সাভার প্রবাসী শ্রমজীবী ফ্রন্টের সম্মেলন অনুষ্ঠিত : পাহাড় ও সমতলের শ্রমজীবী জনতার ‍বৃহত্তর ঐক্যর আহ্বান

0
2

ঢাকা : সাভার প্রবাসী শ্রমজীবী ফ্রন্টের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ মে (শুক্রবার) ঢাকার বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টায় সম্মেলন শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সাভার শ্রমজীবী ফ্রন্টের সভাপতি প্রমোদ জ্যোতি চাকমা। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা ফয়জুল হাকিম, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি ও বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা জহিরুল ইসলাম, ইউপিডিএফ সংগঠক (সদ্য কারামু্ক্ত) প্রদীপ ময় চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের দপ্তর সম্পাদক রিপন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি বিনয়ন চাকমা।

# মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিবৃন্দ : বাম থেকে ‘টাফ’ সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নেতা ফয়জুল হাকিম, সাভার শ্রমজীবী ফ্রন্ট সভাপতি প্রমোদ বিকাশ চাকমা, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন-এর সভাপতি ও বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা জহিরুল ইসলাম ও ইউপিডিএফ সংগঠক (সদ্য কারামুক্ত) প্রদীপ ময় চাকমা।

`জাগো জাগো সর্বহারা.. আন্তর্জাতিক সংগীত’ বাজিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। এরপর শ্রমিক কৃষক ও মেহনতি জনতার মুক্তির সংগ্রামে শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন-এর সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা ফয়জুল হাকিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী যে নির্যাতন চালাচ্ছে সেখানে হাসিনা, খালেদা ও এরশাদ সবাই সম্পৃক্ত। সে নির্যাতন পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে করা হচ্ছে। কাজেই তা মোকাবেলা করতে হলে দেশের সকল শ্রমিক শ্রেণি এবং সারা দেশের নিপীড়িত জাতিসমূহের ঐক্য দরকার।

তিনি আরো বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ চেপে বসেছে। এই ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলা করতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের তরুণ, ছাত্র, শ্রমিক, ‍যুব, সংস্কৃতি কর্মী, নারী, বিপ্লবী এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

# বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা ফয়জুল হাকিম

সরকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের নামে র‌্যাব যে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করছে তা একটা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বর্বর গণহত্যা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন-এর সভাপতি ও বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা পাহাড়ি-বাঙালি মিলেমিশে যুদ্ধ করেছিলাম। আমরা আশা করেছিলাম স্বাধীন একটা দেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলবে, একটা গণতান্ত্রিক সরকার দেশ চালাবে, সেই সরকার দেশের সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সকল জাতিসত্তার স্বীকৃতি দেবে। সকল জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের ব্যবস্থা করবে। সকল ভাষা বিকাশের ব্যবস্থা করবে। মাতৃভাষায় সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তা শিক্ষা লাভ করবার অধিকার থাকবে। সেরকমের একটা সুন্দর রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা আমরা কল্পনা করেছিলাম। সেটা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, সংখ্যালঘু জাতিসত্তাকে শোষণ করবার জন্য সংখ্যাগুরুর উগ্র জাতীয়তাবাদ লাগবে। এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেয়ার নানা আয়োজন চলছে। যখনি সংখ্যাগরিষ্ট জাতিসত্তার উগ্র জাতীয়তা তৈরী করতে হয়, তখনি সংখ্যালঘিষ্ট নানা জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে হেয় করে, মার খেতে থাকে। শুধুমাত্র পাহাড়ে নয়, সমতলেও নানান আদিবাসীরা তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু সমতলের চাইতে পাহাড়ের একটু তফাৎ তৈরী হয়েছে। পাহাড়ে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে কোথাও যুদ্ধ লাগলে যুদ্ধ করা, যুদ্ধ না লাগলেও তাঁরা বসে বসে একটা বেতন পায়। আর যুদ্ধ লাগলে তাঁদের বেতন ভাতা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

# বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন-এর সভাপতি ও বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা জহিরুল ইসলাম

