তিমির বরণ চাকমার হত্যাকারী ক্যাপ্টেন কাওসারের বিচার হবে কি?

0
0

সিএইচটিনিউজ.কম

।। মন্তব্য প্রতিবেদন ।।
তিমির বরণ চাকমা ওরফে ডুরন বাবু অধূনালুপ্ত শান্তিবাহিনীর একজন গেরিলা যোদ্ধা। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ গ্রাম দীঘিনালার ভৈরফায় ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে জনসংহতি সমিতির এম. এন. লারমা গ্রুপে যোগ দেন। গত ১০ আগস্ট সেনাবাহিনী তাকে ও অন্য তিনজনকে মাটিরাঙ্গার ইন্দ্রমুনি পাড়া থেকে আটক

নিহত তিমির বরণ চাকমা
নিহত তিমির বরণ চাকমা

করলে ঐদিনই সেনা হেফাজতে তার মৃত্যু হয়।

সেনাদের দুই ভাষ্য
সেনাবাহিনী তার মৃত্যু সম্পর্কে দুইটি ভাষ্য দিয়েছে। একবার বলেছে ‘হঠাৎ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাটিরাঙা  হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বেলা দেড়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।’ [দৈনিক সুপ্রভাত, ১১ আগস্ট] একই সেনাবাহিনীর আর একটি ভাষ্য হলো, ডুরন বাবু ‘পালাতে গিয়ে গাছের সাথে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে পাহাড় থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়।’ [দৈনিক পূর্বদেশ, ১১ আগস্ট]

অপরদিকে, জেএসএস এম. এন. লারমা দলের অভিযোগ আটকের পর সেনাবাহিনীর ভয়ানক নির্যাতনে ডুরন বাবুর মুত্যু হয়েছে। এজন্য তারা ক্যাপ্টেন কাওসারকে দায়ি করে তার শাস্তি দাবি করেছেন। তারা আরও অভিযোগ করেছেন যে, আলামত নষ্ট করার জন্যই গভীর রাতে তার লাশ ধর্মীয় রীতিনীতি ছাড়া দাহ করা হয়েছে।

বহু মিথ্যা, একটি সত্য
ডুরন বাবুর মৃত্যু সম্পর্কে এই পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমাদের সিএইচটি নিউজ ডট কমের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ও বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে। কথায় বলে মিথ্যার বহু রঙ। কিন্তু সত্য একটাই। মাটিরাঙ্গায় সেনাবাহিনী বহু মিথ্যা দিয়ে একটি সত্যকে আড়াল করতে চাইলেও আকাশে উদিত সূর্যের মতো সত্য প্রকাশিত হয়েছে।

নিশিমুনি চাকমার স্ত্রী, পুত্র এবং শিশু কন্যা
নিশিমুনি চাকমার স্ত্রী, পুত্র এবং শিশু কন্যা

সেনা ও এম. এন. লারমা গ্রুপের এই পরস্পর বিরোধী ব্যাখ্যার মধ্যে একটি মিল হচ্ছে: ডুরন বাবুর মৃত্যু হয়েছে সেনা হেফাজতে। এই ব্যাপারে কারোর দ্বিমত নেই। সেনাবাহিনীও অস্বীকার করে বলেনি যে, তাদের হেফাজতে ডুরন বাবুর মৃত্যু হয়নি। কেবল কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে সে সম্পর্কেই রয়েছে বক্তব্যের ভিন্নতা।

এ অবস্থায় আমরা গত ১৩ আগস্ট ঘটনাস্থল ইন্দ্রমুনি পাড়ায় অর্থাৎ যেখান থেকে ডুরন বাবু ও অন্য তিন জনকে আটক করা হয় সেখানে যাই এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলি। গ্রামের নিশিমুনি চাকমার বাড়ি থেকে ডুরন বাবু, গৃহকর্তা নিশিমুনি চাকমা স্বয়ং, তার ছেলে অমর কান্তি চাকমা ও জেএসএস এম. এন. লারমা দলের অপর এক সদস্য রিয়েল ত্রিপুরাকে সেনাবাহিনী আটক করে। বর্তমানে ওই তিন জন খাগড়াছড়ি জেলে চাঁদাবাজির মামলায় আটক রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিশিমুনি চাকমার স্ত্রী এলেনা চাকমা জানান, সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাতে বাড়ি ঘেরাও করে রেখে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাদের আটক করে। তিনি বলেন, ‘আমি ঘুম থেকে জেগে আমার স্বামীকে তাগাদা দিই চাষের কাজে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি বললেন একটু দেরী করে যাবেন। এরপর আমি ঘরের বাইরে টয়লেটে যাই এবং বুট জুতার আওয়াজ ও লোকজনের কথাবার্তার শব্দ শুনতে পাই। আমি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে আমার স্বামীকে এটা বলি ও বাইরে দেখে আসার জন্য অনুরোধ করি। এ কথা বলতে না বলতেই সেনারা বাড়ির দরজায় এসে জিজ্ঞেস করে বাড়িতে কে কে আছি।’

