শহীদ অমর বিকাশ স্মরণে কাল ঢাকায় লাঠি মিছিল, খাগড়াছড়িতে টানটান উত্তেজনা

সেনাবাহিনী বিতর্কিত হচ্ছে, একশ্রেণীর সেনা কর্মকর্তা মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ কলঙ্কিত করতে চাইছে–জনৈক সেনা কর্মকর্তা

0
0

ডেস্ক রিপোর্ট ।। ‘পাকিস্তানিমনা সেনা কর্মকর্তাদের অপতৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক হোন’–এ আহ্বান জানিয়ে আগামীকাল ৭ মার্চ বিকাল ৩ টায় ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাঠি মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন লড়াকু সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ-হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম। খাগড়াছড়িতে শহীদ অমর বিকাশের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণসহ তিন সংগঠন বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য তিন সংগঠনের কর্মসূচির ব্যানারের ক্যাপশনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে “ ’৯৬-এ সেনাসৃষ্ট ‘মুখোশ’ হটিয়েছি, এবার হটাবো ‘নব্যমুখোশ’ পাকিস্তানিমনা সেনা কর্মকর্তাদের অপতৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক হোন! গুণ্ডাপাণ্ডা লেলিয়ে দিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না, শহীদ অমর বিকাশ স্মরণে ‘মুখোশবাহিনী’ দমনের ২২তম বার্ষিকীতে সেনাসৃষ্ট দুর্বৃত্ত প্রতিরোধের প্রত্যয়ে লাঠি মিছিল”।

উল্লেখ্য, ২২-২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে আহূত ছাত্র-যুব-নারী কনভেনশনে উক্ত কর্মসূচি গৃহীত হয়।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী কর্ণেল (অব:) অলি আহম্মদের প্রত্যক্ষ মদদে ও খাগড়াছড়ি ২০৩ সেনা ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে সমাজের বখাটে যুবকদের নিয়ে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি করা হয়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মুখোশবাহিনী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসের মাধ্যমে এলাকা পরিস্থিতি অস্থির করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমাধান বাধাগ্রস্ত করাই ছিল এর লক্ষ্য (বর্তমানেও একই ধারায় ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে)।

১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ সেনাসৃষ্ট মুখোশবাহিনী দুই পিক-আপ সেনা সহায়তায় এক রাজনৈতিক কর্মীকে অপহরণ করতে গেলে স্টেডিয়ামের সন্নিকটে স্থানীয় জনতা কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়। সেনা জওয়ানরা বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছুঁড়লেও তাতে সক্ষম হয় নি। এ সময় উত্তর খবংপুজ্জ্যার অমর বিকাশ চাকমা সেনা জওয়ানদের গুলিতে শহীদ হয়। এতে জনতা দ্বিগুণ ক্রোধে জ¦লে উঠে সেনাদের ধাওয়া করে ক্যান্টনমেন্টের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। দিবসটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলন সংগ্রামে সেনাসৃষ্ট মুখোশ প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পরিগণিত। প্রতি বছরই পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনরত লড়াকু সংগঠনসমূহ দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে থাকে।

এ বছরের শুরুতে গত ৩ জানুয়ারি ইউপিডিএফ সংগঠক মিঠুন চাকমাসহ পাঁচ জন ইউপিডিএফ নেতা-কর্মী সেনাসৃষ্ট সশস্ত্র দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারানোর ফলে দিবসটি বহুমাত্রিক গুরুত্ব লাভ করেছে। সে কারণে তিন লড়াকু সংগঠন ঢাকা ও খাগড়াছড়িতে গুরুত্বের সাথে কর্মসূচি পালন করবে।

এখানে আরও উল্লেখ্য, গত বছর ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়ি সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে সেনা প্রহরায় এক তথাকথিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ’৯৬-এর কায়দায় খাগড়াছড়ি ২০৩ ব্রিগেড সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের মাঠে নামায়। এবার স্থানীয় জনতা তাদের নাম দিয়েছে ‘নব্য মুখোশবাহিনী’।

