তদেকমারা কিজিঙ উপাসক উপাসিকা পরিষদের প্রচারপত্র: ভাবনা কুটির নির্মাণে সেনাবাহিনীর বাধা কেন?

0
1

সিএইচটিনিউজ.কম ডেস্ক:
“বাঘাইছড়ির তদেকমারা কিজিঙে শ্রদ্ধেয় বনভান্তের অনুমোদিত ভাবনা কুটির নির্মাণে সেনাবাহিনীর বাধা কেন?” এই শিরোনামে ‘তদেকমারা কিজিঙ উপাসক উপাসিকা পরিষদ’-এর নামে ১৭ মে তারিখে প্রকাশ করা একটি প্রচারপত্র আমাদের হাতে এসেছে। এতে ভাবনা কুটির নির্মাণে সেনাবাহিনীর বাধাদান ও খাগড়াছড়ির সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। প্রচারপত্রে ভাবনা কুটির নির্মাণে বাধাদান বন্ধ করা সহ সরকারের নিকট ৪ দফা দাবি জানানো হয়েছে। সিএইচটিনিউজ.কম’র পাঠকদের জন্য প্রচারপত্রের লেখাটি হুবহু এখানে প্রকাশ করা হলো:
————-

প্রিয় এলাকাবাসী,
তদেকমারা কিজিঙ উপাসক উপাসিকা পরিষদের পক্ষ থেকে সবাইকে মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনারা জানেন, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন তদেকমারা কিজিঙের অজলচুগ নামক স্থানে (তথাকথিত দুই টিলা) একটি ভাবনা কুটির নির্মাণের কাজ দুই মাস আগে শুরু হয়। শ্রদ্ধেয় বনভান্তের অনুমোদিত এই কুটির নির্মাণে স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। তারা কুটির-নির্মিতব্য স্থানে ঝোপঝাড় পরিস্কার করেন এবং কুটির নির্মাণের সামগ্রী যেমন ইট, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি জড়ো করেন। এরপর গত ২৭ এপ্রিল কুটিরের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হলে তদেকমারা কিজিঙের ক্যাম্প কমান্ডার ওয়ারেন্ট অফিসার রফিক দলবল নিয়ে সেখানে যান এবং সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখার মৌখিক নির্দেশ দেন। কী কারণে কাজ স্থগিত রাখতে হবে তা তিনি বলেননি। যেখানে কুটির নির্মাণ করা হচ্ছে সেই তদেকমারা কিজিঙ রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সীমানা বরাবর বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এই কারণে ভাবনা কুটিরের উদ্যোক্তারা হলেন প্রধানত বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলার বাসিন্দা। আর্যশ্রাবক শ্রদ্ধেয় বনভান্তে মহাপরিনির্বান লাভের ৬ বছর আগে সেখানে একটি বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণের প্রার্থনা অনুমোদন করেছিলেন। তবে স্থানীয় এলাকাবাসী আর্থিক অনটনের কারণে তখন নির্মাণের কাজে হাত দিতে পারেননি।