আটক নিশিমুনি চাকমা
আটক নিশিমুনি চাকমা

এ সময় বাড়িতে তার স্বামী নিশিমুনি চাকমা, দুই ছেলে প্রিয় কান্তি চাকমা ও অমর কান্তি চাকমা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশু কন্যা মনিকা চাকমা ছাড়াও তাদের অতিথি হিসেবে ছিলেন জেএসএস এম. এন. লারমা দলের সদস্য তিমির বরণ চাকমা ও রিয়েল ত্রিপুরা। বড় ছেলে প্রিয় কান্তি চাকমা কলেজে পড়া অবস্থায় পড়াশোনায় ইতি টানেন। ছোট ছেলে অমর কান্তি চাকমা মাটিরাঙ্গা কলেজে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন।

এলেনা চাকমা জানান, সেনারা মা-ঝিকে বাদ দিয়ে বাকি ৫ জনকে বাড়ি থেকে বের করে চোখ বেঁধে দেয়। তিনি বলেন, ‘চোখ বেঁধে দেয়ার পর সেনারা কোন জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই বাড়ির উঠোনে বরই গাছের তলায় তাদের সবাইকে বেদম মারধর করে, বুট জুতো দিয়ে লাথি মারে। আমি আর্মিদের কাছে কাকুতি মিনতি করে বলেছি আমার স্বামী এবং ছেলেদের মারবেন না। ওরা কলেজে পড়ে। ওদের কোন দোষ নেই। কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি। মারধরের ফলে সবাই রক্তাক্ত হয়, এমনকি তাদের কাপড় চোপড়ও নষ্ট হয়ে যায়। তাদের বুকেও রক্তের দাগ দেখেছি। মারধরের এক পর্যায়ে তিমির বরণ চাকমা মুমূর্ষু হয়ে পড়লে সেনারা ক্ষান্ত হয়। অর্ধমৃত অবস্থায় সেনারা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যায়। বাকিরা অনেক কষ্টে আস্তে আস্তে হেঁটে যায়। শুনেছি তাদেরকে রাস্তায় গিয়েও মারধর করেছে। আমার বড় ছেলে প্রিয় কান্তি চাকমা গায়ে গতরে ছোট হওয়ার কারণে তাকে নিয়ে যায়নি। সেনারা আমার স্বামী, ছোট ছেলে অমর কান্তি ও জেএসএস-এর দুই জনকে আটক করে নিয়ে যায়। আমি তাদের সাথে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ছোট মেয়েটার জন্য যেতে পারিনি।’

আটক কলেজ ছাত্র অমর কান্তি চাকমা
আটক কলেজ ছাত্র অমর কান্তি চাকমা

এলেনা চাকমা বলেন, ‘আমরা কৃষিজীবী। চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার স্বামী ও ছেলেকে যেভাবে মারধর করা হয়েছে তাতে তারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছে। তারা আর কোনদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে এবং কাজ করতে পারবে কিনা সন্দেহ।’

প্রিয় কান্তি চাকমা এই প্রতিবেদককে জানান আর্মিরা সম্ভবত তাকে বয়স কম মনে করে ধরে নিয়ে যায়নি, তবে তার চোখ বেঁধে দেয় এবং বাড়ির উঠানে মারধর করে। তাদের ভাষ্য মতে, সেনারা ঘরের আসবাবপত্র, লেপ, তোষক, কাপড়-চোপড় সবকিছু উঠানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়, সমস্ত বাড়ি তল্লাশি করে এবং স্বর্ণালংকারসহ সবকিছু তছনছ করে দেয়। ‘আমার বড় ছেলে প্রিয় কান্তির মানিব্যাগে প্রায় ২,০০০ টাকা ও আমার ভ্যানিটি ব্যাগে ৫০০ টাকা ছিল। আর্মিরা এই টাকাসহ একটি কাপড়ের তৈরি স্কুল ব্যাগ, ২ জোড়া জুতো ও ৮টি মোবাইল সেট নিয়ে যায়।’ জানান এলেনা চাকমা।

