জেএসএস-রা নির্দেশ দিয়েছে বাজার না ছাড়লে জরুরী পদক্ষেপ নেবো: নারেইছড়ি বাজার কমিটির সভাপতি

0
1

সিএইচটি নিউজ.কম
কামিনী রঞ্জন চাকমা মাচ্চো হলেন দীঘিনালার নারেইছড়ি বাজার কমিটির সভাপতি। জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র জঙ্গীরা ২৪ এপ্রিল এক চিঠিতে নারেইছড়ির লোকজনসহ বাজারের সব দোকানদারকে বাজার বন্ধ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলে তিনি ভয়ে বাবুছড়ায় চলে আসেন। গত ৮ জুন সিএইচটি নিউজ.কমের পক্ষ থেকে বাবুছড়ায় তার সাক্ষাতকার নেয়া হয়। নারেইছড়িতে জনগণের দুর্দশার জন্য কে বা কারা দায়ি সে সম্পর্কে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার এই সাক্ষাতকারটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ভেবে আমরা পাঠকদের জন্য এখানে তা প্রকাশ করছি।
————

Kamini Ranjon Chakmaপ্রশ্ন: এখানে কবে এসেছেন?
উত্তর: বাজার পুড়ে যাওয়ার আগে। বাজার পুড়ে গেছে মে মাসের ৩ তারিখ। [বাজার বন্ধ করার নির্দেশ অমান্য করা হলে এদিন সন্তু গ্রুপ বাজারটি পুড়িয়ে দেয়।]

প্রশ্ন: কিভাবে বাজার পুড়ে গেছে?
উত্তর: বাজার পুড়ে যাওয়ার বিষয়ে আমি জানি না। আমি দেখিনি।

প্রশ্ন: বাজার পুড়ে যাওয়ার আগে বাজারে না যাওয়া অথবা বাজার না বসানোর জন্য কেউ কোন কথা বলেছে কি?
উত্তর: বাজারে যাওয়া বা বাজার না বসানোর বিষয়টা আসেনি। ইউপিডিএফ সেখানে গিয়ে আমাদের সাথে মিটিং করেছে আমাদের সুখ দুঃখের ব্যাপারে। সেখানে আমি প্রকাশ্যভাবে বলেছি, ভেইলক আমরা আপনাদের কোন পর নই, আমরা বাবুছড়ায় গেলে আপনাদের লোকদের সাথে কত ডাকাডাকি করে চা খাই। আমাদের পারস্পরিক মায়া মমতা রয়েছে। আপনারা এখানে এসেছেন একইভাবে মায়া মমতার মাধ্যমে আমরা এক সাথে থাকব।  কিন্তু আপনারা হিংসা মনোভাব পোষণ করবেন না, আমরা হলাম নিরীহ মানুষ। তারা [সন্তু গ্রুপ] আসলেও তাদের সাহায্য করতে হয়, আপনারা আসলেও সহযোগিতা দিতে হয়।

সেদিন কি যেন একটা কাজে আমরা একজনকে উপরে [সন্তু গ্রুপের কাছে] পাঠাই। সে ফিরে আসলে আমাকে একটা কাগজ [চিঠি] দেয়। সেই কাগজটা পড়ার পরে আমি বাজার কমিটি’র দুই-একজনকে জানাই। তারপর আমরা আলোচনা করে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কী করবো। কাগজে লেখা ছিল ‘‘অতি সত্ত্বর জরুরী ভিত্তিতে আজকে সাথে সাথে পালিয়ে যাও না হলে তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব’’। নির্দেশ কাগজে লেখা ছিল, তারা [সন্তু গ্রুপ] মুখে বলেনি।

