ভূমি কমিশনের আহুত প্রক্রিয়ায় অংশ নিন, আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হোন–ইউপিডিএফ

0
1

updf-flagডেস্ক রিপোর্ট ॥ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের আহুত প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার ও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানয়েছে।

কমিশনের নতুন করে কার্যক্রম শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্যবাসীর প্রতি জরুরী আহ্বান শীর্ষক ইউপিডিএফ-এর কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ কর্তৃক গত ৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রচারিত এক প্রচারপত্রে এ আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রচারপত্রে বলা হয়, খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ভূমি কমিশনকে পাকিস্তানপন্থী ও কায়েমী স্বার্থবাদী সেনাচক্রটি নেপথ্যে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান কমিশনের কাজেও এ চক্রটি প্রকাশ্যে বা গোপনে হস্তক্ষেপ করবে না বা কমিশনের কোনো কোনো সদস্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? যদি সে রকম হয়, তাহলে বর্তমান কমিশনও কতটুকু স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে এবং দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবে সে ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবে সংশয় থেকে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত “অপারেশন উত্তরণের” নামে মূলত: জারি রয়েছে সেনা শাসন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে বিতর্কিত “১১দফা নিদের্শনা”র মাধ্যমে সেনা কর্তৃত্বকে আইনী বৈধতা দেয়া হয়েছে। ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে হলে অবশ্যই সেনা কর্তৃত্ব থেকে কমিশনকে মুক্ত রাখতে হবে।

এতে আরো বলা হয়, ভূমি সমস্যা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যান্য সমস্যার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পর্কিত একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যার মূলে রয়েছে চিটাগাঙ হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ এর ভূমি ও বসতিস্থাপন সংক্রান্ত ধারার বেপরোয়া সংশোধন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বহিরাগত আমদানি, জোরপূর্বক ভূমি দখল ইত্যাদি। তাই  বিদ্যমান আইনী প্রক্রিয়া ও আইনী কাঠামোর মধ্যে এই সমস্যাকে সমাধান করার চেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ ‘১৯০০ সালের রেগুলেশন’ অতীতে বিভিন্ন সময় শাসকগোষ্ঠী যে যে সংশোধনী এনেছে, তা তার সব ক’টিই আসলে গণবিরোধী। পার্বত্যবাসীর স্বার্থহানি ঘটিয়ে প্রণীত আইন-বিধি (যাকে ‘প্রচলিত আইন’ বা ‘বিদ্যমান আইন’ বলে উল্লেখ করার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়) দিয়ে ভূমি সমস্যার প্রকৃত সমাধান আশা করা যায় না।

তাছাড়া কমিশন আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইনের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও ‘রীতি ও পদ্ধতির’ ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। এক কথায় যে ‘আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ অনুসরণ করে কমিশন কাজ করবে সেগুলো স্পষ্ট উল্লেখ নেই।

প্রশ্ন আরও এসে যায়, সরকার ভূমি কমিশনের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করতে ১৫ বছর সময় নিয়েছে, তারপরও আইনটি পুরোপুরি গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে নি। আর বর্তমান সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে কাজ করার সময় অচলাবস্থা দেখা দিলে সরকার সেটা নিরসন করতে আর কত বছর সময় নেবে, তা কে বলতে পারে? তাই সঙ্গত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেদখলকৃত জমি ফিরিয়ে দিতে বা ভূমি সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ব্যাপারে জনমনে যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা  অত্যন্ত স্বাভাবিক।

