রামগড় হামলা: যা দেখে ও শুনে এলাম

0
2

– অপু চাকমা

মধ্যবয়স্ক মারমা মহিলা স্বামী বয়সের ভারে হাঁটতে পারে না। শণখোলা পাড়ার উত্তর পার্শ্বে ছিল তাদের অভাব অনটনের সংসার। দুই কন্যা, তাদেরকে বিয়ে দেয়া হয়েছে অনেক দূরে, ভিন পাড়ায়। টানা পোড়নের সংসার এতদিন কোন রকম চলছিল। কিন্তু তাও হঠাত্‍ থেমে যায় গত ১৭ এপ্রিল। সেদিনের বর্বরতম সেটলার হামলার নির্মম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের কুঁড়ে ঘরটি। হিংসার লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে তাদের সবকিছু। সর্বস্বান্ত হয়ে ঘটনার বিশ দিন পর ভারী পলিথিন দিয়ে কোন রকম ঝুপড়ি বানিয়ে এখন ঠাই দাঁড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টা। তারা জানে না আর কোনদিন তাদের ঘর হবে কিনা, জানে না আগামী দিনগুলো কিভাবে যাবে। চোখে মুখে এখন হতাশা ও অনিশ্চয়তার ছাপ। খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলার আক্রান্ত ছয়টি পাহাড়ি গ্রামের সর্বত্র এখন এই চিত্র।

কথায় বলে যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। পাহাড়িদের শ্বাস হলো ভূমি। এই ভূমি কেড়ে নেয়া মানেই তাদের শ্বাস রুদ্ধ করে দেয়া; অর্থাত্‍ মৃত্যু। কিন্তু দুনিয়ায় কে মরতে চায়? কোন জাতি তার অস্তিত্ব হারাতে চায়? ভূমিপুত্র বলে হাজার বছরের ঐতিহ্যে পাহাড়িরা গর্ববোধ করে ও স্বপ্ন বুনে। তাই ভূমির ওপর যখন আঘাত আসে, তখন জীবন জাগানিয়া আশাকে ধরে রাখার জন্য তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এমনকি রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও মাতৃপ্রতিম ভূমিকে রক্ষা করে। গত ১৭ এপ্রিলের ঘটনাও তাই। সেদিন শতাধিক পাহাড়ি নারী পুরুষ শণখোলা পাড়ায় মারমাদের ৫০ একরের মতো জমি বেদখলের প্রতিবাদে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

যেভাবে ঘটনাটি ঘটে

এটি মূলতঃ ১৯৮০ দশক থেকে প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের নেয়া কূটকৌশলের একটি অংশ। রামগড় উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের শণখোলা পাড়ায় জমি বেদখলের উদ্দেশ্যে সেটলাররা প্রথমে ১৪ এপ্রিল কথিত বিরোধপূর্ণ জমির জঙ্গল কাটতে যায়। সে সময় রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মংশাপ্রু চৌধুরী, হাফছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপারের কাছে পাহাড়িরা অভিযোগ করে৷ কিন্তু তারপরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেটলারদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

এরপর ১৭ এপ্রিল, রোববার, জালিয়াপাড়ার বড়পিলাক থেকে ৩০ জনের একদল সেটলার ওই জমি দখল করতে গেলে বড় ধরনের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরে সেটলাররা সেনাবাহিনীর সহায়তায় শণখোলা পাড়া, সলুডং পাড়া, রেম্রং পাড়া, মানিকছড়ি, তৈকর্মা পাড়া ও পদাছড়ায় হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুট করে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে মোট ১০৫টি ঘর পুড়ে যায়। ক্ষতি হয় কোটির অধিক মূল্যমানের সম্পত্তি।

