ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন গণসংগঠনের সংবাদ সম্মেলন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গণবিরোধী ১১দফা নির্দেশনা প্রত্যাহারের দাবি

0
1

সিএইচটি নিউজ ডটকম
DSC01509ঢাকা: দেশীয় ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির আলোকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন গণতান্ত্রিক সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ), পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ) ।  আজ মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) সকাল ১১.১৫ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের দো’তলাস্থ ছোট হলরুমে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গণবিরোধী ১১ দফা নির্দেশনা প্রত্যাহার সহ ৬ দফা দাবি জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সিমন চাকমা। এছাড়া এতে আরো উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরম (ডিওয়াইএফ)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি মাইকেল চাকমা, ডিওয়াইএফ-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অংগ্য মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিপুল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন এর কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা এবং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি থুইক্যসিং মারমা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য শেষে তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, ’৭১ সালে নিরস্ত্র সাধারণ জনগণের ওপর নির্বিচারে হামলা, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা-খুন-গুম-লুটপাট-মা-বোনের ইজ্জতহরণ; রাজাকার-আল বদর ইত্যাদি জল্লাদ বাহিনী সৃষ্টি, বিহারীদের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ও উস্কে দিয়ে বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং মানবতাবিরোধী নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার ঘৃণ্য অপরাধের দায়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও সরকার দায়ী–এজন্য এদেশের জনগণের নিকট পাকিস্তান সরকারের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। আজ পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাব তা করেনি। অথচ সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী প্রকাশ্যে যে মন্তব্য করছেন, তা যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধী অপকর্মের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সামিল, এটা মেনে নেয়া যায় না।DSC01515

সংবাদ সম্মেলন থেকে তাঁরা প্যালেস্টাইনি জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন জানান এবং ২৯ নভেম্বর প্যালেস্টাইন সংহিত দিবসে প্যালেস্টাইনের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। এছাড়া সমতলের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের জন্য আলাদা ভূমি কমিশন গঠনপূর্বক তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলন থেকে মিডিয়া ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির নিকট আহ্বান পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে খুনী সেনা কর্মকর্তাদের টিভি টক শো, পত্রিকার কলামে আশ্রয় না দিয়ে তাদের বয়কট করার আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলন জেলা পরিষদ কর্তৃক দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করা; রাঙ্গামাটিতে মেডিক্যাল কলেজ ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধার বন্দোবস্ত করা; আটককৃত নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জারিকৃত গণবিরোধী ১১দফা নির্দেশনা বাতিল করা; বগাছড়িতে ১৬ ডিসেম্বর হামলাকারী সেনা কর্মকর্তা ও জোয়ানদের বিচার ও শাস্তি প্রদান এবং গুইমারা রিজিয়নের সাম্প্রদায়িক সেনা কর্মকর্তা তোফায়েল আহম্মেদ সহ উগ্র সাম্প্রদায়িক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে বাইরে বদলী করার দাবি জানানো হয়েছে।

নীচে সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো:

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাবলী নিয়ে তিন গণতান্ত্রিক সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন
২৪ নভেম্বর ২০১৫
জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা
গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ), পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)

প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা,
আপনারা আমাদের সংগ্রামী অভিবাদন আর আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
আমরা এমন এক সময়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি যখন দুই শীর্ষ মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা কার্যকরের মধ্য দিয়ে ন্যায় বিচার পেয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তান-পরিবার পরিজন দীর্ঘ চার দশক পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, খুনী অপরাধী গণশত্রুদের বিচার হচ্ছে দেখে নতুন প্রজন্ম সন্তোষ প্রকাশ করছে, এমনি সময়ে পাকিস্তান সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে মন্তব্য করে আবারও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আমরা পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির নিন্দা জানাই। ’৭১ সালে নিরস্ত্র সাধারণ জনগণের ওপর নির্বিচারে হামলা, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা-খুন-গুম-লুটপাত-মা-বোনের ইজ্জতহরণ; রাজাকার-আল বদর ইত্যাদি জল্লাদ বাহিনী সৃষ্টি, বিহারীদের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ও উস্কে দিয়ে বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং মানবতাবিরোধী নৃশংস হত্যাকা- সংঘটিত করার ঘৃণ্য অপরাধের দায়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও সরকার দায়ী–এজন্য এদেশের জনগণের নিকট পাকিস্তান সরকারের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। আজ পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাব তা করে নি। অথচ সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী প্রকাশ্যে যে মন্তব্য করছেন, তা যুদ্ধাপরাধী মানবতা বিরোধী অপকর্মের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সামিল, এটা মেনে নেয়া যায় না।

