পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা তৎপরতা বৃদ্ধি : প্রগতিশীল মানবতাবাদী শক্তির আশুকরণীয়

0
1

।। উৎপল খীসা ।।
পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের দীর্ঘ দেড় দশক পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সেনা, র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি’র উপস্থিতি এবং অশুভ তৎপরতা বৃদ্ধির ঘটনা আমাদের জুম্মদের, সাধারণ শান্তিপ্রিয় বাঙালি সমাজ তথা সমগ্র মানব সভ্যতার জন্যে এক অশুভ অশনি সংকেত। সেখানে সন্ত্রাস দমনের নামে সেনা, র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি সরকারের নির্দেশ, সহায়তা, সমর্থনে যেভাবে জুম্মদের উপর দমন পীড়ন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে তা এককথায় ভয়াবহ- যা আমাদের পার্বত্য আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা তৈরি করছে। সেটা এমনই পরিকল্পিত এবং দ্রুত গতিতে ঘটছে যে, তাতে করে মনে হয় আর তেমন দেরি নেই দমকা হাওয়া সমেত বজ্র বৃষ্টির তাণ্ডবলীলা শুরু হবার। সেসবের রোষানলে পড়ে খড়খুটোর মত জুম্মদের ভেসে যাবার! এর পূর্ব লক্ষণ স্বরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, দিঘিনালা বাবুছড়া, রুমা আলিকদম প্রভৃতি এলাকায় ক্যাম্প সম্প্রসারণের নামে তথাকথিত শান্তি রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক জুম্ম সাধারণের ভূমি জবর দখল, উচ্ছেদ তৎপরতা পরিচালনার নগ্ন দৃশ্য। যেসবের মধ্যে দিয়ে সেখানে জুম্মদের চূড়ান্ত অশান্তির বিস্তৃতি, সর্বনাশ ঘটানোর ব্যাপক আয়োজন পাঁয়তারা চলছে। সম্প্রতি মিলিটারিকে ক্ষমতা দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার জারির ঘটনা সেসবের বৈধতা দানের অন্যতম কবজ স্বরূপ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা, সেটলার বাঙালি কর্তৃক জুম্ম নারী ধর্ষণ, খুন, গুম, জ্বালাও পোড়াও, ভূমি দখল প্রভৃতি মানবতা বিরোধী অশান্তির ঘটনা এবং সেসবের বিচার না হওয়া প্রভৃতি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, সরকার, শাসক শ্রেণী অত্র অঞ্চলের শান্তির পরিবর্তে অশান্তি স্থাপনের মাধ্যমে ইসলামিকরণে মরিয়া। ১৯৯৭ এ তৎকালীন আওয়ামী সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতি কথিত শান্তি স্থাপনের নামে যে বিভ্রান্তিকর পার্বত্য চুক্তি করা হয়েছে- সেটা যে কতটা জুম্ম, সাধারণ বাঙ্গালী কিংবা মানবতা স্বার্থ বিরোধী ছিল- সেটা আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। সেসব আমরা নিয়ত প্রত্যক্ষ করছি- সে নিয়ে পরস্পর বিরোধী বা সহায়ক পক্ষগুলোর মধ্যেকার বিদ্যমান ইঁদুর বেড়াল খেলার অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা দেখে।

প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা এমন কোন কঠিন, জটিল সমস্যা নয়- যা শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাধান করতে কোন জনকল্যাণমুখী সরকারের যুগের পর যুগ লেগে যাবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সে খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অতি দ্রুত সমাধান করা যেত! দিতে পারত!

ভুলে গেলে চলবে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান, সমস্যা, সংকট তৈরি হয়েছে বাঙালি সরকার শাসক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ইন্দনে। সেখানে সেতেলার পুরনবাসন, সেনা সম্প্রসারণ, শান্তি শিক্ষা উন্নয়ন প্রভৃতির নামে স্থানীয় জুম্ম জনস্বারথ বিরোধী মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থল বন্দর স্থাপন প্রভৃতি হয়েছে, হচ্ছে- একই লক্ষ্য, উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। পার্বত্য চুক্তিও হয়েছে তারই আলোকে। তাই সেটা এমনভাবে করা হয়েছে যা বাস্তবায়ন হওয়ার পরিবর্তে, দীর্ঘকাল যাবত ঝুলিয়ে রেখে তার মধ্যে দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নিজেদের ইচ্ছামাফিক অশান্তি বৃদ্ধি করা যায়। বাস্তবে তো তাই দেখছি আমরা। এজন্যে অবশ্যই আমাদের জেএসএস সহ অন্যরা কোন অংশে কম দায়ী নয়।

দীর্ঘ দেড় দশকে তারা জুম্ম জনগণকে মুক্তির রাস্তা দেখাতে পারল না। তারা বাঙালি শাসক শ্রেণীর এমন কদর্য আচরণের বিপরীতে কেবল মিউ মিউ মার্কা লড়াই করেই যাচ্ছে! তারা নিজেদের অধিকার, মুক্তি বা শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠনমূলক কিছুরই সন্ধান খুঁজে পেল না, দিতে পারল না আপামর জুম্ম জনসাধারণকে। অথচ তারা তেমন কিছু খুঁজে নিয়ে নিজেদের অতীত বিভ্রান্তিগুলোকে ঝেতিয়ে বিদায় করে দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারত! সে তারা পারল না। উল্টো তারা নিজেদের ভুলের কানাগলিতে হাবুডুবু খাচ্ছে! এ বড়ই বেদনার, বড়ই অপমানের! যা অতিশয় হাস্যকরও বটে!

