মহামতি লেনিনের ১৪৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

0
1

ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটিনিউজ.কম
Lenin-BG20120421185041পৃথিবীর বুকে রাশিয়ায় প্রথম শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র পরিচালনার যুগান্তসৃষ্টিকারী নভেম্বর বিপ্লবের নেতা মহামতি ভি আই লেনিনের ১৪৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল রাশিয়ার মহানদী ভোলগার তীরে সিমবির্স্ক শহরে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের জন্ম।

সমাজতান্ত্রিক জাগরণের মাধ্যমে রুশ বিপ্লবের নায়ক কমরেড ভি আই লেনিনের সেই বলশেভিক বিপ্লব আলোড়িত করেছিল গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে। তার আদর্শে মার্কসবাদকে বুকে ধারণ করে লাল পতাকাতলে একীভূত হয়ে সমাজ পরিবর্তনের শপথ নিয়েছিল হাজারো মানুষ।

লেনিন এই বিশ্বের প্রথম স্বার্থক বিপ্লবী যিনি একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বাস্তব রূপ দেন। রাশিয়ার শোষিত মানুষকে অত্যাচারী জারের শাসন থেকে তিনি শুধু মুক্তই করেননি, বরং তার আদর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বের অগণিত মানুষ শোষণ-নিষ্পেষণের হাত থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে পায়।

আত্মত্যাগে অবিস্মরণীয় এই মানুষটি নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দের কথা ভাবেননি, চিরকাল কাটিয়েছেন দারিদ্রের মাঝে। জীবনের অনেকটা সময় তার কেটেছে নির্বাসনে।

লেনিন ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সমাজ, রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিজীবনে মার্কসবাদের প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি রুশ বিপ্লবকে সার্থক করে তোলেন। তার আদর্শের কারণে গোটা বিশ্বই কেঁপে উঠে। মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তিনি পুঁজিবাদের ভিত্তিকে সরাসরি আঘাত করেন।

১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি ব্যক্তি লেনিনের মৃত্যু হয়। কিন্তু তার আদর্শকে ধারণ করে আজও বিশ্বের বিপ্লবীরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন।

মনীষী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
লেনিনের পিতা ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উইলিয়ানভ ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক, যিনি অসাধারণ মেধা আর অধ্যবসায়ের ফলে পরবর্তীতে শিববির্স্ক গুবেনিয়ার স্কুল পরিচালক হন। তিনি গণশিক্ষার ব্যাপারে অনেক কিছু করেন-গ্রামাঞ্চলে স্কুল খোলেন, শিক্ষকদের সাহায্য করেন, অরুশীয় অধিবাসীদের শিক্ষা বিস্তারের দিকে তার খুবই নজর ছিল।

লেনিনের মা মারিয়া আলেক্সন্দ্রভনা পড়াশোনা করেন বাড়িতে। কয়েকটি বিদেশি ভাষা জানতেন, সাহিত্যে তার ভালো দখল ছিল, আর খুব ভালোবাসতেন সঙ্গীত।

ইলিয়া ও মারিয়া উইলিয়ানভ পরিবারে ছেলেমেয়ে ছিল মোট ছয় জন আন্না, আলেক্সান্দর, ভ্লাদিমির, ওলগা, দিমিত্রি এবং মারায়া। বাবা-মা তাদের জন্য বহুমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, চেয়েছিলেন তাদের সৎ, বিনয়ী, পরিশ্রমী, জনগণের অভাব অনটনের প্রতি সজাগ করে তুলতে।

পাঁচ বছর বয়সেই ভ্লাদিমির পড়তে শেখে, নয় বছর বয়সে ভর্তি হয় সিমবির্স্ক জিমনেসিয়মের প্রথম শ্রেণীতে। পড়াশোনায় ভ্লাদিমির ছিলেন খুবই মনোযোগী। মেধা আর পাঠের প্রতি গুরুত্ববোধে তাকে আলাদা করে চেনা যেত, কঠিন পাঠের বেলায় সে আগ্রহেই সঙ্গীদের বুঝিয়ে দিয়ে সাহায্য করত। ক্লাসের পর ক্লাস উত্তীর্ন হয়ে এলো ভ্লাদিমির প্রথম শ্র্রেণীর পুরস্কার পেয়ে।

পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন লেনিন। তার অধীত সাহিত্যের মধ্যে একটা বড় অংশ জুড়েই ছিল বিপ্লবী গণতন্ত্রী লেখকরা। এরা ছিলেন বেলিনস্কি, হেতসের্ন, চের্নিশেভস্কি, দব্রলিউবভ ও পিসারেভের রচনা। এদের অনেকের লেখা তখন নিষিদ্ধ ছিল, তবু ভ্লাদিমির তা বাদ দেননি। লেনিনকে খুবই আকৃষ্ট করত চের্নিশেভস্কির What’s the Duty উপন্যাস।