প্রচারপত্রে ভূমি কমিশনের কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলা হয়, ভূমি কমিশন আইনের উপরোক্ত দুর্বলতা সত্ত্বেও ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার বা ভূমি কমিশনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টায় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে, বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দিচ্ছে। আপনারা এটাও নিশ্চয় অবগত আছেন যে, ‘পার্বত্য চুক্তির’ বিভিন্ন দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার দিক তুলে ধরে সমালোচনা করলেও তা বাস্তবায়নে ইউপিডিএফ কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নি, বরং চুক্তি স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম বিষয়ে আমাদের পার্টির অবস্থান প্রমাণ করে যে, ইউপিডিএফ উক্ত প্রতিশ্রুতি বিষয়ে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক ছিল এবং এখনো আছে। ইউপিডিএফ মনে করে ভূমি সমস্যা সমাধানে আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা বা কমিটমেন্ট। সরকারের যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানে প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকে, তাহলে আইনের যে যে ত্রুটি রয়েছে তা সংশোধন করা এবং নবগঠিত সদস্যদের পরিবর্তন করে গ্রহণযোগ্য আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দিয়ে কমিশন পুনর্গঠন করা। কাজেই সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানে অতীতের কালক্ষেপণের মাধ্যমে পাহাড়িদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার নীতি থেকে সরে এসেছে কিনা সে ব্যাপারে পর্যবেক্ষণের দরকার রয়েছে। এ পর্যায়ে বহুল উচ্চারিত আইনী শাস্ত্রবাক্য ‘Justice delayed is justice denied.’  অর্থাৎ ‘ন্যায়বিচার বিলম্বিত করার অর্থই হলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা’–কথাটি আমরা সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

করণীয় সম্পর্কে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রচারপত্রে বলা হয়,
১। যারা ভূমি বেদখলের শিকার হয়েছেন বা যাদের জমি ভূয়া দলিলের মাধ্যমে অথবা আইন বহির্ভূত পন্থায় কেড়ে নেয়া হয়েছে, তারা সেই জমি ফিরে পাওয়ার জন্য ভূমি কমিশনে নিয়ম মোতাবেক দরখাস্ত করুন এবং আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হারানো জমি ফিরে পেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান।
তবে কেবলমাত্র দরখাস্ত দিয়ে নিষ্ক্রিয় বা হাতগুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না, একই সাথে ভূমি উদ্ধারের আন্দোলনের জন্যও প্রস্তুত থাকুন। দরখাস্ত জমা দেয়াকে শেষ বা একমাত্র কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করবেন না, এটি হচ্ছে একটা প্রক্রিয়ার একটা পদক্ষেপ মাত্র। সরকার কেবল জনগণের ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রশমনের লক্ষ্যে এ কাজে হাত দিয়েছে। এটি আমাদের দিক থেকে সামগ্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন।

২। হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারের এই আইনী লড়াইকে উচ্চতর রাজনৈতিক সংগ্রামে উন্নীত করুন। কারণ ভূমি পুনরুদ্ধারের আন্দোলন হলো মূলত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন।

৩। ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখুন। যাদের নিয়ে ভূমি কমিশন গঠিত হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা বজায় না থাকার আশঙ্কা রয়েছে, যদি সেটা ঘটে বা কোনো মহল কমিশনের কোনো সদস্যকে অযাচিতভাবে প্রভাবিত করতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন।

৪। যদি সরকার কিংবা কোনো মহলের পক্ষ থেকে ভূমি কমিশনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে সেই ষড়যন্ত্র বানচাল করতে তৎপর হোন।

৫। যদি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের নামে বহিরাগতদের অবৈধ বন্দোবস্তকে আইনগত বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে সেই অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন।

পাঠকদের বুঝার সুবিধার্থে ইউপিডিএফের পুরো প্রচারপত্রটি নীচে দেওয়া হলো:

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের নতুন করে কার্যক্রম শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে

পার্বত্যবাসীর প্রতি
জরুরি আহ্বান:

ভূমি কমিশন আহূত প্রক্রিয়ায় অংশ নিন,
আন্দোলনের জন্যও প্রস্তুত হোন!

প্রিয় পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী,
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) জাতীয় জীবনের এক বিশেষ সময়ে আবারও আপনাদের সম্মুখে হাজির হয়েছে। আপনারা ইউপিডিএফ-এর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সংগ্রামী অভিবাদন গ্রহণ করুন!

আমরা গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করছি, বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বৈঠকের পর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দরখাস্ত আহ্বান করেছে। ৯ আগস্ট ২০০১ সালের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের কতিপয় ধারা সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারির পর এটাই ছিল কমিশনের প্রথম বৈঠক। উক্ত সংশোধিত আইনের ওপর ভিত্তি করে ভূমি কমিশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্পষ্টতই এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনগণের একাংশের মধ্যে এ নিয়ে যেমন আগ্রহ ও উৎসাহ দেখা দিয়েছে, তেমনি দ্বিধা সংশয়ের মধ্যে পড়েছে অন্য অংশ। অনেকের মধ্যে দেখা দিয়েছে দোদুল্যমানতা। অনেকেই করণীয় সম্পর্কে মনস্থির করতে পারেন নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের পার্টি হিসেবে বর্তমান ভূমি কমিশনের কার্যক্রম বিষয়ে আমরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা জরুরি ও প্রাসঙ্গিক মনে করছি।

