচিত নয়।
  • ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সকল ধারাগুলি সম্পূর্ণ এবং কোনও বিলম্ব ছাড়াই বাস্তবায়ন করা উচিত।

 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত/প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.