কিশোর লেনিনের চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে রুশ সাহিত্য ও পরিবেশের জীবন পর্যবেক্ষণের প্রভাবে। এ সময় পুঁজিবাদ দ্রুত বিকাশ পাচ্ছিল, যান্ত্রিক টেকনোলজি ও হাজার হাজার মজুর নিয়ে চালু হচ্ছিল কলকারখানা। পুঁজিবাদী শোষণের সঙ্গে এসময় যোগ দিয়েছিল ভূমিদাস প্রথার সম্পর্ক। জার সরকারের স্বৈরাচার, জমিদার ও পুঁজিপতিদের নিপীড়ন; কৃষক দরিদ্র ও অধিকারহীনতা কিশোর লেনিনের মনে উৎপীড়িতদের প্রতি সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে।

লেনিনকে আরও আলোড়িত করে ১৮৮৭ সালে যখন তার দাদা আলেক্সান্দর উইলিয়ানভ জার তৃতীয় আলেক্সান্দরকে হত্যা করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। দাদার মৃত্যুর পর ভ্লাদিমির বিপ্লবী সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন।

দাদা ও তার কমরেডদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করলেও ভ্লাদিমির কিন্তু তাদের পথ বর্জন করেন। তিনি ভিন্নভাবে সমাধানের চিন্তা করেন। হত্যার মাধ্যমে অধিকার আদায়ের বিরুদ্ধে থেকে তিনি সমঝোতার মাধ্যমে মেহনতিদের অধিকার আদায়ের পক্ষে ছিলেন।

এসবের মধ্যেও তিনি কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। প্রগতিশীল ধ্যান ধারণার ছাত্র-যুবদের নিয়ে তিনি ১৮৮৭ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে সক্রিয় অংশ নেন। যদিও এ অপরাধে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সে সময় জারের স্বৈরশাসনে বিরুদ্ধে ‘নারোদবাদীরা’ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। নারোদবাদ হচ্ছে মেহনতীদের শ্রমমূল্য প্রতিষ্ঠার জন্য জার পুজিপতিদের হত্যা করা।

জারের বিরুদ্ধে হলেও লেনিন নারোদবাদীদের বিরুদ্ধে ছিলেন সবসময়। তিনি হত্যাযজ্ঞ এবং সন্ত্রাসকে কিছুতেই মানতে পারেননি। লেনিন সবসময় মার্কস এবং এঙ্গেলসের ধারণা ও তত্ত্বকে গুরুত্ব দিতেন।

১৮৯২ সালে লেনিন সামারায় প্রথম মার্কসবাদী দল গঠন করেন।

১৮৯৩ সালের আগস্ট মাসে লেনিন সামারা থেকে পিটার্সবুর্গে চলে আসেন। পিটার্সবুর্গ ছিল সে সময় রাশিয়ার রাজধানী। বিপুল উদ্যম আর উদ্দীপনায় লেলিন বিপ্লবী কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। মার্কসদের গভীর জ্ঞান এবং রুশীয় পরিস্থিতে তা প্রয়োগের দক্ষতা, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে অবিচল থাকায় পিটার্সবুর্গে মার্কসবাদী স্বীকৃত নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

এ সময় নারোদবাদীরা লেনিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাঠে নামে এবং তার নীতিকে ভিত্তিহীন বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা প্রচারণা ও ব্যাখ্যা চালাতে থাকে। শুধু নারোদবাদীরাই নয় তথাকথিত ‘বৈধ মার্কসবাদী’রাও তার বিপক্ষে মাঠে নামে। এই বৈধ মার্কবাদীরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, তারা সরকার কর্তৃক অনুমদিত পত্র-পত্রিকায় লিখত এবং মার্কসবাদকে বুর্জোয়াদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করত। লেনিন এই নারোদবাদী ও ‘বৈধ মার্কসবাদী’দের বিরুদ্ধে মেহনতী মানুষদের বোঝাতে থাকেন এবং বড় বড় কল-কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘বিপ্লবী মার্কসবাদী পার্টি’ গড়ে তোলার জন্য।

জার সরকার ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লেনিনকে ৩ বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে। এখানে থাকা ভ্লাদিমির ইলিচের পক্ষে সহজ ছিল না। রেললাইন থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে এক অজ সাইবেরীয় গ্রাম। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। প্রত্যক্ষ বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে বিছিন্ন হলেও তিনি পুরোদমে পড়াশোনা ও লেখালেখি শুরু করেন।

লেনিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ’ নির্বাসিত জীবনেই লিখে শেষ করেন। ১৮৯৯ সালে তা প্রকাশিত হয়। বইটি মূলত কার্ল মাকসের ‘পুঁজি’ বইটির সরাসরি পূর্বানুসরণ। ১৯০০ সালের ২৯ জানুয়ারি নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হয়।