সংগ্রামী জনতা,
আপনারা অবগত আছেন ২০০১ সালে পাস হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন। এ আইনের কিছু ধারা ছিল পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক, অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ। সে কারণে এ আইনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হয় নি। জনগণের প্রবল প্রতিবাদ ও আপত্তি সত্ত্বেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা সংশোধন না করে বিচারপতি খাদেমুল ইসলামকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেয়। খাদেমুল সাহেব প্রথমে ‘ভূমি জরিপে’র কাজে হাত দিতে চান, যা জনমনে সৃষ্টি করে সংশয়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের একটি বিশেষ মহলের এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হন এবং অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন। জনগণের প্রবল আপত্তি ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে তার ‘ভূমি জরিপের’ সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি কমিশনের অন্য সদস্যদের মতামতের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দরখাস্ত আহ্বান করেন। এ ব্যাপারে জনমত গঠনের লক্ষ্যে মিছিল সমাবেশ সংগঠিত করতে তিনি নিজে মন্ত্রী-সাংসদ-রাজনৈতিক নেতার মত পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরে বেরিয়ে পড়েন। স্বাভাবিকভাবে তাতে সন্দেহ আরও ঘণীভূত হয় এবং জনগণের বিরোধিতার ফলে তার এই বিতর্কিত উদ্যোগও মাঠে মারা যায়। পরে এক সময় তাকে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে নিরবে বিদায় নিতে হয়। খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ভূমি কমিশনের বিতর্কিত কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে সে সময় ব্যাপক গণ আন্দোলন গড়ে ওঠে। মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রম কার্যত অচল করে দিতে সক্ষম হয়। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কারণে সরকার অবশেষে কমিশন আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ কথা বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার যে, সংশোধনের পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে এখনো যথেষ্ট দুর্বলতা ও ফাঁক রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালের আইনে কমিশনের চেয়ারম্যানের হাতে নিরঙ্কুশ ও সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই কমিশনের সব সদস্যের সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে– এমন ধারা সন্নিবেশিত ছিল। বর্তমানে এই ধারাটি সংশোধনের পরও চেয়ারম্যানের ক্ষমতা প্রায়-নিরঙ্কুশ। আগের মতো স্বেচ্ছাচারী বা খেয়াল-খুশি অনুযায়ী কাজ করার অবস্থা না থাকলেও চেয়ারম্যানের সম্মতি ছাড়া কমিশন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অর্থাৎ কমিশনের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে না। কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের সম্মতি বাধ্যতামূলক। আরো বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করে বলা যায়, কমিশনের সদস্য হলেন চেয়ারম্যানসহ পাঁচ জন। অন্য চার জন হলেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তার মনোনীত একজন প্রতিনিধি (সংশোধিত আইন মোতাবেক) এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার অথবা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। ভুলে গেলে চলবে না জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা হলেন অনির্বাচিত এবং সরকার কর্তৃক মনোনীত, তারা সরকারের নির্দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এখন যদি কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এ পাঁচ সদস্যের মধ্যে চার জন এক পক্ষে ও চেয়ারম্যান অন্য পক্ষে কিংবা তিন জন সদস্য এক পক্ষে ও চেয়ারম্যান এবং অন্য এক সদস্য অন্য পক্ষে হন, তাহলে কমিশনে অচলাবস্থা দেখা দেবে। আর এই অচলাবস্থা নিরসনের জন্য কোন পন্থা বা বিধি কমিশন আইনে রাখা হয় নি। ফলে ২০০১ সালের আইনে বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক ধারা যুক্ত করে সরকার যেভাবে ভূমি কমিশনের কার্যক্রমকে অচল ও ভূমি সমস্যা সমাধানে কালক্ষেপণ করার নীতি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল, বর্তমান সংশোধিত ভূমি কমিশন আইনের মাধ্যমেও সরকার সেই একই উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইলে তা করা অসম্ভব নয়। প্রসঙ্গত এটা এখানে স্মরণ রাখা দরকার যে, সরকার-প্রশাসন-সেনাবাহিনীর মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-শিবিরের লোক রয়েছে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের, তা আওয়ামীলীগ পন্থী লেখক-বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই বলে থাকেন। এমনকী খোদ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও রাখঢাক না করে তা প্রকাশ্য জনসভায় বহুবার বলেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী এখনও বড় ফ্যাক্টর। ‘বিজয় দিবস (২০১৪)’ ও ‘একুশে ফেব্রুয়ারির (২০১৫)’  মতো জাতীয় দিবসে বগাছড়িতে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ-লুটপাট ও মাটিরাঙ্গায় যাত্রীবাহী বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে মারধরের মাধ্যমে কতিপয় সেনা কর্মকর্তা বিষাক্ত ফণা তুলে নিজেদের পাকিস্তানপন্থীর চেহারা উন্মোচন করে ফেলেছে। জাতীয় মর্যাদা-স্বাধীনতা রক্ষার্থে যারা শপথ নিয়ে চাকুরিরত, তারা যখন জাতীয় দিবস অবমাননা করে, তখন আর কাকে স্বাধীনতা বিরোধী বলে গালি দেয়া যায়? জাতীয় পতাকা পোড়ালে জামাতকেও কি দোষ দেয়া যায়? বগাছড়ি ও মাটিরাঙ্গার এ দু’টি ঘটনা হচ্ছে নমূনা মাত্র, এ ধরনের আরও বহু ঘটনা আছে, তার বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিকভাবে এ সব কারণে জনমনে আশঙ্কা সন্দেহ বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে।

নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সরকার-প্রশাসনের নানা সংস্থায় নানা ছদ্মবেশে যেভাবে তৎপর, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনা ছাউনিতে পাকিস্তানি ভাবধারা জিইয়ে রাখতে কতিপয় চিহ্নিত সেনা কর্মকর্তা নানাবিধ কৌশলে সক্রিয়। নানা বাহানায় বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের অন্যায় পক্ষাবলম্বন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে উস্কানি, দাঙ্গা বাধাতে মদদদান –এসব অব্যাহত আছে।

২০০৯ সালে যেভাবে খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ভূমি কমিশনকে পাকিস্তানপন্থী ও কায়েমী স্বার্থবাদী সেনাচক্রটি নেপথ্যে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান কমিশনের কাজেও এ চক্রটি প্রকাশ্যে বা গোপনে হস্তক্ষেপ করবে না বা কমিশনের কোনো কোনো সদস্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? যদি সে রকম হয়, তাহলে বর্তমান কমিশনও কতটুকু স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে এবং দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবে সে ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবে সংশয় থেকে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত “অপারেশন উত্তরণের” নামে মূলত: জারি রয়েছে সেনা শাসন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে বিতর্কিত “১১দফা নিদের্শনা”র মাধ্যমে সেনা কর্তৃত্বকে আইনী বৈধতা দেয়া হয়েছে। ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে হলে অবশ্যই সেনা কর্তৃত্ব থেকে কমিশনকে মুক্ত রাখতে হবে।

সংগ্রামী বন্ধুরা,
ভূমি সমস্যা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যান্য সমস্যার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পর্কিত একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যার মূলে রয়েছে চিটাগাঙ হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ এর ভূমি ও বসতিস্থাপন সংক্রান্ত ধারার বেপরোয়া সংশোধন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বহিরাগত আমদানি, জোরপূর্বক ভূমি দখল ইত্যাদি। তাই  বিদ্যমান আইনী প্রক্রিয়া ও আইনী কাঠামোর মধ্যে এই সমস্যাকে সমাধান করার চেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ ‘১৯০০ সালের রেগুলেশন’ অতীতে বিভিন্ন সময় শাসকগোষ্ঠী যে যে সংশোধনী এনেছে, তা তার সব ক’টিই আসলে গণবিরোধী। পার্বত্যবাসীর স্বার্থহানি ঘটিয়ে প্রণীত আইন-বিধি (যাকে ‘প্রচলিত আইন’ বা ‘বিদ্যমান আইন’ বলে উল্লেখ করার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়) দিয়ে ভূমি সমস্যার প্রকৃত সমাধান আশা করা যায় না।