তাদের বোঝা উচিত- সরকার শাসক শ্রেণী ষ্ট্রেটেজিক কারণে জেএসএস এর সাথে এমন দমনমূলক ভেল্কিবাজির চুক্তি করলেও সেখানে আজ তারা সেভাবে আর প’ড়ে নেই। সেটা তারা এখন স্রেফ একটা ঝুলানো মূলা হিসেবে দেখে। সেখান থেকে বহুকাল আগে সরে গিয়ে নিজেদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য পুরনে যখন যা করবার তার যতটুকু করা সম্ভব তা করে যাচ্ছে। সে তারা আগামীতেও করে যাবে। কারণ সেটাই বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য। সরকারের লক্ষ্য যদি তেমনই হয়- সেখানে নিপীড়িত জনগণ এবং তাদের সংগঠনের লক্ষ্য কেমন হওয়া উচিত তা চোখ বন্ধ করেই দেখা যায়, বলা যায়।

কোন কিছু বলা সহজ, করা কঠিন। কঠিন কিছু করার জন্যে তেমনই লক্ষ্য, কলা কৌশল পরিকল্পনা, আদর্শ প্রভৃতি থাকা আবশ্যক। সেভাবেই সেসব বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়া আবশ্যক। সেজন্যে নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ, ত্যাগী, আদর্শিক হতে হয়। সন্তু লারমা, তার জেএসএস এর মধ্যে আজ অবদি সে দেখা যায়নি। অন্যদের মধ্যে যে সেসবের তীব্র সংকট তা আজ দিবালোকের মত সুস্পষ্ট।

কত বছর তারা নিজের ছায়ার সাথে লড়ালড়ি করবে? কত বছর তারা বাঙালি সরকার, শাসক শ্রেণীর কাছ থেকে বেকুবি স্টাইলে মার খেয়ে যাবে! আমরা সাধারণেরা মার খেয়ে যাব? অবাক লাগে যখন দেখি, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ার আঁকড়ে ধরেই একটি দল দীর্ঘ দেড় দশক সময় নির্বিকার পার করে দিয়ে নিজেদেরই হত্যার রাস্তা পাকাপোক্ত করেই চলেছে। আজ অবদি নিজেদের হাত, তলোয়ার ঘোরানোর জন্যে তারা তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে আঞ্চলিক পরিষদের বিধিমালা, প্রবিধান পেল না? রাজনইতিকভাবে একটা দল কতটা অথর্ব হলে এ সম্ভব? কোন সাংবিধানিক সংস্থা, কমিশন বা পরিষদের বিধিমালা, প্রবিধান ছাড়া তো কত্রিপক্ষের হাতই নাড়ানো যায় না!

সম্প্রতি ইউপিডিএফ, জেএসএস (এম এন লারমা) দলের নেতা কর্মীদের ধরপাকড়, গুলি করে হত্যা এবং আহতকরনে জেএসএস (সন্তু) এর ফেসবুকি প্রচার কর্মীদের উচ্ছ্বাস, করমকারদে প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে লাফালাফির ঘটনা প্রকৃতপক্ষে জেএসএস (সন্তু) কে রাজনৈতিকভাবে আরও বেকায়দায় ফেলবে। বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সেনা বাহিনী কর্তৃক জেএসএস (সন্তু) নেতৃত্বাধীন পিসিপি কর্মীকে প্রকাশ্যে আহত করার যে খুনি, পাশবিক উন্মাদনা তারই উত্তম দৃষ্টান্ত বলে মনে করি। কারণ বিষধর সর্প সকলকেই দংশন করে।

জনগণের মাথার ঘামে অর্জিত টাকায় পোষা সরকার, সেনাবাহিনীর এমন কদর্য বাড়াবাড়ি প্রকৃত অর্থে দেশের প্রচলিত সিভিল আইন ও সাধারণ জনসাধারণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর নামান্তর। অবশ্য বুর্জোয়া ব্যবস্থায় এসব আইনই তৈরি হয় নিজেদের ইচ্ছামাফিক সেসব লঙ্ঘন করে স্বার্থ রক্ষার অভিপ্রায়ে!

জুম্ম সহ বাংলাদেশের জনগণের উচিত- পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার, সেনাবাহিনীর এমন বাড়াবাড়ি ঘটনার প্রতিবাদ, প্রতিরোধে সোচ্চার ভূমিকায় সক্রিয় থাকা। বাংলাদেশের সকল জাতিসত্তার অধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে সংঘবদ্ধ ভূমিকা পালনে সদা সচেষ্ট থাকা। অন্যথায়, পাহাড়ের বিষ বাস্প সমতলের অপরাপর মানুষের জনজীবনকেও প্রবলভাবে ক্ষত বিক্ষত করে তুলবে।

২০/০৫/২০১৫

—————————————–
সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.