আমি সেই সময় এ বিষয়ে দুই জন বয়স্ক লোকের সাথে কথা বলি। উনারা বললেন, “আপনি যদি বাজারে থাকেন তাহলে আমরাও থাকব।” তাদের বলি, “যদি আপনাদের সঙ্গী পাই তাহলে আমিও বাজার ছেড়ে কোথাও যাব না।” তিন জনে মিলে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই: ‘কোন অবস্থায় বাজার ছেড়ে যাব না।’ আমি দোকান বন্ধ করার পরপরই আমার ছেলে এখানকার কমলা বাগান থেকে সেখানে গিয়ে পৌঁছায় এবং বলে, “বাবা তোমরা বাজার ছেড়ে চলে যাও, নতুবা বাদ বিচারহীনভাবে ব্রাশ ফায়ার করবে।” আপনারা সকলেই জানেন আমার একটা ছেলে শান্তিবাহিনীতে কাজ করছে। আমাকে ফোন করলে পাওয়া যায় না, কারণ নেট থাকে না। সেই কারণে সেই ছেলেটা কমলাবাগানের ছেলেটাকে ফোন করে জানায় যে, বাবাকে বাজার ছেড়ে চলে যেতে। আমার জীবন তো দুটো নয়। ভয় পেলাম। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অন্য দুইজনের কাছে যাই এবং তাদেরকে বিষয়টা খুলে বলি – “আমার ছেলে উক্ত খবর পাঠিয়েছে। আমি চলে যাচ্ছি।” আমি চলে যাওয়ার পর উনারাও চলে যান। বাজারে শুধু আমার নয়, আরো অনেকের ২/৩ লাখ টাকার মালামাল রয়েছে। সে সমস্ত কিছু ছেড়ে যেতে মন চায় না। আমার ছেলেকে দোকানে রেখে চলে যাই। তাকে বলি, “দোকান খুলো না, শুধুমাত্র একটা মাত্র তক্তা খুলে সেখান থেকে যে যা চায় তা দিয়ে দিবে এবং তা লিখে রাখবে।” একথা বলে ছেলেকে দোকানে রেখে চলে আসি। তারপর বাজারের নীচের গ্রামে ছিলাম, ছেড়ে আসতে মন চায় না। একদিন বাদে বাজারে বিডিআরদের [বিজিবি] সাথে ইউপিডিএফের লোকেদের ঝামেলা হয়। বিডিআর-রা ফায়ার করে। সে দিনই আমি বাবুছড়ায় চলে আছি। বাজার তখনও পুড়ে যায় নি। বাজার পুড়ে যাওয়াটা আমি দেখিনি।

সম্ভবত শনিবার  বাজার পুড়ে যাচ্ছে। আনুমানিক সকাল ১১:০০টার সময় আমি দীঘিনালার বড়াদাম বাজারে ছিলাম। সে সময় ইন্দু বিকাশ আমাকে ফোন করে জানায় যে, বাজার পুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং পুড়ে যাচ্ছে। আমি বলেছি, “হ্যাঁ, আর জানাবেন না, যত আপনি করেছেন। আপনার কারণেই আজকে এই অবস্থা। আপনি যদি ভালোভাবে বাজারে রাখতেন তাহলে ইউপিডিএফ মানুষের উপস্থিতিতে কে বাজারে আগুন দিতো। [অর্থাৎ সন্তু গ্রুপ যদি ইউপিডিএফকে বাজার থেকে বিজিবি দিয়ে তাড়িয়ে না দিতো, তা হলে বাজার পুড়ে যেতো না। ইউপিডিএফের অনুপস্থিতিতে বাজার পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।] ইউপিডিএফ কি জনগণ মুগুরানোর জন্য, নাকি আপনাদের মুগুরানোর জন্য এসেছে? নাকি বাজার পুড়ানোর জন্য এসেছে? আমরা শুধু কি আপনাদেরকে ভয় পাই, উনাদেরকে ভয় পায় না? বাজার ত্যাগের জন্য জরুরী নির্দেশ দিয়েছেন, আবার কেন জানাচ্ছেন? আর জানাবেন না।”

ইন্দু বাবু বললেন, ‘‘দেখো বিপদে পরবা’’। আমি উত্তর দিলাম, ‘‘এর থেকে বেশি আর কি ধরনের বিপদ আছে?” আমিও বেশ তর্ক করেছি, বলেছি: “এর থেকে বেশি বিপদ নেই, শুধু মৃত্যু বাকি আছে। আপনি আমাকে ডাকেন এবং মেরে ফেলেন। কিন্তু গুলি করে হত্যা করলে আসব, রিমান্ডে নিলে আসব না। আমি বুড়া মানুষ শাস্তি [শারীরিক নির্যাতন] ভোগ করতে পারব না।” শেষে ইন্দু বাবু বললেন, “দেখি তাহলে কি করতে পারি?’’