আমরা ’৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে গভীরভাবে সম্মান জানাই। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তান-পরিবার পরিজনসহ নির্যাতিত নারী ও স্বজনহারা মানুষের মর্মবেদনা গভীরভাবে উপলদ্ধি করি, আমরা তাদের সমব্যথী এবং তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছি। বিপরীতে যারা এদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খার বিরোধিতা করেছিল, তাদের ধিক্কার ও ঘৃণা জানাই।

বিশ্বের যে প্রান্তে যেখানে সংঘাত, হানাহানি, ধ্বংসযজ্ঞ চলে, সেখানে সবচে’ শিকার হয় দুর্বলরা–তাদের মধ্যে নারী-শিশু-শারীরিকভাবে অক্ষম এবং সংখ্যালঘু ও ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠী। ’৭১ সালে যে হত্যাকা- হয়েছিল, এখন যেমন মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান ও আফ্রিকায় হচ্ছে–তা বিশ্বাবসীর নজর কেড়েছে। বিশেষ করে ৪ বছরের অবোধ শিশু আইলানের তুরস্কের সমুদ্র উপকূলে পড়ে থাকার দৃশ্য গোটা বিশ্বিবিবেককে নাড়া দিয়েছিল। বাস্তুহারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল মানবতাবাদী বিবেক, সাহায্যের জন্য ছুটে গিয়েছিল বিভিন্ন দেশের সাহায্য সংস্থা। বিপন্ন মানুষের আহ্বানে সাড়া দেয়াই মানবতা, এটাই মানুষের ধর্ম!

সাংবাদিক বন্ধুরা,
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে,  আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়তই মানবতা বিরোধী অনেক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটছে। যা সময় মত প্রকাশ পায় না, প্রায় ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যায়। সরকারের কাছে সে সব গুরুত্বহীন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত, এটা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে আমরা মনে করি। যা আমরা যথা সময়ে উল্লেখ করবো।

আমরা দারুণ উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি, সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দাবি করে দেশের শাসন ক্ষমতা নিজেদের একচেটিয়া কারবারে পরিণত করতে চাইছে। বিশেষত গেল ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর ফলে সরকারের এ প্রবণতা বেড়েছে। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ফ্যাসিবাদের বীজ, অতীতের অভিজ্ঞতা তাই বলে। কিছুদিন আগে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ ফেইসবুক ও ভাইবার বন্ধ রয়েছে। সরকার দিন দিনই অসহিষ্ণু ও মারমুখী হয়ে উঠছে। মেডিক্যাল কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি ওপেনসিক্রেট, অথচ সরকার তা পর্যন্ত স্বীকার করতে ভয় পায়। মেডিক্যাল কলেজে পুন:ভর্তির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের যেভাবে মারধর করা হয়েছে, তা উপনিবেশিক আমলের পুলিশ বাহিনীর চরিত্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়–এসব জবরদস্তির নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গণবিরোধী ১১দফা নির্দেশনা জারি থাকায় সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ, যা আমরা যথাসময়ে উল্লেখ করবো। বেতন স্কেল পুননির্ধারণের নামে সরকারি আমলাদের মর্যাদা ও বেতন বাড়িয়ে দেশের শিক্ষক সমাজের মর্যাদা অবনমিত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক নিন্দনীয়। আমরা শিক্ষকদের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাই।