গ্রামবাসীরা জানান, মাটিরাঙ্গা জোন থেকে ক্যাপ্টেন কাওসারের নেতৃত্বে ১২ গাড়ি আর্মি ইন্দ্রমুনি পাড়া ঘেরাও করে। সেনারা গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি থেকে লোকজনকে বের করে ও তাদের মোবাইল সেটগুলো কেড়ে নেয়। এরপর সেনা সদস্যরা বাড়িঘরে ব্যাপক তল্লাশী চালায়। গ্রামের এক বাসিন্দা শরৎ কান্তি চাকমা বলেন, রাত আনুমানিক ৩:০০টার সময় আর্মিরা তাদের বাড়ি ঘেরাও করে তল্লাশি চালায় এবং বাড়ির অতিথি ও ছেলেসহ ৫ জনকে সকাল ৭:০০টা পর্যন্ত চোখ বেঁধে রাখে। সেনারা তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী’ খোঁজার নামে এই তল্লাশি চালায় বলে তিনি জানান।

মৃত্যুর কারণ শারীরিক নির্যাতন
এলেনা চাকমা ও গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণে তিমির বরণ চাকমার মৃত্যু হয়েছে। তিনি শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা গেছেন বলে সেনাদের দাবি তার পরিবারের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তিমির বরণ চাকমার স্ত্রী আলোতারা চাকমা এই প্রতিবেদককে জানান, তার স্বামীর কোন ধরনের শ্বাস কষ্টজনিত অসুখ ছিল না।

প্রিয় কান্তি চাকমা দেখিয়ে দিচ্ছেন এই গাছের তলায় ডুরন বাবুসহ আটককৃতদের মারধর করা হয়
প্রিয় কান্তি চাকমা দেখিয়ে দিচ্ছেন এই গাছের তলায় ডুরন বাবুসহ আটককৃতদের মারধর করা হয়

মাটিরাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক উম্মে সালমা ১১ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোববার সকালে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অসুস্থ অবস্থায় তিমির বরণকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তাঁর তখন শ্বাসকষ্ট ছিল। পরে দুপুরের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।’ [প্রথম আলো, ১২ আগস্ট]

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, তিনি বলেননি যে ডুরন বাবুর শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডাক্তার এ সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, মারধরের ফলে ফুসফুসে আঘাত পেলে তো শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।

এই প্রতিবেদক গত ১৬ আগস্ট খাগড়াছড়ি জেলে তিমির বরণ চাকমার সাথে আটক হওয়া রিয়েল ত্রিপুরা, নিশিমুনি চাকমা ও অমর কান্তি চাকমার সাথে দেখা করেন। তারা জানান, মাটিরাঙ্গা জোনে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানেও আর্মিরা তিমির বরণকে উল্টো করে টাঙিয়ে মারধর করে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে সেনারা তাকে তাদের কাছ থেকে পৃথক করে অন্যত্র নিয়ে যায়। তাদের ধারণা, মাত্রারিক্ত নির্যাতনের কারণে মাটিরাঙ্গা জোনেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ইন্দ্রমুনি পাড়া — যেখান থেকে আর্মিরা ডুরন বাবুসহ চারজনকে আটক করে নিয়ে আসে — মাটিরাঙ্গা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বেশ দূরে অবস্থিত। পাড়ায় যেতে গাড়ি-চলা পথ থেকেও ১৫-২০ মিনিট হাঁটতে হয়। মাটিরাঙ্গা সদর থেকে সেখানে যেতে কম করে হলেও দুই ঘন্টা সময় লাগে। সেনারা সকাল ৭টায় ইন্দ্রমুনি পাড়া ত্যাগ করে। সে হিসেবে মাটিরাঙ্গা জোনে পৌঁছতে তাদের ৯টা বেজে যাবে। কিন্তু আর্মিদের ভাষ্য মতে তিমির বরণ চাকমার স্বীকারোক্তি মোতাবেক তারা বাল্যাছড়ির ১ নং রাবার বাগানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এই অভিযান পরিচালনা করলে দুপুরের আগে মাটিরাঙ্গায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। অথচ তাদের ভাষ্য হলো, তিমির বরণ চাকমাকে সকাল সাড়ে দশটায় মাটিরাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সময়ের এই বিভ্রান্তি ছাড়াও, আর্মিদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট নয় যে, তিমির বরণ চাকমা কখন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন – ইন্দ্রমুনি পাড়ায় মারধরের সময়, নাকি মাটিরাঙ্গা জোনে নিয়ে এসে শারীরিক নির্যাতন চালানোর সময়? তবে জেলে আটককৃতরা জানান, ইন্দ্রমুনি পাড়া থেকে মাটিরাঙ্গা জোনে আসার সময় বাইল্যাছড়ি রাবার বাগানে বা অন্য কোথাও সেনারা অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যায়নি। তারা সরাসরি তাদের চারজনকে নিয়ে জোনে ফিরে আসে। তাদের মতে, জোন থেকে তিমির বরণকে নিয়ে নতুন করে অস্ত্র অভিযানে যাওয়াও সম্ভব নয়, কারণ অতিরিক্ত মারধরের কারণে সে ইতিমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েছিল। আর যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নেয়া যায় যে, সেনারা তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে গেছে, তাহলে তাদের পক্ষে সাড়ে দশটার আগে ফেরা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, তিমির বরণ চাকমা নির্যাতনের ফলে এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছিলেন যে, তার পক্ষে আর্মিদের ভাষ্য অনুযায়ী পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা কিছুতেই সম্ভব নয়। এটা একমাত্র কল্পনাতেই সম্ভব হতে পারে।