# মুখোশ বাহিনীর বিরুদ্ধে জনতার লাঠি মিছিল। ছবিটি ১৯৯৬ সালে তোলা। # ফাইল ছবি

জানা গেছে, খাগড়াছড়িতে পিসিপি-এইচডব্লিউএফ ও ডিওয়াইএফ-এর পূর্ব ঘোষিত ৭ মার্চের কর্মসূচি বানচাল করতে ২০৩ সেনা ব্রিগেডের মেজর জি-টু মেজর নাজমুল সালেহীন সৌরভ নামের এক সেনা কর্মকর্তা ভীষণ তৎপর হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় সেনা টহল বাড়ানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেনাদের নীলনক্সার সাথে যুক্ত একটি আঞ্চলিক দলের চিহ্নিত কয়েক জন্য ব্যক্তিও এতে দৃষ্টিকটুভাবে সক্রিয় বলে বিশেষ সূত্রে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাগড়াছড়ি সদর জোন-এর পদস্থ এক সেনা কর্মকর্তা ক্ষোভের সাথে স্থানীয় কয়েক জন ব্যক্তিকে জানান যে, মূলত পাকিস্তানপন্থী ও বিএনপি-জামাত ঘেঁষা একশ্রেণীর সেনা কর্মকর্তা শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণকে কলঙ্কিত করতে এ ধরনের কারসাজি করছে, যার সাথে অধিকাংশ সেনা কর্মকর্তা একমত নন। তিনি আরও জানান অস্ত্র গুঁজে দিয়ে গ্রেফতারের মাধ্যমে এরা নিজেদের প্রমোশন হাতিয়ে নেয়া ও পাহাড়ে অপারেশনের গোপন বাজেট আত্মসাৎ করার মতলবে এ ধরনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্র গড়ে তুলেছে। তিনি বেশ ক্ষোভের সাথে জানান যে, এতে মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার লাভ হলেও আখেরে সেনাবাহিনীই বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। চাকুরির কারণে তিনি অনেক বিষয়ে মুখ খুলতে পারছেন না বলেও জানিয়েছেন।
রাঙ্গামাটি ব্রিগেডেও সদর জোন ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে নব্য মুখোশদের নিয়ে মতভেদ চরমে পৌঁছেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। স্মর্তব্য যে, ’৯৬ সালে মুখোশবাহিনীর হোতা খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের তৎকালীন জি-টু মেজর মেহবুব দুর্নীতির দায়ে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়। পরে পদচ্যুত মেহবুব ঢাকা উত্তরায় দাগী অপরাধীচক্রের সাথে যুক্ত হয় এবং অপহরণ করতে গিয়ে মাইক্রোবাসসহ ধৃত হয়ে তার সাজা হয়। সমাজে ধিক্কৃত ঘৃণিত মুখোশদের পরিণতি হয় করুণ।

এদিকে পিসিপি খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমল ত্রিপুরার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিএইচটিনিউজ ডটকম-এর প্রতিনিধিকে যে কোন মূল্যে ২২-২৩ ফেব্রুয়ারি কনভেনশনে ঘোষিত কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান। তিনি যে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য খাগড়াছড়ি ২০৩ ব্রিগেড ও চিহ্নিত জাতীয় বেঈমানদের দায়-দায়িত্ব নিতে হবে বলে সতর্ক করে দেন।

তিন সংগঠনের কনভেনশন প্রস্তুতি কমিটির এক নেতা ক্ষোভের সাথে সিএইচটিনিউজ ডটকম’র প্রতিনিধির নিকট এ অভিমতও ব্যক্ত করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি যেভাবে গড়াচ্ছে তাতে প্রয়োজনে ষড়যন্ত্রের দূর্গ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও-এর মতো কর্মসূচি দিতে হতে পারে। তখন যদি ডজন ডজন অমর বিকাশ হতে হয়, তারজন্যও তিন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রস্তুত বলে জানান।
_______
সিএইচটিনিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্রউল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.