পানছড়িতে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বানে বিক্ষোভ সমাবেশ

উত্তরাঞ্চল থেকে জেএসএস-এর গ্রুপ প্রত্যাহার পুর্বক সংঘাত পরিহারের দাবি

0
280

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।। খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে উস্কানীমুলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা ও সমঝোতার শর্ত মেনে চলার জন্য জেএসএস-এর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২০) বেলা ১১ টায় ‘পানছড়ি ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটি’র উদ্যোগে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশ থেকে প্রতিশ্রুতি মোতাবেক খাগড়াছড়ির পানছড়ি তথা উত্তরাঞ্চল থেকে জেএসএস-এর গ্রুপ প্রত্যাহার পুর্বক সংঘাত পরিহারের দাবি জানানো হয়েছে।

সমাবেশে সংঘাত বন্ধের দাবি সম্বলিত বিভিন্ন শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। শ্লোগানগুলোর মধ্যে ছিল— ‘গায়ে পড়ে ঝগড়া, চলবে না বন্ধ কর’; ‘সংঘাত বাঁধায় যারা, জাতির শত্রু তারা’; ‘কথার বরখেলাপ সহ্য করব না’ ‘ঈমান-জবান রক্ষা কর, জাতির ভবিষ্যত নিয়ে ভাব’; ‘শত্রুর গুটি হইও না, জাতির কথা ভাব’; ‘সংঘাত নয়, বৃহত্তর ঐক্য চাই’; ‘জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চাই’; ‘ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি নয়, ঐক্য চাই’; ‘ভাইয়ের বুকে গুলি নয়, কোলাকুলি চাই’; ‘উত্তরাঞ্চল থেকে জেএসএস-এর গ্রুপ প্রত্যাহার কর’; ‘শাসকগোষ্ঠীর ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত নীতির বিরোধিতা করুন’; UPDF – JSS সমঝোতা রক্ষা কর’।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পানছড়ি ভ্রাতিঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক ও পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান শান্তি জীবন চাকমা।

কমিটির সদস্য সঞ্চয় চাকমা’র সঞ্চালনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন কমিটির সদস্য সচিব ও ১নং লোগাং ইউপি চেয়ারম্যান প্রত্যুত্তর চাকমা, ২নং চেঙ্গী ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান অনিল চন্দ্র চাকমা ও নারী মেম্বার সুশীলা চাকমা প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, আমরা পানছড়ি উপজেলার জনগণ শান্তিপ্রিয়, তবে আমরা নিজের জাতীয় অস্তিত্ব ও অধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে সব সময় প্রস্তুত। আমরা জুম্মদের মধ্যে ঐক্য চাই, ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চাই না। গত ২২/২৩ বছর ধরে চলা সংঘাতে আমরা জাতির অনেক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছি। সে কারণে ইউপিডিএফ ও জেএসএস—এর মধ্যে ২০১৮ সালে সমঝোতা হয়েছে শুনে আমরা অত্যন্ত খুশী হয়েছি। আমরা মনে করি এই সমঝোতা দুই পার্টির উচ্চ নেতৃত্বের রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক। আমরা এই সমঝোতাকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করি ও স্বাগত জানাই। কারণ এই সমঝোতা জুম্ম জাতির জন্য এক মহা আশির্বাদ ও সবার জন্য মঙ্গলজনক। উক্ত সমঝোতা না হলে হয়তো এতদিন আরও অনেক প্রাণ অকালে ঝড়ে যেতো, অনেক মায়ের কোল খালি হতো, অনেক জুম্ম নারী বিধবা হতো, অনেক নিষ্পাপ শিশু পিতৃহীন হতো। আর পুরো জুম্ম সমাজ হতো বিধ্বস্ত, পঙ্গু।

তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উক্ত সমঝোতা সত্ত্বেও ইদানিং দুই পার্টির মধ্যে আরও নতুন করে সংঘাত বাঁধার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি এবং অভিযোগও করা হয়েছে যে, গত কয়েক মাস আগে জেএসএস সমঝোতা লঙ্ঘন করে ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকা পানছড়ি ও বাবুছড়ায় প্রবেশ করেছে। যেহেতু সমঝোতা মোতাবেক এক দলের এলাকায় অন্য দলের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং জেএসএস ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হুমকিমূলক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তাই ইউপিডিএফ স্বাভাবিকভাবে সেটা মানতে পারছে না, তারা প্রতিবাদ করছে। আমরা মনে করি সমঝোতা লঙ্ঘন করা জেএসএস—এর পক্ষে সঙ্গত বা ঠিক হয়নি।