আলামত নষ্ট করতে গভীর রাতে লাশ পুড়িয়ে ফেলা
মাটিরাঙ্গা থানা থেকে লাশ ময়না তদন্তের জন্য খাগড়াছড়ি হাসপাতালে পাঠানো হয়। পত্রিকায় জানা যায়, আর্মিরা লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য জনসংহতি সমিতির এন. এন. লারমা গ্রুপের নেতাদের খবর দেয়। কিন্তু তারা লাশ নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে গভীর রাতে পৌরসভা চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে ও বিপুল সংখ্যক আর্মি-পুলিশের কড়া পাহারায় মহাজন পাড়ার শ্মশানে তা পুড়িয়ে ফেলা হয়। ধরে নেয়া গেল লাশ বেওয়ারিশ। কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি গভীর রাতে তা পুড়ে ফেলতে হবে কেন? হাসপাতালে কি বেওয়ারিশ লাশ দীর্ঘদিন পড়ে থাকে না?

ইন্দ্রমুনি পাড়ার বাসিন্দা শরৎ কান্তি চাকমা
ইন্দ্রমুনি পাড়ার বাসিন্দা শরৎ কান্তি চাকমা

লাশের দাবিদার ব্যক্তিদের সন্ধান পেতে কেন দু’একদিন, এমনকি কয়েক ঘন্টাও অপেক্ষা করা হলো না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আর্মি, পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আজও পাওয়া যায়নি। আর লাশ যদি বেওয়ারিশই হবে, তাহলে তা পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ অথবা কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে তা হস্তান্তর করাই কি যুক্তিযুক্ত বা প্রত্যাশিত নয়? তাই এই ধারণা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত যে, সেনারা হত্যার আলামত নষ্ট করার জন্যই তড়িঘড়ি করে লাশ পুড়ে ফেলেছে।

এ প্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে, লাশ গ্রহণ না করে জেএসএস এন. এন. লারমা গ্রুপের নেতারাও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেননি। ধরে নেয়া গেল তারা বুঝতে পারেননি নিহত ব্যক্তি তাদের দলের কর্মী। কিন্তু সেটা লাশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিহত ব্যক্তির লাশ তাদের দলের কর্মীর যদি নাও হতো, তাহলেও তাদের লাশ বুঝে নেয়া উচিত ছিল। কারণ জনগণের পক্ষে আন্দোলনকারী যে কোন দলের এটা একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। লাশ গ্রহণ না করায় আর্মিরা হত্যার আলামত নষ্ট করার সুযোগ পেয়েছে। অথচ লাশ তাদের হেফাজতে থাকলে আর্মিরা এই সুযোগ পেতো না, বরং সহজে প্রমাণ করা যেতো যে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেই মেরে ফেলা হয়েছে।

অবশ্য অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, জেএসএস এন. এন. লারমা গ্রুপের অনেকে ডুরন বাবুর লাশ বুঝে নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এমনকি তারা লাশ নিয়ে আসার জন্য থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু এক রহস্যজনক ফোন কলের কারণে তারা মাঝপথ থেকে ফিরে আসেন।