Leaflet1ক্যাম্প কমান্ডার রফিকের কাজ স্থগিত রাখার বেআইনী নির্দ্দেশ উপেক্ষা করে ধর্মপ্রাণ এলাকাবাসী ভাবনা কুটির নির্মাণের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। আশেপাশের বিভিন্ন পাড়া থেকে শত শত নারী পুরুষ স্বতঃস্ফুর্তভাবে ও স্বউদ্যোগে কুটির নির্মাণের কাজে অংশ নেন। কুটির নির্মাণের জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন রড, সিমেন্ট, ইট, গাছ, বাঁশ ইত্যাদি দায়ক-দায়িকারা তাদের সামর্থ্য অনুসারে দান করেন। বিহার নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলতে থাকে। এমতাবস্থায়, গত ১ মে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে হ্যান্ড মাইক দিয়ে কুটির নির্মাণাধীন এলাকার আশেপাশে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে এবং কোন ধরনের হিংসাত্মক পরিস্থিতি উদ্ভবের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা না থাকার পরও ১৪৪ ধারা জারি করা হয় এবং কুটির নির্মাণের কাজে আসা লোকজনদের হেনস্থা ও জোর করে সরিয়ে দেয়া হয়। এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও সেনা সদস্যকে সেখানে নিয়োজিত করা হয়। এমনকি মহিলা পুলিশও নিয়ে আসা হয়। সেনারা কুটির নির্মাণের সামগ্রী যেমন পানির ড্রাম, দা, খন্তা, কোদাল, করাত, সিমেন্ট ইত্যাদি নষ্ট করে দেয় অথবা হাতিয়ে নেয়। স্তুপাকৃত ৩,০০০ ইট ভেঙ্গে দুই টুকরো করে দেয়। সেনাবাহিনীর হুকুমে অজ্ঞাতনামা প্রায় ৪০০ – ৫০০ জনের বিরুদ্ধে বন বিভাগের পক্ষে স্থানীয় রেঞ্জা কর্মকর্তা সুধাংশু রঞ্জন দাশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে সেখানে ১৪৪ ধারা বলবৎ রয়েছে এবং পুলিশের অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। কুটির এলাকায় পূর্বে নির্মিত বুদ্ধমূর্তিতে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় পূজা-অর্চনা করতে গেলে পুলিশ ধর্মপ্রাণ পুণ্যার্থীদের হয়রানি ও লাঞ্ছিত করছে। সেখানে দুই জনের বেশী পুণ্যার্থীকে যেতে দিচ্ছে না। চেকপোস্টে অযথা তাদের নাম ঠিকানা তালিকাভুক্ত করছে। এভাবে স্বধর্ম পালনের ক্ষেত্রে পদে পদে বাধা দেয়ায় ধর্মপ্রাণ এলাকাবাসী চরমভাবে বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে এবং তার প্রতিবাদে দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়কে অবরোধের ডাক দেয়। দু’ দফায় ৩ দিন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ পালিত হয়।Leaflet2

সম্মানীত সুধী,
এখানে উল্লেখ্য যে, ক্যাম্প কমান্ডার রফিক কাজ স্থগিত রাখার নির্দ্দেশ দেয়ার আগে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কুটির নির্মাণে কোন প্রকার নিষেধাজ্ঞা ছিল না। আর জায়গাটি বন বিভাগ লঘুস্বরে তাদের বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তদেকমারা কিজিঙসহ আশেপাশের সকল এলাকা হলো পাহাড়িদের যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি। স্মরণাতীত কাল থেকে পাহাড়িরা এইসব এলাকায় জুম চাষ করে আসছে। এই বাস্তব সত্যের মৌন সম্মতিস্বরূপ বন বিভাগের পক্ষ থেকে অতীতে এসব জমিতে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণে অথবা এসব জমি ভোগ দখলের সময় (যেমন বন্য ফলমূল ও গাছ বাঁশ সংগ্রহ) কোন ধরনের বাধা দেয়া হয়নি। তাছাড়া, বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলায় যৌথ মালিকানাধীন জমিতে (তথাকথিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলে) বন বিভাগের পূর্বানুমোদন ছাড়া সরকারী ও বেসরকারী বহু স্থাপনাসহ মসজিদ ও গির্জা নির্মাণ করা হয়েছে। এই সমস্ত স্থাপনার ক্ষেত্রে বন বিভাগের আইন প্রযোজ্য না হলে কেবলমাত্র অজলচুগে বৌদ্ধ মন্দির স্থাপনে কেন বাধা দেয়া হচ্ছে তা এলাকাবাসীর বোধগম্য নয়। তবে এর মাধ্যমে এটা দিবালোকের মতো পরিস্কার যে, একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী তাদের প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে দিয়ে ১৪৪ ধারা জারীসহ অন্যান্য হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়েছে।

কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার ন্যাক্কারজনক ভূমিকা
জনগণ যখন নিজেদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তখন ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচিত এমপি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার ভূমিকা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও ন্যাক্কারজনক। তিনি গত ৫ মে দীঘিনালা উপজেলা সম্মেলন কক্ষে অজলচুগ এলাকায় বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে একটা মিটিং ডাকেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘অজলচুগ এলাকায় বৌদ্ধ মন্দির হবে না, কারণ বন বিভাগ বাধা দিয়েছে; জায়গাটি বনবিভাগের। সেনাবাহিনীও চায় না সেখানে বৌদ্ধ মন্দির হোক।’ তিনি বেআক্কেলের মতো প্রশ্ন করেন, ৭৯, ৮০, ৮১ ও ৮৬ সালেও সেনাবহিনীর সাথে যুদ্ধ করে কি করতে পেরেছি? কিছুই করতে পারিনি। তাদের সাথে আমরা পারবোনা।’ মিটিঙে উপস্থিত কবাখালী ইউনিয়নের সাবেক মহিলা সদস্যা অরুণা চাকমা ওরফে নিদ্রামাকে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘তোমার জায়গাও তো বর্তমানে বাঙালীরা বেদখল করে রেখেছে। তুমি অনেক মামলা মোকদ্দমা করছো। কি করতে পেরেছো? কিছুই তো করতে পারো নি।’ উল্লেখ্য, অরুণা চাকমা অজলচুগে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণের জন্য যে কমিটি করা হয়েছে তিনি সেই কমিটির আহ্বায়ক।

Leaflet3কুজেন বাবুকে মিটিঙে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের চার কিলো এলাকায় বিজিবি প্রশিক্ষণ টিলার আশেপাশে পাহাড়িদের যৌথ মালিকানাধীন জমিতে গত জরুরী অবস্থার সময়ে কয়েক শ’ বাঙালী সেটলার পরিবারকে পুনর্বাসন করার সময় এবং সেখানে তাদের জন্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল নির্মাণের সময় বন বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হয়নি কেন? অপরদিকে, অজলচুগে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণে কেন বন বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হচ্ছে? তিনি এসব প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি। তার ভাষায় সেগুলো নাকি ‘চুরি করে’ (গোপনে) র্নিমাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জনগণের জিজ্ঞাস্য – সড়কের পাশে বিজিবির প্রশিক্ষণ টিলায় বিজিবির নাকের ডগায় মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণের সময় প্রশাসন ও বন বিভাগের নজরে পড়ে না, তারা দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে বছরের পর বছর ‘চুরি করে’ মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করতে পারে। অথচ অজলচুগে পাহাড়িদের নিজস্ব জমিতে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করতে গেলে প্রশাসন ও বনবিভাগের কেন এত দ্রুত নজর পড়লো? এতে কি সরল অংকের মতো প্রমাণ হয় না সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও বন বিভাগ একচোখা? জনগণের আরো প্রশ্ন, বিগত জরুরী অবস্থার সময় যখন তদেকমারা কিজিঙ এলাকায় পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে শত শত বাঙালী সেটলার পরিবারকে বসিয়ে দেয়া হচ্ছিল, তখন নিকৃষ্ট দালাল, সেনাবাহিনীর পদলেহনকারী কুজেন বাবু কোথায় ছিলেন? তিনি কি জানেন, জনগণ সংগ্রাম না করলে তিনি এতদিন নির্বংশ হয়ে যেতেন? তিনি কি জানেন, যে জেলা পরিষদে তিনি সরকার-মনোনীত চেয়ারম্যান ছিলেন তা জনগণেরই আন্দোলনের ফসল? তিনি এও কি জানেন, সেনাবাহিনীর সাথে ‘যুদ্ধ’ করেই সাজেক, বাবুছড়া ও মানিকছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূমি বেদখল ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে? আসলে তার মতো দালালরাই কেবল জানেনা যে, জনগণ একতাবদ্ধ হয়ে সঠিক লাইনে সংগ্রাম করলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

