প্রাণভিক্ষা চেয়েও মুক্তিবাহিনী আমাদের রেহাই দেয়নি- কমলেশ্বর চাকমা

0
1

সিএইচটিনিউজ.কম
সাক্ষাতকার ভিত্তিক প্রতিবেদন:
ডিসেম্বর মাসটি  বিজয়ের মাস হBirananda Vanteলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের জন্য এ মাসটি শোকাবহ একটি মাস। ১৯৭১ সালে এই ডিসেম্বর মাসেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিবাহিনী কর্তৃক হত্যাযজ্ঞ, হামলা ও লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার কালানাল এলাকার কমলেশ্বর চাকমাও মুক্তিবাহিনীর সদস্য কর্তৃক হামলার শিকার হয়ে কোনরকমে প্রাণে বেঁচে যান। সেই সময়কার ঘটনাবলী জানতে কমলেশ্বর চাকমাসহ আরো কয়েকজনের কাছ থেকে সাক্ষাতকার নেওয়া হয়। কমলেশ্বর চাকমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার কয়েক বছর পর প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। তাঁর ভিক্ষু নাম বীরানন্দ ভান্তে। দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে তিনি পানছড়ির একটি বৌদ্ধ বিহারে  প্রব্রজ্যারত অবস্থায় অবস্থান করছেন। পড়ুন কমলেশ্বর চাকমা’র(বীরানন্দ ভান্তের) বর্ণনায় সেদিনের মর্মান্তিক ঘটনার বিবরণ……

সেদিন বুধবার। আমরা পানছড়ি বাজারে যাই। অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিকের ঘটনা। আমরা মনতাজিদ দোকান থেকে লবণ কিনছিলাম। সেই সময় মুক্তিবাহিনীর একদল সদস্য অতর্কিতে এসে আমাদের ধরে ফেলে। তারা আামদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, তোমরা চাকমা, ত্রিপুরা না মগ? জবাবে আমরা চাকমা বলে উত্তর দিই। এরপর মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আমাদেরকে বেঁধে মারধর করতে করতে পশ্চিম দিকে নিয়ে যায়। কামমোহন, আমার এক ভাগিনা সহ ১২/১৩ জনকে ধরে এক জায়গায় জড়ো করে রাখে। সকলের নাম এখন আর মনে নেই। তারা(মুক্তিবাহিনীরা) আমাদেরকে এমনভাবে মারধর করে তা বলার মতো নয়। পিছমোড়া করে আমাদের দু’ভাইকে বেঁধে ফেলে। পরে সেখান থেকে সুযোগ পেয়ে কোদাল্যার ভাই আর গনেজ নামে দু’জন পালিয়ে গেলে আমাদের উপর আরো বেশি নির্যাতন চালানো হয়। পরে বিকালের দিকে রাজামিয়া হলুদ ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হারুজ্জামান আমাদেরকে কেটে[জবাই করে] মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়।