প্রশাসন ডুরন বাবুর পরিচয় ও ঠিকানা জানতো
বেওয়ারিশ হিসেবে ডুরন বাবুর লাশ পুড়ে ফেলা হলেও, খাগড়াছড়ির পুলিশ ও সেনা প্রশাসন ঠিকই তার আসল পরিচয় ও ঠিকানা জানতো। কারণ ভৈরফা গ্রামের মুরুব্বী পূর্ণ মনি চাকমা এ প্রতিবেদককে জানান, ‘ওইদিন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার সময় কয়েকজন পুলিশ গ্রামে আসেন এবং এলাকার মেম্বার ঘনশ্যাম ত্রিপুরার মাধ্যমে ডুরন বাবুর বাবা ফেলারাম চাকমাকে লাশ গ্রহণের জন্য খবর পাঠাতে চান। পুলিশ এও জানায় যে, লাশ গ্রহণ করা না হলে তা বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে সৎকার করা হবে। মেম্বার পরদিন সকালে এ ব্যাপারে কাজ করা হবে বলে পুলিশকে জানিয়ে দেন। অথচ তারপরও খাগড়াছড়ি থানা কর্তৃপক্ষ কীভাবে ডুরন বাবুর মৃতদেহ ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে পুড়িয়ে ফেলার অনুমতি দিতে পারে তা আদৌ বোধগম্য নয়।

কে এই তিমির বরণ চাকমা?
এই প্রতিবেদক ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তিমির বরণ চাকমা ওরফে ডুরন বাবুর বাড়ি দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নের ভৈরফা গ্রামে যান ও তার স্ত্রীসহ আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা বলেন। পঞ্চাশোর্ধ ডুরন বাবুর স্ত্রীর নাম আলোতারা চাকমা। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে ডমেন চাকমার বয়স ১৯, ছোট ছেলে রমেন চাকমার বয়স ১৮ ও মেয়ে প্রণিতা চাকমার বয়স ১৩ বছর। প্রণিতা দীঘিনালা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী। বড় ছেলে বিবাহিত। স্ত্রী লাকী চাকমা। তাদের সদ্য এক পুত্র সন্তান হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে ইমন চাকমা। কিন্তু তিমির বরণ চাকমার সে নাম মনপূতঃ হয়নি। তার আশা ছিল তিনি নিজে নাতির নামকরণ করবেন।

তিমির বরণ চাকমা স্ত্রী আলোতারা, মেজ পুত্র রমেন ও নাতি ইমনকে কোলে বড় পুত্র বধু লাকী
তিমির বরণ চাকমা স্ত্রী আলোতারা, মেজ পুত্র রমেন ও নাতি ইমনকে কোলে বড় পুত্র বধু লাকী

মৃত্যুর মাত্র দু’ দিন আগেও ডুরন বাবু তার স্ত্রী আলোতারার সাথে কথা বলেছেন। জানতে চেয়েছেন নাতির জন্য কি নিয়ে আসবেন? স্ত্রী বলেছেন, ‘মশার উৎপাত বেশি, তাই মশারী নিয়ে এসো।’ ডুরন বাবু কথা দিয়েছিলেন কয়েক দিনের মধ্যে নাতিকে দেখার জন্য আসবেন, কিন্তু তা আর হলো না।

ডুরন বাবুদের পরিবার ১৯৮৬ সালে ব্যাপক সেনা নির্যাতনের কারণে এলাকার অনেকের মতো উদ্বাস্তু হন এবং ভারতের ত্রিপুরায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। তিনি এস এস সি পাস করে শান্তিবাহিনীতে যোগ দেন এবং ‘ই কোম্পানীতে’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯২ সালে তাকুমবাড়ি শরণার্থী শিবিরে আলোতারা চাকমার সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজে মনোযোগ দেন। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখলেও, ২০০৬ সালে জেএসএস দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার পর তিনি জেএসএস এমএন লারমা অংশের সাথে যুক্ত হন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালনের পর কিছুদিন আগে তিনি গুইমারা এলাকায় বদলী হন। তার বড় ভাই বাবলা চাকমা কয়েক বছর আগে চলমান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের বলী হন। তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল কর্মী তাকে খুন করে বলে একটি সূত্রে জানা যায়।

চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলা
কোন পাহাড়ি সংগঠনের সদস্য অথবা সাধারণ নিরীহ লোকজনকে আটক করা হলে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলা দেয়া সেনাবাহিনীর রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের ঘটনা মাটিরাঙ্গা, গুইমারা ও রামগড়ে সবচেয়ে বেশী। কয়েক দিন আগে ৬ আগস্ট গুইমারা বাজার থেকে এক স্কুল ছাত্র ও অপর এক কিশোরকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হয়েছে। তাদের মুক্তির দাবিতে গুইমারায় সমাবেশ করতে গেলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ শাখার নেতা রিয়েল ত্রিপুরাকে আটক করে অমানুষিকভাবে মারধর করে। পিসিপি তার মুক্তির দাবিতে সড়ক অবরোধের ডাক দিলে তারপরই কেবল তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