আমরা জানি, ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কেবল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা যুদ্ধে অংশ নেয় নি। অংশ নিয়েছিল আরও অনেক দল, যারা অনেক সাহসী ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছিল। বরং আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে যুুদ্ধের সময় লুটপাতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে, যে কাহিনীও মানুষের অজানা নয়। যুদ্ধে বিশেষ করে সাধারণ মানুষ অপরিসীম কষ্ট ও ত্যাগ করেছিল–যা স্বাধীনতা লাভের এত বছরেও বস্তুনিষ্টভাবে প্রকাশ হয় নি। অভিযোগ রয়েছে ইতিহাস বিকৃতির, যে সরকার ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদের মত পাঠ্যপুস্তক পাল্টায়, এটা কোন জাতীয় ইতিহাস হতে পারে না। বহু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সময় মত স্বীকৃতি পান নি, বীরাঙ্গনা বলে যাদের আখ্যায়িত করা হয় তারাও বাদ পড়েছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার চাইতে বহু গুণ বেশী মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বিতরণের কাহিনী লোকের মুখে মুখেে ফেরে। প্রত্যন্ত অঞ্চল বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্তা থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তারা তো নানাভাবে উপেক্ষিত ও বঞ্চিত হয়েছিলেন। পাহাড়ি জনগণ মুক্তিযুদ্ধের সময় ও স্বাধীনতার পরে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রয়াত চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের “পক্ষাবলম্বন” করায় পাইকারিভাবে পাহাড়িদের সবাইকে পাকিস্তানের দোসর হিসেবে চিত্রিত করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল, অবর্ণনীয় নিপীড়নও চালানো হয়েছিল। এমন ভাষ্যও আমরা শুনেছি প্রয়াত চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চেয়েছিলেন, তার আত্মীয় মানিকছড়ির মঙ চিফ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। প্রয়াত ত্রিদিব রায় নিজ কাকা কোকনাদাক্ষ রায়কে প্রতিনিধি হিসেবে আগরতলায় পাঠিয়েছিলেন, তিনি আগরতলায় এক ব্যক্তির (বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা) প্ররোচনায় মুুক্তিবাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত এবং ভারতীয় বাহিনীর হাতে পাকিস্তানের চর অভিযোগ গ্রেফতার হয়েছিলেন। সে কারণে ত্রিদিব রায় আর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সাহস পান নি, পাকিস্তানিদের সাথে থেকে যান এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারেন নি। ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম ’৭১ সালে অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন। তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ সে সময় উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে মনে করত, এখনও তার ব্যাপারে পাহাড়ি জনগণ নিশ্চিত নন। এমন ভাষ্যও পার্বত্য চট্টগ্রামে চালু রয়েছে, চাকমা রাজার সাথে নানা দ্বন্দ্বের কারণে তৎকালীন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক এইচ. টি. ইমাম স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইদুর রহমানের সাথে ষড়যন্ত্র করে পাহাড়িদের মুক্তিযুদ্ধ থেকে বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন। ত্রিদিব রায় বেঁচে নেই, এইচ. টি. ইমাম প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন, তার পার্বত্য চট্টগ্রাম অধ্যায়টি বিধৃত করা দরকার বলে আমরা মনে  করি।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আগমনের কড়া নাড়ছে। যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধীদের সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে এবং হবার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও ক’জনের মামলা। এ সময় সত্য প্রকাশের স্বার্থে এ বিষয়গুলো উত্থাপন করা দরকার বলে আমরা মনে করি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