যে ধরনের আবেগ এসেছে, আমারও তাকে [ইন্দু বাবুকে] নির্দেশ দিতে ইচ্ছে হয়েছে, কিন্তু পারিনি? দাদাকে [ইউপিডিএফের নেতা] ফোন করে বলেছি, “আমাকে দলে নিতে হবে, বয়স হলেও রান্নার কাজ অর্থাৎ বাবুর্চির কাজটা করতে পারব। এভাবে প্রকাশ করেছি। কত আর সহ্য হবে? এ যাবত ধরে আমরা সেখানে [নারেইছড়িতে] অবস্থান করেছি, সেখানে [সন্তু গ্র“প] আমাদেরকে দাবার গুটি’র মত ব্যবহার করেছে, কখনো না বলিনি। এই বুড়ো বয়সেও যা পারি তা করি। আমি বাজারের দায়িত্বে আছি, জেএসএস আমাদেরকে বানিয়েছে, দায়িত্ব দিয়েছে। আমাকে তারা সভাপতি বানিয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে আমি তার [ইন্দু বাবুর] পায়ে পড়ে বলেছিলাম, “আমাকে এই দায়িত্বে শোভা পায় না। আমাদের পরে যারা শিখছে তাদেরকে দায়িত্ব দিলে ভাল হবে।” তিনি বলেছিলেন, “না, না, হবে না, এই ইলেকশন শেষ হোক, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো কেউ নেই। তোমাকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের কাছে আসতে হবে, ইউপিডিএফ, সংস্কারের সাথে দেখা করতে এবং কথা বলতে হবে।” এভাবে তারা আমাকে বিভিন্ন সংকটে ফেলছে এবং আমি তাদেরকে সংকট থেকে মুক্ত করছি।

বুধবার সকাল ৮:০০টায় ধনপাদা দোর থেকে ফোন আসে, বডি এবং যারা টাকা উত্তোলন করেছে [ইউপিডিএফ ও জেএসএস-এর দুই গ্রুপকে দেয়ার জন্য। অর্থাৎ বাজার যাতে খোলা রাখা যায়।] তাদেরসহ আমাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। আমরা টাকাসহ সবাই হাজির হই। চিনু [সন্তু গ্রুপের সামরিক কমান্ডার] তখন দাবা খেলা খেলছিলেন। তারপর আমাদের সাথে আলাপ করতে আসে। তিনি টাকাগুলো চাইলেন। আমি টাকাগুলি তার হাতে তুলে দিই। আমি বললাম, “এখন কি করব? আপনারা তো টাকাগুলি কেড়ে নিলেন।” তখন চিনু উত্তর দিলেন, “পারলে তারা [ইউপিডিএফ] এসে নিয়ে যাবে, তোমাকে দিয়ে আসতে হবে না।”

সেদিন শনিবার দাদার [ইউপিডিএফ নেতা] সাথে কথা বলে ওকে করি [অর্থাৎ টাকার বিষয়টার সুরাহা করেন]। তারপর দিন রবিবার এখানে ঘটনা ঘটলো। কি নাম যেন যিনি মারা পড়লেন? আমার ভাগিনা লাগে।

প্রশ্ন: বাবুছড়ায়?
উত্তর: হ্যাঁ। সুদৃষ্টি চাকমা [গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সদস্য, সন্তু গ্রুপ তাকে গুলি করে হত্যা করে ও অন্য একজনকে আহত করে]। ঘটনা ঘটলো। এ পর্যন্ত ভালোভাবে যাচ্ছিল। বাজার তো পুড়ে গেল। আমরা র্দুবল হলাম। এলাকার মানুষ জন কে কোথায় আছে জানি না। এখানে এখন দোকান তুলছি। আমি আপনাদের সামনে মিথ্যা বলব না, আসার সময় ২০-৫০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে পেরেছি। সেগুলো দিয়ে এই দোকান তুলছি। এখানে কোথায় থাকব? সেখানে গেলেও কোথায় যাব? কোন ঘরবাড়ি নেই। এখানে ঘর নির্মাণ করছি। এটা নির্মাণ করতে ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হবে। এতটুকু আমার বক্তব্য। অভাব অনটনে আছি। নতুন করে ঘর সংসার করার মত অবস্থা। পরনের কাপড় ব্যতিত আর কিছুই নেই। নতুন করে খাট পালঙ্ক কিনতে হচ্ছে। মাটিতে তো থাকা যায় না। এভাবে নতুন সংসার সৃষ্টি করছি। আপনাদের আর্শীবাদে যার যার মত নারেইছড়ি বাজারে সুখে ছিলাম। সপ্তাহান্তে আমার বেচা কেনা হতো কমপক্ষে ৩০-৩৫ হাজার টাকার।

