ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসহযোগ আন্দোলন -১

1
1

non-cooperation-movement-1-638।। মানবমিত্র চাকমা।।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যিনি মহাত্মা গান্ধী নামে জগদ্বিখ্যাত, তার নেতৃত্বে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। ১৯২০ – ২২ সাল ব্যাপী চলা সেই সময়ে সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতির এই আন্দোলন উপনিবেশিক বৃটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। চৌরিচৌরায় পুলিশের উপর জনতার সহিংস হামলার পর গান্ধীজী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। বৃটিশ সরকার পরে তাকে ও কংগ্রেসের অন্য নেতাদের গ্রেফতার করে ও ব্যাপক দমনপীড়ন চালায়। তবে পরবর্তীতে এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আইন অমান্য আন্দোলন ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করে।

এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে ভারতের জনগণের এই মহান আন্দোলনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে দুই পর্বে আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে। আশাকরি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই আলোচনার গুরুত্ব পাঠকের কাছে প্রতিভাত হবে। প্রথম পর্বে অসহযোগ আন্দোলন কী এবং কিভাবে পরিচালিত হয়েছিল তা আলোচিত হয়েছে।

অসহযোগ আন্দোলন কী ও কেন
অসহযোগ আন্দোলন হলো মূলত একটি গণআন্দোলন যার উদ্দেশ্য হলো শাসক সরকারের উপর থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাহার করা ও এর মাধ্যমে তাকে গণদাবি মেনে নিতে বাধ্য করা। Seeley -এর মতে, বিদেশী শাসককে তার প্রভুত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করা একটি লজ্জাজনক কাজ – এই হলো অসহযোগ আন্দোলনের মূল চেতনা। (Non-co-operation was essentially, as Seeley had said long ago, “the notion that it was shameful to assist the foreigner in maintaining his domination”.)

সি. এফ. এন্ড্রুর মতে, ‘আত্ম মর্যাদা ফিরে পাবার একমাত্র উপায় হলো নিজের ভেতরের শক্তির উত্থান ঘটানো। এ ধরনের উত্থানের জন্য যে বিষ্ফোরক শক্তির দরকার তা অবশ্যই ভারতের নিজের আত্মা থেকে উৎপন্ন করতে হবে। এটা বাইরে থেকে ধার, উপহার, অনুদান, ছাড় এবং ঘোষণা হিসেবে আসতে পারে না। এটা অবশ্যই নিজের ভেতর থেকে আসতে হবে। (C. F. Andrew “the only way of self recovery was through some vital upheaval from within. The explosive force needed for such an upheaval must be generated within the soul of India itself. It could not come through loans and gifts and grants and concessions and proclamations from without. It must come from within”.)non cooperation movement2

মহাত্মা গান্ধী ইয়াং ইন্ডিয়া পত্রিকায় লেখেন, ‘অসহযোগ নিষ্ক্রিয় অবস্থা নয়। এটা একটা বড় রকমের সক্রিয়াবস্থা এবং দৈহিক বল কিংবা হিংসাত্মক প্রতিরোধ অপেক্ষা অধিক সক্রিয়।’

অসহযোগ আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯২০ সালের ১ আগষ্ট, যেদিন লোকমান্য তিলক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই আন্দোলনের রূপ ছিল অহিংস এবং এর উদ্দেশ্য হলো সরকারের ওপর থেকে সহযোগিতা প্রত্যাহার করে বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বরাজ কায়েম করা। আন্দোলনের শুরুতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত আহ্বান জানায়:

