ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-এর সংবাদ সম্মেলন : ধর্ষণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ ১২ ফেব্রুয়ারি ধর্ষণবিরোধী গণসমাবেশ সফল করার আহ্বান

0
124


আমরা অত্যন্ত আতংকের সাথে লক্ষ্য করলাম দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী গণজাগরনের মধ্যেই ধর্ষণের মাত্রা, তীব্রতা ও ভয়াবহতা অন্য যেকোন সময়কে ছাড়িয়ে গেছে


ঢাকা ।। ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ৯ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ও দেশে অব্যাহত নারী নির্যাতনের পরিস্থিতি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেছে ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ।

আজ মঙ্গলবার (০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে ধর্ষণ বিরোধী গণসমাবেশ সফল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স।

লিখিত বক্তব্যে ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশ করা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, গত অক্টোবর মাসের ৫ তারিখ থেকে পাহাড়ে সমতলে অব্যাহত ধর্ষণ-নিপীড়ন এবং বিচারহীনতার প্রতিবাদে ধারাবাহিকভাবে আমরা আন্দোলন সংগ্রামে আছি। এর মধ্যে গত ৯ অক্টোবর ঢাকায় সর্বস্তরের জনতার অংশগ্রহণে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এই ৯ দফা দাবির সমর্থনে সাংস্কৃতিক সমাবেশ, নারী সমাবেশ, সাইকেল র‍্যালীসহ নানা কর্মসূচী পালন শেষে গত ১৬-১৭ অক্টোবর ঢাকা থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। লংমার্চের পথে পথে সারা দেশের মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন-সহযোগিতা আমরা পেয়েছি। জনতার এই সমর্থনে ভয় পেয়ে শাসকগোষ্ঠী ফেনিতে দফায় দফায় লংমার্চের উপর হামলা চালায়। এতে আমাদের অনেক সহযোদ্ধারা গুরুতর আহত হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসজুড়ে সারা দেশে বিভাগীয় শহরগুলোতে মহাসমাবেশ, শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে সমাবেশ এবং ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে সমাবেশ করা হয়। এরই অংশ হিসেবে সাভার, খাগড়াছড়ি, সিলেট, চট্টগ্রা্‌ম, রংপুর, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ইত্যাদি অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক জনতার অংশগ্রহণে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গত জানুয়ারি মাসজুড়ে ঢাকার লালবাগ, বনানী, খিলগা, মিরপুর, ধানমন্ডী, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, সূত্রাপুর, তেজগাও, বাড্ডাসহ বেশকিছু অঞ্চলে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারাদেশে এবং ঢাকায় এসকল সমাবেশে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতার স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছিল।

লিখিত বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, আমরা অত্যন্ত আতংকের সাথে লক্ষ্য করলাম দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী এই গণজাগরনের মধ্যেই ধর্ষণের মাত্রা, তীব্রতা ও ভয়াবহতা অন্য যেকোন সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই ৮-১০টি ধর্ষণের খবর এই সময়ও এসেছে। এরকম নানা বীভৎস খবর প্রতিদিনই পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকছে। সম্প্রতি মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষার্থী ধর্ষণ এবং দায়ীর পরিবার বিত্তবান ও প্রতাপশালী হওয়ায় সেই ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে টালবাহানা, শহিদ মিনারে ফুলবিক্রেতা শিশু মীম হত্যার ঘটনা, মোহাম্মদপুরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করে আইন পাস করেই যে ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না সেই আশংকার কথা আমরা আগেই প্রকাশ করেছিলাম। সেই আশংকা এখন সত্য হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।

আইনের রক্ষক থেকে শুরু করে ক্ষমতার সাথে যুক্ত ছা্ত্র-যুব-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবং তাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীরাই এসকল ঘটনার বেশিরভাগের সাথে যুক্ত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আসলে দেশব‌্যাপী যে অগণতান্ত্রিক ফ‌্যাসিবাদী শাসন চলছে তাই এদের ক্ষমতার উৎস।

দেশে বিচারহীনতার চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমরা যদি গত দুই দশকে বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতন-সহিংসতার মামলাগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে সেখানে বিচারহীনতাকেই খুঁজে পাওয়া যাবে। সরকারের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার যে তথ্য-উপাত্ত রেকর্ড করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ২০০১ থেকে ২০২০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে যেসব মামলা করা হয়েছে, সেগুলোর মাত্র ৩.৫৬ শতাংশের ক্ষেত্রে আদালতের রায় ঘোষিত হয়েছে। আর এসব মামলার মধ্যে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে ০.৩৭ শতাংশের ক্ষেত্রে। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে যত ধর্ষণ ঘটেছে, নারী-শিশুর ওপর যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের ৯৯.২৩ শতাংশই কোনো শাস্তি পায়নি। অর্থাৎ প্রায় শতভাগ ধর্ষক ও নারী-শিশু নির্যাতক বিচার ও শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে; এটাকেই বলে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। পাড়ায় পাড়ায় গণকমিটি করে ধর্ষণ প্রতিরোধে উদ্যোগ নেয়া জরুরী। ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে যে সামাজিক আয়োজন তাকে উচ্ছেদ করা এখন সময়ের দাবি। নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি তার বিপরীতে নারী-পুরুষের সমতার সমাজ বিধানের লড়াই আজ জরুরী। একই সাথে পর্ণোগ্রাফি-মাদকের অবাধ ব্যবসা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া ছাড়া এই বর্বর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের ভিন্ন কোন পথ নেই।

সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকাল ৩ টায় ঢাকার শাহবাগে ধর্ষণবিরোধী গণসমাবেশ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সফল জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে যে রাষ্ট্রকাঠামো এর বিচার না করে ধর্ষণ এবং ধর্ষককে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাকে ভাঙ্গার সংগ্রামও জোরদার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-এর উত্থাপিত ৯ দফা দাবি হচ্ছে-

১। সারাদেশে অব্যাহতভাবে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার সাথে যুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ, নিপীড়ন বন্ধ ও বিচারে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।

২। পাহাড়-সমতলে আদিবাসী নারীদের ওপর সামরিক-বেসামরিক সকল প্রকার যৌন ও সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।

৩। হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর করতে হবে। সিডো সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল আইন ও প্রথা বিলোপ করতে হবে।

৪। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-১৫৫ (৪) ধারাকে বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে।

৫। অপরাধ বিজ্ঞান ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ট্রাইবুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে অনিষ্পন্ন সকল মামলা দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে।

৬। তদন্তকালীন সময়ে ভিকটিমকে মানসিক নিপীড়ন-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ভিকটিমের আইনগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৭। ধর্মীয়সহ সকল ধরণের সভা-সমাবেশে নারী বিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। পর্ণোগ্রাফি বন্ধে বিটিআরসি’র কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকব্যবসার হোতাদের গ্রেফতার করতে হবে, মাদকাসক্তি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।

৮। পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি অবমাননা ও বৈষম্যমূলক যে কোন প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পরিচ্ছদ, ছবি, নির্দেশনা ও শব্দ চয়ন পরিহার করতে হবে।

৯। গ্রামীন সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মাসুদ রানা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সংগঠক মুক্তা বাড়ৈ, চারণ সংস্কৃতিক কেন্দ্রের সংগঠক শোভন রহমান ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অমল ত্রিপুরা।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.