সারাদেশে চাঁদাবাজি হয় এ তথ্য সবার জানা। তবে সমতল জেলাগুলোতে যেভাবে পথে পথে বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেরকম হয় না। আর রাঙামাটি শহরে যে পরিমাণ চাঁদাবাজি হয়, মাটিরাঙা, গুইমারা এলাকায় তার শত ভাগের একভাগও হয় কিনা সন্দেহ রয়েছে। ডুরন বাবুদেরকে আটকের আগে কেউ তাদের বিরুদ্ধে থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ করেনি। কিন্তু তারপরও কেন মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা? মূলতঃ বছরের পর বছর ধরে এইসব এলাকায় ব্যাপকহারে পাহাড়িদের ভূমি বেদখল করা হচ্ছে। নাম জানা ১৪ – ১৫টি কোম্পানী পাহাড়িদের যৌথ মালিকানাধীন জমি নানা কৌশলে বেদখল করে প্রাকৃতিক বন উজার করে তাতে ফলজ গাছের বাগান করছে।১ অনেকে সময় জনগণ সংঘবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও বেদখলকৃত জমিতে লাগানো বিভিন্ন গাছ কেটে দেয়। সেনাবাহিনী ও প্রশাসন মনে করে জনগণকে এই সংগ্রামে উদ্ধুদ্ধ করে থাকে বিশেষত ইউপিডিএফ ও জেএসএস এম. এন. লারমা গ্রুপের নেতাকর্মীরা। তাই জনগণের এই প্রতিরোধ মোকাবিলার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী সুযোগ পেলেই পার্টির সদস্য ও সাধারণ গ্রামবাসীকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলা দিয়ে থাকে। ডুরন বাবুর সাথে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অস্ত্র মামলা দেয়া হয়েছে। অথচ তাদেরকে আটকের সময় কোন ধরনের অস্ত্র পাওয়া যায়নি। আর্মিরাও এই দাবি করেনি। তারা দাবি করেছে আটকের পর অন্য এক অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অথচ সরেজমিন তদন্ত করে জানা গেছে, সে ধরনের অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আদৌ হয়নি।

ডুরন বাবুর হত্যাকারীর বিচার হবে কি?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, তার সাথে গ্রেফতার হওয়া ও বর্তমানে জেলে অন্তরীণ তিন ব্যক্তির বক্তব্য, ঘটনার পর সেনা-পুলিশের আচরণ, সেনাদের বক্তব্যের অসঙ্গতি ও circumstancial evidence থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিমির বরণ চাকমা ওরফে ডুরন বাবুকে সেনা হেফাজতে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং হত্যার আলামত নষ্ট করতে তার লাশ ফেরত না দিয়ে তড়িঘড়ি করে পুড়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তার হত্যার সাথে জড়িত ক্যাপ্টেন কাওসার ও তার সহযোগীদের বিচার হবে কি?

ভৈরফায় তিমির বরণ চাকমার বাড়ি
ভৈরফায় তিমির বরণ চাকমার বাড়ি

ইউপিডিএফ ও জেএসএস এম. এন. লারমা গ্রুপ ডুরন বাবুর হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশনও সেনা হেফাজতে ডুরন বাবুর মৃত্যুর নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার কিংবা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

এই অবস্থায় বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী হিসেবে সুনাম অর্জনকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমার অপহরণকারী লেঃ ফেরদৌসকে শাস্তি দেয়ার বদলে তাকে রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আজো আন্তর্জাতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। অথচ একটি rotten apple হিসেবে তার বিচার করে শাস্তি দেয়া হলে এমনটা হতো না। ক্যাপ্টেন কাওসারকে যদি শাস্তি দেয়া না হয়, তাহলেও সেনাবাহিনী নামক পুরো প্রতিষ্ঠানটি আরো একবার ইমেজ সংকটের মধ্যে পড়বে। কাজেই অন্য কিছু বাদ দিলেও, ন্যায়বিচার ও সেনাবাহিনীর নিজ স্বার্থেই কাওসারের বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ একজনের অপরাধের জন্য সকলে দোষী হতে পারে না। [সমাপ্ত]

—————-

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.