প্রশ্ন: আপনি মুরুব্বী, বাজার কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয়ত আপনার একটা ছেলে শান্তিবাহিনীর [সন্তু গ্র“প] সাথে কাজ করছে। এ জন্য ইউপিডিএফের লোকজন সেখানে যাওয়ার পর আপনাদের সাথে বা বাজারের লোকজনের উপর কোন জোরজবরদস্তি করেছে কি?
উত্তর: না। আমি যেখানেই যাই, স্বর্গে যাই আর মর্তবে যাই, বলব আমাদের সাথে [ইউপিডিএফ] কোন ধরনের অন্যায় বা দুর্ব্যবহার করেনি। কারো কাছ থেকে বড় কথা শুনিনি। এমনকি মাল-পত্রও ফ্রি খেয়েছে কি? তাও খায়নি। যা খেয়েছে কিনে খেয়েছে। দুই বেলা রান্না করে দিয়েছি। সেই চালের দামও আমাদেরকে দিয়েছে। আন্তরিকতা হিসেবে আমি জনগণকে বলেছিলাম, চালের দাম তো দিয়েছেন, অন্ততঃ তরিতরকারির দাম আমরা নেব না। অন্য জনের সাথে [ইউপিডিএফ] কি ব্যবহার করেছে জানি না। তবে [ইউপিডিএফের] কেউ আমার কাছ থেকে একটা ম্যাচও নেয়নি।

ইউপিডিএফের লোকজন [আমাদেরকে] বলেছিলেন, “আপনারা পালাবেন না।” জেএসএস-রা নির্দেশ দিয়েছে “বাজার না ছাড়লে জরুরী পদক্ষেপ নেবো।” কি করতে হবে তাই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। সারাদিন পরামর্শ করেও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা যদি বাজারে থিতু হয়ে অবস্থান করতাম বা থাকতাম তাহলে বাজারের কোন ক্ষতি হতো না। আমার অন্তর এটাই বিশ্বাস করে। সে কারণে ইন্দু বাবুকেও বলেছি, ‘‘যত আপনার কারণে এই ঘটনার সৃষ্টি। কোন দুঃখে ইউপিডিএফ আগুন লাগাবে? এসব যত আপনিই করেছেন। এধরনের কথা আর বলবেন না। আপনি যদি বাজার ছাড়ার নির্দেশ না দিতেন তাহলে বাজার পুড়ে যেত না। আপনি বাজার খেলে ভাল কিন্তু উনারা [ইউপিডিএফ] খেলে আপনার রাগ হয়।’ আমি আরো বলেছি, “আমাদেরকে বাজার ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন ভাল কথা, কিন্তু বাজারটা রক্ষা করার দায়িত্ব তো আপনার। আপনি বাজার রক্ষা করার পরিবর্তে এ ধরনের খবর দিচ্ছেন।” তখন [ইন্দু বাবু} আমাকে বলেছিলেন, “দেখো বিপদে পড়বে। আামি বলেছিলাম, কি ধরনের বিপদ? এটা কি বিপদ নয়? বিপদে তো পড়েছি, মরণ শুধু বাকি রয়েছে।”

ইন্দু বাবু আমাকে সেদিকে [অর্থাৎ ভারত সীমান্তের দিকে] যাওয়ার জন্য বললেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন তিনটা দল আছে। এ বয়সে আমি কোন পক্ষভুক্ত হয়ে থাকতে পারব না। আমি চাই ৩ দলের সাথে এক সাথে অবস্থান করতে। তিনি তাদের দিকে আমাকে যাওয়ার জন্য ডাকলেন, এবং বললেন, “তোমার যত মাল-পত্র ক্ষতি হয়েছে তার সব পূরণ করা হবে।” আমি বলি, “বাজারে কোটি টাকার সম্পত্তি ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হবে কি? শুধু আমি সুখী হলে হবে না, গোটা নারাইছড়িবাসীকে সুখী হতে হবে।” আমাকে ভারত থেকে মালপত্র নিয়ে এসে কোগিয়েতুলীতে দোকান দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। কোগিয়েতুলীতে কত দিন বাচঁব? যা নয় তা। আবার প্রস্তাব দেয় “এখানে না হলে রাঙ্গামাটিতে যান, সেখানে ৩ তলার উপর থাক।” আমি বলেছিলাম এসি ফিটিং করা বাড়িতে থাকলেও আমি সুখী হতে পারব না, যদি এদিকে হাজার হাজার মানুষ দুঃখে থাকে।” তাই ইন্দুবাবু আমাকে কোন দিকে পাঠাতে পারেনি।