তাছাড়া কমিশন আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইনের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও ‘রীতি ও পদ্ধতির’ ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। এক কথায় যে ‘আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ অনুসরণ করে কমিশন কাজ করবে সেগুলো স্পষ্ট উল্লেখ নেই।

প্রশ্ন আরও এসে যায়, সরকার ভূমি কমিশনের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করতে ১৫ বছর সময় নিয়েছে, তারপরও আইনটি পুরোপুরি গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে নি। আর বর্তমান সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে কাজ করার সময় অচলাবস্থা দেখা দিলে সরকার সেটা নিরসন করতে আর কত বছর সময় নেবে, তা কে বলতে পারে? তাই সঙ্গত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেদখলকৃত জমি ফিরিয়ে দিতে বা ভূমি সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ব্যাাপারে জনমনে যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা  অত্যন্ত স্বাভাবিক।

ক্ষমতাসীন সরকার যদি প্রকৃতই ভূমি সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হয়, তাহলে সংসদে এ ব্যাপারে আইন পাস করা জরুরি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ-াদেশ দেয়ার লক্ষ্যে দায়মুক্তি আইন বাতিল করতে যেভাবে বিধি রচিত হয়েছিল, অনুরূপভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামেও ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথাগত ভূমি অধিকার  স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করা অত্যাবশ্যক। প্রসঙ্গত আরো বলা প্রয়োজন যে, জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত আইনী ধারা বাতিল করাসহ তার ফৌজী শাসন অবৈধ বলে হাইকোর্ট কর্তৃক রায়ও দেয়া হয়েছে। এমনকী কেড়ে নেয়া হয়েছে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদকও। জিয়ার ফৌজী শাসন ও প্রবর্তিত আইন অবৈধ হওয়ায় অত্যন্ত সঙ্গত কারণে জিয়া-এরশাদ কর্তৃক আশির দশকে পুনর্বাসিত সেটলাররাও অবৈধ। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইনীভাবে অবৈধ ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সে সমস্ত বিধি বহাল রাখা হয়। বর্তমান সময়ে জিয়ার ফৌজী শাসন অবৈধ হওয়ার কারণে তৎকালীন অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আলি হায়দার খান ও অন্য সরকারি কর্মকর্তাগণ কর্তৃক জারিকৃত গোপন সার্কুলার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধি লংঘন করে সেটলারদের যে দলিলপত্র (কবুলিয়ত) প্রদান করা হয়েছে, সে সব অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা জরুরি। কারণ ঐ সমস্ত অবৈধ কবুলিয়ত দেখিয়ে সেটলাররা ভূমির ওপর মালিকানা দাবি করছে। যদি একই ভূমির একাধিক মালিকানার দাবি উত্থাপিত হয়, তাহলে তা দেশের অন্য অঞ্চলের মতো প্রচলিত আইনে নিরসন হবে না। এ ধরনের বিরোধের নিষ্পত্তির আইনী ভিত্তি হচ্ছে প্রথাগত আইন, যা ১৯০০ সালের রেগুলেশনে বর্ণিত রয়েছে। কেবল দলিল কবুলিয়তের (যা আইন লংঘন করে ফৌজী শাসক কর্তৃক প্রদত্ত এবং ভূয়া) মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত ভূমি মালিক নিরুপণ করা সম্ভব নয়। কারণ সেনা দমন-পীড়ন অভিযানের সময় অধিকাংশের দলিল পুড়ে গেছে, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের কার্যালয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে পুড়িয়ে দিয়েও দলিল নষ্ট করা হয়েছে। তাছাড়া জুমচাষীদের জমির দলিল নেই, ১৯০০ সালের রেগুলেশন অনুসারে তা প্রয়োজনও পড়ে না। অথচ তার বিপরীতে সেটলারদের রয়েছে জাল দলিল ও অবৈধ কবুলিয়ত। এখন কেবল দলিল কবুলিয়তের ভিত্তিতে মালিকানা নির্ধারণ করতে গেলে যে সমস্যা দেখা দেবে–তা নিশ্চিত।

