সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে

সেনাবাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে মানিকছড়িতে তিন সংগঠনের বিক্ষোভ সমাবেশ

0
0

মানিকছড়ি(খাগড়াছড়ি) : সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল ও  স্ব স্ব জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে সেনাবাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে খাগড়াছড়ি মানিকছড়ি উপজেলার দুই স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি), গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম(ডিওয়াইএফ) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন(এইচডব্লিউএফ) মানিকছড়ি থানা শাখা।

আজ শুক্রবার (২৯ জুন ২০১৮) সকালে উপজেলার ধর্মঘর ও জামতলা এলাকায় পৃথকভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর টহল জোরদার, যাত্রীবাহী গাড়ি তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছেন।

‘পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল কর, সংবিধানে স্ব স্ব জাতিসত্তার স্বীকৃতি দাও’ এবং ‘সেনা ক্যম্প সম্প্রসারণ, ভূমি বেদখল, যৌথ অভিযানের নামে ধরপাকড়, হয়রানি, লুটপাট, নারী নির্যাতন, খুন-গুম-অপহরণ বন্ধ কর এবং ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা তুলে নাও’ এসব দাবি সম্বলিত শ্লোগানে আজ সকাল ১১টায় মানিকছড়ি উপজেলা সদরের ধর্মঘর এলাকায় তিন সংগঠন সমাবেশ করতে চাইলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা প্রদান করে। এতে সমাবেশে আগত ১ হাজারের অধিক ছাত্র-যুব-নারী ও জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে সেনা-পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। জনতার প্রতিরোধের মুখে পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় সেখানে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর সংগঠক ও পিসিপি’র সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ক্যাহ্লাচিং মারমা. গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রতন স্মৃতি চাকমা, পিসিপি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক সমর চাকমা প্রমুখ।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় একই দাবিতে উপজেলার জামতলা এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালে সেনা-পুলিশ বাধা প্রদান করলে বিক্ষোভকারীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জনতার প্রতিরোধের ফলে সেনা-পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফ-এর লক্ষীছড়ি উপজেলা ইউনিটের সংগঠক ও পিসিপি’র সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আপ্রুসি মারমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রুপেশ চাকমা ও পিসিপি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সদস্য নরেশ ত্রিপুরা প্রমুখ।

বক্তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে সেনা-পুলিশের বাধাদান ও অগণতান্ত্রিক আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

ইউপিডিএফ-এর সংগঠক ক্যাহ্লাচিং মারমা তার বক্তব্যে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ করার অধিকার সকলের রয়েছে। এটি সংবিধান স্বীকৃতি একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী এই গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করে সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান করছে। তিনি সমাবেশে বাধা প্রদানকে সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের নগ্ন রূপ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি আরো বলেন,  “চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ সকল সংখ্যালঘু জাতিগুলো কখনো বাঙালি হতে পারে না। একটি জাতি তার নিজের পরিচয় নিজেই ঠিক করবে। তার পরিচয় লুপ্ত করে দেয়ার অধিকার কারোর থাকতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী তথা আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা না করে ২০১১ সালের ৩০ জুন  বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাসের মাধ্যমে এদেশের ভিন্ন ভাষাভাষী সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের উপর উগ্র বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সরকার বাঙালি ছাড়া অন্য জাতিসত্তাগুলোকে সাংবিধানিকভাবে অস্বীকার করছে”।

সমাবেশে অন্যান্য বক্তারা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সমতলে বন্দুক যুদ্ধের নামে ক্রসফায়ার দিয়ে যেভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে একই কায়দায় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পার্বত্য চট্টগ্রামে নব্য মুখোশ বাহিনী সৃষ্টি করে ইউপিডিএফ-এর নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের হত্যা, যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে অন্যায় ধরপাকড়, নারী নির্যাতন, মিথ্যা মামলা দিয়ে  হয়রানি, ঘরবাড়ি তল্লাশি-লুটপাট চালানো হচ্ছে।

সরকার পাহাড়িদের অস্তিত্ব রক্ষার ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেয়ার নানা ষড়যন্ত্র করছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে নতুন করে সেনা ক্যাম্প সম্প্রসারণসহ ভূমি বেদখল করার পাঁয়তারা চলছে। রামগড়ে পাহাড়িদেরকে নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের হুমকি ও গুইমারায় বৌদ্ধ বিহার নির্মাণে বাধা প্রদান করা হচ্ছে।

বক্তারা আজকে আহুত বিক্ষোভ সমাবেশে সেনা-পুলিশের বাধার প্রতিবাদে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় এলাকার জনসাধারণের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে সরকারের সকল অন্যায়-অবিচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সবত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম জোরদার করার আহ্বান জানান।

সমাবেশ থেকে বক্তারা, অবিলম্বে সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে দেশের সকল সংখ্যালঘু জাতিসমূহের স্ব স্ব জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণার দাবিসহ যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে খুন-গুম-অপহরণ, অন্যায় ধরপাকড়, হয়রানি, নারী নির্যাতন ও সেনা ক্যাম্প সম্প্রসারণ বন্ধ করা এবং ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা তুলে নেয়ার দাবি জানান।
—————–
সিএইচটিনিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.