রাঙ্গামাটিতে গিয়ে নাকি পেপারে ফ্লাশ করে দিতাম যে, “ইউপিডিএফ নারাইছড়ি বাজার পুড়ে দিয়েছে।” আমি বলেছিলাম, “দাদা, সে কথা বলবেন না, বিডিআর-রা কি দিয়েছে সেটা আমি পত্রিকায় পড়েছি। তারা যা দিয়েছে তাতে মন ভরেনি? আবার আমি বাজার কমিটির সভাপতির সীল মেরে পেপারে দিতাম। তার চাইতে আমাকে শান্তিবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার কথা বল না কেন? শরণার্থীতে নিয়ে গিয়ে দোকান দিলে কী হবে আমি দেখতে পাই না?”

প্রশ্ন: শরণার্থীর প্রসঙ্গ যেহেতু এসেছে — কেন শরণার্থী হতে হলো? তাদেরকে কেউ তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি?
উত্তর: [ইন্দুবাবুরা] আমাদেরকে জরুরী নির্দেশ দিয়েছে। তাদেরকে [যারা ভারতে গেছে তাদেরকে] কি নির্দেশ দিয়েছে সেটা তো আমি জানি না। সেখানে আমি ছিলাম না। সে বিষয়ে আমি কিভাবে বলব? তারা হয়ত ভয়ে পালিয়েছে। কিভাবে এবং কি কারণে পালিয়েছে সে বিষয়ে আমি জানি না। আমি তো বাজার পুড়ে যাওয়ার আগে এবং শরণার্থী যাওয়ার আগে [এখানে] এসেছি।

প্রশ্ন: যে সমস্ত গ্রামবাসী শরণার্থী হয়েছেন তাদের এলাকায় এখন কারা অবস্থান করছেন?
উত্তর: সেখানে ইউপিডিএফের লোকজন এবং উনাদের (জেএসএস) লোকজন রাউন্ড দিয়ে থাকেন। হাজাছড়া, দজরপাড়া, হলিছড়া এলাকায় দু’দলের লোকজনই ঘোরাফেরা করেন। যেহেতু আমি সেখানে যাই না, তাই বিস্তারিত জানি না।

প্রশ্ন: সেখানে বাঘাইহাট নামে জায়গা আছে কি?
উত্তর: বাঘাইহাট, হাজাছড়া, দজরপাড়া, হলিছড়া পাড়া রয়েছে। এই গ্রামের লোকজন গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে বলে শুনেছি। বাঘাইহাটের উপরে হাজাছড়ায় কিছু লোক রয়েছে। তাদের কয়েক জনের সাথে দেখা হয়েছে।

প্রশ্ন: কাদের সাথে?
উত্তর: হাজাছড়ার নীচে এবং বাঘাইহাটের উপর থেকে। সম্ভবত পুরো জনশুন্য হয়েছে দজরপাড়া আর হলিছড়া। বাঘাইহাটে সম্ভবত কয়েকজন আছে এ ধরনের খবর পাচ্ছি।

প্রশ্ন: মানুষ নেই কোন এলাকায়?
উত্তর: হলিছড়া, দজরপাড়া এবং কোগিয়েতুলী-তে কোন মানুষ নেই। কোগিয়েতুলী তাদের [সন্তু গ্রুপের] এলাকার মধ্যে পড়েছে।

প্রশ্ন: আপনারা বাজার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তো জেএসএস-এর নির্দেশের কারণে?
উত্তর: আর কার কথা শুনব না? নির্দেশ দিলে আমাদের মত সাধারণ মানুষ ভয় পায়। সে বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে সন্ধ্যার সময় আমরা যে যার মত করে ভাগ হয়ে যাই।

