তাইন্দংয়ে পাহাড়ি গ্রামে হামলার সাথে জড়িতদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ কমিটি

0
2
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
সিএইচটিনিউজ.কম
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
 
খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন তাইন্দংয়ে গত ৩ আগস্ট সেটলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়ি গ্রামে হামলা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাটের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে তাইন্দং-তবলছড়ি এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাগড়াছড়িতে গঠিত ‘ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ’ কমিটি।আজ ১২ আগস্ট সোমবার সকাল ১১টায় খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভরস্থ ঠিকাদার সমিতি ভবনের হলরুমে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ দাবি জানানো হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষয়-ক্ষতির বিবরণ ও হামলার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রেস ব্রিফিং থেকে সুপারিশ আকারে ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হচ্ছে- ১. তাইন্দং-তবলছড়ি ঘটনায় পুড়ে দেওয়া ঘর-বাড়ি পুননির্মাণসহ প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যুনতম নগদ ৬ লক্ষ টাকা ও  ৫ বছরের জন্য রেশনিং-এর ব্যবস্থা করা, ২. ঘটনায় মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট, সম্পত্তি বিনষ্ট ও চুরি যাওয়া প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যুনতম নগদ ৬ লক্ষ টাকা এবং ৫ বছরের রেশনিং-এর ব্যবস্থা করা, ৩. চুরি-করা বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার ও ভেঙ্গে দেওয়া বুদ্ধমূর্তি যথাযথ ক্ষতিপূরণপূর্বক প্রতিস্থাপনসহ পাকা বৌদ্ধ মন্দির ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে দেয়া, ৪. বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার ষড়যন্ত্রকারী, ইন্ধনদাতা ও হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া, ৫. নিরাপত্তা বাহিনীর উষ্কানীমূলক অপতপরতা বন্ধ করাসহ যামিনীপাড়া বিজিবি জোন কমান্ডারসহ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যবস্থা করা, ৫. পাহাড়িদের নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব গ্রাম প্রতিরক্ষা দল বা ভিডিপি গঠনের অনুমতি দেয়া, ৬. অনুপ্রবেশকারী সেটলারদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরিয়ে নিয়ে সমতলে তাদের প্রকৃত আবাসস্থলে জীবিকার নিশ্চয়তাসহ সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা, ৭. তাইন্দং-তবলছড়ি, মাটিরাঙ্গাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল পাহাড়িদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান, বসতভিটা-ভূমি বেদখল বন্ধ এবং পাহাড়িদের উপর সেটলার বাঙালিদের হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করা ও ৯. ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হামলার পরবর্তী অনিল বরণ চাকমা বাদী হয়ে মাটিরাঙ্গা থানায় দায়েরকৃত মামলাটি চট্টগ্রামে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করা।

প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ কমিটির আহ্বায়ক কিরণ মারমা। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি রবিশংকর তালুকদার, স্বনির্ভর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি দীপায়ন চাকমা, সমাজকর্মী অনুপম চাকমা ও ধীমান খীসা, হেডম্যান এসোসিয়েশনের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সহ সভাপতি ক্ষেত্র মোহন রোয়াজা, কার্বারী এসোসিয়েশনের খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সভাপতি রণিক ত্রিপুরা, পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সভাপতি ভদন্ত নন্দ প্রিয় থের ও সাধারণ সম্পাদক ভদন্ত অগ্রজ্যোতি থের, নির্বাচিত জুম্ম জনপ্রতিনিধি সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা, মহালছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সোনারতন চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি সোনালী চাকমা, তাইন্দং এলাকার ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ কমিটির প্রতিনিধি সুপায়ন চাকমা ও ৪নং লতিবান ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান শান্তি জীবন চাকমা প্রমুখ।এছাড়া প্রেস ব্রিফিংয়ে সেটলার হামলার শিকার বান্দরশিং গ্রামের কার্বারী অমৃত রঞ্জন চাকমা, সুকুমনি চাকমা সহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

হামলায় ক্ষয়-ক্ষতির বিবরণ উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে কিরণ মারমা বলেন, তাইন্দংয়ে সেটলার হামলায় সর্বেশ্বর পাড়ায় ১৭টি, বগা পাড়ায় ১২টি, বান্দরশিং পাড়ায় ৩টি ও তালুকদার পাড়ায় ২টি সহ মোট ৩৪টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ সহ সর্বেশ্বর পাড়ায় একটি বৌদ্ধ বিহার ও একটি দোকান ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে। যার ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৬০ লক্ষ ৯১ হাজার টাকা।