ক্ষমতাসীন সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি, ধর্মনিরপেক্ষ, সংখ্যালঘু জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল ইত্যাদি দাবি করলেও বাস্তবে এর বিপরীত ধারাই লক্ষ্যণীয়। সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিভাবে আক্রান্ত ও তাদের জায়গা-জমি ক্ষমতাসীন দলের লোকজন দ্বারা বেদখল হচ্ছে, তা কমবেশী সবার জানা। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা তুলে ধরতে চাই। দেশে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার ও সাজা হচ্ছে। এতে বিচার প্রক্রিয়ায় ক্ষেত্র বিশেষে সীমাবদ্ধতা থাকলেও, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী ছাড়া অন্য কেউ দ্বিমত করতে পারবে না। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত খোদ নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধী কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়, যা নিয়ে তেমন কোন আলোচনা সমালোচনা নেই। বিষয়টি মোটেও উপেক্ষণীয় নয় বলে আমরা মনে করি। গেল ১৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির বগাছড়িতে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পের কর্মকর্তা ঐদিন পাহাড়িদের ঘরবাড়ি জ¦ালিয়ে দিয়ে “বিজয় উৎসবে” মেতে উঠেছিল। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবার কথা আমরা জানি না। যারা দেশের মান-মর্যাদা রক্ষার্থে নিয়োজিত এবং সরকারের বিশেষ সুযোগ-সুুবিধাপ্রাপ্ত তারাই বিজয় দিবসের মাহাত্ত্য ম্লান করেছে, এ সমস্ত কার্যকলাপই তো স্বাধীনতা বিরোধী ও রাজাকারের কার্যকলাপ। লেখক প্রকাশক দীপন হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির বলেছিলেন,‘প্রশাসনের মধ্যে জামাত-শিবিরের লোক রয়েছে।’ আমরা আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, নিরাপত্তা  বাহিনীর মধ্যে একশ্রেণীর কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে নানাভাবে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করতে আপনারা ভূমিকা রাখুন। পার্বত্য চট্টগ্রামে নৃশংস হত্যাকা-সহ বিভিন্ন দুঃখজনক ঘটনার জন্য এরা দায়ী। তাদের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত অঘটন ঘটছে। গুইমারা সেনা রিজিয়নে নিযুক্ত কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল আহম্মেদ-এর মত একজন উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা প্রকাশ্যে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলেন এবং সাম্প্রদায়িকতার উস্কানি দেন। বর্তমান ঐ অঞ্চলে সেনা টহল ও ধরপাকড়ের কারণে জনজীবন দুঃসহ হয়ে উঠেছে। খোদ খাগড়াছড়ি জেলা সদরেও একই অবস্থা। ক’দিন আগে বিনা ওয়ারেন্টে দোকান থেকে লোক ধরে নিয়ে নির্যাতন করে জেলে দেয়া হয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও “অপারেশন উত্তরণ” জারি রেখে সরকার সেনা খবরদারি বজায় রেখেছে। এ বছর ৭ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে গণবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক “১১দফা নির্দেশনা” জারি করে সেনা শাসন বৈধতা দিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি অসহনীয় করে তুলেছে। জনগণের তীব্র প্রতিবাদ আপত্তি সত্ত্বেও সরকার এখনও সে নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নি। আমরা উদ্বেগের সাথে দেখতে পাচ্ছি, গণবিরোধী ঐ নির্দেশনা জারির পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়ন আগের চেয়ে তীব্রতর হয়েছে। সেনা-বিজিবি-পুলিশ স্থাপনা নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও সংস্কার জোরদার হয়েছে। অন্যায়ভাবে ধরপাকড় বেড়েছে। শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বিনা উস্কানিতে হামলা, মারধর করে নিরীহ লোকজনকে ধরে জেলে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ভূমি বেদখলও আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সেটলারের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।