বক্তারা বলেন, আমরা জেএসএস নেতৃত্বের কাছে দাবি জানাচ্ছি, আপনারা ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের আশঙ্কা দূর করতে পানছড়ি ও বাবুছড়া এলাকা থেকে আপনাদের গ্রুপগুলোকে প্রত্যাহার করুন, সমঝোতার শর্ত মেনে চলুন। আর ইউপিডিএফের কাছে অনুরোধ আপনারাও সমঝোতার শর্ত মেনে চলুন, জেএসএস—এর সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘনের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে জেএসএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করে সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দেবেন না।

আমরা দুই পার্টির নেতৃত্বকে, বিশেষত জেএসএস নেতৃত্বকে অনুরোধ করছি, আপনারা জুম্ম জাতিকে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত থেকে মুক্তি দিন। আপনারা আন্দোলন না করলে করবেন না, কিন্তু দোহাই আন্দোলনের নামে ভাইয়ের বুকে গুলি চালিয়ে জাতির ক্ষতি ও সর্বনাশ করবেন না।

বক্তারা আরো বলেন, যেখানে সকল জুম্ম পার্টিগুলো একজোট হয়ে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করার কথা, সেখানে তাদের মধ্যে হানাহানি কখনো কাম্য নয়। এতে জুম্মদের ক্ষতি ছাড়া লাভ হয় না। শাসকগোষ্ঠী চায় আমরা জুম্মরা খুনোখুনি করে, ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত করে নিজেরাই শেষ হয়ে যাই, ধ্বংস হয়ে যাই। সেই জন্য তারা নানা ষড়যন্ত্র করে, নানা ফাঁদ পাতে। আমরা শাসকগোষ্ঠীর সেই ফাঁদে পা না দেয়ার জন্য সকল জুম্ম দলকে আহ্বান জানাচ্ছি।

“ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটি” গঠনের বিষয়ে তারা বলেন, আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই, গত ২২/২৩ বছর ধরে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে জর্জরিত হয়ে আমাদের জুম্ম জাতি আজ চরম সংকটে পতিত হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা আর চুপ করে বসে থাকতে পারি না। আমরা আর চাই না এই সংঘাতের কারণে জাতিগতভাবে, পারিবারিকভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই।

সমাবেশে উপস্থিত জনতা হাত উঁচিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটির দাবি ও আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন

সংঘাতে আমাদের মত সাধারণ জনগণকেই অনেক বেশী ভুগতে হয়। দলগুলোতে কাজ করার জন্য নিজের সন্তানকে কর্মী হিসেবে যোগান দিতে হয়, অর্থ যোগান দিতে হয়, খাদ্য সংস্থান করে দিতে হয়, তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়, তাদের গাইড হিসেবে কাজ করতে হয়। এক কথায় দলগুলোর সব কাজগুলো সাধারণ জনগণকে করে দিতে হয়। অথচ বিনিময়ে আমরা জনগণ যা পাই তা হলো সার্বিক ক্ষতি, সর্বনাশ ও হতাশা। কাজেই একদিকে শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, অন্যদিকে নিজ জাতির দলের লোকজনের নানা কর্মকাণ্ডের চাপে পড়ে আমাদের একেবারে মরণদশা হয়ে যায়। একারণে নতুন করে যাতে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত না হয়, তার জন্য আমরা জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের বক্তব্য ও প্রচেষ্টা যোগ করতে চাই। এই প্রেক্ষাপটে আমরা এই কমিটি গঠন করেছি। আমরা কারো দলের পক্ষে নই। জুম্ম জাতির মঙ্গলের পক্ষেই আমাদের অবস্থান।

সমাবেশে উপস্থিত জনতা হাত উঁচিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটির উত্থাপিত দাবি ও আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানান।

ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সমাবেশের এ তথ্য জানানো হয়।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.