সংসদে এখন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, এ গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের জন্য দরকার শুধু সদিচ্ছা। আওয়ামী লীগ যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে ফৌজী শাসকদের জারিকৃত আইনকে অবৈধ মনে না করে, বরং তা ব্যবহার করে স্বার্থ হাসিল করতে উদ্যোগী হয় (ইতিপূর্বে বার বার তাই ঘটেছে) সেটা চরম নীতিহীনতা। সারা দেশের ক্ষেত্রে যা অবৈধ ও অপরাধ, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে তা অবাধে চলতে দিয়েছে শাসকগোষ্ঠী, এর মধ্য মধ্য দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর স্ববিরোধিতা দ্বিমুখী আচরণ ধরা পড়ে। শাসকগোষ্ঠীর এ ধরনের নীচ হীন বৈমাত্রেয় আচরণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয় না, তারা বিভক্ত ও দুর্বল করতে পারে মাত্র।

প্রিয় দেশবাসী,
ভূমি কমিশন আইনের উপরোক্ত দুর্বলতা সত্ত্বেও ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার বা ভূমি কমিশনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টায় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে, বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দিচ্ছে। আপনারা এটাও নিশ্চয় অবগত আছেন যে, ‘পার্বত্য চুক্তির’ বিভিন্ন দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার দিক তুলে ধরে সমালোচনা করলেও তা বাস্তবায়নে ইউপিডিএফ কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নি, বরং চুক্তি স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম বিষয়ে আমাদের পার্টির অবস্থান প্রমাণ করে যে, ইউপিডিএফ উক্ত প্রতিশ্রুতি বিষয়ে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক ছিল এবং এখনো আছে। ইউপিডিএফ মনে করে ভূমি সমস্যা সমাধানে আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা বা কমিটমেন্ট। সরকারের যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানে প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকে, তাহলে আইনের যে যে ত্রুটি রয়েছে তা সংশোধন করা এবং নবগঠিত সদস্যদের পরিবর্তন করে গ্রহণযোগ্য আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দিয়ে কমিশন পুনর্গঠন করা। কাজেই সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানে অতীতের কালক্ষেপণের মাধ্যমে পাহাড়িদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার নীতি থেকে সরে এসেছে কিনা সে ব্যাপারে পর্যবেক্ষণের দরকার রয়েছে। এ পর্যায়ে বহুল উচ্চারিত আইনী শাস্ত্রবাক্য ‘Justice delayed is justice denied’ অর্থাৎ ‘ন্যায়বিচার বিলম্বিত করার অর্থই হলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা’–কথাটি আমরা সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

সংগ্রামী জনতা,
হারানো ভূমি আদায়ের দাবিকে কেবল নিজের বাস্তুভিটা ফিরে পাবার ব্যক্তি-পারিবারিক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা হবে গুরুতর ভুল ও অপরিণাদর্শিতা। ভূমি আদায়ের তৎপরতাকে রাজনৈতিক আন্দোলনে উন্নীত করতে না পারলে তা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র দরখাস্ত দাখিল করে অর্থাৎ আবেদন নিবেদনে সব হাসিল হবে “সরকার সহানুভূতিশীল, দরদী” এমন অতিরিক্ত আশা-ভরসা করে নিচেষ্ট, উদ্যোগহীন ও আন্দোলনবিমুখ হয়ে পড়া হবে আত্মঘাতি ও অপরাধের সামিল।

ভূমি কমিশন কর্তৃক দরখাস্ত আহ্বানের পর থেকে বিভিন্ন তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন গোষ্ঠী নামে-বেনামে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে কায়েমীস্বার্থবাদী সেনাচক্রের তৎপরতা যথেষ্ট চিন্তা ও উদ্বেগের বিষয়। আইনী সহায়তা দেবার নাম করে অথবা দরখাস্ত-ফরম পূরণে সহায়তার উছিলায় একশ্রেণীর লোক মৌসুমী ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারে, সে ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। সাধারণ জনগণকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষুদ্র স্বার্থ হাসিলের যে কোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একপক্ষের বিভ্রান্তি প্রতিপক্ষের জয়ের সহায়ক। এ যাবত পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ি জনগণকে নানা বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে। শাসন-শোষণ জারি রাখতে শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে জনমনে হতাশার বিষ ঢুকিয়ে অধিকারকামী বৃহৎ অংশকে নিষ্ক্রিয় ও উদাসীন রাখতে চেয়েছে। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে জনগণ যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, সে জন্য চক্রান্ত করেছে। সমাজের মধ্যকার চিহ্নিত একটি অংশ প্রায় সময়ই গাছেরটা ও তলারটা কুড়িয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ভীষণ পারদর্শী, যারা সব সময়ই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার পক্ষে জয়ধ্বণি দেয়। তারা সাধারণদের বাগিয়ে নিয়ে দলভারী করার চেষ্টা করে, পরে তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়। এদের চিনে রাখুন, সতর্ক হোন!