আমি তখন মুক্তিবাহিনী কমান্ডার হারুজ্জামানকে বলি “কাটলে[জবাই করলে] তো বেশি কষ্ট পাবো, তাই গুলি করে মেরে ফেলেন”। তখন তিনি [হারুজ্জামান] বলেন “না না, গুলি করবো না, তোমাদের জবাই করে মেরে ফেলবো”। এরপর তারা আমাদেরকে দা দিয়ে কোপায়। এর আগে আমি প্রাণভিক্ষা চেয়ে বলি ” খোদা হলেও আপনি, আল্লাহ হলেও আপনি, ঈশ্বর হলেও আপনি, ভগবান হলেও আপনি। আমাদের এগারজনকে একটু প্রাণ ভিক্ষা দেন।” কিন্তু তারা আমার কোন কথায় কর্ণপাত করেনি। একটি গর্তের ভিতর ঢুকিয়ে তারা আমাদেরকে কোপাতে শুরু করে। প্রথমে ফাত্তো নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে, তিনি প্রাণে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কোপ দেয়ার সময় সে চিৎকার দিয়ে উঠে। আমি নিজেই দেখেছি তাকে কোপানোর দৃশ্য। তাকে কোপাতে দেখে আমি “ব্যাঙচাগা” করে শুয়ে থাকি। গরু-ছাগল যেভাবে জবাই করা হয় সেভাবে একের পর একজনকে কোপানো হচ্ছে। আমি শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এভাবে একের পর এক কোপানোর পর আমাদেরকে সেখানে ফেলে রেখে তারা চলে যায়। আমরা দু’ভাই কোনরকমে বেঁচে যাই। পরে আমরা দু’ভাই বাঁধা অবস্থায় গর্ত থেকে উঠে একটি ঝিড়ির দিকে লাফিয়ে পড়ি। কিন্তু আমি আটকা পড়ে যায়। অবশ্য আমার ভাই মাটিতে পড়ে যান। তারপর দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে দড়িটা ছিড়ে ফেললে আমার ভাইয়ের বাধনটি খুলে যায়। কিন্তু আমার হাতের বাধনটি রয়ে যায়। পরে বাধনটি সামনে এনে আস্তে আস্তে কামড়িয়ে খুলে ফেলা সম্ভব হয়। ততক্ষণে আমার ভাইটি সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

এরপর রাজামিয়া হলুদ ক্ষেতের দক্ষিণ দিকে একটি ছড়ায় গিয়ে পৌঁছি। ছড়ায় নেমে পানিতে আঙুল দিয়ে দেখি পানি নীচের দিকে নামছে। এরপর পানির লাইনকে ফলো করে নীচের দিকে যেতে থাকি। পরে একটি হলুদ ক্ষেত নাগাল পাই। আমার যাওয়ার শব্দ শুনে কে যেন পালিয়ে গেছে মনে হলো। তখন আমি মুক্তিবাহিনীরা এম্বুশে আছে মনে করে একটু ভয় পেতে থাকি। পরে আরো একজনের পালিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাই। এরপর আমি ভয়ে ভয়ে পশ্চিম দিকের একটি টিলায় উঠে পড়ি। সারারাত সেখানে থাকি। কিন্তু কোথায় থেকেছি তা আমি বুঝতে পারিনি। আমার ভাইও তখন সেখান থেকে চলে গেছে। অনেকক্ষণ পরেই আমার ঘাড়ে যে কাটা ঘা রয়েছে সেটা বুঝতে পারি। ঘা’টি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। তখন রক্ত শুকিয়ে গেছে। শীতকাল। জঙ্গলের ভিতরতো কোন ঔষধপত্র নেই। পাশের ঝোপ-ঝাড় হাত দিয়ে ধরে ধরে দেখলাম কোন প্রাকৃতিক ঔষধ(লতা-পাতা) পাওয়া যায় কিনা, এমতাবস্থায় একটি “মুউজো” গাছ খুঁজে পেলাম। ওই ‘মুউজো’ গাছের পাতাগুলো ছিড়ে মুখের ভিতর ঢুকিয়ে কচলিয়ে কাটা ঘা’য়ে লাগিয়ে দিই। এটুকুই মাত্র চিকিৎসা। পরদিন ভোর হলে টিলার উপর থেকে দুলোমন চাকমাদের বাড়ি দেখতে পেলাম।  তখনও রাইফেলের আওয়াজ শুরুতে পাচ্ছি। সেদিন দুর্গামোহন নাকি কাকে যেন পালিয়ে যাবার সময় গুলি করেছে মুক্তিবাহিনীরা। সেদিন তারা ঘরবাড়িতেও আগুন লাগিয়ে দেয়।