ঘটনার পরবর্তী চিত্রে দেখা যায় পাহাড়ি জনগণ আগের তুলনায় আরো বেশী সংগঠিত হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। অনেকে নিজ কাঁধে বহন করে এই ত্রাণ সামগ্রী তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এ ধরনের সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পাহাড়িদেরকে আরও সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগাচ্ছে। বিশেষ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভবিষ্যতের যে কোন বেদখলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তারা আজ অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাদের চোখে মুখে রয়েছে প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই চরম দুঃসময়ে সবাইকে আজ তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের মনে আরো সাহস ও মনোবল জোগাতে হবে।

নাহলে সেন্ডেল পেটা শুরু হবে”
তারা আমাদের অনুপ্রেরণার উত্‍স হন যখন তারা ঘটনার পর ত্রাণ দিতে আসা আর্মিদের বলেন
, “আমাদের তোমরা কি সহযোগিতা করবে, তোমরাই ঘটনার সময় আমাদের ডাব পেরে খেয়েছ। সেটলারদের সাথে আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছ। লুটে নিয়েছ আমাদের সম্পত্তি। আমরা তোমাদের ত্রাণ নেবো না। তোমাদের ত্রাণ আমাদের প্রয়োজন নেই। তোমাদের বন্দুক আছে, আমাদের আছে স্যান্ডেল। এখনি এখান থেকে চলে যাও, নাহলে সেন্ডেল পেটা শুরু হবে।” শেষে আর্মিরা ত্রাণ সামগ্রীগুলো এমনি ফেলে রেখে চলে যেতে বাধ্য হয়। এ ধরনের কথাবার্তা মানুষ কখন বলে? যখন না বলে তার আর কোন উপোয় থাকে না। অর্থাত্‍ যখন তার পিঠ দেয়ালে ঠেকে। তখন সে সামনে এগোয়, প্রতিবাদ মুখর হয় ও যুদ্ধ করে। এ রকম অনেক প্রতিবাদী ঘটনা আমরা তাদের মুখ থেকে শুনেছি।

এডিসির প্রতারণার ফাঁদ
এ রকম আরেকটি ঘটনার বয়ান তারা দেন এভাবে: “হামলার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে খাগড়াছড়ি জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) শণখোলা পাড়ার পশ্চিম প্রান্তে রাস্তায় এসে আমাদের খবর পাঠান আলোচনা হবে বলে। এদিকে আমরা জানতে পারি এডিসি সাহেব সঙ্গে করে মিডিয়া কর্মী নিয়ে এসেছেন। এছাড়া আরো জানতে পারি সেটলারদেরকে বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদের গাড়িতে বোঝাই করে রাখা হয়েছে। যখনি আমরা আলোচনার জন্য যাব
, গাড়ি বোঝাই সেটলাররা এসে আমাদের সাথে যোগ দেবে আর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রচার করা হবে এলাকায় শান্তি বিরাজ করছে, পাহাড়ি বাঙালি ভেদাভেদ ভুলে গেছে, এডিসির নেতৃত্বে শান্তি মিছিলে সবাই সামিল হয়েছে। আমরা তাদের কৌশল বুঝতে পেরে আলোচনায় যাইনি। এডিসি সারাদিন বসে থেকেও কোন ফল পেলেন না। এভাবে আমরা নীরবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি৷ প্রশাসনকে তো আর লাঠি দিয়ে মারা যায় না।”

সংগ্রাম চলবে
যাই হোক
, এত বড় হামলার পরও শণখোলা পাড়াসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনগণের মনোবল ও দৃঢ়তা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি, অনুপ্রেরণা পেয়েছি। ইতিপূর্বে তারা অনেক বার নিজ জমি থেকে উত্‍খাত হয়েছিলেন। ভারতে মানবেতর শরণার্থী জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। চুক্তির পরও তাদের জীবনে শান্তি আসেনি। ভূমি বেদখল হওয়ার দুশ্চিন্তা কাটেনি। নির্যাতিত নিগৃহীত হওয়ার ভয় দূর হয়নি। সেই সাথে বেঁচে থাকার সংগ্রামও শেষ হয়নি। এই সংগ্রাম চলবে… প্রয়োজনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলবে।

——— শেষ ———

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.