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমি কমিশনের ব্যাপারে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং তার আলোকে বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশোধিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ও কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের (যা এখনো অজানা) ব্যাপারে অতি আশাবাদ যেমন ক্ষতির কারণ হতে পারে, হৃত ভূমি পুনরুদ্ধার আন্দোলনে জরুরি প্রয়োজনের সময় জনগণকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ফেলতে পারে, দোদুল্যমানতা সিদ্ধান্তহীনতা জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্যোগহীনতার জন্ম দিতে পারে।

তাই সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমরা নিম্নোক্ত করণীয় নির্ধারণ করে সেগুলো পালনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি:
১। যারা ভূমি বেদখলের শিকার হয়েছেন বা যাদের জমি ভূয়া দলিলের মাধ্যমে অথবা আইন বহির্ভূত পন্থায় কেড়ে নেয়া হয়েছে, তারা সেই জমি ফিরে পাওয়ার জন্য ভূমি কমিশনে নিয়ম মোতাবেক দরখাস্ত করুন এবং আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হারানো জমি ফিরে পেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান।

তবে কেবলমাত্র দরখাস্ত দিয়ে নিষ্ক্রিয় বা হাতগুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না, একই সাথে ভূমি উদ্ধারের আন্দোলনের জন্যও প্রস্তুত থাকুন। দরখাস্ত জমা দেয়াকে শেষ বা একমাত্র কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করবেন না, এটি হচ্ছে একটা প্রক্রিয়ার একটা পদক্ষেপ মাত্র। সরকার কেবল জনগণের ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রশমনের লক্ষ্যে এ কাজে হাত দিয়েছে। এটি আমাদের দিক থেকে সামগ্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন।

২। হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারের এই আইনী লড়াইকে উচ্চতর রাজনৈতিক সংগ্রামে উন্নীত করুন। কারণ ভূমি পুনরুদ্ধারের আন্দোলন হলো মূলত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন।

৩। ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখুন। যাদের নিয়ে ভূমি কমিশন গঠিত হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা বজায় না থাকার আশঙ্কা রয়েছে, যদি সেটা ঘটে বা কোনো মহল কমিশনের কোনো সদস্যকে অযাচিতভাবে প্রভাবিত করতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন।

৪। যদি সরকার কিংবা কোনো মহলের পক্ষ থেকে ভূমি কমিশনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে সেই ষড়যন্ত্র বানচাল করতে তৎপর হোন।

৫। যদি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের নামে বহিরাগতদের অবৈধ বন্দোবস্তকে আইনগত বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে সেই অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন।

যে কোনো আন্দোলনে জয়লাভের জন্য দরকার সঠিক নেতৃত্ব, অর্থাৎ সঠিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিচালিত আদর্শভিত্তিক সুশৃঙ্খল একটি পার্টি। রাজনৈতিক পার্টি ব্যতীত জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও বিক্ষিপ্ত তৎপরতাকে সংগঠিত করা যায় না। ইউপিডিএফ এ পর্যন্ত সঠিক পথে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নিরিখে আন্দোলন পরিচালনা করেছে, বিভিন্ন স্থানে ভূমি পুনরুদ্ধার আন্দোলনে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছে। অতীতে পার্টি (ইউপিডিএফ) ও জনগণ এক মন এক প্রাণ হয়ে লড়াই করে বিভিন্ন জায়গায় ভূমি বেদখল প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে, সেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করলে হারানো জমিও অবশ্যই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। তাই কোনো ধরনের অপপ্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।
* ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে ও হৃত জমি পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে মনপ্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন, ভূমি পুনরুদ্ধার হবেই!
* পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরুন!
* বিজয় আমাদের অনিবার্য!

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)
কেন্দ্রীয় কমিটি
ইউপিডিএফ-এর কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত। ৩ অক্টোবর ২০১৬।

————————–

সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.