১) সমস্ত ধরনের খেতাব ও সম্মানধারী পদবী বজর্ন কর এবং স্থানীয় সরকারী সংস্থার আসন থেকে পদত্যাগ কর;
২) সরকারী অথবা আধাসরকারী অনুষ্ঠান বর্জন কর;
৩) সরকারী সাহায্যপুষ্ট বা সরকার-নিয়ন্ত্রিত স্কুল কলেজ থেকে ছেলেমেয়েদের ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নাও;
৪) আইনজীবী ও মোকদ্দমাকারী উভয়ে বৃটিশ কোর্ট বয়কট কর;
৫) সেনাবাহিনী ও অন্যান্য চাকুরীতে যোগদান করতে অস্বীকার কর;
৬) ১৯১৯ সালের সংস্কার অনুযায়ী কাউন্সিলের নির্বাচন বয়কট কর; এবং
৭) বৃটিশ পন্য বর্জন কর।

উক্ত আহ্বান ছাড়াও সারা ভারতে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় বিচারিক সংস্থা গড়ে তোলা এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমবারের মতো ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়। গুজরাট বিদ্যাপীঠ, বিহার বিদ্যাপীঠ, তিলক মহারাষ্ট্র বিদ্যাপীঠ, কাশি বিদ্যাপীঠ, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটি এবং দিল্লি জামিয়া মিলিয়া ইত্যাদি স্বজাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। স্বদেশী ধারণা ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা লাভ করে। খদ্দের স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হয়। অসহযোগ আন্দোলনের অর্থ যোগাড়ের জন্য তিলক স্বরাজ তহবিল গঠন করা হয়। এতে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রায় এক কোটি রূপী জমা পড়ে।

non cooperation movement3সুমিত সরকারের মতে, এই আন্দোলনে চারটি পর্ব লক্ষ্যণীয়। ১৯২১ সালের জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত ছাত্র ও আইনজীবীদের আদালত বর্জনের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। নীচের দিকের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাপের মুখে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি ২৮-৩০ জুলাই বোম্বে অধিবেশনে জঙ্গী অবস্থান (militant stance) গ্রহণ করে। এই অধিবেশনে গান্ধী জেলখানাগুলোকে স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে প্লাবিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “কসাইখানায় যেভাবে ভেড়াগুলোকে তাড়িয়ে নেয়া হয়, ঠিক সেভাবে হাজার হাজার মানুষ জেলে গেলেই আমাদের বিজয় আসবে’।

হিন্দু মুসলমান সবাই এই আন্দোলনে সমানভাবে অংশ নিয়েছিল। যারা গান্ধীজীর নেতৃত্বে আকর্ষণীয় পেশা ছেড়ে দিয়ে জেলে ঢুকতে লাইনে দাঁড়াতে প্রস্তুত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন মতিলাল নেহেরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ, সি. আর. দাস, বল্লভ ভাই প্যাটেল ও সি. রাজগোপালচারী। মুসলমানদের মধ্যে মওলানা আজাদ, আকতার আহমেদ আনসারী, হাকিম আজমল খান, আব্বাস তৈয়বজী, মওলানা মুহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শেষের দু’জন ছিলেন খিলাফত আন্দোলনের দুই প্রধান নেতা। এই আলী ভ্রাতৃদ্বয়কে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ১৯২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রেফতার করা হয় এই অভিযোগে যে, তারা সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহে উস্কানি দেয়ার মতো অপরাধ সংঘটিত করেছেন।

সরকারের আশা ছিল আভ্যন্তরীণ মতবিরোধ অথবা জনগণের অনাগ্রহের কারণে আন্দোলন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে, কিন্তু তা হয়নি। এই আন্দোলনে ৩০ হাজারের মতো নারী পুরুষ গ্রেফতার হন। ১৯২২ সালের ৫ জানুয়ারী উত্তর প্রদেশের গোরাখপুরের কাছে চৌরিচৌরা নামক স্থানে পুলিশের সাথে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়, জনতা থানা  আক্রমণ করে জ্বালিয়ে দিলে ২২ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারায়। এই ঘটনার পরই গান্ধীজী তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলন বন্ধ ঘোষণা করেন। #

শেষ পর্ব পড়ুন আগামীকাল
——————–

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.