সেনাবাহিনীর বাধাদান বিদ্বেষপ্রসূত
এটা আজ সবার কাছে পরিস্কার যে, অজলচুগে ভাবনা কুটির নির্মাণে সেনাবাহিনীর বাধা প্রদান বিদ্বেষপ্রসূত ছাড়া কিছুই নয়। গত ১ মে কুটির নির্মাণে আসা কয়েকজন লোকের সামনে বাঘাইহাট ও দীঘিনালা জোনের কমান্ডারদ্বয় কথাচ্ছলে মন্তব্য করেন, অজলচুগে বৌদ্ধ মন্দির নির্মিত হলে ক্যাম্পের সদস্যদের ‘সমস্যা’ হবে। কারণ মন্দির থেকে মাইকে ধর্মীয় সূত্র দেয়া হলে তা নাকি ক্যাম্পের সদস্যদের জন্য বিরক্তিকর হবে। এজন্য তারা সেখানে ভাবনা কুটির নির্মাণ করতে দেবে না। তাদের এই কথার মাধ্যমে স্পষ্ট যে, একমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে তারা কুটির নির্মাণে বাধা দিচ্ছে। এখানে বন বিভাগের জমি বলে দাবি করা একটা অজুহাত মাত্র। বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরীর বক্তব্যে তা আরো পরিস্কার হয়েছে। গত ১ মে তার কাছে ভাবনা কুটির নির্মাণে প্রশাসনের বাধা প্রদান বিষয়ে কুটির নির্মাণের একজন উদ্যোক্তা মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাঘাইহাট জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল মোঃ রশিদ ও দীঘিনালা জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল লোকমান আলীর নির্দ্দেশে তিনি ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এও বলেন যে, তিনি একজন সরকারী কর্মকর্তা মাত্র। বিধি মোতাবেক তাকে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দ্দেশ মানতে হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চান অজলচুগে বৌদ্ধ মন্দির নির্মিত হোক। বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণের ব্যাপারে নৈতিকভাবে তার কোন দ্বিমত নেই।Leaflet4

এখানে উল্লেখ্য, তদেগমারা কিজিঙে সেনা ক্যাম্প ঘেঁষা মন্নান ও ভান্ডারী নামে দু’টি বাঙালীর সেটলার পরিবার রয়েছে। তাদেরকে গত জরুরী অবস্থার সময় সেখানে আনা হয়েছিল। এই দুই বাঙালী পরিবারের জন্য সেখানে একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদে একজন ইমামও রয়েছেন। গত জরুরী অবস্থার সময় এই অজলচুগ এলাকায় সেনাবাহিনী ১২২ পরিবার অনুপ্রবেশকারী বাঙালীকে জোর করে নিয়ে আসে। তাদের পুনর্বাসনের সুবিধার্থে বাঘাইহাট জোনের পক্ষ থেকে ক্যাম্প এলাকার ভিতরে তখন একটি বাজার স্থাপনেরও উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের সমর্থন না পাওয়ায় বাজার স্থাপনের উদ্যোগ ভেস্তে যায় এবং জরুরী অবস্থা উঠে গেলে ১২০টি বাঙালী পরিবার সেখান থেকে তাদের পূর্বের জায়গায় চলে যায়।

অপরদিকে, তদেগমারা কিজিঙের অজলচুগ এলাকার আশেপাশে কয়েকটি পাড়ায় ৪৬০ পরিবার পাহাড়ির বসবাস রয়েছে। অথচ তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জন্য সেখানে একটিও মন্দির নেই। মন্দির স্থাপনে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দূরে থাক, এলাকার লোকজন স্বউদ্যোগে শ্রদ্ধেয় নন্দপাল ভান্তের অনুমতি নিয়ে একটি ভাবনা কুটির নির্মাণ করতে গেলে সেনাবাহিনী তাতে বাধা দিচ্ছে। আর স্থানীয় প্রশাসনও সেনাবাহিনীর চাপে এই বাধা দেয়ার কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। কাজেই একদিকে কেবল দুই পরিবার বাঙালির জন্য একটি মসজিদ চালু রাখা ও অন্যদিকে ৪৬০ পরিবার পাহাড়ির জন্য একটি বিহার নির্মাণে বাধা প্রদান আর্মি ও প্রশাসনের দ্বৈত ও বৈষম্যমূলক নীতিকেই প্রতিফলিত করেছে।