১৯১৪ সালের প্রথমার্ধে রাশিয়ায় বিপ্লবী আন্দোলন ক্রমেই ব্যাপক হয়ে উঠল এবং পনের লক্ষ শ্রমিক ধর্মঘট করে। অর্থনৈতিক ধর্মঘটের সঙ্গে রাজনৈতিক ধর্মঘট জড়িয়ে পড়েছিল। এ বছরই ইউরোপে দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে শুরু হয় লড়াই। যা বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। এদের এক দলে জার্মানি ও অস্ট্রো হাঙ্গেরি এবং অন্যদলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া। দুই দলই অনুসরণ করছিল রাজ্যগ্রাসী নীতি। পরে যুদ্ধে যোগ দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অন্যান্য রাষ্ট্র।

যুদ্ধের সময় অস্ট্রিয়ার সরকার জার সরকারের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে লেনিনকে গ্রেফতার করে। তবে লেনিনের সমর্থকদের বিক্ষোভের কারণে দুই সপ্তাহ পর তিনি ছাড়া পেয়ে সুইজারল্যান্ড চলে যান।

বিভিন্ন স্থানে গোপনে রাজনৈতিক কাজ করে প্রায় দশ বছর পর ১৯১৭ সালের ৩ এপ্রিল রাতে লেনিন রাশিয়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে শ্রমিক শ্রেণী ও গরীব কৃষকদের ক্ষমতা দখলের জন্য বিপ্লব ব্যবহারিক প্রস্তুতির কর্তব্য, সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য তৈরি হবার জন্য জোর দিলেন। ভ্লাদিমির লেনিন বুজোর্য়া সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থান, প্রলেতারীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালে তা সমর্থন করে দেশে ২৫০টির বেশি সোভিয়েত।

১ অক্টোবরের পত্রে লেলিন আর বিলম্ব না করে অভ্যুত্থানে এগুতে বলেন। ২৪ অক্টোবর রাত্রে পেত্রগ্রাদের ফাঁকা রাস্তাগুলোয় যখন কসাক ও ইউঙ্কার বাহিনী টহল দিচ্ছিল তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেলিন স্মোলনি আসেন এবং অভ্যুত্থান পরিচালনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন।

লেনিন ও বলশেভিক পার্টির নেতৃত্ব শ্রমিক, লালরক্ষী, সৈন্য ও নাবিকদের আত্মোৎসর্গী সংগ্রাম ও বীরত্বের ফলে বিশ্ব ইতিহাসে এক মহাসাফল্যের ঘটনা ঘটে- জমিদার ও পুঁজিবাদ ধ্বংস হয়।

২৫ অক্টোবর সকাল ১০টায় পেত্রগ্রাদ সোভিয়েতের অধীনস্থ সামরিক বিপ্লব কমিটি লেনিনের বিবৃতি প্রকাশ করে ঘোষণা দিল, ‘যে আদর্শের জন্য জনগণ লড়ছিল তা সফল হয়েছে।’ এদিন সন্ধ্যাতেই স্মোলনিতে শুরু হয় দ্বিতীয় সোভিয়েত কংগ্রেস। এতে নানা অঞ্চল থেকে ৬৫০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ৪০০ জনই বলশেভিক।

২৬ অক্টোবর কংগ্রেসে লেনিনের বক্তৃতাকে অভিনন্দিত করে প্রতিনিধিরা। কংগ্রেসের প্রতিনিধি এ এ আন্দ্রেয়েভ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, ‘লেলিন যেই মঞ্চে এলেন অমনি সমস্ত সভাকক্ষ উঠে এগিয়ে যায় লেনিনের দিকে। অবিরাম করতালি আর লেনিন জিন্দাবাদ ধ্বনিতে মুখরিত প্রাঙ্গণে তিনি বহুক্ষণ বক্তৃতা শুরু করতে পারেননি।’

এভাবেই যাত্রা শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সোভিয়েত জনগণ যে বিরাট রূপান্তর সাধন করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে মার্কস-লেনিনবাদের বিজয়।

১৯২৩ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে লেনিনের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে আসে। এভাবে কয়েক মাস চলার পর ১৯২৪ সালের ২১শে জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান লেনিন। আর সেই সাথে অবসান হয় একটি বিপ্লবী চরিত্রের, একজন রাষ্ট্র নায়কের, এক মেহনতীদের নেতার।

২৩ জানুয়ারি ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের শবাধার গরইক থেকে মস্কোয় এনে ইউনিয়ন ভবনের সভাকক্ষে রাখা হয়।

২৭ জানুয়ারি বিকাল চারটায় লেনিনের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শুরু হয়। ক্রেমলিনের দেয়ালের কাছে, বিশেষভাবে নির্মিত ম্যুজোলিয়ামে স্থাপিত হয় লেনিনের দেহ। পেত্রগ্রাদের শ্রমিকের অনুরোধে পেত্রগ্রাদের নাম হয় লেনিনগ্রাদ।

সূত্র: অনলাইন


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.