ভাংচুর, লুটপাটের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ৬টি গ্রামের মোট ২৬১টি বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর, লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করা হয়। এতে র্সবমোট ক্ষতির পরিমাণ ১,০৮,৯৩,৫৩০ টাকা।
এছাড়া বগাপাড়া, সর্বেশ্বরপাড়া ও বান্দরশিংপাড়ায় প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজ পড়–য়া ২৭ জন শিক্ষার্থীর বইপত্র পুড়ে ছাই অথবা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের শিক্ষা জীবন চরম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

লিখিত বক্তব্যে কিরণ মারমা অভিযোগ করে বলেন, তাইন্দং ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার ফণীভূষণ চাকমাসহ ১২জনকে ক্রসিং নামক স্থানে বিজিবি জওয়ানদের উপস্থিতিতে সেটলাররা মারধর করে। এতে অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন। এছাড়া পালিয়ে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকজন আহত হন।

পালিয়ে গিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে রাত যাপন করতে বাধ্য হওয়ার কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে নিউমোনিয়া আক্রান্ত ২ মাস বয়সী আশামনি চাকমা নামে এক শিশুকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সে গত ১০ আগস্ট মারা যায়। সে বান্দরসিং গ্রামের সুকুমনি চাকমার ছেলে। সুকুমনি নিজেও হামলায় আহত হয়েছিলেন।

তাইন্দংয়ের হামলার ঘটনা বর্ণনা দিয়ে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ৩ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে সেটলাররা মোটর সাইকেল চালক কামাল হোসেন (৩০) অপহৃত হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে দেয়ার পর সেটলাররা ক্রসিং নামক স্থানে জড়ো হয়। কথিত অপহৃত কামালকে উদ্ধারের সহযোগিতা চেয়ে পাহাড়িদেরকেও সেখানে ডাকা হয়। বগাপাড়ার বাসিন্দা বকুল বিকাশ চাকমাসহ অনেকে জানান, সকাল ১১.৩০টায় সিন্ধুকধেবা গ্রামের নায়েব আলী ও তানাক্ষাপাড়া গ্রামের মোঃ ইধন সরদার বগাপাড়া দোকানে বলেন “কামালকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করেছে, ক্রসিং নামক স্থান থেকে সে আমাদেরকে ফোন করেছে, সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করতে হবে।” তাদের কথামত বকুল বিকাশ চাকমা ও সুপায়ন চাকমা মোটর সাইকেল যোগে ক্রসিং-এ গিয়ে দেখতে পান বিজিবি কমান্ডারসহ ১০০জনের অধিক অনুপ্রবেশকারী বাঙালী ইতিমধ্যে জড়ো হয়েছে। বিজিবি কমান্ডার বাদশা মিয়া ফোন করে অন্যান্য পাহাড়ি মুরুব্বীদেরকে একে একে ক্রসিং-এ আসার জন্য ফোনে ডাকতে থাকে। বকুল কান্তি চাকমা ও সুপায়ন চাকমাসহ মোট ১২জন পাহাড়ি উপস্থিত হন। আধ থেকে এক ঘন্টার মধ্যে এক হাজারের অধিক অনুপ্রবেশকারী বাঙালী একত্রিত হয়। এরপর বিজিবি বান্দরশিং ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার সাহাদাত ও বিজিবি তানাক্ষাপাড়া ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার বাদশা মিয়ার উপস্থিতিতে তাইন্দং ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার ফণী ভূষণ চাকমাসহ ১২জন পাহাড়িকে নির্মমভাবে মারধর করে। মারধরের পর মুমূর্ষু অবস্থায় তাদেরকে বান্দরশিং ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের উপর নির্যাতনের সময় বিজিবি সদস্যরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।লিখিত বক্তব্যে হামলার শিকার ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ক্রসিং-এ ১২ পাহাড়িকে মারধর করার পর বেলা ১:৩০টার দিকে আনুমানিক ১,২০০ সেটলার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতা, তাইন্দং ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও মেম্বার এবং কতিপয় প্রাইমারী স্কুলশিক্ষকের নেতৃত্বে পাহাড়ি গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় তারা ‘নারায়ে তকবির আল্লাহ্ হু আকবর, পাহড়িদের ঘর জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, পাহাড়িদের উচ্ছেদ কর’ ইত্যাদি শ্লোগান দেয়। তারা প্রথমে বান্দরশিংপাড়ায় গিয়ে পাহাড়িদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, লুটপাট ও ভাঙচুর করে। এরপর বিকাল আনুমানিক ৩টা হইতে বগাপাড়া, সর্ব্বেশ্বরপাড়া, মনোদাসপাড়া ও তালুকদারপাড়ায় হামলা,অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। হামলার সময় বিজিবির সদস্যরা সার্বক্ষণিক তাদের সাথে ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ দিয়ে  প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।