যেখানে রাত কাটিয়েছিলাম সেটা রাতে গভীর জঙ্গল মনে হলেও সকালে দেখি আসলে তেমন বেশি জঙ্গল নয়। সবকিছু দেখা যায়। এরপর আমি আরো গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ি। তখন ভুত-দেবতাকে কোন ভয় পাচ্ছি না, শুধু মানুষকে ভয় পাচ্ছি। দিন চলে যায়, রাত নেমে আসে। চারদিকে কোন মানুষজনের সাড়াশব্দ নেই। শিয়ালের ডাক শুনা যাচ্ছে। ভক্কেবাপ’দের গ্রামে আগুন লাগানোর শব্দ শুনা যাচ্ছে। এ অবস্থায় গ্রামে ফেরার আর সাহস হচ্ছে না। পেটের ক্ষুধারও কোন খবর নেই।

জঙ্গলের ভিতর থেকে দেখতে পেলাম তিনজন বাঙালি লম্বা লম্বা দাও হাতে করে ভক্কেবাপ’দের বাড়ির নীচে করে যাচ্ছে। কতক্ষণ পর তাদেরকে তিনটি বলদ গরু নিয়ে আসতে দেখলাম।  এগুলো চাকমাদের গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে। তারা গরুগুলোকে আমি যেখানে লুকিয়ে আছি, সেদিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। ফলে সেখান থেকেও পালানোর উপক্রম হয়েছে। পরে সেদিকে না নিয়ে উত্তরদিকে করে নিয়ে যায়।  তখন আমি একেবারে চুপচাপ করে ছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর আরো তিনজন পাহাড়িকে “কাল্লোঙ”-এ করে ধান আনতে দেখলাম।  তারা কোথায় থেকে এসেছে তা জানার জন্য যখন তাদের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন তারা আমার শব্দ শুনে পালিয়ে যায়। এরপর পশ্চিমদিকে আবার জঙ্গলের ভিতর ঢুকে পড়ি।