প্রিয় বন্ধুরা,
আপনারা হয়ত এও অবগত আছেন যে, বৈসাবি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম সামাজিক উৎসব। এ উপলক্ষে এ বছর ১২ এপ্রিল স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে খাগড়াছড়িতে র‌্যালি আয়োজন করা হলে নিরাপত্তা বাহিনী তাতে হামলা চালিয়ে ভণ্ডুল করে দেয়। র‌্যালির ব্যানার কেড়ে নিয়ে লাঠিপেটা করে এবং দুই পিসিপি কর্মীকে ধরে নিয়ে দীর্ঘ দিন আটক রাখে।

আমরা দেখেছি, বৈসাবি ছুটির ঐচ্ছিক ছুটি বাড়ানো হয়েছে বলে সরকার প্রচার মাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার চালিয়েছিল। বাস্তবে ঐচ্ছিক ছুটি আগেও ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দাবি হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার বিশেষত্ব ও জাতিসত্তাসমূহের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে স্বীকৃতিদান স্বরূপ বৈসাবি’র তিন দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা দেয়া, এ বছরের ছুটির তালিকায় তা নেই। ঐচ্ছিক ছুটি দেখিয়ে বলতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।

বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করিয়ে আমাদের জাতিসত্তার পরিচিতি কেড়ে নেয়া হয়েছে, অন্যায় জবরদস্তিমূলকভাবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে “বাঙালি” জাতীয়তা। প্রতিবাদ সত্ত্বেও সরকার এখনও তা বাতিল করে নি। ৭ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১১ দফা নির্দেশনা জারি করে পার্বত্য চট্টগ্রামে কার্যত কায়েম করা  হয়েছে সেনা শাসন।

প্রিয় বন্ধুগণ,
আমরা দেশের গণতান্ত্রিক ধারার সাথে সম্পৃক্ত। আমরা শুধু নিজেদের দাবি-দাওয়ার জন্যই আন্দোলন করছি তা নয়, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে যে সংখ্যালঘু জাতিসত্তা রয়েছে, তাদের দাবির প্রতিও সমর্থন দিই। দেশের বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের ভাত-কাপড়ের ন্যায্য দাবির সাথেও আমরা একাত্ম এবং দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের আন্দোলনেও আমরা যুক্ত রয়েছি।

* আমরা প্যালেস্টাইনি জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন জানাই এবং ২৯ নভেম্বর প্যালেস্টাইন সংহিত দিবসে আমাদের প্যালেস্টাইনের সাথে সংহতি প্রকাশ করছি।
* সমতলের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের জন্য আলাদা ভূমি কমিশন গঠনপূর্বক তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি
* মিডিয়া ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির নিকট আহ্বান :
* পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে খুনী সেনা কর্মকর্তাদের টিভি টক শো, পত্রিকার কলামে আশ্রয় দেবেন না, তাদের বয়কট করুন!

আমাদের দাবি :
* জেলা পরিষদ কর্তৃক দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করতে হবে।
* রাঙ্গামাটিতে মেডিক্যাল কলেজ ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধার বন্দোবস্ত করতে হবে।
* আটককৃত নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।
* স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জারিকৃত গণবিরোধী ১১দফা নির্দেশনা বাতিল করতে হবে।
* বগাছড়িতে ১৬ ডিসেম্বর হামলাকারী সেনা কর্মকর্তা ও জোয়ানদের বিচার ও শাস্তি প্রদান করতে হবে।
* গুইমারা রিজিয়নের সাম্প্রদায়িক সেনা কর্মকর্তা তোফায়েল আহম্মেদ সহ উগ্র সাম্প্রদায়িক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে বাইরে বদলী করতে হবে।

ধন্যবাদ

১। মাইকেল চাকমা, সভাপতি, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম
২। অংগ্য মারমা, সাধারণ সম্পাদক, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম
৩। সিমন চাকমা, সভাপতি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)
৪। বিপুল চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)
৫। নিরূপা চাকমা, সভানেত্রী, হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)
৬। থুইক্যসিং মারমা, সাবেক সভাপতি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)
——————————

সিএইচটিনিউজ.কম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.