বগা পাড়া গ্রামের সত্যব্রত চাকমার উদ্ধৃত্তি দিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ‘সকাল ১১ টার দিকে বটতলী, আচলং, তানাক্কাপাড়া থেকে শত শত সেটলার বাঙ্গালী হোন্ডা যোগে এবং পায়ে হেঁটে বান্দরশিং এর দিকে যেতে দেখেছি। তাদের হাতে ছিল লাঠি সোটা, দা, বল্লম, হাতুড়ি/মাস্তুল, কিরিচ (লম্বা দা)। দুপুর ১ টার দিকে সেটলাররা যখন হৈ হুল্লা করে পাহাড়িদের মারধর, গ্রামে হামলা ও বান্দশিং-এ অগ্নিসংযোগ শুরু করে; তখন আমরা বগাপাড়ার লোকজন সকলে পালিয়ে যাই। আমি কিছুটা লুকিয়ে বাড়ীর পাশে অবস্থান করি। বান্দরশিং এ অগ্নিসংযোগের পর সেটলাররা বগাপাড়ার নোয়াপাড়ায় অগ্নিসংযোগ, হামলা, ভাঙ্গচুর করার পর মূল বগাপাড়ার দিকে অগ্রসর হয়। তারা আমার পাশের বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দিলে আমি চিৎকার দিই। এরপর বাঙ্গালীরা আমার বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ না করে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। আমি দেখলাম প্রায় ২০০-৩০০ জনের অধিক সেটলার বাঙ্গালী আমাদের গ্রামে হামলা করতে আসে। তাদের পিছনে ছিল বিজিবি ১০-১২ জন সদস্য। যুবকরা সামনে, তারপর বয়স্করা, পেছনে বিজিবি সদস্যরা এভাবে তারা হামলা করতে আসে।’

ঘটনার আগের ঘটনা উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, হামলার কয়েক দিন আগে গত ২৯ জুলাই রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মুখোশ পড়া ৫-৬ জন লোক সাহেব সরদারপাড়ায় ওসমান ড্রাইভার নামের এক বাঙালিকে মারধর করেছে এই অভিযোগে পরদিন বাঙালী ছাত্র পরিষদ সাম্প্রদায়িক ও উষ্কানীমূলক শ্লোগান দিয়ে তাইন্দং বাজারে মিছিল করে।

৩১ জুলাই বুধবার রাতে মসজিদ থেকে মাইকে এই মর্মে ঘোষণা দেয়া হয় যে, অস্ত্রধারী পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বাঙালীদের হামলা করতে এসেছে। ওই ঘোষণার পর রাত ১-২ টার দিকে শত শত সেটলার তাইন্দং বাজারে মিছিল করে এবং পাহাড়ি বিরোধী সাম্প্রদায়িক শ্লোগান দেয়। মিছিল থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য সেটলার বাঙালীদের আহ্বান জানানো হয়। সেটলাররা শ্লোগান দিতে দিতে হেডম্যান পাড়া ও বগাপাড়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে হামলার আশঙ্কায় মনুদাসপাড়া, আচলং ও সর্ব্বেশ্বরপাড়ার পাহাড়ি লোকজন ভারতের সীমান্তে পালিয়ে যায়। পরদিন পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা আবার নিজ নিজ গ্রামে ফিরে আসে। এ যাত্রায় সেটলারদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন না থাকায় পাহাড়িরা হামলার হাত থেকে বেঁচে যায়। তবে সেটলাররা তাদের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা অব্যাহত রাখে। ১ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে এবং ২ আগস্ট শুক্রবার বিকালে সেটলারা আবার একইভাবে মিছিল করে ও শ্লোগান দেয়। পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত জিনিসপত্র বিক্রির জন্য তাইন্দং বাজারে গেলে সেটলাররা তাদের ৮-১০জনকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। ফলে পাহাড়িরা ভয়ে বাজারে আসা বন্ধ করে দেয়।তাইন্দংয়ে পাহাড়ি গ্রামে হামলার ঘটনা সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পিত উল্লেখ করে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, হামলার আগে বেশ কয়েকদিন ধরে সেটলারদের মধ্যে পাহাড়ি-বিরোধী সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও উত্তেজনা ছড়ানো হয়। এ সব বিষয় বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন জানলেও তারা এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তারা হামলার ষড়যন্ত্র চালাতে ও প্রস্তুতি গ্রহণে সেটলারদের সুযোগ দেয়। এমনকি ৩১ তারিখ রাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও পাহাড়িদের ভারত সীমান্তে পালিয়ে যাওয়ার খবরও কোন মিডিয়ায় প্রচার করা হয়নি। ফলে সেটলাররা বিনা বাধায় পাহাড়িদের উপর হামলা চালাতে দ্বিগুণ সাহস ও উৎসাহ পেয়ে যায়।

