লামার আজিজনগরে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মারমা উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র!

0
0

সিএইচটি নিউজ ডটকম
lama213বান্দরবান॥ দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রাম বান্দরবানের লামা উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম  আজিজনগর। চট্টগ্রামের চকোরিয়া সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলটি এক সময় সম্পূর্ণ মারমা অধ্যুষিত  ছিল। বর্তমানে আজিজনগর প্রায় বাঙালিদের দখলে চলে গেছে। কেবলমাত্র বাজারের পাশে হেডম্যান পাড়া নামক ছোট্ট একটি জায়গায় ঠাসাঠাসি করে বাস করছে শ’ খানেক মারমা পরিবার।

একসময় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও বর্তমানে তারা দারিদ্র্যের নিগড়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা। তাদের গ্রামের চারদিকে এখন বাঙালিদের ঘনবসতি। পাহাড়ি মারমাদের কাছে থেকে নানাভাবে জমি হাত করে তারা সেখানে বসতি গড়ে তুলেছে। বিশেষত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে তাদের আগমন সেখানে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। অপরদিকে এলাকার মারমারা  হয়ে যায় নিজ ভূমে পরবাসী —  সংখ্যালঘু। তাদের এলাকার নামটিও বদলে দেয়া হয়।

বর্তমানে এই হতদরিদ্র অসহায় মারমাদেরকে সেখান থেকেও উচ্ছেদ করে বিতাড়িত করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। মাদক বিরোধী অভিযান হলো এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ।

এই তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানের কল্যাণে আজিজনগর এখন প্রায়ই মিডিয়ায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকে। সেখানে সর্বশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয় গত বছর ২৩ ডিসেম্বর। দুলাহাজরা থেকে র‌্যাব ও পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে এক ম্যাজিষ্ট্রেট এই অভিযান পরিচালনা করেন। এর আগে ২৯ অক্টোবর ও ২৮ নভেম্বর দু’বার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।

কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযানের নামে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা মারমাদের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর করে ও লুটপাট চালায়। আসবাবপত্রসহ বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করে দেয়। অভিযানের সময় মাদক উৎপাদন ও ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা ও গ্রেফতার করা হয়। এই সব মামলা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসার জন্য গরীব মারমাদেরকে জমিসমাসহ সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে হয়। ফলে এতে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।

হেডম্যান পাড়ার এক যুবক এই প্রতিবেদককে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত বছর ভ্রাম্যমান আদালত পাঁচ জনের কাছ থেকে মামলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা করে এক লক্ষ টাকা নেন। উছেলা মারমা নামের একজনকে মামলা থেকে বাদ দেয়ার জন্য লামা থানায় ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়।

গ্রামের লোকজনের সাথে কথা বলে আরো জানা গেছে, এলাকার বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। সর্বশেষ সুইসাই মং মারমা ও চচৈ মং বৈদ্যসহ ১০ – ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার ও মামলা থেকে নারীরাও বাদ যায় না। ২০১৩ – ১৪ সালের দিকে এসিংমে ও হাইনুংচে নামে দুই মারমা নারীকে কথিত মাদক অপরাধে জেল খাটতে হয়।

আজিজনগরের বেশ কয়েকজন শিক্ষিত যুবকের সাথে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা মনে করেন, ‘মাদক অভিযানের আসল উদ্দেশ্য হলো আজিজনগর থেকে মারমাদের উচ্ছেদ করে তাদের জমিজমা বেদখল করা। তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে রাখা, যাতে তারা হয়রানি অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক সময় কম দামে তাদের জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।’ তাদের মতে বাঙালিদের একটি স্বার্থান্বেষী মহল চায় না বাজারের মধ্যে বাঙালিদের পাশে একটুখানি জায়গায় একটি মারমা পাড়া থাকুক।

তারা বলেন, মদ চোলাই বা উৎপাদন ও বিকিকিনি তো কেবলমাত্র আজিজনগরে হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বত্র হয়ে থাকে। ‘কই, অন্য কোথাও তো মদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সোচ্চার হতে দেখা যায় না। প্রতি বছর বান্দনবানে রাজপূন্যায় মেলার নামে জমজমাট মদ ও অশ্লীল নাচের আসর বসে। রাজপূন্যা এখন মদের মেলা ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু কই, সেখানে তো পুলিশ ও র‌্যাবকে মদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে শোনা যায় না।’

তারা স্বীকার করেন বাঁচার তাগিদে আজিজনগর হেডম্যান পাড়ায় কিছু মারমা পরিবারকে মদ চোলাই ও বিক্রি করতে হয়। কারণ এ ছাড়া তাদের জীবিকার আর অন্য কোন অবলম্বন নেই। এক সময় এলাকার মারমারা পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বিড়ি-সিগারেট ফ্যাক্টরীতে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তারা হঠাৎ গণহারে বেকার হয়ে যান। অন্যদিকে ডেসটিনি তাদের শত শত একর জমি কেড়ে নিয়ে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ যেমন ইউক্লিপটাস, একাশিয়া ইত্যাদিক রোপন করে। সরকারও তাদের জন্য বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করেনি। এমন কোন প্রাইভেট কোম্পানী বা সংস্থাও নেই যেখানে তাদের কর্মসংস্থান হতে পারে। এমনকি এলাকায় দিনমজুরের কাজেরও অভাব রয়েছে। এই চরম দুরাবস্থায় তারা মদ বিক্রি করে জীবন ধারণ করা ছাড়া আর কোন উপায় খুঁজে পাননি। তাদের এই করুণ অর্থনৈতিক দুরাবস্থা দেখে বান্দরবান জেলা পরিষদ গত বছর ২০ পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু পরিষদের এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তা দারিদ্র্যের রুক্ষ মরুভূমিতে এক ফোঁটা বারিবিন্দুর মতো।

আজিজনগর হেডম্যান পাড়ার মারমাদের এক কথা, ‘মদ উৎপাদনে আমাদের ইচ্ছে নেই। বৌদ্ধ ধর্মীয় মতেও আমাদের মদ উৎপাদন, বিক্রি ও পান করা নিষিদ্ধ। কিন্তু বাঁচার জন্য আমাদের আর কী করার আছে। আমাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক, আমরা এখনই মদ তৈরি বন্ধ করবো। আর না হলে আমাদের জমি জমা ফিরিয়ে দেয়া হোক, আমরা চাষবাস করে খাব।’ তারা মাদক বিরোধী অভিযানের নামে হয়রানি ও তাদেরকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র বন্ধ করারও দাবি জানান।
—————

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.