ধর্মপ্রাণ পুণ্যার্থীরা এখন আসামী!
আগেই বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর চাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বাঘাইহাট রেঞ্জের এফ, আর রেঞ্জ কর্মকর্তা সুধাংশু রঞ্জন দাশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৪০০ – ৫০০ জনের বিরুদ্ধে বন আইনে একটি মামলা করতে বাধ্য হন। মামলার তারিখ ২৯/৪/২০১৪, মামলার ধারা- ১৯২৭ সালের বন আইন (সংশোধিত) ২০০০ সনের ২৬(১ক)। ধর্মীয় তদেকমারা কিজিঙ উপাসক উপাসিকা পরিষদতদেকমারা কিজিঙ উপাসক উপাসিকা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত। ১৭ মে ২০১৪।প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার ‘অপরাধে’ আসামী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া একটি নজীরবিহীন ঘটনা। যারা মন্দির নির্মাণের কাজে অংশ নিয়ে পুণ্য সঞ্চয় করতে এসেছেন, তারা হয়ে গেলেন ‘আসামী’। পূণ্যের বদলে পেলেন দ-, হয়রানি ও লাঞ্ছনা। এটা কেবলমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সেনাশাসন কবলিত অঞ্চলেই সম্ভব। সেনাবাহিনীই এখানে সর্বেসর্বা। তাদের ইচ্ছায় প্রশাসনকে চলতে হয় ও আইনকে বাঁকা করতে হয়। সেনাবাহিনীর নির্দেশেই যে বন বিভাগ মামলা করতে বাধ্য হয়েছে তা রাঙ্গামাটি বন বিভাগের কর্মকর্তা (সিএফ) মাকসুদ আলমের কথায় স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি  বঙ্গলতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অমর চান চাকমার কাছে মোবাইলে ফোন করে স্বীকার করেন যে, সেনাবাহিনীই অজ্ঞাতনামা ৪০০ – ৫০০ জন এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য করেছে।

সংগ্রামী জনতা,
তদেকমারা কিজিঙের অজলচুগে পাহাড়িদের নিজস্ব জমিতে ভাবনা কুটির নির্মাণে সেনাবাহিনীর বাধা প্রদান আইনবিরুদ্ধ, মৌলিক অধিকারের পরিপস্থী ও ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর উলঙ্গ হস্তক্ষেপ। এই আচরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর স্বেচ্ছাচারীতা ও অন্যায় প্রভাব খাটানোর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ধর্মীয় অধিকার হরণ করার ঘটনা এটা একমাত্র নয়। সশস্ত্র আন্দোলনের সময়কার কথা বাদ, খোদ তথাকথিত শান্তিচুক্তির পরও পাহাড়িদের বসতিতে হামলার পাশাপাশি বৌদ্ধ বিহার, হিন্দু মন্দির ও খৃষ্টানদের গীর্জায় বহু বার হামলা করা হয়েছে। বিহার পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস, দানকৃত অর্থ লুট, ভিক্ষুদের লাঞ্ছনা-হয়রানি ও সর্বোপরি উপসনালয় অপবিত্র করা হয়েছে। সেসব ঘটনার কথা বললে একটা পুরো বই হয়ে যাবে। তবে প্রশ্ন হলো, আর কতকাল এভাবে চলতে থাকবে? কবে পাহাড়িদের বসতবাড়িতে হামলা ও তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে?

সরকারের কাছে দাবি:
তদেকমারা কিজিঙের অজলচুগে যেখানে ভাবনা কুটির নির্মাণ করা হচ্ছে তা বন বিভাগ তাদের সংরক্ষিত বনাঞ্চল বলে দাবি করলেও আসলে তা হচ্ছে পাহাড়িদের যৌথ মালিকানাধীন জমি। এই জমির পাশে পাহাড়িদের বহু বসতি রয়েছে। তারা সুদূর অতীত থেকে এইসব জমি ভোগ দখল করে আসছেন। বন বিভাগ বা অন্য কেউ মালিকানা দাবি করলেই এই সত্য কখনো মিথ্যা হয়ে যাবে না। তাই সরকারের কাছে জনগণের জোর দাবি:

 ১। অবিলম্বে অজলচুগে ভাবনা কুটির র্নিমাণে বাধা প্রদান বন্ধ করতে হবে এবং সেখানে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে।
২। কুটির এলাকায় স্থাপিত বুদ্ধমূর্তিতে পূজা অর্চনা করতে যাওয়া পুণ্যার্থীদের নাম-গ্রাম লিপিবদ্ধ করার নামে হয়রানি ও অশোভন আচরণ বন্ধ করতে হবে।
৩। এলাকাবাসীদের গণহারে আসামী করে বন বিভাগের দেয়া বানোয়াট ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৪। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং তদেকমারা কিজিঙ থেকে সেনাক্যাম্প ও সেটলার প্রত্যাহার করতে হবে।

আশাকরি, সরকার অবিলম্বে জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেবেন।
————-

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.