পরদিন শুক্রবার ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি শরীর দুর্বল লাগছে। তখন ভাবলাম এভাবে আর হবে না। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে খাগড়াছড়ির দিকে চলে যেতে হবে। তখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, মানুষ দেখলেই ভয় পাচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে উগুধোছড়িতে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে ২/৩ জন মানুষ নাগাল পেলাম। তারও পালিয়ে এসেছে এবং গ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন তাদেরকে বলি যে, আমি তিনদিন ধরে ভাত খেতে পায়নি। তারাও খেতে পায়নি বলে জানায়। কোথায় যাচ্ছেন বলে তারা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। তারা আরো বললেন, এখন নাকি গ্রামে ফিরতে পারবো, মুক্তিবাহিনীরা নাকি আর কোন কিছু করবে না। আমি বললাম, আমিতো জায়গা চিনি না, আপনাদের সাথে আমিও যাবো আর কি। তাদের সাথে উগুদোছড়ির নীচের দিকে পৌঁছাই। তখনও আমার ভয় কাটছে না। তাদেরকে বলি আপনারা আগে যান, আমি টিলার উপর  থেকে দেখি। সেই পশ্চিম টিলা (যেখানে এখন ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে) থেকে চেয়ে থাকলাম। যাদেরকে নাগাল পেয়েছি তারা হলেন মনা বাপ’র ছেলে-মেয়ে। দেখলাম তারা বাড়িতে ঢুকছে। মনে মনে ভাবছি তাদেরকে তাড়াতে দেখলে আমি এখান থেকে পালিয়ে যাবো। তারপর আস্তে আস্তে টিলা থেকে নেমে গ্রামে আসলাম। তখন মনাবাপ আমাকে দেখতে পেয়ে বলেন, বেয়াই নাকি? আসেন আসেন। আমি হ্যাঁ বলে উত্তর দিই এবং উঠবো না বলে জানিয়ে দিই। এরপর তাঁর কাছ থেকে জিজ্ঞেস করি মিটিঙে কারা কারা গেছে? তিনি বলেন, করমা, নিশাকর, দিবাকর(মিনতিবাপ) এরা গেছে। মিটিঙে যাওয়াদের মধ্যে কেউ আছেন? তিনি মিনতিবাপ-এর কথা বললেন। আমি সরাসরি মিনতিবাপের বাড়িতে গেলাম। দিবাকরকেও নাগাল পেলাম। আমাকে দেখে দিবাকর বলেন, ঐ তো কারিগজ্জ্যে, আসেন আসেন, আপনার কথা গতকাল বলাবলি হচ্ছিল। বাঙালীরা(রাজামিয়া, মোহাম্মদ আলী) নাকি অনেক কাকুতি-মিনতি করেছে আপনাকে না মারার জন্য। আমি বলি, ‘আমি মরি নাই, বেঁচে রয়েছি।’  যখন “কাবা খেইনেও” মরি নাই এখন আর ভাতেও মরবো না, পীড়ায়ও মরবো না। যদি ঘা’য়ের  রিএ্যাকশনের কারণে ধনুষ্টঙকার হয় তখন হয়তো মরে যেতে পারি। এখন আমার একটি এটিএস(ইনজেকশন) দরকার, কারোর কাছে আছে কিনা? তখন তারা বলেন, এখনতো সে ইনজেকশন নেই। তারপর আমরা শুগুনোছড়িতে গেলাম। সেখানে করমাসহ সবাইকে নাগাল পেলাম। পরে সেখান থেকে আমরা যখন চেঙ্গী নদী পার হচ্ছি তখন দেখতে পেলাম মুক্তিবাহিনীর সদস্যরাও ফিরছে। আমরা লুকিয়ে থাকলাম। তারা চলে যাওয়ার পর আমরা বের হয়ে এলাম। বিনাকর-এর কাছ থেকে ‘এটিএস ইনজেকশন’ চাইলাম। কিন্তু তার কাছেও নেই। এ সময় নিশাবাপ বাজারে যাচ্ছিলেন। আমি তার মাধ্যমে মোহাম্মদ আলীকে ‘এটিএস ইনজেকশন’ পাঠানোর জন্য খবর পাঠাই। বিকালে তিনি ইনজেকশনটি পাঠিয়ে দেন। সেখানে রাঙাপানি থেকে দেবানে নামে এক ব্যক্তি আমাকে দেখতে গিয়ে জানায় যে, তোমার স্ত্রী-কেও মুক্তিবাহিনীরা কুপিয়েছে। আমি তখন জিজ্ঞেস করি বেঁচে আছে, না মারা গেছে। তিনি বেঁচে আছে বলে জানান। তাকে বললাম “বেঁচে আছি বলেই দেখা হলো, মরলেতো আর দেখা হতো না। কখন যে কিভাবে মৃত্যু হয় তার কোন ঠিক নেই। কেউ “কাবা খেই” মরবে, কেউ গুলি খেয়ে মরবে, কেউ গাছ থেকে পড়ে মরবে, কেউ পীড়ায় ভুগে মরবে, মানুষের মরণ কোন ঠিক ঠিকানা নেই।”

ঘটনার শিকার হওয়ার পর ৩ দিন ধরে অনাহারে জঙ্গলে কাটিয়ে ৫ দিনের মাথায় ঘরে ফিরতে পেরেছেন বলে তিনি জানান।

তিনি আরও জানান, মুক্তিবাহিনীরা শুধু পানছড়ি বাজারে নয়, সত্যধন পাড়া, করমা পাড়া, কালানাল সহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালিয়েছে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা এসব হামলা করেছে। তাদের কাছ থেকে নারীরাও রেহাই পায়নি। আমার স্ত্রীকেও তারা কুপিয়েছে। এসময় তিনি তাঁর ঘাঁড়ের কাটা দাগটিও দেখান।

এ ঘটনার বিষয়ে কোন দাবি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুক্তিবাহিনীরা কোন অপরাধ ছাড়াই যেভাবে আমাদের উপর (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) অত্যাচার চালিয়েছে, মারধর করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, হত্যা করেছে ও হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

তিনি আরো বলেন, আগে তো আমরা ভারতে পালিয়ে গেছি। এখন কোথায় পালাবো? ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোন ঘটনার শিকার না হই, নিজেদের স্বাধিকার-অধিকার নিয়েই যেন ভালোভাবে থাকতে পারি সরকারের কাছে এটাই দাবি করি।
——————
সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.