তিনি বলেন, কারখানার শ্রমিকেরা, বিশেষ করে ডাইং সেক্টরে যেখানে এসিড ডাই ব্যবহার করা হয়, সেখানকার শ্রমিকদের অনেক ঝুঁকি থাকে। কিন্তু তাঁদেরকে কোন প্রকার ঝুঁকি ভাতা দেয়া হয় না। কিন্তু সেনাবাহিনী যদি একটি এলাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতি আছে বলে প্রমাণ করতে পারে তখনি তাঁদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণ তিনগুণ হয়ে যায়। ফলে পৃথিবীর সবচাইতে শান্তিময় এলাকাটিতে যদি সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা হয়, তাহলে তাঁরা চাইবে সেখানে কিভাবে একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে এরকম একটা দেখানো যায়। কেননা এরকমটা দেখাতে পারলে তাঁদের বেতনটা দ্বিগুণ হয়ে যাবে, নানা রকম ঝুঁকি বা যুদ্ধ পরিস্থিতি ভাতা পাওয়া যাবে। তাই সেনাবাহিনীর মনে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির একটা বাসনা সবসময় থাকে। যেখানে দেশের একজন শ্রমিক সাধারণ চিকিৎসা ভাতা পান না, সেখানে একজন সেনাবাহিনীর গোঁফ রাখার ভাতা আছে। এইরকম নানা কারণে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধ পরিস্থিতি আছে সেটা প্রমাণ করতে চায়। এবং সেটা প্রমাণ করার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে সংখ্যালঘু মানুষকে নিরাপত্তাহীন করতে চায়।

তিনি পাহাড় ও সমতলের শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যের দরকার উল্লেখ করে বলেন, সকল শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে। মালিক গোষ্ঠীকে মোকাবেলা করতে হবে। শ্রমিকের কর্মস্থলের নিরাপত্তার দাবি আদায় করতে হবে, রুটি-রুজি ও বাসস্থানের দাবি আদায় করতে হবে।

# শহীদদের স্মরণে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হচ্ছে

শ্রমিক আন্দোলনের সাথে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের কোন বিরোধ নাই উল্লেখ করে করেন তিনি বলেন, শ্রমিকরা পাহাড়ের স্বায়ত্তশাসন চাইতে পারে, পাহাড়ে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার চাইতে পারে, এমনকি বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ সাংবিধানিক অধিকার চাইতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইউপিডিএফ সংগঠক প্রদীপময় চাকমা বলেন, সাভার প্রবাসী শ্রমজীবী ফ্রন্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান বাস্তবতায় যুগোপযোগী একটি সংগঠন। এ ধরনের সংগঠন অনেক আগে গঠন করা উচিত ছিল।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে ইপিডিএফ-এর বিরুদ্ধে নব্য মুখোশ বাহিনীকে ব্যবহার করছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই পার্বত্য চট্টগ্রামে যে তিনটি আসন রয়েছে তা নিশ্চিত করতে একটি চিহ্নিত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মাঠে নামানো হয়েছে। ইউপিডিএফ যেহেতু পার্বত্য নির্বাচনী রাজনীতিতে একটা বড় ফ্যাক্টর, তাই দলটির বিরুদ্ধে  ক্ষমতাসীনরা নব্য মুখোশ বাহিনী ও জেএসএস সংস্কারবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে ব্যবহার করছে।

তিনি আরো বলেন, রাঙামাটি জেলার নান্যাচরে শক্তিমান চাকমা ও তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা-দের রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়ার পর সরকার যৌথ বাহিনী অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। শধু তাই নয়, ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত বিকাশ খীসাসহ বহু নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলা ও ইউপি চেয়ানম্যান-মেম্বারসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলা ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক। এর সাথেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে। যৌথ বাহিনী অভিযানের আড়ালে ইউপিডিএফ-এর সাংগঠনিক এলাকায় সেনা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাঁদের সাথে নব্য মুখোশ বাহিনী ও জেএসএস সংস্কারবাদী সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের যুক্ত করেছে। তিনি অবিলম্বে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত সেনা অভিযান বন্ধ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অগণতান্ত্রিক ১১ দফা নির্দেশনা বাতিল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অঘোষিত সেনা শাসন বাতিলের দাবি জানান।

সভা শেষে একটি র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি তোপখানা রোড থেকে শুরু হয়ে পুরানপল্টন মোড় প্রদক্ষিণ শেষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মুখে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
________
সিএইচটিনিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.