প্রশ্ন: ইউপিডিএফ পক্ষ থেকে আপনাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে কি?
উত্তর: না। তারা এ ধরনের কোন কথা বলেনি। জেএসএস-এর কাগজের [চলে যাওয়ার নির্দেশ সম্বলিত চিঠি] বিষয়ে আমরা সমঝোতায় আসতে পারিনি। যে যার মত কাজ করেছি। ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে “এখান থেকে চলে যাও” এ কথা বলেনি। তারা বরঞ্চ বলেছেন বাজারের মধ্যে ১৪ হাতের বাঁশ দিয়ে দোকান, ঘর টেঁস দিয়ে শক্ত করে থাকার জন্য। “পালিয়ে যাবেন না। আপনারা থাকেন। আমরা আপনাদের [ক্ষতি করার] জন্য আসিনি। যাদের জন্য এসেছি তাদেরকে আমরা খুঁজব।”

প্রশ্ন: নারেইছড়ি বাজার কিভাবে প্রতিষ্ঠা হয় একটু বলবেন কি?
উত্তর: নারেইছড়ি প্রায় ২০বছর আগে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আমার চাইতে দাদারা [ইউপিডিএফ-এর নেতারা] বেশি ভালভাবে বর্ণনা দিতে পারবেন। আমি মাত্র ৮-১০ বছর আগে গিয়েছি। কয়েক বছর আগেও সেখানে ইউপিডিএফ ছিল। তখন দোকান ছিল। সংস্কার করতে করতে আজকে এই অবস্থা। ইউপিডিএফ-ই বাজারটি সংস্কার করে।  তারা সেখান থেকে চলে আসার পর আমরা শান্তিবাহিনীর সাথে এলোমেলোভাবে থাকলাম। দু’ দলই বাজারকে খেয়াল রাখে। আমরাও কেউ কেউ টাকা পয়সা কামিয়েছি। কিছুটা স্বার্থ আদায় করেছি। সেভাবে ব্যবসার কেন্দ্র গড়ে উঠে। গাছ, বাঁশ এখান থেকেই বেচা কেনা হয়। কাট্টন্যারা সেখানে যায় এবং বেচা-কেনা হয়। নারাইছড়ি বাজারের মতো পরিপূর্ণ বাজার এই নতুন বাজারে একটাও নেই। নিজস্ব নৌকা এবং বোট বসিয়েছি। আমার নিজস্ব ২টি বোট ছিল। বোটগুলিও পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

আমার ছেলেকে [সন্তু গ্রুপের লোকজন] দোকান থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং মারধর করে। তাকে তাদের সাথে ঘুরিয়েছে। এবং [ইউপিডিএফের সাথে] যুদ্ধ করার জন্য বলেছে। আমি তাকে নিষেধ করেছি “খবরদার হাতিয়ার ধরবা না। মার যা খাবার খাবে। তারপরও হাতিয়ার ধরবে না।” পরে আমার ছেলে তার মাসহ বাঁশের ভেলায় করে পালিয়ে এখানে ধনপাদায় চলে আসে। এর পরই কেবল স্ত্রী ও ছেলের মুখ দেখতে পাই। এখন বাঁশ বিক্রির টাকা দিয়ে ছেলেকে শহরে পাঠিয়েছি কোম্পানি চাকুরী করার জন্য।

ইন্দু বাবু আমাকে সহজ কাজ দেয় না। কঠিন কাজ দেয়, যাতে আমাকে কালার করে তাদের দলে ভেড়াতে পারে। তার কুটকৌশলগুলো সে রকম। দাবা খেলার গুটির মতন ইচ্ছে মত ব্যবহার করেন।

প্রশ্ন: ইন্দু বাবুরা সেখানে কত দিন ধরে অবস্থান করছেন?
উত্তর: ৪ বছর হবে। তারা আসার পর ভাল কিছু ভোগ করতে পাইনি। ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করি। মোবাইল-এর যুগ। কোন ঘটনা ঘটলে যদি তার সাথে আমাকে জড়ায়, এই ভয়।

প্রশ্ন: আপনার ছেলে একটা জেএসএস-এর সাথে কাজ করছে বলেছেন। কি নাম, কোথায় কি দায়িত্ব পালন করছে জানেন কি?
উত্তর: অবস্থান সম্ভবত [রাঙামাটির] হরিণায়। তার স্কুলের নাম সাগর। পার্টির নাম জানি না। ২০০১ সালে মেট্রিক পাশ করেছে। দায়িত্ব সম্পর্কে জানি না। একবার শুনেছি বাজার করার কাজ করে এবং হিসাব দেখাশুনা করে। [সমাপ্ত]

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.