যে ঘটনাকে ইস্যু করে সেটলার বাঙালিরা পাহাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়েছে সেই হোন্ডা চালক কামাল হোসেনের অপহরণ ঘটনাকে সাজানো নাটক উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এই নাটকের সাথে তথা ষড়যন্ত্রের সাথে বিজিবির কী ধরনের সম্পর্ক তা অনুসন্ধানের বিষয়। কারণ ঘটনার দিন পাহড়িদেরকে ক্রসিং-এ ডেকে এনে মারধর করার সময় বিজিবির  সদস্যরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, সেটলারদের নিবৃত্ত করতে তারা কোন পদক্ষেপ নেয়নি। মারধরের পর শত শত সেটলার তাদের সামনে থেকে পাহাড়িদের গ্রামে হামলা করতে যাওয়ার সময়ও তারা কোন বাধা দেয়নি। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী বিজিবি’র সদস্যরা হামলার সময় সারাক্ষণ সেটলারদের সাথে ছিল। বিজিবির এই ভূমিকা মূল ষড়যন্ত্রের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতাকেই ইঙ্গিত করে। এছাড়া বিজিবি’র বিরুদ্ধে তাইন্দংসহ মাটিরাঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়িদের উপর নির্যাতন, হয়রানি, বিনা কারণে গ্রেফতার, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ বানচাল ও সাম্প্রদায়িক হামলায় সেটলারদের সহযোগিতা করার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

ত্রাণ ও সাহায্যের অপর্যাপ্ততার কথা উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকার ও বিজিবির দেয়া ক্ষতিপূরণ ও জানমালের নিরাপত্তার আশ্বাসের পর পালিয়ে যাওয়া পাহাড়িরা বর্তমানে নিজ গ্রামে ফিরে এসেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের পুনর্বাসনের কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমনকি জরুরী চিকিৎসারও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।  ত্রাণ হিসেবে যা দেয়া হয়েছে তা বিশাল মরুভূমিতে কয়েক বিন্দু পানি ফোঁটার মতো।

সরকারী প্রতিনিধি হিসেবে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকার, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাহেদুল আলম, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সমীর দত্ত  চাকমা সহ অনেকে ভারতের সীমান্তে আশ্রয় নেয়া পাহাড়িদের নানা প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস দিয়ে ফিরিয়ে আনেন। এরপর থেকে তাদের কোন দেখা মেলেনি এবং তারা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করেনি। ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের সাথে তারা চরম প্রতারণা করেছেন বলেও প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ৩ আগস্ট হোন্ডা চালক কামাল হোসেন(৩০) অপহৃত হয়েছেন এমন গুজব রটিয়ে পরিকল্পিতভাবে সেটলাররা মাটিরাঙ্গার তাইন্দং ও তবলছড়ি ইউনিয়নে পাহাড়িদের গ্রামে হামলা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়।

এ হামলায় ১১টি পাহাড়ি গ্রামের ৮৮৩ পরিবার পাহাড়ি বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তার মধ্যে ৪৫৫ পরিবার পাহাড়ি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নোম্যান্স ল্যান্ডে এবং ৪২৮ পরিবার পানছড়ি উপজেলায় এবং আশে-পাশের বনে-জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার ও প্রশাসনের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে পালিয়ে যাওয়া পরিবারগুলো নিজ নিজ গ্রামে ফিরে আসলেও পর্যান্ত ত্রাণ সহায়তা না পেয়ে বর্তমানে তারা অনাহারে অর্ধাহারে ও রোগে-শোকে খোলা আকাশের নীচে দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.